ক্রাইস্টচার্চে নামাজরত মুসল্লি হত্যা, এরপর কার পালা?

Send
মো. জাকির হোসেন
প্রকাশিত : ১৪:২৭, মার্চ ২২, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৪:২৭, মার্চ ২২, ২০১৯

মো. জাকির হোসেনকোনও এক কটাক্ষ করা লেখায় পড়েছিলাম যুক্তরাষ্ট্রের রাস্তায় পাগলা কুকুরের আক্রমণের শিকার হয়ে বাঁচাও বাঁচাও বলে চিৎকার করছে এক তরুণী। অনেকে দাঁড়িয়ে এ দৃশ্য দেখলেও ভয়ে কেউ সাড়া দিচ্ছে না। হঠাৎ এক যুবকদৌড়ে গিয়ে উন্মত্ত কুকুরের সঙ্গে ধস্তাধস্তি করে তরুণীকে বাঁচালেও নিজে ক্ষতবিক্ষত হন। যুবকের সাহসিকতায় মুগ্ধ আমেরিকান এক সাংবাদিক তাৎক্ষণিকভাবে ওই যুবকের সাক্ষাৎকার নিতে শুরুতেই বলেন, একজন আমেরিকান হিসেবে আপনার বীরত্বে আমিও গর্ববোধ করছি। যুবকটি শান্তভাবে জবাব দেন তিনি আমেরিকান নন। এবার সাংবাদিক বলেন, নিশ্চয়ই আপনি ইহুদি? যুবকটি জবাব দেন, তিনি ইহুদি নন, মুসলিম। পরদিন সংবাদপত্রের শিরোনাম হয় ‘মুসলিম জঙ্গির হাত থেকে নিরীহ কুকুরও নিরাপদ নয়’। পৃথিবীতে জঙ্গি, সন্ত্রাসী, উগ্রবাদীর একক মালিকানা এখন কেবলই মুসলমানদের। সৃষ্টিকর্তার কাছে মাথানত করে নামাজরত অবস্থায় বন্দুক উঁচিয়ে গুলি করতে করতে মসজিদে ঢুকে ৫০ জন নারী-পুরুষ-শিশুকে বর্বরোচিতভাবে হত্যা করা, ৪৮ জনকে মারাত্মক জখম করা এটি কি জঙ্গিবাদ নয়?

পশ্চিমা বিশ্বের নেতারা যারা কোনও ছলছুঁতো পেলেই মুসলমানদের জঙ্গি বলতে মুখিয়ে থাকেন তাদের ক’জন খ্রিস্টান জঙ্গিবাদ, শ্বেতাঙ্গ উগ্রবাদকে স্বীকার করতে প্রস্তুত আছেন। জঙ্গিবাদের ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, মুসলমানের গায়ে জঙ্গি, উগ্র, সন্ত্রাসী তকমা লাগার অনেক আগেই পৃথিবীতে উগ্রবাদ ও সন্ত্রাসের উত্থান হয়। আর বর্তমানে মুসলমান নামধারী জঙ্গিদের পাশাপাশি, খ্রিস্টান, বৌদ্ধ, ইহুদি ও হিন্দু ধর্মের উগ্রবাদীরা হামেশাই দৃষ্টিগোচর হয়। কিন্তু মুসলমান জঙ্গিরা ছাড়া অন্য ধর্মের উগ্রবাদীরা মিডিয়ায় খুব একটা প্রচার-প্রচারণা পায় না। এফবিআই’র পরিসংখ্যান অনুযায়ী ১৯৮০ থেকে ২০০৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রে যত সন্ত্রাসী হামলা হয়েছে তার সর্বোচ্চ ৪২ শতাংশের সঙ্গে যুক্ত ল্যাটিনো গ্রুপ। ২৪ শতাংশ চরম বামদল, ইহুদি চরমপন্থী গ্রুপ ৭ শতাংশ, ইসলামি জঙ্গি গ্রুপ ৬ শতাংশ, কমিউনিস্ট গ্রুপ ৫ শতাংশ ও অন্যান্য গ্রুপ ১৬ শতাংশ সন্ত্রাসী আক্রমণের সঙ্গে জড়িত।National Consortium for the Study of Terrorism and Responses to Terrorism (START)-এর পরিসংখ্যান বলছে ১৯৭০ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে যে সন্ত্রাসী হামলা হয়েছে তার ২.৫ শতাংশ হামলার সঙ্গে জড়িত মুসলমানরা।

