‘কথা ছিলো একটি পতাকা পেলে…’

Send
চিররঞ্জন সরকার
প্রকাশিত : ১৫:৩৩, মার্চ ২৫, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:৩৫, মার্চ ২৫, ২০১৯

চিররঞ্জন সরকারকয়েকশ’ বছর পরাধীন থাকার পর বাংলাদেশ নামে একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশের জন্ম হলো ১৯৭১ সালে। ১৯৭১ সালের আগে কেউ ভাবেনি বাংলাদেশ স্বাধীন হবে। বরং সেই সময়ের জ্ঞানী-গুণী-পণ্ডিতদের মনে আমাদের স্বাধীনতা নিয়ে বেশ নেতিবাচক ধারণা কাজ করছিল। আমরা সকল প্রতিপক্ষের মুখে ছাই দিয়ে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছি। দুইশ’ বছরের ব্রিটিশ শাসন, ২৪ বছরের পাকিস্তানি শাসন-শোষণের পর স্বাধীনতা অর্জন করে বাংলাদেশ। গৃহীত হয় স্বাধীন দেশের সংবিধান। এই সংবিধান অনুসারে দেশের প্রতিটি নাগরিককে সমমর্যাদা দেওয়া হয়। দুঃখজনক হলেও সত্যি যে, দেশের বর্তমান প্রজন্ম স্বাধীনতা লাভের পেছনের রক্তক্ষয়ী ইতিহাস জানে না। সে ইতিহাস তেমনভাবে জানানোর মতো ব্যবস্থাও খুব একটা নেই। অনেকেই মোটা দাগে বলে, ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়। নয় মাস যুদ্ধের পর ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর দেশ চূড়ান্ত বিজয় অর্জন করে। কেউবা ত্রিশ লক্ষ শহীদ আর দু’ লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে আমরা স্বাধীনতা পেয়েছি- এমন একটা বাক্য যোগ করে। স্বাধীনতার সংগ্রাম কোত্থেকে শুরু হয়েছিল, পরাধীন দেশে তখন আমরা কেমন ছিলাম, কারা, কীভাবে স্বাধীনতার সংগ্রাম শুরু করলো, কারা যুদ্ধ করলো, কীভাবে যুদ্ধ করলো, অস্ত্র পেলো কোথায়, ট্রেনিং পেলো কোথায়, তাদের খাবার জোগাড় হতো কীভাবে, পাকিস্তানি সেনাদের বর্বরতা ঠিক কী ধরনের ছিল, কারা পাকিস্তানিদের সহায়তা করেছে, রাজাকার কারা, তাদের ভূমিকা কী ছিল, এ দেশের নারীরা স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় কী ধরনের ত্যাগ স্বীকার করেছে, কতটা অত্যাচার-নির্যাতন সহ্য করেছে, আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধে কোন দেশ কতটা সাহায্য করেছে, কারা আমাদের বিরোধিতা করেছে- এসব প্রশ্নের বিস্তারিত উত্তর আমরা অনেকেই জানি না। জানতে চাইও না!

অন্যসব বিষয় বাদ দিলাম, এই যে আমরা তোতা পাখির মতো বলি ‘ত্রিশ লক্ষ শহীদ আর দুই লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে আমরা স্বাধীনতা পেয়েছি’- এই কথাটার মানে কি আমরা ভালোভাবে বুঝি? বোঝার চেষ্টা করি? ত্রিশ লক্ষ মানুষ ঠিক কতো, এর জন্য কী পরিমাণ জায়গা লাগে সে ব্যাপারে কি আমাদের স্পষ্ট কোনও ধারণা আছে? ‘দুই লক্ষ মা-বোনের সম্ভ্রম’ যে অনেক অনেক মানুষের কষ্ট আর ত্যাগের সমষ্টি- তা কি আমরা ধারণা করতে পারি?

