ছাত্র রাজনীতির ধারাবাহিকতা বনাম ‘প্রথা বিরোধিতা’?

Send
আহসান কবির
প্রকাশিত : ১৬:২৭, মার্চ ২০, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:৩০, মার্চ ২০, ২০১৯

আহসান কবির‘প্রথাবিরোধী’ (প্রতিষ্ঠান বিরোধিতাও বলেন কেউ কেউ। সবচেয়ে বড় প্রতিষ্ঠান কী সরকার?) বলে একদা জনপ্রিয় একটা শব্দ ছিল। একসময়ের ছাত্র রাজনীতির মূল অনুপ্রেরণা ছিল এই ‘অ্যান্টি এস্টাবলিস্টমেন্ট’ তথা প্রথাবিরোধী প্রবণতা। এখন কী সেটা আদৌ আছে নাকি নেই?
প্রথার প্রতি পক্ষপাতিত্ব যে আগে ছিল না তেমনও নয়। হয়তো প্রথা বিরোধিতা ছিল অন্তরের প্রবণতা, কারো কারো কাছে ফ্যাশন (রাজনীতি যারা করতেন তাদের ভেতর কেউ কেউ নাকি এটাকে ফ্যাশান হিসেবে নিতেন), একই সঙ্গে প্রথা বা প্রতিষ্ঠানের প্রতি পক্ষপাতিত্বও ছিল বহমান। যেমন ধরুন, ১৯৪৮ সাল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আসবেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলি খান। রেওয়াজ অনুসারে সম্মান জানানোর জন্য মানপত্র পাঠ করা হবে। পাঠ করবেন ডাকসুর ভিপি। ডাকসুতে সে সময়ে ইলেকশন হতো না, সিলেকশন প্রথা বজায় ছিল। তখন ডাকসুর জেনারেল সেক্রেটারি মনোনীত হয়েছিলেন গোলাম আজম, ভিপি হয়েছিলেন অরবিন্দ বোস। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান ১৯৪৮ সালের নভেম্বরে পূর্ব পাকিস্তান এলে তাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমন্ত্রণ জানানো হয়। ১৯৪৮-এর ২৭ নভেম্বর লিয়াকত আলী খানকে স্বাগত জানিয়ে এক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়, যেখানে মানপত্র পাঠ করার কথা ছিল ভিপি অরবিন্দ বোসের। মাত্র পনের ষোল মাস আগে ধর্মের ভিত্তিতে ভাগ হওয়া দুই দেশের সাম্প্রদায়িক উসকানি কিংবা ক্ষত তখনও শুকায়নি।  মুসলিম লীগ সরকারের প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানিয়ে মানপত্র পাঠ করবেন একজন হিন্দু, এটা অনেকেই মেনে নিতে পারেননি। তাই এই সুযোগটা পেয়ে যান সিলেক্টেড ডাকসু জিএস গোলাম আজম। ওই মানপত্রে বাংলা ভাষাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার অনুরোধ ছিল। জামায়াতিরা এই ঘটনাকে পুঁজি করে বহুদিন প্রচার করেছে গো.আজম ভাষাসৈনিক ছিলেন। ১৯৭০ সালে পাকিস্তানের শুক্কুরে আঞ্জুমানে ইয়ারানের পক্ষ থেকে এক সংবর্ধনা দেওয়া হয় গো. আজমকে। সেখানে তিনি বলেছিলেন, ‘বাংলা ভাষা আন্দোলন ভুল হইয়াছিল! সেখানে তিনি বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে চাওয়ার জন্য দুঃখ প্রকাশ করেন। এতবড় রাজনৈতিক ভুল আর হবে না বলেও তিনিও প্রতিশ্রুতি দেন’!

