মুহম্মদ খসরু: নয়নে-হৃদয়ে

Send
দাউদ হায়দার
প্রকাশিত : ১২:৫২, মার্চ ২৩, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১২:৫৩, মার্চ ২৩, ২০১৯

দাউদ হায়দারএকদা উদীচীর শিল্পী, নোয়াখালির, ফেনীর, নাম মঈন চৌধুরী, বার্লিনে বাস, পিটু নামে অধিক পরিচিত। বার্লিনের বঙ্গীয় সংস্কৃতির সব অনুষ্ঠানে তিনি জনপ্রিয়, সবরকম গানে যথার্থ শিল্পী। গণসঙ্গীত থেকে রবীন্দ্রসঙ্গীত, তাঁর কণ্ঠে সুরেলা। শ্রোতাকুলের সর্বদাই আবদার (কোনও অনুষ্ঠানে) ‘আরো গান, আরো গান।’
মঈন চৌধুরী ওরফে পিটু, দেশে থাকাকালীন ছাত্র রাজনীতির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ ছিলেন, মস্কোপন্থী হিসেবে খ্যাত, ছাত্র ইউনিয়ন করতেন। পঁচিশ বছরের বেশি বার্লিনে বাস, এখন জার্মান নাগরিক। কিন্তু, কমিউনিজমে ঘোরতর বিশ্বাসী, ভোট দেন কমিউনিস্ট পার্টিকেই। কমিউনিস্ট পার্টির হালের বেলেল্লাপনা সত্ত্বেও। ঘোরতর, কট্টর সমালোচকও।
যতদূর জানি (ভুল হতে পারে জানায়) মঈন চৌধুরী জার্মান, বাংলাদেশ, বিশ্বের রাজনীতি নিয়ে মাথা খামচান, বিচারবিশ্লেষণ করেন, ওঁর স্ত্রী (জার্মান) রীটা শেফারও (জার্মান সরকারের একটি মন্ত্রণালয়ে উচ্চ পদস্থ) জার্মান রাজনীতির, বিশ্বরাজনীতির, এমন কী বাংলাদেশ তথা ভারত (সার্ক দেশের) রাজনীতির গলিগলি জানেন, আরও বিস্ময় ওঁদের কন্যা লেনা, তৃতীয় বিশ্বের রাজনীতির ‘হালিচাচালিচা’ (নোয়াখালির আঞ্চলিক ভাষা, অর্থাৎ ‘হালহকিকত’) জানেন। লেনা হিলডেসহাইম বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী। তিনি বছরাধিক কাটিয়েছেন বলিভিয়ায়, বলিভিয়ার শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি-রাজনীতি চর্চায়। এই চর্চার মূলে তাঁর পিতামাতার রাজনৈতিক চেতনা-বিশ্বাস-বোধও।

মঈন চৌধুরী বাংলাদেশের (জার্মানি সহ ইউরোপের) নিত্যদিনের খবরই রাখেন। বলেন। যেমন বলেন ফ্রাঙ্কফুর্টের মোহাম্মদ হোসেন মন্টু। তাঁর স্ত্রী জয়িতা রহমান (সোমা)। স্মরণীয়, সোমার মা, নাজমা রহমান (অধ্যাপিকা। সাংবাদিক মুজিবুর রহমান বাদলের স্ত্রী। আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়ামের অন্যতম নীতিনির্ধারক ছিলেন। পরলোকগত।)।

স্বীকার করছি, বাংলাদেশের খবরাখবর সংবাদপত্রের ইন্টারনেট সংস্করণেও পড়া হয় না। চোখের সমস্যার কারণে।

গত একমাসে কিচ্ছু পড়া হয়নি, নতুন উপন্যাস লিখেছি। হিমশিম খাচ্ছি। অন্যদিকে মনোযোগ নেই। পালিয়ে এসেছি বার্লিন থেকে, ইউরোপের এমন এক গ্রামে, কাকপক্ষির হদিস পাওয়া দুস্কর। কিন্তু মঈন চৌধুরী নাছোড়। মোবাইলে দুঃসংবাদ জানান, ‘আপনার বন্ধু মুহম্মদ খসরু, বাংলাদেশের সুষ্ঠ চলচিত্র আন্দোলনের পুরোধা, মারা গেছেন।’