না, আমরা এই বিষয়গুলো কখনও তেমনভাবে তলিয়ে দেখি না। গভীরভাবে ভাবি না, আমাদের উপলব্ধির মধ্যে নিই না। আমরা এখন অনেকটাই হেলাফেলা করে স্বাধীনতাকে দেখি। অনেককে এমনটাও বলতে শুনেছি, হ্যাঁ, ত্রিশ লক্ষ লোক শহীদ হয়েছেন, আমরা স্বাধীনতা পেয়েছি, তাতে কী? আমরা চাকরি চাই। কোটা বিলোপ চাই। ওই সব মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার নামে ঘ্যান-ঘ্যান অনেক শুনেছি, আর না। ওসব ফালতু!

বিশ্বাস করুন, আমি নিজে এমন কথা একাধিক আড্ডায় শুনেছি। তখন কেবলই মনে হয়েছে, স্বাধীনতার পর প্রায় চার যুগ পেরিয়ে এসে সত্যিই কী পেলাম এই স্বাধীন বাংলাদেশে?

আসলে এর জন্য আমাদের পূর্ব-প্রজন্ম যেমন দায়ী, দায়ী আমরাও। সঠিক ইতিহাস সবিস্তারে আমরা কেউই শিখিনি, শেখাতে পারিনি। একটি দুটি খণ্ডিত বাক্যে যে ইতিহাস বর্ণনা করেছি তা প্রকৃত সত্য তুলে ধরার জন্য মোটেও যথেষ্ট নয়। আর ইতিহাস বিকৃতকারীরা অত্যন্ত সচেতনভাবে স্বাধীনতার ইতিহাস বিকৃত করে গেছে। অনেক ক্ষেত্রে স্বাধীনতা যুদ্ধের নায়কদের ভিলেন বানিয়েছে, ভিলেনদের নায়কে পরিণত করেছে। হিরা আর চিড়াকে একই পাল্লায় তুলে ওজন করে বিক্রি করতে চেয়েছে। পাশাপাশি নানা ষড়যন্ত্র আর সংকীর্ণ রাজনীতির ডামাডোলে আমরাও স্বাধীনতার চেতনা থেকে একটু একটু করে দূরে সরে গেছি। স্বাধীনতা কী, কেন- এটাও আমাদের রাজনৈতিক নেতৃত্ব বোঝাতে ব্যর্থ হয়েছেন! 

‘কথা ছিল একটি পতাকা পেলে/পাতা কুড়োনির মেয়ে শীতের সকালে/ওম নেবে জাতীয় সংগীত শুনে পাতার মর্মরে।/কথা ছিল একটি পতাকা পেলে/ভূমিহীন মনু মিয়া গাইবে তৃপ্তির গান জ্যৈষ্ঠে-বোশেখে,/বাঁচবে যুদ্ধের শিশু সসম্মানে সাদা দুধে-ভাতে’ (হেলাল হাফিজ)।

সেসব এখনও দূর-অস্ত। আমাদের দেশের স্বাধীনতা এসেছিল দুইশ’ বছরের ব্রিটিশ শাসন আর চব্বিশ বছরের পাকিস্তানি শোষণ-বঞ্চনা সমস্ত কূটিলতাকে পরাজিত করেই। এই সোয়া দুইশ’ বছরের নৃশংস আর্থিক লুটপাট, মানুষের বিরোধ-বিদ্রোহকে হিংস্রতায় রক্তপাতে ডুবিয়ে দেওয়ার চেষ্টা তো ছিলই, কিন্তু এখন তো আরও স্পষ্ট তার থেকে আরও ভয়ঙ্কর ছিল, আমাদের অতীতের বিকৃত ইতিহাস কথন।

