বইমেলার কাকভেজা দর্শক এবং কিছু কথা

Send
রেজানুর রহমান
প্রকাশিত : ১৫:০৬, ফেব্রুয়ারি ২৮, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:১১, ফেব্রুয়ারি ২৮, ২০১৯

রেজানুর রহমানমানলাম আগে থেকে সবকিছু বলে দেওয়া ছিল। আবহাওয়ার পূর্বাভাস দেখে সতর্ক করে দেওয়া হয়েছিল একুশে বইমেলার সকল প্রকাশক ও স্টল মালিককে। বলা হয়েছিল বইমেলায় ঝড়-বৃষ্টির ধাক্কা আসতে পারে। কাজেই সবাই সতর্ক থাকবেন। ঝড় বৃষ্টি হলে নিজের দায়িত্ব নিজে নেবেন। এমনই আগাম সতর্কবাণী ছিল একুশে বইমেলায়। কিন্তু একুশে বইমেলা বলে কথা। বছরের একমাত্র আন্তরিক আয়োজন। শুধু বই কিনবো বলে নয়, প্রিয়জনের সঙ্গে দেখা হবে, দুর্দান্ত সময় কাটাবো বন্ধুদের সঙ্গে। তাই সকলেই সেজেগুজে পরিকল্পনা সাজিয়েই বাংলা একাডেমি আয়োজিত বইমেলায় আসেন। সেখানে বৃষ্টি হোক অথবা ঝড় হোক, কোনও কিছুকেই যেন বাধা মনে হয় না। আর বাধা হবেইবা কেন? একুশে বইমেলা বলে কথা। যেকোনও প্রতিকূল পরিবেশেও সেখানে যাওয়ার কথা ভাবেন অনেকে। সবচেয়ে বড় কথা বাংলা একাডেমি একুশে বইমেলার আয়োজক। এই একটি প্রতিষ্ঠানের প্রতি দেশের মানুষের এখনও অনেক বেশি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা আছে। তাই বাংলা একাডেমি কোনও কিছুর আয়োজন করলেই সকলে সেই আয়োজনকে গুরুত্ব দেয়। ভাবনাটা এমন- এটাতো আমার বা আমাদের অনুষ্ঠান। কাজেই যত ঝামেলা হোক যাবোই যাবো...।

তবে হ্যাঁ, আবহাওয়ার সতর্কবাণী অনেকেরই মাথায় ছিল। বৃষ্টি হতে পারে। ২৭ ফেব্রুয়ারি সকালের আবহাওয়া দেখে অনেকেই হয়তো সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, সারা দিনে কোথাও বের হবেন না। বইমেলায়ও যাবেন না। কিন্তু দুপুরে আকাশ যেন হঠাৎ করে ফর্সা হয়ে গেলো। মনে হচ্ছিল আজ  আর আকাশ ফুঁড়ে বৃষ্টি নামবে না। অনেকেরই মন আনন্দে নেচে উঠলো। আর বইমেলার রয়েছে মাত্র দুই দিন। যাই একবার মেলাটাকে দেখে আসি। এক মাসের প্রিয় বইমেলার প্রতি একটা মায়া পড়ে গেছে। যাই একটু বিদায় জানিয়ে আসি। যদি বৃষ্টি হয়? এমন আশঙ্কা মনে হতেই কেউ কেউ হয়তো ভেবেছিলেন, বৃষ্টি হলে হবে। বৃষ্টিকে ডরাই নাকি? তাছাড়া আমাদের প্রিয় বাংলা একাডেমি কর্তৃপক্ষ তো আছে। তারা তো আর তাড়িয়ে দেবে না। এর আগে সতর্ক করে দিলেইবা কী, বিপদে পড়লে পাশে তো দাঁড়াবে!

২৭ ফেব্রুয়ারি দুপুরের দিকে একুশে বইমেলায় হঠাৎ করেই ক্রেতা-দর্শকের ঢল নামে। তখনও যে আকাশ পুরোপুরি পরিষ্কার হয়েছে তা বলা যাবে না। আকাশের মন ভার দেখে মনে হচ্ছিলো যেকোনও সময়ই আবার বৃষ্টি নামবে। ঝড়ো হাওয়াও বইতে পারে। তবুও বইমেলায় মানুষ আসছে দলে দলে। বিকেলে বইমেলার উভয় অংশই জনসমুদ্রে পরিণত হলো।

