গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির আতঙ্ক

Send
আনিস আলমগীর
প্রকাশিত : ১৪:০৪, মার্চ ১৯, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ২১:৫২, মার্চ ১৯, ২০১৯

আনিস আলমগীর
গ্যাসের বিতরণ কোম্পানিগুলো গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাব করেছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের কাছে। এ নিয়ে টিসিবি অডিটোরিয়ামে গণশুনানিও অনুষ্ঠিত হয়েছে চলতি মাসে। পাঁচটি গ্যাস বিতরণ কোম্পানি আবাসিক, শিল্প, বাণিজ্য, বিদ্যুৎসহ সব খাতেই দাম বাড়ানোর আবেদন করেছে। পত্রপত্রিকায় মূল্যবৃদ্ধির যে প্রস্তাব প্রকাশিত হয়েছে তাতে সারাদেশে একটা আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে। প্রস্তাবে বিদ্যুতের জন্য প্রতি ঘনমিটার গ্যাসের দাম ৩.১৬ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৯.৭৪ টাকা, সিএনজি ৩২ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৪৮.১০ টাকা, প্রিপেইড মিটারে ৯.১০ টাকা থেকে ১৬.৪১ টাকা করার প্রস্তাব করেছে। সার উৎপাদনে প্রতি ঘনমিটার ২.৭১ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৮.৪৪ টাকা, ক্যাপটিভ পাওয়ারে ৯.৬২ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৮.০৪ টাকা, শিল্পে ৭.৭৬ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২৪.৪৫ টাকা, বাণিজ্যিকে ১৭.০৪ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২৪.৫০ টাকা করার প্রস্তাব করেছে। আবাসিকে এক চুলার দর ৭৫০ টাকা থেকে ১৩৫০ টাকা, দুই চুলা ৮০০ টাকা থেকে ১৪৪০ টাকা করার প্রস্তাব করেছে।

প্রায় ক্ষেত্রে দ্বিগুণ মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাব করা হয়েছে। এ প্রস্তাব কার্যকর হলে প্রতিটি জিনিসের ওপর তার প্রতিক্রিয়া হবে এবং জিনিসপত্রের মূল্যও দ্বিগুণ হয়ে যাবে। কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) পক্ষে গ্যাসের দাম বাড়ানোর প্রক্রিয়া স্থগিত চেয়ে হাইকোর্টে রিট আবেদনও দাখিল করা হয়েছে এরইমধ্যে। অবশ্য রেগুলেটরি কমিশনের চেয়ারম্যান মনোয়ারুল ইসলাম জনগণকে আতঙ্কিত না হওয়ার অনুরোধ করেছেন এবং বিতরণ কোম্পানিগুলো মূল্য বাড়ানোর প্রস্তাবে যা বলুক না কেন, যৌক্তিক পর্যায়ে সবকিছু বিবেচনা করে মূল্য নির্ধারণের কথাও তিনি উল্লেখ করেছেন। জ্বালানি উপদেষ্টা তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী বলেছেন, পুরনো দরের সঙ্গে সমন্বয় করে দর স্থির করা হবে। সর্বশেষ ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে গ্যাসের দাম গড়ে ২২ দশমিক ৭০ শতাংশ বাড়ানো হয়। সে বছরের মার্চ ও জুলাই থেকে দুই ধাপে তা কার্যকর হয়।

এত উচ্চ হারে গ্যাসের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব আসলো কেন? বাংলাদেশে এখন গ্যাস মজুত আছে ১৪.৩২ ট্রিলিয়ন কিউবিক ফিট (টিসিএফ) আর আমাদের বর্তমানে গ্যাস প্রয়োজন হয় বার্ষিক এক টিসিএফ।