পাকিস্তানি শাসনের নখ-দাঁতের বিরুদ্ধে রক্তক্ষয়ী লড়াই আর আত্মত্যাগের পাশাপাশি ধর্মীয় পরিচিতি, সামাজিক জাতপাতভিত্তিক বিভাজন, অর্থনৈতিক শোষণ, লিঙ্গবৈষম্যের ঊর্ধ্বে ওঠে এই ঐক্য সাধনের প্রচেষ্টা ছিল স্বাধীনতা অর্জনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। যা আমাদের আলোচনায় স্থান পায় না। মূলত ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন থেকেই প্রগতিবাদী চেতনা বিকশিত হয়েছে। এই আন্দোলনই বাংলাদেশকে ঐক্যবদ্ধ এবং আধুনিক চেহারায় প্রতিষ্ঠিত করেছিল। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে যে প্রগতিশীল সংস্কার আন্দোলন তৈরি হয় তা ছিল স্বাধীনতা আন্দোলনের পরিপূরক।

সুতরাং ধর্মীয় বিশ্বাস আশ্রিত জাতীয়তাবাদের বিপরীতে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ধারণা এবং বাঙালি জাতীয়তাবাদ নির্মিত হয় জাতি ধর্ম বর্ণ ভাষা লিঙ্গ ভৌগোলিক অবস্থা নিরপেক্ষ একটি সমানাধিকারের ভিত্তিতে নাগরিকত্বের ওপরে দাঁড়িয়ে। স্বভাবতই, স্বাধীনতার এই ধারণাটিই রূপ পেলো ১৯৭২ সালে বাংলাদেশের সংবিধানটি গ্রহণ করার মাধ্যমে। বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য, ঐক্যের সূত্রটি সমান নাগরিকত্বের ভিত। ধর্মনিরপেক্ষতা, গণতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ এবং সমাজতন্ত্রবাদের আধুনিক ধারণাগুলো আত্মস্থ করেই আধুনিক বাংলাদেশ প্রজাতন্ত্র এবং তার সংবিধান।

একথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, জামায়াতে ইসলামী, মুসলিম লীগ বা পাকিস্তানপন্থীরা ঠিক যেমনভাবে স্বাধীনতা আন্দোলনের মূলধারা এবং সুরটির বিরুদ্ধে মুখর ভূমিকা নিয়েছিল, সদ্যগৃহীত বাংলাদেশের প্রজাতান্ত্রিক সংবিধানের প্রতি তাদের বিভাজনমুখী মনোভাবের ক্ষেত্রেও তা অন্যথা হয়নি।

তাই তো দেখা যায়, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মধ্য দিয়ে প্রথমেই পাকিস্তানের ভাবধারার সঙ্গে সঙ্গতি রেখে সংবিধানের মূলনীতিগুলোকে পরিবর্তন করা হয়। ধর্মনিরপেক্ষতার নীতি ও গণতন্ত্রের ভিত্তিটিকে জন্মলগ্ন থেকেই যারা বিরোধিতা করেছে, তারাই আবার নতুন করে সাফল্য পায়।

স্বাধীন দেশের সংবিধান যারা প্রণয়ন করেছিলেন, তাদের অন্তর্দৃষ্টি ছিল প্রতিটি নাগরিকেরই ভোটের মূল্য এক। তাদের আরও আকাঙ্ক্ষা ছিল একসময় দেশে প্রতিটি নাগরিকের মূল্য সমান হবে। তারা দেশ ও সমাজের মধ্যে বিদ্যমান অর্থনৈতিক ও সামাজিক বৈষম্যের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করে বৈষম্যমুক্ত দেশ গড়ার কথাও বলেছিলেন। তারা এও ভেবেছিলেন যে, বৈষম্য অপসারণ করে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে তৃণমূল স্তরে সুদৃঢ় না করতে পারলে সেটা দেশের ভবিষ্যতের গণতন্ত্র এবং স্বাধীনতাকেই বিপন্ন করবে। তাই তারা বিকেন্দ্রীকরণের ওপর জোর দিয়েছিলেন।