সন্ত্রাস বা টেরোরিজম কথাটা প্রথম ব্যবহার করা হয় ফ্রান্সের বিপ্লবী সরকারের বিরুদ্ধে, যা তারা নিজেদের জনগণের বিরুদ্ধে ব্যবহার করেছিলো। ১৭৯৮ সালে সন্ত্রাসবাদের সংজ্ঞা আবিষ্কারের অনেক আগে থেকেই বিশ্বের নানা প্রান্তে সন্ত্রাসের ব্যবহার লক্ষণীয়। প্রায় তিন হাজার বছর আগে আসিরীয় রাজা দ্বিতীয় আসুরনাসিরপাল ইরাকে অধিকৃত এলাকায় তার বিরুদ্ধে যারা অস্ত্রধারণ করেছিলো তাদের হত্যা করে তাদের চামড়া দিয়ে সিটি গেটের দেয়াল আবৃত করেছিলো, কারও নাক-কান কেটে নিয়েছিলো, কারও চোখ উপড়ে ফেলেছিলো, পুড়িয়ে হত্যা করেছিলো এবং মাথা কেটে সিটিগেটের মনুমেন্টে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছিলো। এ সন্ত্রাসের কথা সিটি গেটের মনুমেন্টে লিখিত ছিল বলে ইতিহাসবিদরা উল্লেখ করেছেন। ইতিহাসের প্রাচীনতম সন্ত্রাসী দল সম্ভবত সিকারি (Sicarii)। প্রথম শতাব্দীতে ইহুদিদের এ সন্ত্রাসী গ্রুপ তাদের টার্গেটকে রেকি করে উপযুক্ত সময়ে গলাকেটে হত্যা করতো। গুপ্তহত্যার ইংরেজি প্রতিশব্দ Assasin-এর উৎপত্তি ইসমাইলি হাসা-সিন বা আল হাসা-সিন থেকে, যারা নিজেদের রাজনীতির প্রয়োজনে গুপ্তহত্যা চালাতো। একাদশ শতাব্দীতে পারস্যে এরা সালাদিনের সাম্রাজ্য ও অটোম্যান সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে আত্মঘাতী ও অতর্কিতে হামলা চালিয়ে মানুষ হত্যা করে এক ভয়ঙ্কর ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিলো। ইসলামে জঙ্গিবাদের অনুপ্রবেশ ঘটে খিলাফতের শাসনামলে। ইসলামি খিলাফতের তৃতীয় খলিফা হজরত উসমান (রা.)-এর হত্যার বিচারের সময়-ক্ষণ নিয়ে চতুর্থ খলিফা হজরত আলী (রা.) আর সিরিয়ার গভর্নর হজরত মুয়াবিয়া (রা.)-এর মধ্যে মতবিরোধকে কেন্দ্র করে ৬৫৮ সালে সিফফিনের যুদ্ধ সংঘটিত হয়। সন্ধির মাধ্যমে যুদ্ধ অবসান হলে বিষয়টি আলী (রা.)-এর পক্ষের একটি দল মেনে নিতে পারেননি। এই দলের মতে, যুদ্ধের ফলাফল কেবল আল্লাহর হাতে। মানুষ যুদ্ধের ফলাফল নির্ধারণ করতে পারে না,অর্থাৎ সন্ধির মাধ্যমে যুদ্ধ শেষ করতে পারে না। তারা বললো আলী এবং মুয়াবিয়া কুরআনের বিধান লঙ্ঘন করেছেন। তাই তারাউভয়েই মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হওয়ার যোগ্য। এই দল আলী এবং মুয়াবিয়া উভয়ের পক্ষ ত্যাগ করলো। ইতিহাসে এদের ‘খারেজি বলা হয়; যার শাব্দিক অর্থ বের হয়ে আসা। খারেজিদের দমন করতে আলী (রা.)-এর সাথে আরেকটি যুদ্ধ হয়, যা নাহরাওয়ানের যুদ্ধ’ বলে খ্যাত। এ যুদ্ধে পরাজিত হয়ে খারেজিরা গুপ্তহত্যার পথ বেছে নেয়। ইবনে মুলজিম নামে একজন খারেজি ৬৬১ সালের ২৬ জানুয়ারি আলী (রা.)-কে বর্তমান ইরাকে অবস্থিত কুফার শাহী মসজিদে হত্যা করে। এ খারেজিদের অনুসারীরা এখনও ইসলামের নামে কেবল বিধর্মীদের ওপরই জঙ্গি হামলা করছে না, বরং তাদের মতের সাথে না মিললে মুসলমানদেরও কাফের আখ্যা দিয়ে তাদেরও হত্যা করছে।

