ট্রাম্পের ইমার্জেন্সি

Send
বখতিয়ার উদ্দীন চৌধুরী
প্রকাশিত : ১৮:৩৩, মার্চ ০১, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৩:৩৭, মার্চ ০২, ২০১৯

বখতিয়ার উদ্দীন চৌধুরী
আমেরিকার প্রেসিডেন্টরা আমেরিকায় ২৯ বার জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছিলেন। সেই ২৯ বারই জরুরি অবস্থা ঘোষণা জরুরি ছিল। এবার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অহেতুক অপ্রয়োজনীয়ভাবে একগুঁয়েমি করে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছেন। গত ১৫ ফেব্রুয়ারি তিনি জরুরি অবস্থা জারির ঘোষণা দেন।  দক্ষিণে মেক্সিকো সীমান্তে বিদ্যমান পরিস্থিতিকে উদ্বেগজনক বলে অভিযোগ উত্থাপন করে তিনি জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছেন। অনুরূপ জরুরি অবস্থা প্রয়োজন তা প্রমাণ করার জন্য তিনি কয়েকবার মেক্সিকো সীমান্ত পরিদর্শনেও গিয়েছিলেন। মেক্সিকো সীমান্তে দেয়াল নির্মাণের বিষয় ছিল তার গত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রদত্ত মেনিফেস্টোর অন্যতম শর্ত। তিনি দাবি করেছিলেন, সীমান্তে প্রাচীর নির্মাণের জন্য খরচ মেক্সিকোই সরবরাহ করবে।
খরচের বিষয়টা চূড়ান্ত করার জন্য গত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রাইমারি ভোট চলার সময়ই তিনি মেক্সিকো সফর করে মেক্সিকোর প্রেসিডেন্টের সঙ্গে কথাবার্তা বলেছিলেন। মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট তখনই দেয়াল নির্মাণের বরাবরে কোনও টাকা পয়সা দেবেন না বলে দিয়েছিলেন। ট্রাম্প প্রাইমারি নির্বাচনের সময় বলতেন মেক্সিকো সীমান্ত দিয়ে ল্যাটিন ও দক্ষিণ আমেরিকার লোক প্রবেশ করে আমেরিকানদের সরকারি চাকরি ও বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা অন্যায়ভাবে ভোগ করছে। অপরাধীচক্র ওই সীমান্ত দিয়ে ঢুকে আমেরিকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বিনষ্ট করছে এবং আমেরিকায় মাদক আসছে ওই সীমান্ত দিয়ে।

ট্রাম্প সবসময় আমেরিকান মানে সাদা গোষ্ঠীকে বোঝাতে চেয়েছেন। তার এ সাম্প্রদায়িক কথাবার্তায় আমেরিকার প্রত্যন্ত অঞ্চলে থাকা সাদা গোষ্ঠী উজ্জীবিত হয়েছে, অনেকের ধারণা তাদের ভোটেই তিনি নির্বাচনে উত্তীর্ণ হয়েছেন। ২০২০ সালের নির্বাচনেও ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট পদে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে প্রার্থী হওয়ার কথা বলেছেন। ক্ষমতায় থাকা প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রার্থী হলে তাকে প্রাইমারি নির্বাচন করতে হয় না। কারণ, তিনি তখনই দলের একক প্রার্থী হিসাবে বিবেচিত হন। এখন ট্রাম্প উঠেপড়ে লেগেছেন মেক্সিকো সীমান্তে প্রাচীর নির্মাণ করে সাদাদের ভোট নিশ্চিত করতে।