২০০৯ সাল থেকে আবাসিক ও শিল্প কারখানায় চালু করা হয়েছিলো কিন্তু অব্যাহত রাখা সম্ভব হয়নি। সব সংযোগ বন্ধ রাখলে দেশের মজুত গ্যাস দিয়ে আরও ১২ বছর চলবে। কিন্তু সংযোগ আর কতদিন বন্ধ রাখা যায়। বিশেষ করে শিল্পকারখানা স্থাপনের জন্য, বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের জন্য, সার কারখানা স্থাপনের জন্য গ্যাসের প্রয়োজন। সম্ভবত তাই সরকার এলএনজি (তরল গ্যাস) আমদানির সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এখন দেখা যাচ্ছে আমদানিকৃত তরল গ্যাসের দাম পড়ছে ৩২ টাকা প্রতি ঘনফুট। অথচ স্থানীয়ভাবে মূল্য আদায় করা হচ্ছে ৭.১৭ টাকা প্রতি ঘনফুট অর্থাৎ এক ঘনফুটে ব্যবধান হচ্ছে ২৪.৮০ টাকা।

তরল গ্যাস আমদানির শুরু থেকে গত ৯ মাসে প্রতিদিন ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট আমদানিকৃত তরল গ্যাসের খাতে পেট্রোবাংলা নাকি ৯ হাজার কোটি টাকা লোকসান দিয়েছে। এ পরিস্থিতিতে গ্যাসের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব যৌক্তিক। তবে এ যৌক্তিক দাম বাড়ানোর প্রস্তাব মেনে নিলে সারের দাম বেড়ে যাবে, বিদ্যুতের দাম বেড়ে যাবে, শিল্পকারখানার উৎপাদিত সব জিনিসের দাম বহুগুণ বেড়ে যাবে। গণপরিবহনে ভাড়া বাড়বে এবং জনজীবনে এক ব্যাপক দুর্ভোগ নেমে আসবে।

দক্ষিণ ভারতের রিলায়েন্স গ্রুপ তরল গ্যাস দিয়ে একটা বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করেছিলো আর উৎপাদিত বিদ্যুতের দাম এত বেশি পড়েছিলো যে রিলায়েন্স এ বিদ্যুৎ বাজারজাত করতে পারেনি এবং শেষ পর্যন্ত বিদ্যুৎ কেন্দ্রটিই বন্ধ করে দিয়েছিলো। সুতরাং তরল গ্যাসের ওপর কখনও আমাদের মতো দরিদ্র দেশের পক্ষে নির্ভর করা সম্ভব নয়। বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে আমাদের হয়তো মিয়ানমার থেকে পাইপ লাইনের মাধ্যমে প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানি করতে হবে, না হয় বঙ্গোপসাগর থেকে গ্যাস উত্তোলনের দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে।

সমুদ্রসীমার রোয়েদাদ পাওয়ার পর মিয়ানমার ও ভারত সার্ভের কাজ শুরু করে দিয়েছিলো। এখন উভয় দেশ গ্যাস উত্তোলন আরম্ভ করেছে এবং মিয়ানমার তার গ্যাস চীনের কাছে বিক্রি করেছে এবং পাইপলাইন স্থাপন করে চীন মিয়ানমার থেকে গ্যাস নিচ্ছে। ভারতেরও সেভেন সিস্টারের জন্য মিয়ানমার থেকে গ্যাস নেওয়ার কথা। এখন বিষয়টা কোন স্তরে আছে সর্বশেষ খবর জানি না। অথচ আমরা সাগরে সার্ভের কাজটি পর্যন্ত সম্পন্ন করতে পারিনি। সমুদ্র বিজয়ের গান গেয়ে দিন কাটিয়েছি।