দুর্বৃত্তের ইংরেজি শব্দ ‘Thug’-এর উৎপত্তি হয়েছে ভারতীয় উপমহাদেশের আরেক সন্ত্রাসী গ্রুপ ঠগি সম্প্রদায় থেকে। ১৮৩৯ সালে ফিলিপ মেডোউস টেলরের উপন্যাস ‘কনফেসনস অব আ থাগ’-এর মাধ্যমে ঠগিদের কাহিনি জনপ্রিয়তা অর্জন করে এবং একই সাথে ‘থাগ’ শব্দটি ইংরেজি ভাষায় অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়। পথিকের গলায় রুমাল বা কাপড় জড়িয়ে ঠগিরা মানুষ হত্যা করতো। ১৩ থেকে ১৯ শতকে বাংলাসহ উত্তর ভারতে ঠগিরা ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিল। এক পরিসংখ্যান অনুযায়ী কেবল ১৮৩০ সালেই ঠগিরা প্রায় ৩০ হাজার মানুষ হত্যা করেছে। সন্ত্রাসবাদ আন্তর্জাতিক এজেন্ডায় পরিণত হয় গত শতাব্দীর তিরিশের দশকে যখন Stern Gang নামে একটি ইহুদি জঙ্গি গ্রুপ ফিলিস্তিন থেকে ব্রিটিশ ম্যান্ডেটের বিলুপ্তি, ফিলিস্তিনে ব্যাপক ইহুদি অভিবাসন অনুমোদন ও ফিলিস্তিনে ই্হুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দাবিতে প্রায় প্রতিনিয়ত সন্ত্রাসী আক্রমণ শুরু করে।