ডাকসুর জিএস হয়েও গো.আজম  কিংবা জুলমত আলী খানরা স্বাধীনতার বিরোধী ছিলেন। তখন প্রথাবিরোধী রাজনীতি করেছেন এবং স্বাধীনতার পক্ষে কাজ করেছেন রাশেদ খান মেনন, তোফায়েল আহমেদ, আব্দুল কুদ্দুস মাখন,আসম রবসহ আরও কয়েকজন। এক-দুজন বাদে স্বাধীনতার আগে এবং পরে ছাত্রনেতারা অনেকবার তাদের পথ ও মত বদলেছেন। সন্দেহ নেই ১৯৫২’র ভাষা আন্দোলন, ১৯৬৬’র ছয় দফা আন্দোলন, ১৯৬৯’র গণঅভ্যুত্থান এবং ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে ছাত্ররাই ছিল সবচেয়ে বড় নিয়ামক শক্তি, তাদের নেতৃত্বেই এই আন্দোলন সংগ্রামগুলো বাস্তবায়িত হয়েছিল। এরপর থেকে ক্রমশ কমেছে প্রথা বিরোধিতার রাজনীতি, যেন ক্ষমতার হালুয়া রুটিই হয়ে দাঁড়িয়েছে সবকিছুর নিয়ামক।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার করা হয়েছিল। ১৯৪৭ সালের পর থেকে ১৯৭১ পর্যন্ত যারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি হয়েছেন, কোনও না কোনোভাবে তারা পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকদের (ন্যূনতম হলেও) ‘গুডবুকে’ ছিলেন। ১৯৭৫ সালের পর থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত ছাত্র রাজনীতিতে একরকম ‘পুরনো ধারাই’ বজায় আছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলো দখল করে সেখানে সাধারণ ছাত্রদের অসহায় ও জিম্মি করে রেখে এবং ভয়ভীতি দেখিয়ে সমর্থন আদায় অথবা মিছিলে আনার কাজটা প্রথম শুরু করে আইয়ুব-মোনায়েম খানদের ছাত্র সংগঠন ন্যাশনাল স্টুডেন্ট ফেডারেশন বা এনএসএফ। এনএসএফের গুণ্ডা-খ্যাত পাঁচপাত্তুর বা খোকা এবং তার চেলাচামুণ্ডারা ক্যাম্পাসে হকিস্টিক,চাকু,ড্যাগার নিয়ে ঘুরে বেড়াতো। সাপ ছেড়ে দেওয়ার গল্প কিংবা ক্যাম্পাসে মেয়েদের আটকে রেখে ফুর্তি করার ঘটনা অনেকজনের লেখাতেই আছে। পাঁচপাত্তুর ওরফে খোকা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে খুন হয়েছিল। ১৯৭১ সালেই এরা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস থেকে পালিয়েছিল।