ভারতও তার সমুদ্র এলাকার গ্যাস উত্তোলন আরম্ভ করেছে। তারা সাধারণ সার্ভে করে গ্যাস উত্তোলনে সফল হয়েছে। বাংলাদেশ বঙ্গোপসাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে মাল্টিক্লায়েন্ট সিসমিক (ভূতাত্ত্বিক) সার্ভের কথা চিন্তা করছে। ভারত ও মিয়ানমার গ্যাস পেয়েছে, বাংলাদেশ অংশেও নিশ্চয়ই গ্যাস মজুত রয়েছে। কোনও এক বিদেশি পত্রিকায় বাংলাদেশের সমুদ্র সম্পদ সম্পর্কে একটা আর্টিক্যাল পড়েছিলাম। তাতে বলা হয়েছিলো, এখানে নাকি কয়েক ট্রিলিয়ন ডলারের সম্পদ মজুত আছে। সম্ভবত প্রধানমন্ত্রীও এ বিষয়ে নিশ্চিত হয়েছেন, যে কারণে এ সম্পদের সুরক্ষার জন্য তিনি উদ্যোগী হয়ে দুটি সাবমেরিন কিনেছেন। ক্ষমতার ধারাবাহিকতা গণতান্ত্রিক দেশে খুবই কঠিন। গত দশ বছর আওয়ামী লীগ একটানা ক্ষমতায়। এখন পুনরায় পাঁচ বছরের জন্য ক্ষমতায় এসেছে। সরকারের উচিত ছিল খুব দ্রুততার সঙ্গে সমুদ্রে গ্যাস উত্তোলনের উদ্যোগ নেওয়া।

জ্বালানি উপদেষ্টা তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরীর মতো একজন অভিজ্ঞ লোক থেকে অনুরূপ অমনোযোগিতা জাতি কখনও আশা করেনি। গ্যাস এমন একটা প্রয়োজনীয় জিনিস, যার অপ্রতুলতা বহুমুখী কঠিন সমস্যা সৃষ্টি করে। অথচ আমাদের ধারণা আমরা সমুদ্রে ৭০/৮০ বছরের প্রয়োজনীয় গ্যাস পাবো। গণশুনানিতে অংশগ্রহণ করে পেট্রোবাংলার এক পরিচালক বলেছেন, বাংলাদেশের কাছে দক্ষ জনশক্তি নেই এবং সমুদ্রে গ্যাস আহরণের কোনও অভিজ্ঞতাও নেই। অভাব থাকলে অভাব পূরণের কি কোনও উপায় নেই? চার বছর ধরে হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকলে কি সমস্যার সমাধান হবে।

বাংলাদেশ অনন্ত সমস্যার দেশ। ৫৬ হাজার বর্গমাইলের মাঝে ১৭ কোটি মানুষের বাস। এখানে যারা রাষ্ট্র পরিচালনা করেন তাদের কোনও বিশ্রাম নেওয়ারও অবকাশ নেই। সিঙ্গাপুরে লি কুয়ান ইউ বা মালয়েশিয়ার মাহাথির বিন মোহাম্মদ একটানা দেশ শাসন করেছেন আর কঠোর পরিশ্রম করে দেশকে একটা দৃশ্যমান উন্নত স্তরে পৌঁছে দিয়েছেন। তিন লাখ ত্রিশ হাজার বর্গ কিলোমিটারের দেশ মালয়েশিয়ায় লোকসংখ্যা ২ কোটির ওপরে, প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর। বিশ্বের এক নম্বর রাবার উৎপাদনকারী দেশ। প্রচুর ভোজ্যতেলও উৎপাদন করে। তারা রাশিয়ার কাছ থেকে যুদ্ধবিমান কিনেছে ভোজ্যতেলের বিনিময়ে (পাম অয়েল)।

আমাদের সম্পদ হচ্ছে মানুষ আর মানুষ। সুতরাং আমাদের উন্নতি দৃশ্যমান করা, স্থায়ী করা খুবই কঠিন। এখানে অবহেলার কোনও অবকাশ নেই। প্রতিটি কর্মকর্তাকে, প্রতিটি মানুষকে কঠোর পরিশ্রম করতে হবে। প্রশিক্ষিত মানুষ গড়ে তুলতে হবে যেন ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ট থেকে উন্নত যেসব দেশ বঞ্চিত হচ্ছে সেসব দেশের প্রয়োজনে আমরা জনশক্তি রফতানি করতে পারি। আবার দেশে সব রকমের অবকাঠামোগত উন্নয়নও করতে হবে, যেন বিদেশিরা পুঁজি বিনিয়োগে এগিয়ে আসে।

