বিনামূল্যে পাওয়া উন্মুক্ত সফটওয়্যারে টিভি নিউজ সম্প্রচার

Send
জিশান হাসান
প্রকাশিত : ১৭:২৭, মার্চ ১০, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ২১:৩৬, মার্চ ১০, ২০১৯

জিশান হাসানএকটি দেশের লক্ষ্য থাকতে হবে নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবনের, ক্রেতা হওয়ার না।
এর আগে, বাংলাদেশ ও বিশ্বের বেশিরভাগ টিভি চ্যানেলই তাদের বার্তাকক্ষ পরিচালনার জন্য নিউজরুম কন্ট্রোল সিস্টেম নামে অনেক দামি একটি সফটওয়্যার কিনে ব্যবহার করতো। এগুলো কিনতে হতো বিদেশ থেকে আর পরিচালনার জন্য বার্ষিক ফি দিতে হতো। তবে দীপ্ত টিভি এই ব্যয়বহুল বিদেশি এনআরসিএস সফটওয়্যারের পরিবর্তে বিনামূল্যে উন্মুক্ত সফটওয়্যার ব্যবহার শুরু করেছে। এতে টিভি ইন্ডাস্ট্রি প্রযুক্তিগতভাবে আরও স্বাবলম্বী ও স্বাধীন হয়েছে। বেঁচেছে অনেক বৈদেশিক মুদ্রাও।
টিভি নিউজ প্রোডাকশনে কয়েকটি কাজ করতে হয় এবং প্রত্যেকটি পরস্পরের সঙ্গে সংযুক্ত। প্রথমে প্রতিবেদক ও ক্যামেরাম্যানদের প্রতিদিন সংবাদ সংগ্রহের জন্য বাইরে যেতে হতো। ক্যামেরায় রেকর্ড হতো এবং সেটি কম্পিউটারের হার্ডড্রাইভে সংরক্ষণ করা হতো। ভিডিও এডিটিং সফটওয়্যারের মাধ্যমে সেটি প্রয়োজন মতো কেটে নেওয়া হতো।

একই সময়ে রিপোর্টার বা প্রতিবেদক সংবাদটি লিখতে থাকতেন। সংবাদ পাঠক টেলিপ্রম্পটারে দেখে সেই সংবাদের শুরু করেন। একজন বার্তা সম্পাদক সেই প্রতিবেদন সম্পাদনা করেন, সংবাদের গুরুত্ব অনুযায়ী ক্রমধারা সাজান এবং সেভাবে প্রকাশ করেন।

এনআরসিএস সাধারণত সংবাদের ভিডিও এবং লেখাকে একত্রিত করে; সরাসরি সম্প্রচারের সময় সংবাদের লেখাটি সংবাদপাঠক বা উপস্থাপকের সামনে টেলিপ্রম্পটারের সামনে আসতে থাকে। চলতে থাকে ভিডিও। জটিল প্রক্রিয়ায় নিয়ন্ত্রণ করা হয় শব্দও। আর দীপ্ত টিভি ওপরের এসব কাজই বিনামূল্যে পাওয়া উন্মুক্ত সফটওয়্যারের মাধ্যমে করে আসছে।

দীপ্ত টিভি (এবং এর মূল প্রতিষ্ঠান কাজী ফার্মস গ্রুপ) ইতোমধ্যে উবুন্টু লিনাক্স’র মতো বিনামূল্যের সফটওয়্যার ব্যবহার শুরু করেছে। ব্যবহার করছে লিবরেঅফিসও। এছাড়া সুইডিশ রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের তৈরি ফ্রি সফটওয়্যার ক্যাসপারসিজিও ব্যবহার করছে তারা।

সাংবাদিকরা ভিডিও এডিটিংয়ের জন্য কেডিএনলাইভ (www.kdenlive.org)  সফটওয়্যার ব্যবহার করেন। সেটি তারা সংরক্ষণ করেন ক্যাসপারসিজিপ্লে আউট  সার্ভারে। সংবাদ সম্প্রচারের সময় এখান থেকেই সেটা সম্ভব। এছাড়া গ্রাফিক্স ডিজাইনের সময় ক্যাসপারসিজি ব্যবহার করা হয়। ২০১৮ সালে ইলেকট্রনিক নিউজ গ্রাফিক্সের সবকিছুই এই সফটওয়্যার দিয়ে করা হয়েছে। তবে ক্যাসপারসিজিতে টেক্সট বা লেখা সংযোজনের বিষয়টি সরাসরি যুক্ত নয়। তবে আরেকটি উন্মুক্ত সফটওয়্যার ক্যাসপারসিজি ক্লিপ টুলের (https://github.com/olzzon/) মধ্যে এই সুবিধা যুক্ত করা যায়। ভিডিওক্লিপও সংযোগের ক্ষেত্রেও ক্রমধারা বজায় রাখা সম্ভব। একইসঙ্গে ভিডিও ক্লিপগুলো প্রকাশের সময় আগে থেকেই নির্ধারণ করা সম্ভব ক্যাসপারসিজির মাধ্যমে। এতে দীপ্ত টিভি ক্যাসপারসিজির মাধ্যমে নিউজের ভিডিও এবং অনুষ্ঠান সম্প্রচার নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে।

