বই লেখা ও বিক্রির ইঁদুর দৌড়

Send
বিধান রিবেরু
প্রকাশিত : ১৮:০৪, মার্চ ১৮, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৯:১২, মার্চ ১৮, ২০১৯

বিধান রিবেরুযারা লেখক তারা ভাষা নিয়ে কারবার করেন। তবে ভাষা নিয়ে কারবারি মাত্রই লেখক নন। তাহলে তো দলিল লেখকরাও ‘লেখক’ হিসেবে গণ্য হতেন। তাছাড়া যা ইচ্ছা তা লিখলেই তো আর লেখক হওয়া যায় না— এমন প্রতীতি এখন অবশ্য হুমকির মুখে। সম্প্রতি একটি প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, অনেকেই ফেসবুকে লেখা স্ট্যাটাস নিয়ে একটি বই বের করে ফেলছেন এবং প্রস্তুতি ছাড়াই লেখক যশপ্রার্থী হচ্ছেন। অনেকে আবার কাণ্ডজ্ঞানসমৃদ্ধ লেখার সংকলন বই আকারে প্রকাশ করেও নিজেদের লেখক দাবি করছেন। কেউ কেউ আছেন ইউটিউবে শিক্ষা ও অনুপ্রেরণামূলক ভিডিও তৈরি করে বেশ নাম কামিয়েছেন, ভার্চুয়াল দুনিয়ায় তাদের অনেক অনুসারী ও ভক্ত রয়েছেন, তারাও ইদানীং একুশে বইমেলা উপলক্ষে ‘বই’ লিখে উঠছেন।
অন্য মাধ্যমে যারা খ্যাতি অর্জন করেছেন, ইংরেজিতে যাদের সেলিব্রেটি বলে, তারা আজকাল হরদম বই প্রকাশ করছেন। যেহেতু তাদের বিরাট ভক্তকুল রয়েছে, তারা ওই সেলিব্রেটিদের বই চোখ বন্ধ করে কিনছেন এবং যথারীতি কোনও কোনও ই-কমার্স সাইটে তারা হয়ে উঠছেন বেস্ট সেলিং অথর।
ঠিক আছে বই পণ্য তো বটেই, তবে তারা যে সর্বাধিক বিক্রীত বইয়ের মালিক হচ্ছেন, সেটা কিন্তু সাহিত্যের বন্ধুর পথ মাড়িয়ে নয়। তারা ছোট, বড়, কম্পিউটার ও মোবাইল ফোন পর্দার তারকা। সেখানে নানাভাবে তারা খ্যাতি অর্জন করেছেন। দেশের মানুষ বই পড়তে অতটা ভালোবাসে না। বিশেষ করে গভীর বোধের কোনও সাহিত্যকর্ম তো নয়ই। তো সেলিব্রেটিরা যখন সহজ-সরল, চটুল অথবা কাণ্ডজ্ঞাননির্ভর কথা বইয়ে গুঁজে দিচ্ছেন, তখন ভক্ত সম্প্রদায় কর্তব্যজ্ঞান করে সেসব বই কিনছেন। এটাই হলো সর্বাধিক বিক্রীত বইয়ের তরুণ লেখকদের ‘বিখ্যাত’ হয়ে ওঠার পাটিগণিত। আর বীজগণিত হলো বেচাবিক্রি বাড়ানোর জন্য অর্থ ব্যয় করে তারা অনলাইনে ব্যাপক প্রচারণা চালায় এবং লোভনীয় সব অফার দেয়, যেমন- প্রথম একশজন ক্রেতা পাবেন লেখকের অটোগ্রাফসহ বই বা পাবেন একটি টি-শার্ট, মগ ইত্যাদি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্রেতাদের আকৃষ্ট করার জন্য আরও কত কায়দা-কানুন যে করা হয়!

