দুটি মলাট মানেই নয়তো বই

Send
শেগুফতা শারমিন
প্রকাশিত : ১৮:৪৪, মার্চ ০৫, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ২০:৫৭, মার্চ ০৫, ২০১৯

শেগুফতা শারমিন‘বাংলাদেশের মানুষের রুচির মারাত্মক অবনতি হয়েছে’। বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়? বিশ্বাস করেন বা না করেন, কথা সত্য। এই রুচির অবনতি করা হয়েছে পরিকল্পিতভাবে এবং এতে বুঝে না বুঝে ভূমিকা রেখে গেছে সবাই। এখন যখন প্রকটভাবে রুচির নীচতা দৃশ্যমান, তখন উঠেছে গেলো গেলো রব। এখন রব তুলে লাভ কতটুকু জানি না। কারণ, যা চলছে তা হলো অনেক ঘটনাক্রমের ফলাফল। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয়েছে ১৪ ডিসেম্বর ১৯৭১ সালে। মেধাশূন্য সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশে কোনও বাতিঘর গড়ে ওঠেনি, যারা স্বাধীন দেশের মৌলিক বুদ্ধিবৃত্তিক গঠনে কাজ করবে। প্রথম থেকেই কখনও দেশের শিক্ষাব্যবস্থা আমাদের শিক্ষিত করার জন্য তৈরি হয়নি। দেশের আপামর শিক্ষাব্যবস্থা আমাদের নোংরা প্রতিযোগিতা শেখায়। দিনে দিনে এর দীনতা বেড়েই গেছে। উন্নত দেশের শিক্ষাব্যবস্থাই সে দেশের শিশু-কিশোর-তরুণদের দেশের কৃষ্টি সংস্কৃতি নিয়ম-কানুন সম্পর্কে শিক্ষিত করে। আর আমাদের শেখানো হয় বাঁশ বেয়ে বানরের ওঠা আর নামা।

আমাদের বইয়ের সারবস্তু নির্ধারিত হয় ক্ষমতাবানদের খায়েশ অনুযায়ী। কীভাবে ক্ষমতাশীলদের খুশি করা যাবে, তার প্রদর্শনী আমাদের অনেক বইজুড়ে।

আমাদের রাজনীতির ভেতর নোংরামি, লোভ, ঘৃণার ছড়াছড়ি। আমাদের দেশে দেশপ্রেম বলে কিছু নেই। আছে দলপ্রেম আর ক্ষমতাপ্রেম। দলপ্রেমে অন্ধ থেকে চলে এসেছে খারিজ করে দেওয়ার সংস্কৃতি। তোমার লোভের সঙ্গে যায় না বলেই আরেকজনকে খারিজ করে দেওয়ার রুচি সংস্কৃতি চলছে জোরেশোরে। বাতিঘরহীন দেশে এমনিতেই কোনও রুচির কারিগর গড়ে ওঠেনি। তারপরেও যে দু-একজন হাতে গুনে পাওয়া যায়, তাদেরও রোষের শিকার হতে হয়, রাজনৈতিক মত না মিললে। এই দেশে এখন আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যারকেও কে কে যেন তাচ্ছিল্য করার রুচি ধরে। আবার ‘তেতুঁল হুজুরদের’ তোষামোদ করার রুচিও দৃশ্যমান। 

সেই রকম এক দেশে, এরকম এক সময়ে বইমেলা পরবর্তী একটা অনলাইন বই বিক্রেতা প্রতিষ্ঠানের সর্বাধিক বিক্রীত বইয়ের তালিকা দেখে এত উত্তেজিত হওয়ার কী আছে? এটাই তো এখন ট্রেন্ড। আপনাদের মনে আছে, হুমায়ূন আহমেদ কীভাবে জনপ্রিয় লেখক হয়ে উঠেছিলেন? বিটিভির ‘এইসব দিনরাত্রি’ নাটকের পর হুমায়ূন আহমেদের বই বিক্রি বাড়ে। এরপর একে একে বহুব্রীহি, অয়োময়, কোথাও কেউ নেই হুমায়ূন আহমেদকে লেখক হিসেবে প্রত্যেক বাঙালির ঘরে ঘরে পৌঁছে দেয়। একমাত্র বিটিভি একটা লেখককে জনপ্রিয়তম লেখক হতে প্রমোট করে গেছে। একটা সরকারি গণমাধ্যম সবচেয়ে সেরা লেখকটাকে চিনেছে এবং চিনিয়েছে। এখন তো এত এত চ্যানেল, এত এত রিয়েলিটি শো। কই কেউ তো গত বিশ বছরে কোনও ক্ষেত্রেই কোনও লিজেন্ডকে বের করে আনতে পারেনি। কারণ, এখানেও আছে রুচি এবং মানের ঘাটতি।