মঈন চৌধুরী জানতেন (মুহম্মদ খসরুকে নিয়ে লিখেছিলুম একবার), মুহম্মদ খসরুর সঙ্গে কীরকম সম্পর্কিত ছিলুম (লেখা পড়ে)।

মুহম্মদ খসরুকে নিয়ে স্মৃতিকথা অফুরন্ত। সংক্ষিপ্ত এই আমরা থাকতুম পাশাপাশি। আমাদের ভাড়িবাড়ি (১৪/২ মালিবাগ) থেকে খসরুর একচালা ঘরের দূরত্ব ৭০ মিটারও দূর নয়।

খসরুর বাড়ির (একচালা ঘর) সবটাই প্রায় খোলা, বৃষ্টি হলে সাপ, জোঁক, মাছও আসে, খসরু আমাদের বাড়িতে চলে আসেন। মাকে কী করে পটান, জানি না, ‘মা বলেন, ছাওয়ালডা খেতে পায় না। থাকার জায়গা নেই, ছাওয়ালডা ফিলিমটিলিমের পাগল, পাগলাটাকে দুটি রুটি বেশি দিলেম।’

একদিন দেখি, দুটি রুটির একটি পকেটে পুরছে, বলেন ‘কাল দুপুরে খাবো।’ শুনে মা’র কথা, ‘দুপুরে খেয়ে যেও।’

-খসরু, পরদিন থেকে প্রত্যেক দুপুরে আমাদের বাড়িতে খাদক।

থাক এসব স্মৃতিকথা। সংক্ষিপ্ত ইতিহাস।

খসরু বললেন, ‘ফিল্ম সোসাইটি করছি।’- সেটা কী জিনিস?

বিস্তারিত বলেন। দারুন উৎসাহ। যুক্ত হই। ‘কার কার টাকা আছে? কে হতে পারেন সভ্য? টাকা দেবেন? প্রস্তাব করি, ‘জামিল ভাই সিনেমা পাগল, চলুন তাঁকে ধরি।’ মাহবুব জামিল (পরে সিঙ্গার, বাংলাদেশের মহামালিক) শুনে বললেন, ‘আচ্ছা, যুক্ত হবো। বেশি টাকা দিতে পারবো না। এখন তিন শ’ টাকা নাও।’

-তিন শ’ টাকা? ১৯৬৯ সালে?

আমরা, ওই তিন শ’ টাকায়, তৎকালীন ‘নাজ’ সিনেমা হলে বার্গমানের একটি ছবি দেখলুম (তিন শ টাকা খরচ হয়নি, ২৯ টাকা চুরি করলুম।) ওই চুরির ভাগও খসরুকে দিতে হয়।

খসরু ১৯৭৯ সালের মার্চে কলকাতায়, বাই রোডে এসেছেন, শিয়ালদহ স্টেশনে পকেটমার, নো চিন্তা, ট্যাক্সি নিয়ে হাজির, ‘বলেন ট্যাক্সির ভাড়া দাও’। এও বাহুল্য, পাঁচদিন থেকে (অন্নদাশঙ্কর রায়ের আস্তানায়) অন্নদাশঙ্কর রায়ের কাছ থেকে ৫০ টাকা ধার নিয়ে বলেন, ‘দাউদ শোধ করবে।’

মঈন চৌধুরীর টেলিফোনে মুহম্মদ খসরুর মৃত্যু সংবাদ শুনলুম। মন ভারাক্রান্ত। কার না ভারাক্রান্ত মুহম্মদ খসরুর মতো বন্ধুকে হারিয়ে? যে ছিলেন (‘ছিল’) ‘নয়নে-সমুখে, হৃদয়ে বুকে।’

লেখক: কবি ও সাংবাদিক

/এসএএস/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