কিন্তু বিভিন্ন সূত্রে থেকে পাওয়া খবরে এ বিষয়টি এখন প্রায় নিশ্চিত, যে পরিমাণ অভিবাসী প্রবেশ করছে বা মাদকদ্রব্য প্রবেশ করছে তা কড়া নজরদারিতে বন্ধ হয়ে যায়। তার জন্য এত ব্যয়বহুল প্রাচীর নির্মাণের প্রয়োজন নেই। এখন অভিবাসী ও মাদক প্রবেশ সম্পর্কে যা বলা হচ্ছে তা নাকি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের অপপ্রচার। বর্তমান প্রতিনিধি পরিষদে ডেমোক্র্যাটরা সংখ্যাগরিষ্ঠ। দীর্ঘ দুই হাজার মাইল দীর্ঘ প্রাচীর নির্মাণে প্রতিনিধি পরিষদ প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের জন্য সাড়ে পাঁচ শত বিলিয়ন ডলার বরাদ্দ বিল পাস করতে নারাজ। প্রতিনিধি পরিষদে এ বিলে বিরোধিতার বিষয়ে দেখা যাচ্ছে, ডেমোক্র্যাট সদস্যদের সঙ্গে কিছু রিপাবলিকান সদস্যও ঐক্যমত পোষণ করে ট্রাম্পের দেয়াল নির্মাণের বরাদ্দের বিরোধিতা করছেন। প্রতিনিধি পরিষদ ট্রাম্পের দেয়াল নির্মাণের বরাদ্দ বিল পাস করতে অসম্মত হওয়ায় সরকারি কর্মচারীদের বেতন বরাদ্দের বিলেও দস্তখত করেননি তিনি। তাতে প্রায় দুই মাসব্যাপী সরকারি কর্মচারীরা কোনও বেতন পায়নি।

ট্রাম্পের চাপের মুখেও প্রতিনিধি পরিষদ দেয়ালের বরাদ্দের বিষয় বিবেচনা করতে সম্মত হননি। অবশ্য প্রতিনিধি পরিষদ কর্মচারীদের বেতন বরাদ্দের বিলে প্রেসিডেন্ট স্বাক্ষর না করায় যে জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে তা নিরসনের জন্য সাড়ে পাঁচ বিলিয়নের স্থলে দেড় বিলিয়ন ডলার বরাদ্দ দিতে সম্মত হয়েছিলো। কিন্তু প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সে বরাদ্দ প্রস্তাব নাকচ করে দিয়েছেন। অবশ্য শেষ পর্যন্ত কর্মচারীদের ব্যাপক অসন্তোষের কথা বিবেচনা করে তাদের বেতন বরাদ্দ বিলেও প্রেসিডেন্ট দস্তখত করেছেন।

অনুরূপ কঠিন পরিস্থিতিতে প্রেসিডেন্ট বারবার বলছিলেন, তিনি জরুরি অবস্থা জারি করবেন। কারণ, জরুরি অবস্থাকালীন প্রেসিডেন্ট প্রতিনিধি পরিষদের সম্মতি ছাড়াও অর্থ-বরাদ্দ দিতে পারেন, তাতে শাসনতন্ত্রে কোনও বিধিনিষেধ নেই। এরই মাঝে ১৬টি রাজ্য জরুরি অবস্থার বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছে এবং তারা আদালতে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। আবার জরুরি অবস্থা আটকানোর জন্য প্রতিনিধি পরিষদে ডেমোক্র্যাট সদস্যরা একটা প্রস্তাব আনেন। প্রতিনিধি পরিষদ ২৭ ফেব্রুয়ারি মঙ্গলবার রাতে, যুক্তরাষ্ট্র-মেক্সিকো সীমান্ত বরাবর প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের জরুরি অবস্থা জারি নাকচ করে দেওয়ার পক্ষে ভোট দিয়েছে। ডেমোক্র্যাট নিয়ন্ত্রিত প্রতিনিধি পরিষদে ট্রাম্পের জরুরি অবস্থা ঘোষণা নাকচ করে যে প্রস্তাব নেওয়া হবে সেটা প্রত্যাশিতই ছিল। তবে রিপালিকান নিয়ন্ত্রিত সিনেটে সেটা নিশ্চিত নয়। যদিও তিনজন রিপাবলিকান সদস্য সুজান কলিন্স, লিজা মার্কৌস্কি ও টম টিলিস এরই মধ্যে জানিয়েছেন, তারা জরুরি অবস্থার বিরোধিতা করছেন। অন্য রিপাবলিকানরা বলছেন তারা ট্রাম্পের এই কাজের বিরোধিতা করছেন। তবে এখনও তারা জানাননি যে এর বিরুদ্ধে ভোট দেবেন কিনা। সুতরাং প্রস্তাবটার চূড়ান্ত পর্যায়ে কি হয় এখনও বলা যাচ্ছে না।

