বঙ্গবন্ধুকে মুছে ফেলা যায়নি

Send
লীনা পারভীন
প্রকাশিত : ১৫:৫২, মার্চ ১৭, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:৫৩, মার্চ ১৭, ২০১৯

লীনা পারভীনবাংলা ট্রিবিউন একটি চমৎকার কাজ করছে। গত ৭ মার্চকে কেন্দ্র করে তারা প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিলো কোন সালে কোন কোন পত্রিকায় ৭ মার্চ নিয়ে কেমন সংবাদ ছাপা হয়েছিলো। আজকে আবার ১৭ মার্চ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৯৯তম জন্মদিন উপলক্ষে তারা ছেপেছে একই ধরনের একটি প্রতিবেদন। অত্যন্ত চমৎকার একটি কাজ। চমৎকার এই অর্থে যে, আমরা যারা ৭৫-পরবর্তী প্রজন্ম– আমাদের কাছে বঙ্গবন্ধুর ইতিহাস বলতে তেমন কিছুই নেই। একটা সময়ে আমরা বঙ্গবন্ধুকে জানতাম একজন দুর্বল প্রশাসক হিসেবে। নানা প্রচারণায় তিনি ছিলেন প্রায় অনুপস্থিত। ৭ মার্চের গভীরতাকে কখনও সামনে আনা হয়নি। ছোটবেলায় জানতাম, ওইদিন বঙ্গবন্ধু একটি ভাষণ দিয়েছিলেন, ঠিক যেমনটা রাজনৈতিক নেতারা বক্তৃতা দিয়ে থাকেন। তবে সেই ৭ মার্চে দেওয়া ১৯ মিনিটের বক্তৃতার কী মর্ম বা ঐতিহাসিক গুরুত্ব, সে বিষয়টি বুঝতে আমাদের অপেক্ষা করতে হয়েছে অনেক বছর। যত বুদ্ধি হয়েছে ততই বুঝতে পেরেছি সেটি কেবল একটি রাজনৈতিক বক্তৃতাই ছিল না, ছিল আমাদের আজকের অস্তিত্বের স্বীকৃতি আদায়ের ঘোষণা। যেখানে তিনি কিছু কথামালার সুরে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন বাংলাদেশ কারও অধীনে আর থাকবে না। স্বাধীন বাংলাদেশের মানুষের স্বাধীনতার স্বপ্নকে তিনি পরিষ্কার করে দিয়েছিলেন। অথচ সেই ঘোষণাকে স্বীকৃতি দেয়নি কোনও শাসকগোষ্ঠী। কেন স্বীকৃতি দেয়নি বা প্রকাশ করেনি সে বিষয়ে প্রশ্ন জাগার মতো মানসিকতাও যেন মনে না আসে তেমনি এক পরিবেশ তৈরি করা হয়েছিলো। মুছে ফেলার সেই চেষ্টার অংশ হিসেবেই সাহস দেখাতে পারেনি আমাদের সংবাদপত্রের লোকেরাও।

একই পরিস্থিতি ছিল ১৭ মার্চে জাতির পিতার জন্মদিনকে  নিয়েও। অনেকেই সাদা মনে ভাবতে পারেন, একজন মানুষের জন্মদিনকে কেন এতটা গুরুত্ব দিয়ে পালন করতে হবে বা জন্মদিনের কী এমন মাহাত্ম যে সেই দিনটিকে কেন্দ্র করে এত উৎসব আয়োজন করতে হবে? বিষয়টা বুঝতে হলে আগে বঙ্গবন্ধুকে বুঝতে হবে। মানতে হবে জাতির পিতাকে আর অনুধাবন করতে হবে ১৯৪৮ সাল থেকে শুরু হওয়া সেই লড়াইকে। আজকের দিনে বসে সেই দিনগুলোকে কখনোই বোঝা সম্ভব নয়। আর তাই হয়তো এমন প্রশ্ন আসবেই। ১৭ মার্চ কেবল একজন ব্যক্তির জন্মদিনই না। অস্বীকার করা যাবে না যে সেই একজন ব্যক্তির জন্ম না হলে আজকের বাংলাদেশ পেতাম না আমরা। এমনকি স্বপ্নটাই দেখার সাহস পেতাম না। হয়তো এখনও আমাদের স্বাধীনতার প্রশ্নে জীবন দিয়েই যেতে হতো।

একজন শেখ মুজিবকে ধারণ করা না গেলে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামকে ধারণ করা সম্ভব নয়। অনেকেই চেষ্টা করেন এই লড়াইটিকে নয় মাসের মাঝেই বেঁধে রাখতে। বাস্তবে কি তাই? আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রাম কি কেবল ওই কয়টা মাসেই সীমাবদ্ধ? এমন সংকীর্ণভাবে ভাবতে গেলে অস্বীকার করা হবে আমাদের ভাষার সংগ্রামকে, যাকে বলা হয় আমাদের স্বাধিকার আন্দোলনের বীজ।