একবিংশ শতাব্দীতে জঙ্গিবাদ পূর্বের ধরন পাল্টে নতুন রূপ নেয়। আগে সন্ত্রাসী আক্রমণ নির্ধারিত টার্গেটের মধ্যে সীমিত ছিল। এখন তা নির্দিষ্ট টার্গেটের মধ্যে সীমিত না থেকে বেপরোয়া ও বাছ-বিচারহীনভাবে আক্রমণ করা হচ্ছে। ফলে একদিকে সহিংসতা যেমন অনুমেয় হতাহতের সংখ্যাও তেমনি অনেক বেশি। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বিশেষ করে পশ্চিমা বিশ্ব ইসলামের নামে জঙ্গিবাদের বিষয়ে যতটা সোচ্চার, অন্যান্য ধর্ম বিশেষ করে খ্রিস্ট, বৌদ্ধ, হিন্দু ধর্ম ও শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্বের নামে উগ্রবাদের ব্যাপারে ততটা উচ্চকিত নয়। ইসলাম ধর্মকে Dangerous Ideology বা Dangerous Religion হিসেবে প্রতিপন্ন করার চেষ্টা করলেও পশ্চিমা বিশ্ব অন্য ধর্মের ও শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্বের উগ্রবাদকে আড়াল করার নামে আশ্রয়-প্রশ্রয় দিচ্ছে। মিয়ানমারের বৌদ্ধ জঙ্গিবাদ গত চার দশক ধরে রোহিঙ্গা মুসলিমদের ওপর ভয়ঙ্কর গণহত্যা, ধর্ষণ, নিপীড়ন-নির্যাতন চালালেও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এখনও আড়মোড়া দিয়ে ঘুম থেকে জাগার চেষ্টা করছে। ইহুদি জঙ্গিবাদ ফিলিস্তিনিদের তাদের নিজস্ব ভূমি থেকে বিতাড়ন করে জবরদস্তি কৃত্রিম রাষ্ট্র ইসরায়েল সৃষ্টি করে গত কয়েক দশক ধরে বিরামহীনভাবে ফিলিস্তিনিদের হত্যা-নির্যাতন, জাতিসংঘের সিদ্ধান্তকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে ক্রমাগত ফিলিস্তিন ভূমি দখল-উচ্ছেদ, ঘর-বাড়ি গুঁড়িয়ে দেওয়া ও মুসলমানদের প্রথম কাবা মসজিদুল আকসাতে প্রবেশে বাধা দিলেও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় প্রায় নির্বিকার।

গণতান্ত্রিক, ধর্মনিরপেক্ষ ভারতের ঈশান কোণে হিন্দুত্ব উগ্রবাদের মেঘ এখন সুস্পষ্ট। ভারতীয় রাজনীতিক, লেখক, কবি, সাহিত্যিক, সাংবাদিকরাই হিন্দুত্ববাদের বিদ্বেষের শিকার সংখ্যালখু সম্প্রদায়ের নিপীড়ন-নির্যাতনের বিষয় তুলে ধরছেন। এদিকে চীন ইসলামকে মানসিক রোগ ও সংক্রামক ব্যাধি মনে করে। জাতিসংঘ ও যুক্তরাষ্ট্রের এক প্রতিবেদন বলছে, চীনের মুসলিম সংখ্যালঘু সম্প্রদায় উইঘুরের প্রায় ১০ লাখ মানুষকে কয়েক মাস ধরে আটকে রাখা হয়েছে গোপন বন্দিশিবিরে। তাদের বাধ্য করা হচ্ছে নিজেদের ধর্ম ইসলামকে অস্বীকার করতে, ইসলামি মূল্যবোধ বিসর্জন দিতে এবং প্রতিদিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা কমিউনিস্ট পার্টির প্রোপাগান্ডা সংগীত গাইতে।

