কালো সূর্য

Send
তুষার আবদুল্লাহ
প্রকাশিত : ১৬:৩৪, মার্চ ১৬, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৮:২১, মার্চ ১৬, ২০১৯

তুষার আবদুল্লাহলাল সূর্যতে কালো ছায়া পড়ছিল অনেকদিন। সেই ছায়াকে অস্বীকার করে আসছে গোলক। সেই অবসরে ইশতেহার তৈরি করে ফেলেছে কালো। নিজে ছাড়া আর কোনও রঙ সইবে না সে। এই ঘোষণা নতুন নয়, আদি। সৌরমণ্ডলের এই পাড়ার অধিবাসীরা জন্মসূত্রে এমনই। আগ্রাসী, এবং আস্ফালন প্রিয়। এমন চরিত্রের কত ভূমিপুত্রই না আপন ভিটে-মাটি হারিয়েছে। এ-পাড়ার মানুষেরা অন্যকে বধ করতে, নিজের থাবায় সব ভোগ নিয়ে আসতে এক আদিম খেলার প্রচলন করে। যার নাম যুদ্ধ।
অরণ্যকাল থেকে কংক্রিট-কাঁচ-প্লাস্টিক সভ্যতায় নিত্যনতুন অস্ত্রের চমক দেখছে গোলক। কার তৈরি কোন অস্ত্র কখন কোথায় ব্যবহার হবে বলা মুশকিল। কখনও এমনও হয়েছে নিজের দিকেও অস্ত্র তাক হয়েছে। যুদ্ধের রসদ কখনও রঙ বা বর্ণ, কখনও ধর্ম। দেখা গেছে, যুদ্ধের চুল্লি দাউ দাউ করে জ্বললে সেখানে ব্যবহার হয় ধর্ম। জ্বালানি হিসেবে বাজারের জনপ্রিয় বিজ্ঞাপন– মুসলমান জঙ্গিরাই সবচেয়ে হিংস্র, আগ্রাসী। তাদের হাতেই মানুষ হত্যা হয়েছে বেশি। কিন্তু পরিসংখ্যানে ইহুদি, খ্রিস্টানের সূচক আকাশছোঁয়া। সম্পদ ও বাজার যাদের হাতে এসব তাদের বিজ্ঞাপন। কিন্তু মানুষ যে বিশ্বাসের ঘরেই জন্ম নিক না কেন, তার প্রথম পরিচয় সে এই গ্রহের নাগরিক। তাকে হত্যার অধিকার কারও নেই। দেশভেদে অপরাধের জন্য শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ডের বিধান রয়েছে। কিন্তু কোনও ধর্মে বিশ্বাস রাখা বা ধর্মের পরিচয় থাকা তো তার অপরাধ নয়। হতে পারে তিনি মুসলিম, খ্রিস্টান, ইহুদি, বৌদ্ধ বা অন্য ধর্মের বিশ্বাসী।
একইভাবে মানুষের শরীরে যে রঙ লেপন করে দিয়েছে প্রকৃতি, সেখানে মানুষের নিজস্ব কোনও মত বা চাহিদা নেই। কিন্তু মানুষের রঙ নিজেকে হত্যা ও বঞ্চিত করার অধিকার হিসেবে দেখছে। গোড়ার দিন থেকেই মানুষ স্থির থাকেনি। গোলকের অন্যান্য প্রাণীর মতো তারাও চঞ্চল। এক ভূমি থেকে অন্য ভূমি চষে বেড়িয়েছে খাবার ও আশ্রয়ের খোঁজে। টিকে থাকার স্বার্থে। মানুষের সেই টিকে থাকার সংগ্রাম ফুরোয়নি। মানুষ এখনও অভিবাসী। যেখানে নিশ্চিত রোজগার, খাবার, আশ্রয় সেখানেই ছুটে যাচ্ছে। এই ছুটে চলা অভিবাসী ও শরণার্থীরা যেখানে গিয়ে তাঁবু ফেলছে, সেখানকার মানুষেরা সইতে পারছে না তাদের। কারণটা সঙ্গত— তারা ভাগ বসাচ্ছে রোজগার, খাবার ও ভিটায়। অভিবাসীদের ভিড়ে ধীরে ধীরে সংখ্যালঘু হয়ে পড়ার আশঙ্কায়ও আছে তারা। তাই তারা ভীত। এই ভীতি থেকেই তৈরি হয়েছে আরেক প্রকার প্রতিহিংসা।

যাদের হাতে পৃথিবীর আনা সম্পদ। সেই অধিবাসীদের টিকে থাকতে লড়াই করতে হয়নি। অন্তত খাবার আর কাজের জন্য। ফলে যোগ্যতার পরীক্ষা দেওয়ার পাঠ তাদের নেই। সেই পাঠ বঞ্চিতদের। শ্রমিক থেকে শুরু করে পৃথিবীর চালক হওয়ার দৌড়ে এখন এগিয়ে সেই বঞ্চিতরাই। তাদের রঙ হয়তো কালো, ধর্ম হয়তো ইসলাম বা অন্য যেকোনও বিশ্বাস। পৃথিবীর পণ্যের বাজার ও চিন্তার সাম্রাজ্যে এখন তাদেরই দাপট। এই দাপট সইতে পারছে না সুখ নিদ্রায় থাকা কোনও বিশেষ রঙের নাগরিকেরা। কারণ তাদের তো সম্পদ ও বাজার ধরে রাখার মানসিক শক্তি ও জ্ঞান নেই। তাহলে নিজেদের সম্ভ্রম রক্ষা হবে কেমন করে? তারা পুরনো ঘিয়ের কৌটায় হাত দিলো। কল্পিত কিচ্ছা-কাহিনি দিয়ে এক ধর্মের সঙ্গে আরেক ধর্মের লড়াই বাঁধিয়ে দিলো। এক রঙকে অন্য রঙের প্রতিপক্ষ বানিয়ে বলি খেলায় নামিয়ে দিলো। ছেলেমানুষি সেই খেলার খেলনার জোগানদাতা তারাই।
চলছে যুদ্ধ। যারা নিজেদের আপনা মোড়ল ভাবেন, তারা ‘মেন্টর’ হিসেবে আছেন পেছনে। পশ্চিম-পূর্বে ঘোষণা হচ্ছে, প্রকাশ্য ইশতেহার তৈরি হচ্ছে শরণার্থী, অভিবাসী ঠেকাও। গোলকে ওদের ছাড়িয়ে যাওয়া জাতিসত্তাকে আটকে দিতে ‘জঙ্গি’ নামক ফ্যান্টাসি খেলা খেলে যাও। আসলে রক্ত, হত্যা, যুদ্ধ সবই তো এক-দুই লোকমা খাবারের জন্যই। তা যেন হাতছাড়া না হয়, সেজন্যই লাল সূর্যকে ধীরে ধীরে সৌরজগতের এ-পাড়ার বাসিন্দারা কালো রঙে ঢেকে দিচ্ছি। জানি না, সৌরবাবু এই কালিমা কত সময় ধরে সইবার শক্তি রাখেন।

লেখক: বার্তা প্রধান, সময় টিভি

/এসএএস/জেএইচ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