বাংলা ট্রিবিউনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৯৭৫ পর্যন্ত পত্রিকার পাতায় ছিলেন জাতির পিতা, তবে সেটি হারাতে থাকে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের সেই হত্যাকাণ্ডের পর থেকেই। স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি ও তার দোসররা যে চক্রান্ত ষড়যন্ত্র করে ৭১’কে ভুলিয়ে দিতে চেয়েছিলো, ১৫ আগস্ট ছিল সেই চক্রান্তের চূড়ান্ত রূপ। তারা ভালোই জানতো যে এই একজন ব্যক্তিকে সরিয়ে দিতে পারলেই সফলতা আনতে পারবে। পাকিস্তানিরা যে কাজটি করতে গিয়েও সাহস পায়নি, স্বাধীন বাংলাদেশের কিছু পাকিস্তানি এজেন্ট সেটা করতে সাহস করেছিলো। শাসন ক্ষমতায় বসিয়েছিলো তাদেরই ভাই ব্রাদারদের, যাতে ক্ষমতা ব্যবহার করে পরবর্তী কাজগুলো করা যায় খুব সহজে।

১৯৭৫ সালের ১৭ মার্চ যেখানে সব পত্রিকায় বড় বড় করে ছাপা হয়েছিলো বঙ্গবন্ধুর ওপর প্রতিবেদন, সেখানে ১৯৭৬ সালের ১৭ মার্চ থেকে একদম হাওয়া হয়ে গিয়েছিলো বঙ্গবন্ধু নামটি। এটিকে সহজ দৃষ্টিতে দেখার কোনও উপায় আছে কি? কিন্তু পেরেছে কি তারা সফল হতে? একদম ব্যর্থ হয়েছিলো সেটাও ঠিক বলা যায় না। অন্তত কয়টা বছর তারা সফলতার সাথেই পেরেছিলো সেই কাজটি করতে। আর এর মাঝেই বেড়ে উঠেছে কয়েকটি প্রজন্ম, যাদের বয়স বাংলাদেশের বয়স থেকে কম বা ৪২ থেকে নিচের দিকে। বঙ্গবন্ধু আবার ফিরতে শুরু করেছিলো ১৯৯৬ সাল থেকে। ৯৬ সাল বলছি কারণ ৭৫’র পর সেই প্রথম বঙ্গবন্ধুর দলটি ক্ষমতায় আসতে পেরেছিলো। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় না এলে প্রকৃত ইতিহাস লুকানোই থাকতো। আজও আমরা সেটাই জানতাম, যেটা জেনেছিলাম জন্মের পর থেকে। বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে অপপ্রচারে অংশ নিয়েছিলো আমাদের দেশের কিছু বাম প্রগতিশীল রাজনৈতিক দলও। তারা তাদের কর্মীদের কখনও বঙ্গন্ধুকে জাতির পিতা বলতে উৎসাহিত করতো না। আন্তর্জাতিকতাবাদের স্লোগানের দোহাই দিয়ে জাতির পিতাকে অস্বীকারের সংস্কৃতি গড়েছিলো তারা। তখনকার প্রজন্ম জানতেই পারেনি একজন ব্যক্তির দেশপ্রেম কতটা উচ্চতার হলে ৫৫ বছরের জীবনের মধ্যে ১৪ বছর কাটিয়েছেন জেলখানায়। প্রিয়তমা স্ত্রী, কন্যা ও পুত্রদের স্বামী ও পিতৃস্নেহ থেকে বঞ্চিত করেছিলেন কেবল একটি স্বপ্নকে বুকে নিয়ে। একদিন স্বাধীন হবে এই দেশ আর স্বাধীন দেশের মানুষ হয়ে মাথা উঁচু করে বাঁচবে প্রতিটি বাঙালি।

সেই স্বপ্নকেই ভয় ছিল শাসকগোষ্ঠীর। কারণ, বঙ্গবন্ধু তাঁর মাঝেই সে স্বপ্নকে আটকে রাখেননি। বীজ বুনে দিয়েছিলেন প্রতিটি মানুষের মাঝে। আর স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখা কোনও জাতিকে পায়ের তলায় দমিয়ে রাখা সম্ভব নয় এটি বুঝতে পেরেছিলো বলেই হতভাগা এই জাতিকে দেখতে হয়েছিলো ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট।

তবে একটা জায়গায় আমাদের আসতেই হবে যে কিছু সময়ের জন্য সফল হলেও চূড়ান্ত হিসাবে তাদের সেই ষড়যন্ত্র সফল হয়নি আর হবেও না কখনও। বঙ্গবন্ধুকে এ দেশ থেকে মুছে দিতে চেয়েছিলো কিন্তু তিনি এখন ছড়িয়ে পড়েছেন দেশের সীমানা ছাড়িয়ে গোটা বিশ্বে। তাঁর ৭ মার্চের ভাষণ এখন জাতিসংঘ কর্তৃক স্বীকৃত। নতুন প্রজন্ম এখন নতুন করে আবার আবিষ্কার করতে পারছে বঙ্গবন্ধুর গভীরতাকে। সরকার অনেক বেশি আন্তরিক মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে সবার কাছে উন্মুক্ত করতে, বিশেষ করে নতুন প্রজন্মের কাছে সঠিক বিষয়টা পৌঁছে দিতে। আশা করছি, যে কালো অধ্যায়ের শুরু হয়েছিলো ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সেই কালো অধ্যায় বাংলার মাটি থেকে একদিন নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে আর চিরঅম্লান হয়ে বেঁচে থাকবেন আমাদের জাতির পিতা, আমাদের বঙ্গবন্ধু, গোটা বিশ্বের নিপীড়িত জনতার নেতা শেখ মুজিবুর রহমান।

লেখক: কলামিস্ট

 

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