ইউরোপ ও আমেরিকায় সবচেয়ে ভয়ঙ্কর হয়ে দাঁড়িয়েছে খ্রিস্ট ধর্ম ও শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্বের উগ্রবাদী বিভিন্ন সংস্থা। শ্বেতাঙ্গ উগ্রবাদ বা শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদের ইতিহাস বেশ পুরনো। ১৮৬৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রে গঠিত হয়েছিল ‘কু ক্লাক্স ক্ল্যান’ নামে একটি সংগঠন। শ্বেতাঙ্গ অগ্রাধিকার, শ্বেতাঙ্গ জাতীয়তাবাদ এবং অভিবাসনবিরোধী সংগঠন হিসেবে এটি নানা সময়ে হিংসাত্মক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ছিল। বর্তমানে এই সংগঠনের প্রকাশ্য কোনও কর্মকাণ্ড নেই। কিন্তু হোয়াইট সুপ্রিমেসির ধারণাটি অনেক শ্বেতাঙ্গের মধ্যেই প্রবলভাবে সক্রিয়। এই মতবাদে বিশ্বাসীরা প্রধানত মুসলিম, এশীয় ও কালোদের পছন্দ করেন না। কু ক্লাক্স ক্ল্যান-এর মতো অনেক শ্বেতাঙ্গ উগ্রবাদী সংগঠন এখন কাজ করছে ইউরোপ-আমেরিকাজুড়ে। সন্ত্রাসবিরোধী গবেষণা কাজে নিয়োজিত Southern Poverty Law Center তাদের ২০১৭ সালের রিপোর্টে উল্লেখ করেছে, কেবল যুক্তরাষ্ট্রেই ১০০টি শ্বেতাঙ্গ উগ্রবাদী গ্রুপ ও ৯৯টি নব্য নাৎসি গ্রুপ সক্রিয় রয়েছে। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো, Atomwaffen Division (AWD), Hammerskin Nation, Identity Evropa, League of the South, National Socialist Movement (NSM), Vanguard America/Patriot Front ইত্যাদি। এদের মধ্যে বেশ কয়েকটি গ্রুপের সদস্যদের সামরিক প্রশিক্ষণের ভিডিও প্রকাশিত হয়েছে। এ গ্রুপ সহিংস শ্বেতবিপ্লবে বিশ্বাসী। এরা মনে করে একটি জাতিগত যুদ্ধ অনিবার্য। Hammerskin Nation শ্বেতাঙ্গ উগ্রবাদী গ্রুপগুলোর মধ্যে সবচেয়ে সংগঠিত ও সহিংস। এদের বিরুদ্ধে হত্যা, আক্রমণ, অগ্নিসংযোগ, হয়রানিসহ নানা হেট ক্রাইমের অসংখ্য অভিযোগ রয়েছে। Evropa, League of the South এবং NSM-এর বিরুদ্ধে রাজনৈতিক সহিংসতা ও অভ্যন্তরীণ সন্ত্রাসবাদের অভিযোগ রয়েছে। NSM-এর কার্যক্রম যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে যুক্তরাজ্য, ইতালি, সুইডেন ও এস্তোনিয়ায় বিস্তৃত। ইউরোপের শ্বেতাঙ্গ উগ্রবাদী গ্রুপের মধ্যে যুক্তরাজ্যে প্রতিষ্ঠিত Terror Machine নামে অভিহিত Combat 18 সবচেয়ে কুখ্যাত। ১৮টি দেশে তাদের কার্যক্রম রয়েছে। ইংরেজি সংখ্যা 18 দিয়ে এরা ইংরেজি বর্ণমালার প্রথম অক্ষর A ও অষ্টম অক্ষর H বুঝায়, যার মানে Adolf Hitler. এরা সহিংসতার মাধ্যমে কেবল শ্বেতাঙ্গ মানুষের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় বিশ্বাসী। English Defence League (EDL) বিশ্বাস করে ব্রিটিশ সমাজ মুসলিম উগ্রপন্থীদের দ্বারা আক্রান্ত। যুক্তরাজ্যের আরেকটি নাৎসি গ্রুপ National Action প্রকাশ্যেই প্রচার করে ব্রিটেন কেবল ব্রিটিশদের হবে। এরা প্রচার করে হিটলার সঠিক ছিল। সুইডেনের Nordic Resistance Movement (NRM) মুসলিম, আশ্রয়প্রার্থী ও সমকামীদের বিরুদ্ধে অনেক সহিংস আক্রমণ পরিচালনা করেছে। ফ্রান্সের Les Identitaires গ্রুপ ভয়ঙ্কর রকম মুসলিম ও অভিবাসীবিদ্বেষী।