প্রিয় পাঠক, নিজের পুরনো লেখা থেকে রেফারেন্স টানতে হচ্ছে বলে দুঃখিত।

‘১৯৭১ সালে বাংলাদেশ লিবারেশন ফোর্স (বিএলএফ) গড়ে উঠেছিল ইন্ডিয়ান জেনারেল উবানের নেতৃত্বে। বিএলএফ পরে মুজিব বাহিনী নামে পরিচিত হয়। এই বাহিনীর চার আঞ্চলিক নেতা ছিলেন মনোজ (শেখ ফজলুল হক মনি), সরোজ (সিরাজুল আলম খান), রাজু (আবদুর রাজ্জাক) ও  তপন (তোফায়েল আহমেদ)। এই চারজন মানুষ তখন ইন্ডিয়ান সরকারের প্রটোকল পেতেন বলে মহিউদ্দীন আহমেদ তার বইতে (জাসদের উত্থান পতন: অস্থির সময়ের রাজনীতি) লিখেছেন। স্বাধীনতার পর রাজনীতির বাঁকবদলও হয়েছিল ছাত্র রাজনীতিকে ঘিরেই। মনোজ, সরোজ, রাজু ও তপন স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের রাজনীতিকে প্রভাবিত করতে পেরেছিলেন। বাংলাদেশের রাজনীতির বিভাজন এবং স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে নতুন রাজনৈতিক দল তৈরি হয়েছিল মূলত এই চারজন এবং তাদের বলয়ভুক্ত নেতাদের বিভাজনকে কেন্দ্র করে। ১৯৭২ সালের জুলাই মাসে ছাত্রলীগের ভেতর প্রথম বিভাজন আসে। অবশ্য স্বাধীনতার চার পাঁচ মাস পরেই ছাত্রলীগের দুটো গ্রুপ সিরাজ-রব গ্রুপ ও মুজিববাদী গ্রুপ বলে পরিচিতি লাভ করছিল। ৭২-এর ২১-২৩ জুলাই ছাত্রলীগের দুই গ্রুপ কেন্দ্রীয় সম্মেলন ডাকে। সিরাজ-রব গ্রুপ সম্মেলন ডাকে পল্টন ময়দানে আর মুজিববাদী গ্রুপ (তোফায়েল, রাজ্জাক, আব্দুল কুদ্দুস মাখন, আমু, শেখ মনি) ডাকে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে। ছাত্রলীগের দুই গ্রুপই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে প্রধান অতিথি হিসেবে আমন্ত্রণ জানান। বেশিরভাগ মানুষের ধারণা ছিল বঙ্গবন্ধু ছাত্রলীগের দুই গ্রুপকে হয়তো এক করে ফেলতে সমর্থ হবেন। বাস্তবে সেটা হয়নি এবং বঙ্গবন্ধু তোফায়েল আহমেদ,আব্দুর রাজ্জাক,শেখ ফজলুল হক মনিদের ডাকা ছাত্রলীগের সম্মেলনে যোগ দিতে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে যান এবং ছাত্রলীগ বিভাজিত হয়। ছাত্রলীগের সিরাজ-রব গ্রুপের সম্মেলনে গান গাইতে এসেছিলেন রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী অশোকতরু বন্দোপাধ্যায় ও বাণী ঠাকুর। এই দুজনের সাথে ছিলেন সংগীতশিল্পী ফকির আলমগীর। তিনি বঙ্গবন্ধু ও তার দলকে ব্যঙ্গ করে গান রচনা করেছিলেন এবং এই সম্মেলনে সেই গান পরিবেশন করেছিলেন। গানের লাইন ছিল এমন- ‘একশ টাকা চালের দাম/মুজিববাদের অপর নাম!’ (যদিও তখন ষাট টাকা মণ দরে চাল পাওয়া যেত!)। ফকির আলমগীর গানের জন্য পদকও পেয়েছেন। শুধু নেতা কিংবা শিল্পীরা নন, সম্ভবত সব শ্রেণি ও পেশার মানুষরা ‘ক্যারিয়ারিস্টিক’ হয়ে উঠছেন। প্রথা বিরোধিতা কি এখন ব্যাকডেটেড?