সৌভাগ্যবশত, সাংবাদিকদের সংবাদ লেখা ও বার্তা সম্পাদকদের সম্পাদনার ক্ষেত্রে নিউজস্কুপ (https://www.sourcefabric.org/) নামের আরেকটি উন্মুক্ত ও বিনামূল্যে পাওয়া সফটওয়্যার ব্যবহার করা হচ্ছে। এটি মূলত সংবাদভিত্তিক ওয়েবসাইটের জন্য কনটেন্ট ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (সিএমএস)। দীপ্ত টেলিভিশন তাদের সংবাদভিত্তিক ওয়েবসাইট পরিচালনার জন্য নিউজস্কুপ ব্যবহার করে, সংবাদের টেক্সটের জন্যও তাই এই সফটওয়্যারই ব্যবহার করা হয়েছে। নিউজস্কুপে একবার সংবাদটি সংরক্ষণ করলে সেটি ক্যাসপারসিজির মিডিয়া ফোল্ডারে নেওয়া যায়। এতে দুটি সফটওয়্যারই সংযুক্ত করা অনেক সহজ হয়।

নিউজস্কুপের লেখা যখন ক্যাসপারসিজি প্লেআউট সার্ভারের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়, তখন একজন সম্পাদককে শুধু সেদিনের সংবাদ পরিবেশনের নির্দেশনা দিতে হয় (এই ক্রমধারাকে বলা হয় রানডাউন)। নিউজস্কুপে রানডাউনটি ওয়েবপেজে থাকা সংবাদগুলোর লিস্ট ও সংশ্লিষ্ট ভিডিওক্লিপ থেকে তৈরি হয়। শুধু ড্র্যাগ অ্যান্ড ড্রপের মতো সহজ পদ্ধতিতে এর ক্রমধারা বা রানডাউন সাজানো সম্ভব। 

রানডাউন চূড়ান্ত হয়ে গেলে, টেলিপ্রম্পটারে সংবাদ পাঠকের সামনে সঠিক ধারায় নিউজ আসতে থাকে। এটি আসে ওয়েবপেজের মতো করে। ফলে এটি উপস্থাপক চাইলে উপর-নিচ করতে পারেন। একইভাবে ক্যাসপারসিজি নিউজ প্লেআউটি অপারেটর রানডাউন দেখতে পান এবং সঠিক সময়ে সঠিক ভিডিও বসাতে পারেন।

এই উপায়ে কেডিএনলাইভ ভিডিও এডিটর, ক্যাসপারসিজি প্লেআউট সার্ভার, নিউজস্কুপ সিএমএস’র মতো বিনামূল্যে পাওয়া সফটওয়্যারগুলো ব্যয়বহুল এনআরসিএস সফটওয়্যারের পরিবর্তে ব্যবহার করছে দীপ্ত। নতুন এই ব্যবস্থাটি পুরোপুরি বিনামূল্যে তৈরি করা। কেনা এবং পরিচালনার কোনও বার্ষিক ফি নেই। এতে দীপ্ত টিভি তার সংবাদ সম্প্রচার সম্পূর্ণ বিনামূল্যে পাওয়া সফটওয়্যারের ওপর নির্ভর করে তৈরি করছে।

আশা করা যাচ্ছে বাংলাদেশের অন্যান্য প্রতিষ্ঠান এই বিনামূল্যে পাওয়া উন্মুক্ত সফটওয়্যার ব্যবহার করে বিদেশি কোম্পানির ওপর থেকে নির্ভরতা কমিয়ে প্রযুক্তিগত স্বাধীনতা অর্জন করবে। সবশেষে একটি দেশকে প্রযুক্তির উদ্ভাবক হতে হবে, ক্রেতা নয়। আর উন্মুক্ত সফটওয়্যারের মাধ্যমেই এটি অর্জন সম্ভব।

লেখক: পরিচালক, টুএ মিডিয়া লিমিটেড

 

 

/এমএইচ/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