‘শ্বেতাঙ্গরাই শ্রেষ্ঠ’ মতবাদে বিশ্বাসী উগ্রপন্থী গ্রুপগুলো সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অনেক হামলা চালিয়েছে। তাদের প্রধান লক্ষ্য ছিল মসজিদ, সিনাগগ, ব্ল্যাক চার্চ ও বামপন্থী রাজনীতিবিদ। গত আট বছরে শ্বেতাঙ্গ সন্ত্রাসীরা বিভিন্ন দেশে গুলি চালিয়ে, ছুরিকাঘাত করে, বোমা হামলা চালিয়ে এবং গাড়ি দিয়ে হামলা চালিয়েছে। তারা মনে করছে, ইহুদি, মুসলিম, অভিবাসী, শরণার্থী, নারীবাদী ও বামপন্থী রাজনীতিবিদরা তাদের জন্য হুমকি। নিউ জিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চের মসজিদে জুমার নামাজ চলাকালে ভয়াবহ হত্যাযজ্ঞের পর নব্য নাৎসিবাদী সন্ত্রাসী সংগঠন ‘ব্ল্যাক সান’ নিয়ে বিশ্বজুড়েহৈচৈ শুরু হয়েছে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো বলছে, হামলাকারী শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদী সন্ত্রাসী ব্রেন্টন ট্যারান্ট কুখ্যাত ‘ব্ল্যাক সান’-এর সদস্য। টুইটারে তার প্রকাশিত ৭৪ পাতার ইশতেহারের প্রচ্ছদে ‘ব্ল্যাক সান’-এর লোগো ব্যবহার করেছেন ব্রেন্টন। নিউইয়র্ক টাইমস, ডেইলি টেলিগ্রাফ,ডেইলি মেইল, সান হেরল্ড, নিউইয়র্ক পোস্টসহ বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যম জানাচ্ছে,অস্ট্রেলিয়ার ২৮ বছর বয়সী সন্ত্রাসী ব্রেন্টন ট্যারান্ট নিজেকে কট্টর শ্বেতাঙ্গবাদী হিসাবে উপস্থাপন করে আসছিলো। ইশতেহারে অভিবাসন ও মুসলিম বিদ্বেষের কথা তুলে ধরেছে ব্রেন্টন। উগ্র শ্বেতাঙ্গ জাতীয়তাবাদ প্রতিষ্ঠার জন্য সে যোগ দিয়েছে ‘ব্ল্যাক সান’ সোসাইটিতে। নিউইয়র্ক টাইমস বলছে, ব্রেন্টন দাবি করেছেন ‘ব্ল্যাক সান’-এর সদস্য অ্যান্ডার্স বেহরিং ব্রেইভিক, যিনি ২০১১ সালের ২২ জুলাই নরওয়ের লেবার পার্টির বার্ষিক ইয়ুথ ক্যাম্পে নির্বিচারে গুলি চালিয়ে ৭৭ জনকে হত্যা করেছে। সেই নরওয়েজিয়ান গণহত্যাকারী অ্যান্ডার্স ব্রেইভিকের সঙ্গে তার ‘সংক্ষিপ্ত যোগাযোগ’ ছিল ও তিনি এই হামলার জন্য তাকে ‘আশীর্বাদ’ দিয়েছেন।