এই ভুঁইফোড় লেখকদের নিয়ে অনেক পুরনো ও পোড়খাওয়া লেখক চিন্তিত হয়ে পড়েছেন। প্রথমত তারা মনে করছেন, সাহিত্যচর্চা বুঝি ডুবতে বসেছে। দ্বিতীয়ত মনে করছেন, এ জাতির ভবিষ্যৎ অন্ধকার। তৃতীয়ত, এ ধরনের লেখাপত্র সর্বাধিক বিক্রি হয় কী করে? এটা অসূয়া-জাতও হতে পারে। এসব শঙ্কার বিপরীতে বলতে চাই, সাহিত্যচর্চা এ দেশে ডুবেই ছিল। কখনোই ভাসেনি। নয়তো স্বাধীনতার পর থেকে হিসাব করে দেখুন, কোনও বড়মাপের সাহিত্যিক বা প্রাবন্ধিকের কত কপি বই বিক্রি হয়েছে বা হচ্ছে? আর জাতির ভবিষ্যৎ? আরও অন্তত তিনশ বছর অপেক্ষা করতে হবে অন্ধকার কাটার জন্য। এর জন্য দায়ী আমাদের শিক্ষা-অবান্ধব সরকারি পরিকল্পনা ও বাজেট। শেষ প্রশ্নের উত্তরে বলবো, অধিকাংশ মানুষের যেমন রুচি, তেমন ধারার বই-ই তো বেশি বিক্রি হবে। এটা নিয়ে এতো চিন্তিত হওয়ার কিছু নেই। বহুকাল ধরেই তো ‘তুমিই পারবে’ বা ‘সাফল্যের একশ একটি উপায়’ ধরনের বই বাজারে ভালো বিকোয়। এখন ধরনটা বদলেছে, এই আর কি। এ ধরনের চরম স্বার্থপর ও ব্যক্তিবাদী ঘরানার বইয়ের কাটতি দেখে অনেক প্রতিষ্ঠিত লেখকও এখন বাজার ধরার ইঁদুর দৌড়ে শামিল হচ্ছেন। তারা ‘সফল যদি হতে চাও’ শিরোনামে বইও লিখছেন। বিষয়টি মনোযোগ আকর্ষণের মতোই।

আশঙ্কার ব্যাপার হলো, যে পদ্ধতিতে তরুণরা ও গুটিকয়েক প্রবীণ লেখক বই প্রকাশের প্রতিযোগিতা ও নিজেদের বিজ্ঞাপন-প্রচারের বন্যা বইয়ে দিচ্ছেন, সেটা লেখালেখিতে আগ্রহী অনেক তরুণের কাছে ভুল বার্তা পৌঁছে দিতে পারে। তারা ভাবতে পারেন, লেখালেখি একটি অতি সহজ কাজ, অজস্র যা-তা লিখেই একুশের বইমেলাতে একাধিক বই বের করে অনেক খ্যাতি অর্জন করা যায় আর নগদ প্রাপ্তি তো আছেই। কঠিন বাস্তবতা হলো লেখালেখি করা অতটা সহজ কর্ম নয়। শ্রম ও সাধনার মধ্য দিয়ে লেখকদের কাজের অঞ্চল ও নিজস্ব ভাষারীতি তৈরি করতে হয়। দুনিয়াতে কোনও কিছুই সহজলভ্য নয়। একজন মানুষ ইউটিউবার হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেছে মানেই এই নয়, তিনি লেখক হিসেবে সফল হবেন। ইউটিউবার হিসেবে সাফল্য পেতে হলে যেমন পরিশ্রম করতে হয়, বিষয়ের ভেতর ডুব দিতে হয়, ভিডিও নির্মাণে দক্ষতা থাকতে হয়, তেমনি একজন লেখক হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেতে গেলেও একই রকম নিষ্ঠা নিয়ে কাজ করতে হয়। কিন্তু এটা অনেক ইউটিউবার বা ফেসবুকারই বুঝতে পারছেন না।

এটা যেন অনেকটা অমিতাভ বচ্চনের হুট করে কোনও চলচ্চিত্রের প্লে-ব্যাক করার মতো ঘটনা। পার্থক্য হচ্ছে, অমিতাভ জানেন, তার গাওয়া গানটি অজস্র লোক শুনবে বটে, কিন্তু তিনি নিজেকে কখনও গায়ক দাবি করবেন না। লোকেও সেটা বলবে না। তবে আমাদের প্রজন্মের যারা রেডিও জকি বা অনলাইনের জন্য কন্টেন্ট তৈরি করেন, তারা হয়তো বুঝতে পারছেন না, প্রস্তুতি ছাড়াই একের পর এক বই লিখে গেলেই লেখক হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাওয়া যায় না, সাময়িক খ্যাতি ও অর্থ পাওয়া যায়, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে তারা সাহিত্যিক বা লেখক হিসেবে টিকে থাকতে পারবেন না। হয়তো তারা জবাবে বলবেন, নগদ যা পাও, হাত পেতে নাও।

ভুলভাল বাংলা ও ভাষাদূষণ করে, বিষয়ের প্রতি যত্নবান না হয়েও যদি ‘লেখক’ হিসেবে সাময়িক খ্যাতি পাওয়া যায় ক্ষতি কী? এই মনোভাব থেকে একের পর এক বই প্রসব করে গেলে কেউ তো আর তাদের ঠেকাতে পারবে না। জেল-জরিমানাও করতে পারবে না। তাই শুদ্ধ বলতে চাই, লেখক হতে হলে লেখালেখির প্রস্তুতি হিসেবে কিছু জিনিস অবশ্যই করা দরকার।