স্বাধীনতার পর তুমুল জনপ্রিয় সংগঠন ‘ছাত্রলীগের’ এই বিভাজন ডাকসু নির্বাচনে ভিন্ন ফলাফল বয়ে আনে। স্বাধীনতার পর (১৯৭৩) ডাকসুর প্রথম ভিপি হন ছাত্র ইউনিয়নের মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম ও সাধারণ সম্পাদক হন মাহবুব জামান। ছাত্রলীগের ভাঙনের কারণেই ফলাফল এমন হয়েছিল। তারপরও কেউ কেউ বলে থাকেন, ছাত্রদের ভেতরে তখন ক্ষমতাসীনদের সমালোচনা ও সঠিক বিরোধিতা করার ট্রেন্ড ছিল, যাকে প্রথা বিরোধিতা বলা হয়ে থাকে,যে কারণে এই দুজন নির্বাচিত হন। তোফায়েল আহমেদ ও আবদুল কুদ্দুস মাখনের মতো মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম ও মাহবুব জামান এই দুইজনের কেউ তাদের রাজনৈতিক মতাদর্শ পরিবর্তন করেননি। প্রায় সাত বছর পরে পরপর তিনবার ডাকসু নির্বাচন হয়েছিল ১৯৭৯, ১৯৮০ ও ১৯৮২ সালে। প্রথমবার মাহমুদুর রহমান মান্না ও আখতারুজ্জামান ডাকসুর ভিপি-জিএস নির্বাচিত হয়েছিলেন জাসদ ছাত্রলীগ থেকে। এরপরই তারা দল পরিবর্তন করে বাসদ ছাত্রলীগে যোগ দেন বা বিভাজিত হন। পরের বছর এই দুইজন বাসদ ছাত্রলীগ থেকে ডাকসুর ভিপি ও জিএস হয়েছিলেন। ১৯৮২ সালে বাসদ ছাত্রলীগ থেকে ডাকসুর ভিপি ও জিএস নির্বাচিত হয়েছিলেন আখতারুজ্জামান ও জিয়াউদ্দীন বাবলু। ছাত্র রাজনীতির পুরনো ধারাই যেন ফিরে আসতে শুরু করে। ছাত্র রাজনীতিতে অস্ত্র বহন,ব্যবহার,আর্মস ক্যাডার হওয়ার বাসনা, হল দখল করে ছাত্রদের জিম্মি করার প্রবণতা নতুন করে শুরু হতে থাকে। জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় থাকাকালীন আর্মস ক্যাডারভিত্তিক ছাত্রদল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলো দখল করা শুরু করে। মাহমুদুর রহমান মান্না বা আখতারুজ্জামানরা পর পর দুইবার নির্বাচিত হলেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকটি হলে ছাত্রদলের প্রার্থীরা জিতে যায়। মান্না-আখতারদের বিজয় যদি ‘অ্যান্টি এস্টাবলিস্টমেন্টের’ বিজয় হয় তাহলে ছাত্রদল ক্রমশ যে আলোচনায় চলে আসছিল সেটা তাহলে কী? সেই সময়কার সরকার বিরোধিতা তথা প্রথা বিরোধিতা করা মাহমুদুর রহমান মান্না পরবর্তীতে দুইবার তার রাজনৈতিক আদর্শ ও দল বদল করেছেন। একবার আওয়ামী লীগে এসে এমপি হিসেবে ভোট করে হেরেছেন,পরে ঐক্যফ্রন্টে গিয়ে নির্বাচন করে পরাজিত হয়েছেন। আকতারুজ্জামানও তার রাজনৈতিক আদর্শ বদল করেছেন। আর জিএস থাকাকালীন জিয়াউদ্দীন বাবলু স্বৈরাচারী এরশাদের ছাত্র বিষয়ক উপদেষ্টা (পরে জাতীয় পার্টিতে যোগ দেন) হয়ে সবাইকে অবাক করে দেন! এরশাদ বিরোধিতায় আপসহীন ছাত্রদল ক্রমশ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে জনপ্রিয় হওয়া শুরু করে। ১৯৮৯ সালের ডাকসু নির্বাচনে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের হয়ে ছাত্রলীগের প্রার্থী সুলতান মোহাম্মাদ মনসুর ভিপি এবং জাসদ ছাত্রলীগের মুশতাক আহমেদ জিএস হলেও হলগুলোতে ছাত্রদলের বিপুল বিজয় ছাত্রদলকে আরও জনপ্রিয় করে তোলে। সুলতান মোহাম্মদ মনসুরও পরবর্তীকালে তার রাজনৈতিক মতাদর্শ ও দল পরিবর্তন করেছেন। মুশতাক সাহেব ক্রমশ রাজনীতিতে নিষ্ক্রিয় হয়েছেন। ১৯৯০-এর ডাকসু নির্বাচনে ছাত্রদল ‘ল্যান্ডস্লাইড’ বিজয় অর্জন করে এবং আমানউল্লাহ আমান ও খায়রুল কবির খোকন ভিপি-জিএস নির্বাচিত হন। আমান ও খোকন পরে দল কিংবা রাজনৈতিক মতাদর্শ পরিবর্তন করেননি। সবচেয়ে বেশিবার সম্ভবত মতাদর্শ বদলেছেন আসম আব্দুর রব। এরশাদের সাথে ছিলেন, আওয়ামী লীগের মন্ত্রী হয়েছিলেন, পরে ঐক্যফ্রন্টে গিয়ে নির্বাচন করে হেরেছেন।

প্রথা বিরোধিতার রাজনীতি এরপর কোথায় গিয়েছে, কেমন হয়েছে? ১৯৯৬ পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলো একরকম ছাত্রদলের নিয়ন্ত্রণেই (জহুরুল হক হল ও জগন্নাথ বাদে) ছিল। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পরে ১৯৯৭ সালে ছাত্রলীগ ক্রমশ ঢাকা ভার্সিটির হলগুলো দখল করে নেওয়া শুরু করে। ছাত্রদল ও ছাত্রলীগের সংঘর্ষে ছাত্রলীগ নেতা পার্থ নিহত হলে ছাত্রদল ঢাকা ভার্সিটির হল ছেড়ে যেতে বাধ্য হয়।