দুশ্চিন্তার বিষয় হলো, ১৯৯০-এরপর থেকেই খুব সন্তর্পণে হলেও অপ্রতিরোধ্য গতিতে উগ্র ডানপন্থী রাজনৈতিক দলের উত্থান ঘটছে ইউরোপজুড়ে। ইউরোপের বিভিন্ন দেশের রাজনীতিতে ক্ষমতার ভারসাম্য দল হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছে এরা। এই দলগুলোর গড়পরতা জনসমর্থন রয়েছে ১৫-২৫ শতাংশ। ইউরোপের বিভিন্ন প্রগতিশীল, মানবতাবাদী, গণতান্ত্রিক ও সমাজতান্ত্রিক দলগুলো উগ্র ডানপন্থীদের রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলার পরিবর্তে এরাও অনেকটা অভিন্ন সুরে উগ্র ডানপন্থীদের বিভিন্ন ইস্যুতে সমঝোতা করে ক্ষমতায় যাওয়ার চেষ্টা করেছে। আর এ সুযোগে ডানপন্থী উগ্রবাদী রাজনৈতিক দলগুলো অপ্রাপ্তবয়স্ক স্কুল-কলেজ পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের মাঝে তাদের মৌলবাদী, সাম্প্রদায়িক, বর্ণ-বিদ্বেষমূলক উগ্রবাদী দর্শনের বিস্তার ঘটিয়ে চলেছে। অভিবাসীবিরোধী বিশেষ করে মুলসমান বিদ্বেষী উগ্র ডানপন্থী রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো, হাঙ্গেরির জব্বিক, নরওয়ের প্রগ্রেস পার্টি, অস্ট্রিয়ার ফ্রিডম পার্টি, ইতালির নর্দান লীগ ও ন্যাশনাল এলায়েন্স, বেলজিয়ামের ফ্লেমিশ ব্লক, ডেনমার্কের ডেনিশ পিপলস পার্টি, ফ্রান্সের ন্যাশনাল ফ্রন্ট ফর ফ্রান্স ইউনিটি, জার্মানির এএফডি, রিপাবলিকান পার্টি, জার্মান পিপলস ইউনিয়ন ও ন্যাশনাল ডেমোক্র্যাটিক পার্টি, পর্তুগালের পপুলার পার্টি, গ্রিসের হেলনিক ফ্রন্ট ও গোল্ডেন ডন, নেদারল্যান্ডের লিভ্যাবল নেদারল্যান্ড, সুইজারল্যান্ডের সুইস পিপলস পার্টি ও ইংল্যান্ডের ব্রিটিশ ন্যাশনাল পার্টি।

জঙ্গিবাদ ও উগ্রবাদ মানবতার শত্রু, সভ্যতার অস্তিত্বের জন্য বড় হুমকি।

জঙ্গিবাদ উগ্রবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে হলে পক্ষপাতহীনভাবে, সততার সাথে সম্মিলিতভাবে লড়তে হবে। মুখে জঙ্গিবাদ দমনের কথা বলে আড়ালে-আবডালে বিশেষ ধর্ম-মতাদর্শ-গ্রুপকে আশ্রয়-প্রশয় দেওয়া, অর্থ-অস্ত্র-প্রশিক্ষণ দিয়ে সাহায্য-সহযোগিতা করা বিশ্বের সাথে প্রতারণা। তথাকথিত ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ সূচনা করে কোন রাষ্ট্রকে বিশেষ করে মুসলিম বিশ্বকে পদানত রাখার পরিকল্পনা কিংবা যুদ্ধ অর্থনীতি (War Economy)-কে চাঙ্গা রাখতে অস্ত্র ব্যবসার কূট-কৌশল কোনোভাবেই জঙ্গিবাদের মূলোৎপাটন করবে না, বরং এটা জঙ্গি দমনের নামে ভয়ঙ্কর রাজনীতির খেলা, যা নতুন নতুন ক্রাইস্টচার্চ হামলার জন্ম দেবে। ক্রাইস্টচার্চে মসজিদে সন্ত্রাসী হামলার ঘটনার কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে লন্ডনে মসজিদের বাইরে লোকজনের ওপর হাতুড়ি নিয়ে হামলার ঘটনা ঘটেছে। এরপর ২০ তারিখে যুক্তরাজ্যে এক রাতে চার মসজিদে হাতুড়ি নিয়ে হামলা হয়েছে। দুর্বৃত্তদের হামলায় যদিও হতাহতের ঘটনা ঘটেনি, তবে ওই হামলায় মসজিদগুলোর জানালা, দরজা ভেঙে গেছে। ক্রাইস্টচার্চে নামাজরত মুসল্লি হত্যার পর এবার কার পালা, কেবল তার জন্য অপেক্ষা।


লেখক: অধ্যাপক, আইন বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।
ই-মেইল: zhossain1965@gmail.com

/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