আবার শিক্ষাব্যবস্থার কথা বলতে হয়। দেশের শিক্ষাব্যবস্থা আমাদের বই-বিমুখ করেছে দিনের পর দিন। সাহিত্যের বইয়ের নাম হয়েছে ‘আউট বই’। একের পর এক জেনারেশন তৈরি হয়েছে, ‘আউট বই’ না পড়ে পড়ে। স্কুল-কলেজ-ইউনিভার্সিটিতে পড়ার সময় আশপাশে বন্ধুবান্ধবীদের অনেক বাসা দেখেছি। যেখানে একটাও ‘আউট বই’ নেই। বই পড়ার কোনও সংস্কৃতি নেই। এত বছর পর সোশ্যাল মিডিয়ার কল্যাণে বইমেলা এখন তাদের কাছে অবশ্য গন্তব্য। বইমেলায় না গেলে, একটা পোস্ট না দিলে ‘স্ট্যাটাস’ থাকছে না। এদের একটা অনেক বড় অংশের কাছেই অবশ্য প্রথম পড়া বইয়ের নাম  ‘ফেসবুক’। ফেসবুকের পোস্ট মানেই তাদের কাছে সাহিত্য। দুই মলাটে পোস্ট সমগ্র মানেই বই। নিজের বন্ধুমহলে সেই বই বিলিয়ে দিয়ে আবার দ্বিতীয় মুদ্রণ, তৃতীয় মুদ্রণের আওয়াজ। তাই হয়তো প্রকাশকদের প্রায়ই বলতে শোনা যায়, বইয়ের বেচাবিক্রি কম। বইমেলায় এত মানুষ যায়, এত ছবি দেখি, এত আওয়াজ শুনি। তবু বই কেন বিক্রি হয় না?

সেই বই না বিক্রি হওয়ার অভ্যস্ততায় একটি অনলাইন বই বিক্রি দোকানের সেলিং লিস্ট। মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা। আমরা টেরই পাই না কিন্তু হিরো আলমরা হিরো হয়ে যায়, তথাকথিত ফেসবুক সেলিব্রিটিরা লেখক হয়ে যায়। তাও আবার বেস্ট সেলার! শূন্যতা যে কোনোভাবেই পূরণ হয়। রুচির শূন্য জায়গাটা খুব সহজেই ধরে ফেলতে পারছে, এসব ফেসবুক সেলিব্রিটি কাম বেস্ট সেলিং লেখক।  সোশ্যাল মিডিয়ায় সবাই নিজ নিজ জায়গার একটা বুদবুদের ভেতর থাকে। তার কাছে এই বুদবুদই পৃথিবী। যার বুদবুদ যত বড় তার পৃথিবীর সাইজও ততটুকুই। যার যার পৃথিবীতে, আসলে বুদবুদে এরা সফল। এদের মধ্যে কোনও সামগ্রিকতা নেই। কোনও মূলধারার ব্যাপার নেই। তার বুদবুদে সে রাজা। তার ফলোয়াররা তার বই কেনেন, কিনেছেন। হয়তো অনেকেই বই কিনে লেখকের কাছে বইসহ একটা ছবিও পাঠিয়েছেন, খুশি করার আশায়। ব্যস, এ পর্যন্তই।

এখন বাকি কাজটা করে যাচ্ছেন আপনি। যিনি গেলো গেলো করছেন, তার বুদবুদের বাইরেও তাকে প্রচার করছেন। মূলধারায় তার নাম আলোচনায় আনছেন। বহু সময় গেছে, এখনও হয়তো কিছুটা সময় আছে। যারা সাহিত্য পড়েন, পড়েছেন। যারা বাংলা ভাষা ভালোবাসেন। বাংলা সাহিত্যের ভালো চান, তারা দলাদলি ভুলে, স্বজনপ্রীতি ভুলে, সাহিত্যকে সাহিত্যের চোখেই দেখুন। সাহিত্যের গঠনমূলক সমালোচনা করুন। লেখকের সমালোচনা নয়। ভালোটাকে ভালো বলুন, মন্দটাকে কেন ভালো লাগেনি বলুন। এক হাউজ প্রমোট করলো বলে তার সঙ্গে আপনার রাজনৈতিক লোভাদর্শ মিলে না বলে খারিজ করে দেবেন না। নিজেদের রুচি বদলের দায় ও দায়িত্বের অংশীদার হোন।

লেখক: উন্নয়নকর্মী

 

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