বইমেলার মূলমঞ্চে নির্ধারিত আলোচনা পর্বে আলোচক ছিলাম সেদিন। ‘বইমেলা: উদ্যোগ ও অর্জন’ শীর্ষক আলোচনা সভায় আরও আলোচক ছিলেন বিশিষ্ট প্রকাশক ওসমান গণি, বইমেলার সদস্য সচিব জালাল আহমেদ ও কবি ফরিদ আহমেদ দুলাল। সভাপতিত্ব করবেন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম। মূল প্রবন্ধ পাঠ করবেন শাহিদা খাতুন। মঞ্চে সভাপতির পাশে বসে আছি। আকাশ কালো হচ্ছে বুঝতে পারছি। বিকেল ৪টাকেও মনে হচ্ছিল এ বুঝি সন্ধ্যাকাল। পাঁচটার দিকে ঝুমবৃষ্টি শুরু হলো। চারদিকে অন্ধকার নেমে এসেছে। মেলার দর্শনার্থীরা যে যেভাবে পারে পড়িমড়ি করে আলোচনা সভার মূল প্যান্ডেলের নিচে খালি চেয়ার দখল করে বসলেন। আলোচনা সভার প্রতি কারোই তেমন আগ্রহ ছিল না। কিন্তু বৃষ্টির হাত থেকে বাঁচতে প্যান্ডেলের নিচে চেয়ারে বসে সকলেই মনোযোগী শ্রোতা হয়ে গেলেন। বৃষ্টি কিন্তু থামছেই না। বরং বৃষ্টির প্রকোপ বাড়ছে। আলোচনা সভার প্যান্ডেলের নিচে যারা এসে আশ্রয় নিয়েছিলেন তাদের পায়ের নিচে বৃষ্টি পানি এসে জমা হচ্ছে। তবুও কেউ নড়ছেন না। কারণ, যাওয়ার তো কোনও জায়গা নেই। মঞ্চে বসেই দেখতে পারছি ছোট ছোট বাচ্চাকে কোলে নিয়ে বসে আছেন অনেকে। আহারে! বৃষ্টি যদি না থামে তাহলে এদের কী হবে! মঞ্চে থেকে বইমেলার বৃষ্টি আক্রান্ত করুণ পরিবেশ দেখা যাচ্ছিল। কোনও স্টলেই বৈদ্যুতিক বাতি জ্বলছে না। সভাপতির আসনে বসা বিশিষ্ট কথাসাহিত্যিক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম অস্থির কণ্ঠে বললেন, একে তো বৃষ্টি, তার ওপর বিদ্যুৎ না থাকলে মানুষের তো অনেক ভোগান্তি হবে। পাশেই বসা বইমেলার সদস্য সচিব জালাল আহমেদও অস্থির হয়ে উঠলেন। তিনি মঞ্চে বসেই ফোন করছেন এখানে ওখানে, যাতে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়।

কিন্তু একটা পর্যায়ে পরিস্থিতি এতটাই নাজুক হয়ে পড়লো যে কর্তৃপক্ষ সেদিনের জন্য বইমেলা বন্ধ ঘোষণা করলেন। প্রচারযন্ত্রে বলা হলো দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার কারণে আজকের বইমেলা বন্ধ ঘোষণা করা হলো।

মেলার দর্শনার্থী ও প্রকাশকদের অতি দ্রুত মেলা প্রাঙ্গণ ত্যাগ করতে বলা হচ্ছে। কিন্তু ততক্ষণে মেলার উভয় অংশে হাজার হাজার দর্শনার্থী আটকা পড়েছে। অনেকেই বিভিন্ন স্টল ও প্যাভিলিয়নের সামনে কোনও মতে কাকভেজা অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে। কেউ কেউ বৃষ্টিতে ভিজে জবুথবু। তবুও কারও মনে কোনও ক্ষোভ নেই। বৃষ্টি থামার অপেক্ষায় সকলে অন্ধকার আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে।

ঠিক তখনই বইমেলার প্রচারযন্ত্র থেকে বারবার একটি সতর্কবাণী ভেসে আসতে থাকলো, দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার কারণে আজকের বইমেলা বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। এখনই মেলার বৈদ্যুতিক সংযোগ বন্ধ করে দেওয়া হবে। কাজেই সকলকে অতিদ্রুত মেলা প্রাঙ্গণ ত্যাগ করতে বলা হচ্ছে...।

অনেকের কাছে একাডেমি কর্তৃপক্ষের এই ঘোষণা মোটেই মনঃপূত হলো না। অনেক আগেই মূলমঞ্চের আলোচনা সভা শেষ হয়েছে। বইমেলায় আমাদের পত্রিকা আনন্দ আলো বইমেলা প্রতিদিন-এর একটি স্টল আছে। এলাকাটা নিচু হওয়ায় বৃষ্টির পানি স্টলের ভেতরে ঢুকে পড়েছে। ছাদ চুইয়েও স্টলটিতে বৃষ্টির পানি পড়ছে। বৃষ্টি থেকে বই বাঁচানোর চেষ্টা করছেন স্টলের কর্মীরা। আমি নিজেও তাদের সহায়তা করছি। খুবই অসহায় মনে হচ্ছিলো। এমনই মুহূর্তে একাডেমি কর্তৃপক্ষ বারবার ঘোষণা দিচ্ছে দ্রুত মেলা থেকে চলে যেতে। না হলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সকলকে তাড়িয়ে দিতে পারেন এমনই সতর্কবাণী প্রচার করা হচ্ছিল বারবার।