চীনের সংস্কারপন্থী নেতা দেং জিয়াও পিং যখন গত শতাব্দীর আশির দশকে অবকাঠামো ঠিক করে সাংহাইয়ে ইপিজেড স্থাপন করে পুঁজিপতিদের আহ্বান করেন তখন তো আমেরিকার সব বন্ধ হয়ে যাওয়া কারখানা চীনের সাংহাইয়ে চলে আসে। এমনকি তাইওয়ানের পুঁজিপতিরাও এসেছিলো। সেই রমরমা ব্যবসার কারণে গত চল্লিশ বছরের চীন বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পুঁজির মালিক হয়েছে। দেং জিয়াও পিংয়ের পরিকল্পনা ছিল নিখুঁত আর সমগ্র জাতি মনপ্রাণ দিয়ে কাজ করেছে। অথচ ৭১ বছর আগেও অফিম খেয়ে এ চীনা জাতিটা নেশায় বুঁদ হয়ে পড়ে থাকতো।

যাক, আপাতত দেখা যাচ্ছে গ্যাস উন্নয়নের মূল চালিকাশক্তি। গ্যাসের ওপর প্রেসার কমানো দরকার। গ্যাসের ওপর প্রেসার কমাতে হলে নিম্নলিখিত পদক্ষেপগুলো বিবেচনায় আনা সমীচীন হবে কিনা চিন্তা করা দরকার।

এক. সার কারখানার মূল কাঁচামাল গ্যাস আর মিঠা পানি। পূর্বে আমাদের দেশ প্রয়োজনের সব সারই বিদেশ থেকে আমদানি করতো। শুধু আওয়ামী লীগ যখন ১৯৫৬ সালের ৩০ আগস্ট ক্ষমতায় আসে তখন সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জে একটা ছোট সার কারখানা স্থাপন করেছিলো এবং ১৯৬১ সালে এটি চালু হয়। এছাড়া গত শতাব্দীর ছয় দশকে চট্টগ্রামে টিএসপি সার কারখানাটি হয়েছিলো। ইউরিয়া সম্পূর্ণভাবে আমদানি হতো। এখন ইউরিয়ার উৎপাদন কমিয়ে দিয়ে পুনরায় প্রয়োজনীয় ইউরিয়া আমদানি করার কথা চিন্তা করা যায়। তাতে আপাতত সংকটকালে কিছু গ্যাস সাশ্রয় হবে।

দুই. আমাদের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো গ্যাস টারবাইনে রূপান্তরিত করা হয়েছিলো। এখন তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র আছে শুধু বড়পুকুরিয়ায়। রামপাল, মাতারবাড়ি, বাঁশখালী, পায়রায় যেসব তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের প্রক্রিয়া চলছে তা এখনও উৎপাদনে আসেনি। আমরা মনে করি আশুগঞ্জ ও ঘোড়াশাল উভয় বড় গ্যাস টারবাইন বিদ্যুৎকেন্দ্র। এ উভয় কেন্দ্রের যে কোনও একটার পাশে একটা দ্রুত তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া যায়। প্রয়োজনে গ্যাস টারবাইন স্থগিত রেখে যেন তাপবিদ্যুৎ দিয়ে প্রয়োজন মিটানো যায়।

তিন. বড় বড় শহর, যেমন- ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, সিলেট, রাজশাহী ইত্যাদি শহরে প্রতিটি দালানে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন বাধ্যতামূলক করা হয়।

চার. গণপরিবহন ছাড়া অন্য পরিবহনের গ্যাস সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়া দরকার।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে অনুরোধ করবো যেন গ্যাসের দাম বাড়ানো না হয়। প্রধানমন্ত্রী আগেও চার হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিয়ে জনসাধারণের অশেষ কল্যাণ করেছেন। এবারও যেন অনুরূপ কিছু করা হয়। আর সাগরের গ্যাস উত্তোলনের যেন দ্রুত ব্যবস্থা করা হয়। গ্যাসের দাম বাড়লে প্রতিটি জিনিসের দাম বাড়বে আর তাতে মানুষের জীবনে দুর্ভোগ নেমে আসবে।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট। ইরাক ও আফগান যুদ্ধ-সংবাদ সংগ্রহের জন্য খ্যাত।

anisalamgir@gmail.com

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