এরপর থেকে সরকার যার পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের দখল তার। ২০০১ সালে বিএনপির ভূমিধস বিজয় হলে রাতের আঁধারে ঢাকাসহ অন্যান্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের হল ছেড়ে পালিয়ে যায় ছাত্রলীগের নেতারা। সমর্থকরা নীরব হয়ে যায় শুধু হলে থাকার জন্য কিংবা ছাত্রদলে যোগ দেওয়ার জন্য। ২০০১ থেকে ২০০৬ পর্যন্ত পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলো নিয়ন্ত্রণ করতো একচ্ছত্রভাবে ছাত্রদল ও শিবিরের ছেলেরা। ২০০৮’র শেষে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পরও ছাত্রদল ও শিবিরের নেতারা সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ থেকে রাতের আঁধারে হাওয়া হয়ে যায়। সেই থেকে এখন পর্যন্ত হলগুলো সব ছাত্রলীগের নিয়ন্ত্রণেই আছে।

আওয়ামী লীগ সরকারকে ধন্যবাদ এ কারণে যে তারা ২৮ বছর পরে ডাকসু নির্বাচনের ব্যবস্থা করেছেন। ২০১৪ ও ২০১৮-এর জাতীয় নির্বাচনের তুলনায় এই নির্বাচন খানিক সাহসী। কারণ, এখানে ডাকসুর কেন্দ্রে বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের ব্যানারে নুরুল হক নুর ভিপি হয়েছেন। কোটা আন্দোলন তথা ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের দুজন জিএস পদে দাঁড়িয়েছিলেন। না হলে জিএস পদের ফলও অন্যরকম হতে পারতো। এছাড়া মেয়েদের চারটি হলে মোটামুটি বিপ্লব করে ফেলেছেন ছাত্রীরা। কিন্তু এসবের পরেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগ এবং আওয়ামী লীগ সমর্থিত শিক্ষকরাই নিয়ন্ত্রণ করবেন। ছাত্রছাত্রীরা ভাবতে পারেন শিক্ষকদের কাছেও যাওয়ার জায়গা নেই। কারণ, তারা সবার শিক্ষক নন,একটি দলের বা মতের শিক্ষক। বহু বছর পরে ডাকসু নির্বাচনে শিক্ষকদের ভূমিকা তেমনই মনে হয়েছে।

নুরুল হক নুর পরবর্তীতে কী করবেন সেটাই দেখার ব্যাপার। তবে একদা প্রবল পরাক্রমশালী ছাত্রদল এবং সবসময় মিছিল মিটিংয়ে থাকা বাম ঘরানার দলগুলোর ভরাডুবি লক্ষণীয়। স্বাধীনতার ৪৮ বছর পরে রাজনীতিতে নেমে নির্মোহ জীবনযাপন এবং রাজনীতির জন্য সর্বস্ব ত্যাগ করার ব্যাপারটা সম্ভবত উবে গেছে। শুধুমাত্র সিনেমা, নাটক বা পত্রিকার পাতায় এমন নেতাদের দেখা মেলে। এখন হল দখল করে থাকা,অসহায় ছাত্রদের নিয়ন্ত্রণ করে নিজের পদ, চাকরি বা ব্যবসা বাগিয়ে নেওয়াটাই আসল। গত চল্লিশ বছরে ছাত্রনেতারা সাত খুন, জোড়া খুন, মডেল খুন, কন্ট্রাকটরি, টেন্ডারবাজি,দখলদারিত্ব থেকে শুরু করে ব্যাংকের মালিক কিংবা ব্যাংক কেলেঙ্কারির সঙ্গেও জড়িত হয়েছেন।

যে জীবন মনি সিংয়ের অথবা সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুর যে জীবন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের, একালের ছাত্রনেতাদের সঙ্গে সে জীবনের দেখা মিলবে না কখনোই। 

লেখক: রম্যলেখক

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