ভেজা স্টল থেকে বেরিয়ে বৃষ্টি মাথায় নিয়ে বাইরে পা বাড়ালাম। প্রথমে গিয়ে আশ্রয় নিলাম বইমেলা থেকে বেরিয়ে যাওয়ার গেটের পাশেই বাংলা একাডেমির একটি ভবনের বারান্দায়। দাঁড়াবার জায়গা নেই। সকলে কাকভেজা হয়ে বৃষ্টি থামার অপেক্ষা করছেন। মাইকে ঘোষণা শুনে একজন বয়স্ক লোক ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করলেন এভাবে, ‘আমি জানি এত বড় বইমেলায় বৃষ্টির মতো দুর্যোগ থেকে হাজার হাজার ক্রেতা-দর্শককে নিরাপত্তা দেওয়া সম্ভব নয়। তাই বলে মাইকে এভাবে সতর্কবাণী দেওয়া কি ঠিক হচ্ছে।’ ‘আপনারা এখনই মেলা প্রাঙ্গণ ত্যাগ করুন। না হলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আপনাদের চলে যেতে বাধ্য করবে।’ এই যে কথাগুলো বলা হচ্ছে... এত কঠোর করে না বলে সুন্দর করে, নরম ভাষায়ও তো বলা যেতো? বৃষ্টি না থাকলে কেউ কি এভাবে কাকভেজা হয়ে অপেক্ষা করতো? খুবই দুঃখ পেলাম।

বারবার সতর্কবাণী শুনে বৃষ্টি মাথায় নিয়েই বেরিয়ে এলাম বইমেলা থেকে। পথে নেমে দেখি শত শত মানুষ ভিজে রাস্তায় হেঁটে যাচ্ছে। তাদের মধ্যে বয়স্ক মানুষের সংখ্যাও নেহায়েত কম নয়। সবাই এসেছিল বইয়ের মেলায়। আহারে কত অনাদরেই না তাদের ফিরে যেতে হচ্ছে!

প্রশ্ন উঠতেই পারে, দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার আগাম খবর তো বইমেলা কর্তৃপক্ষ আগেই দিয়েছিলেন। এর বাইরে মেলার কর্তৃপক্ষের করারইবা কি ছিল? হাজার হাজার মানুষকে বৃষ্টির হাত থেকে নিরাপত্তা দেওয়া কি সম্ভব? না, তা সম্ভব নয়। কিন্তু দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় যারা আটকা পড়েছিল তাদের জন্য একটু সহানুভূতিও তো প্রকাশ করা যেত? এখনই মেলা প্রাঙ্গণ ত্যাগ করুন, না হলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাড়িয়ে দিবে- এমন ধরনের কঠোর ভাষা ব্যবহার না করেও তো দর্শনার্থীদের বোঝানো যেত! আমরা বোধকরি ভুলে যাচ্ছি, একুশে বইমেলার প্রধান আকর্ষণই হলো এর দর্শক। প্রতিদিন হাজার হাজার দর্শক মেলায় আসে বলেই আমাদের বইমেলা গোটা পৃথিবীতে এতো আলোচিত হয়ে উঠেছে। কাজেই যেকোনও প্রতিকূল পরিবেশে দর্শকের প্রতি আমাদের শ্রদ্ধার জায়গাটিতে যেন কোনও ঘাটতি না পড়ে। আমি নিজে বৃষ্টিতে ভিজে বুঝেছি ২৭ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় মেলায় আসা হাজার হাজার দর্শক কতটা বিড়ম্বনার মধ্যে পড়েছিলেন।

বৃষ্টি হবে। বৃষ্টির ওপর কারও কোনও হাত নেই। গত কয়েক বছর ধরে বাংলা একাডেমি আয়োজিত একুশে বইমেলা এভাবেই বৃষ্টি আক্রান্ত হচ্ছে। প্রথমবার আগাম সতর্কবাণী না থাকায় প্রকাশকদের অনেক ক্ষতি হয়েছে। পরের বছরগুলোতে প্রকাশকরা সতর্ক হয়েছেন বলে তাদের ক্ষতিটা কম হচ্ছে। কিন্তু দর্শকের ভোগান্তি বাড়ছে। শোনা যাচ্ছে আগামী বছরে একুশে বইমেলার পরিসর আরও বৃদ্ধি পাবে। বইমেলা আরও বড় হবে। বইমেলা আরও বড় হোক এটা সবারই প্রত্যাশা। কিন্তু আয়োজন বড় করার আগে বইমেলা নিয়ে প্রতি বছরই যে সমস্যাগুলো সৃষ্টি হচ্ছে, বিশেষ করে বৃষ্টি হলে মেলাকে কীভাবে বাঁচানো যাবে? হাজার হাজার দর্শকের তখন কী হবে? এই বিষয়গুলো খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

কথায় আছে, মেলা হোক অথবা যেকোনও আয়োজনই হোক, দর্শকই হলো তার প্রাণ। দর্শকই হলো লক্ষ্মী। বইমেলা ভবিষ্যতে আরও বড় হোক এটা সবার প্রত্যাশা। কিন্তু সেখানে যেন দর্শকের নিরাপত্তার বিষয়টি মাথায় রেখে চূড়ান্ত পরিকল্পনা নেওয়া হয় এটাই সময়ে দাবি। জয় হোক একুশে বইমেলা।

লেখক: কথাসাহিত্যিক, নাট্যকার, সম্পাদক- আনন্দ আলো।

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