ট্রাম্প ২০২০ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে সামনে রেখে দ্বিতীয়বার নির্বাচন করার আশায় মেক্সিকো সীমান্তে প্রাচীর নির্মাণের জন্য তৎপর হয়েছেন সত্য, কিন্তু তার বিরুদ্ধে অসংখ্য অভিযোগের তদন্ত চলছে। ট্রাম্পের অভিশংসনের ব্যাপারে প্রতিনিধি পরিষদের বিচার বিভাগীয় কমিটি দুইজন আইনজীবী নিয়োগ করেছেন। উভয় আইনজীবী খুবই তৎপরতার সঙ্গে কাজ করছেন। প্রতিনিধি পরিষদের বিচার বিভাগীয় কমিটির চেয়ারম্যান জেরি ন্যাডলার আরও বহু বিষয়ে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিতে প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলে জানা গেছে। আইনজীবীরা মুলারের প্রতিবেদনও পর্যালোচনা করবেন। সবাই মুলারের তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশের অপেক্ষায় রয়েছেন।

নিউইয়র্ক সাউদার্ন ডিস্ট্রিক বিচার বিভাগীয় কমিটিও ট্রাম্পের সব বিষয়ে তদন্ত করছে। এমনকি তিনি ব্যবসা-বাণিজ্যে যেসব অসৎ উপায় অবলম্বন করেছেন সে বিষয়েও তদন্ত হচ্ছে। মুলারের তদন্ত এবং নিউইয়র্ক সাউদার্ন ডিস্ট্রিকের তদন্ত সমানে চলছে। আমেরিকার সচেতন জনগণ মুলারের তদন্ত রিপোর্টের আশায় বসে আছে। ট্রাম্পকে প্রায় সব কর্মকর্তাই ছেড়ে গেছেন। এখন ট্রাম্প যাদের নিয়োগ দিয়েছেন তারা সবাই দক্ষিণপন্থী আর অনেকটা তার তোষামোদকারী। সুতরাং এখন প্রেসিডেন্টের কাজ সঠিক হবে বলে কেউ বিশ্বাস করে না।

শ্বেতাঙ্গদের খুশি করার জন্য মেক্সিকো সীমান্তে যে প্রাচীর নির্মাণের চেষ্টা করছে, ট্রাম্প জরুরি অবস্থা ঘোষণা করে চেষ্টা করছে সামরিক খাতের বাজেট বরাদ্দের কিছু কেটেছেঁটে ৮ শত বিলিয়ন ডলারের ব্যবস্থা করতে। তিনি তা কতটুকু পারবেন তা এখনও বলা যাচ্ছে না।

আমেরিকাসহ পশ্চিমা বিশ্বের শত শত মানুষ বিশ্বাস করেন ট্রাম্প রাশিয়ার এজেন্ট এবং গত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে রাশিয়ার সাইবার কারসাজিকে ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন। গণতান্ত্রিক বিশ্বের নেতা সুপার পাওয়ার আমেরিকার নেতৃত্ব থেকে ট্রাম্পকে সরানোর ব্যাপারে আমেরিকার সুশীল সমাজ একমত। ট্রাম্পের পুনর্নির্বাচিত হওয়ার এত ক্লান্তিকর প্রচেষ্টা শেষ পর্যন্ত ফলপ্রসূ হবে বলে মনে হয় না। আর যদি ফলপ্রসূ হয় তবে বিশ্বে আমেরিকা তার শ্রেষ্ঠত্ব হারাবে।

 

লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলাম লেখক

bakhtiaruddinchowdhury@gmail.com

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