প্রথমত প্রচুর পড়তে হবে এবং সেটা বাছাই করা বইপত্র হলেই ভালো। লেখকদের গ্রন্থকীট হওয়ার দরকার নেই। বাজে বই পড়ে সময় নষ্ট করার মানে হয় না। দ্বিতীয়ত হলো, যা লিখে উঠেছেন সদ্য, সেটাই ছাপানোর জন্য অস্থির না হওয়া। প্রথমে সেটি ঘনিষ্ঠ পড়ুয়া কাউকে দেখান। অথবা প্রতিষ্ঠিত লেখককে দিন পড়ার জন্য। ব্লগেও দিতে পারেন কিংবা ফেসবুকে নোট হিসেবেও আপ হতে পারে আপনার লেখা। লেখা বুঝদার কাউকে পাঠান। তাদের প্রতিক্রিয়া জানুন। এর পরের ধাপে আপনার লেখা দেশের প্রতিষ্ঠিত পত্রিকা ও অনলাইন পত্রিকাতে পাঠান। দেখুন, সেখানে কীভাবে আপনার লেখা সম্পাদিত হয়ে প্রকাশ হচ্ছে। তারপর আপনি সিদ্ধান্ত নিন বই প্রকাশ করবেন কী করবেন না।

তবে এসকল কিছুর ঊর্ধ্বে আমি মনে করি, যে ভাষা ব্যবহার করে আপনি লিখতে ও নিজের মনোভাব প্রকাশ করতে চান, নতুন বক্তব্য বা আফসানা পেশ করতে চান, সেই ভাষাটিকে আপনার ভালোবাসতেই হবে। ভাষার প্রেমে না পড়লে ওই ভাষার লেখক হয়ে ওঠা আমি মনে করি দুঃসাধ্য ব্যাপার। এর কারণ, একটি ভাষার শব্দভাণ্ডার, তার বাক্যগঠনের রীতি, তার অলিগলি ও তার রহস্যময়তা সম্পর্কে আপনি যদি ওয়াকিবহাল না হন, তাহলে ভাষা নিয়ে কারবার করা সম্ভব নয়। বেশি হলে কসরৎ হয়তো করা যাবে। আরেকটু বেশি হলে অশিক্ষিত পটুত্ব হবে। প্রকৃত অর্থে সাহিত্যমূল্য সমৃদ্ধ রচনা হয়ে উঠবে না।

শেষ করার আগে এক ভিনদেশি মানুষের বাংলা ভাষার প্রতি ভালোবাসার কথা বলতে চাই। মানুষটির নাম পল দ্যতিয়েন। তিনি একজন ধর্মযাজক এবং বাংলা গদ্যের অনন্য শিল্পী। চিন্ময় গুহকে বেলজিয়ামের ফরাসিভাষী সেই ফাদার দ্যতিয়েন এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘বাংলায় লেখক হবো ভাবিনি, ভালো করে ভাষাটা শিখতে চেয়েছিলাম। অন্যেরা, মানে বিদেশিরা, কোনও রকমে ভাষাটা বলতে শেখে, লিখতে পারে না। আমি খুব নিষ্ঠাভরে ভাষা শিখতে চেয়েছিলাম। আসলে বাংলা ভাষার ধ্বনিমাধুর্য, সংগীত—musicalité de la prose—আমাকে আকৃষ্ট করেছে। বাংলা গদ্যের সুরের মূর্ছনা আমার কানে বাজে।’

বাংলা ভাষায় যারা লিখতে চান তাদের এই ভাষার ‘সুরের মূর্ছনা’কে শুনতে পারতে হবে। কানকে প্রস্তুত করতে হবে। সুর ধরতে না পারলে লেখার মধ্যে বেসুরো উপস্থাপনা ভেসে আসবে। আর গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চে কেউ বেসুরো গায়ককে পছন্দ করেন না। বাংলা একাডেমি আয়োজিত একুশে গ্রন্থমেলা লেখকদের জন্য একটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ। এখানে বেসুরো গান পরিবেশন না করাই ভালো। তবে একটাই স্বস্তি, প্রকৃত পাঠক সুরাসুরের পার্থক্য বোঝেন!

দোহাই

১. ফাদার পল দ্যতিয়েনের সাক্ষাৎকার, (২০১৯), আয়না ভাঙতে ভাঙতে: চিন্ময় গুহর সঙ্গে কথোপকথন, (কলকাতা: পরম্পরা)।

লেখক: প্রাবন্ধিক

 

 

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