কিন্তু আমরা স্বাধীনতার চার যুগ পেরিয়ে দেখছি, সংবিধান প্রণেতাদের আকাঙ্ক্ষা থেকে আমাদের দেশ অনেক দূরে সরে গেছে। অর্থনৈতিক এবং সামাজিক বৈষম্য আরও তীক্ষ্ণ হয়েছে। মাত্র দশ শতাংশ ধনাঢ্যের হাতে দেশের সম্পদের প্রায় ৭৩ ভাগ। ছত্রভঙ্গ হয়ে যাচ্ছে মানুষের রুটিরুজি। অন্ন, বস্ত্র, শিক্ষা, স্বাস্থ্যের মতো জরুরি বিষয়গুলো চূড়ান্ত অধোগতির সম্মুখীন।

ফলে যা হওয়ার তা-ই হচ্ছে। চূড়ান্ত অনিশ্চয়তা এবং নিরাপত্তাহীনতা গ্রাস করছে বিপুল সংখ্যক সংখ্যাগরিষ্ঠের দৈনন্দিন অস্তিত্বকে। কৃষিতে ভয়াবহ সংকট। কৃষিজীবীদের মধ্যে হতাশা কেবলই বাড়ছে। কার্যত ফসলের দাম এমনই তলানিতে পৌঁছেছে যে, লাভ এবং উপার্জন তো দূরের কথা, উৎপাদন খরচই উঠছে না। আর তার ওপর ঋণের বোঝা। শিল্পোৎপাদনেও মন্দা। সংগঠিত শিল্প সংক্ষিপ্ত হয়ে বেশিরভাগ শ্রমজীবীই বাধ্য হচ্ছে অসংগঠিত এবং প্রথাবহির্ভূত ক্ষেত্রগুলোতে ভিড় জমাতে। মূল্যবৃদ্ধির ধাক্কায় প্রকৃত উপার্জন কমছে আর অন্যদিকে সামাজিক নিরাপত্তা অন্তর্হিত হয়েছে। কর ব্যবস্থাও মূলত ছোট এবং মাঝারি ব্যবসা-বাণিজ্যকে বিপর্যস্ত করছে। অর্থনীতির ক্ষেত্রে ভয়াবহ কৃষি সংকটের পাশাপাশি তুমুল হচ্ছে কর্মসংস্থানের সংকট। তরুণ সম্প্রদায়ের বেশিরভাগই বিপর্যস্ত।

করপোরেটদের প্রতি কুণ্ঠাহীন আনুগত্য সরকারের অর্থনৈতিক অভিমুখকে প্ররোচিত করছে সামাজিক ক্ষেত্রে সরকারি বিনিয়োগকে শুকিয়ে মারতে। এর ধাক্কায় শিক্ষা এবং স্বাস্থ্যের মতো জরুরি ক্ষেত্রগুলোতে ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা সৃষ্টি করেছে।

সামাজিক পরিস্থিতিও রাজনৈতিক ও ধর্মীয় বিভাজনের তোড়ে বিপন্ন। হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান, আদিবাসী, দলিত এবং অন্যান্য পিছিয়ে পড়া অংশের মানুষ আজ  রুটি-রুচি-জমি-নিরাপত্তা হারাতে বসেছে। সংখ্যালঘু ও বিভিন্ন প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ওপর জুলুম-অত্যাচার বাড়ছে। প্রতিকারহীন এই অত্যাচার সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে শঙ্কিত করে তুলছে।

অর্থনীতি ও সামাজিক পরিবেশের এই ভয়াবহ আবহে অনিশ্চয়তা ও নিরাপত্তাহীনতাকে পরিচালিত করা হচ্ছে তীব্র মেরুকরণ ও বিভাজনের লক্ষ্যে। আর পাশাপাশি যে গণতান্ত্রিক প্রতিক্রিয়া মানুষের ঐক্যবদ্ধ প্রতিবাদ প্রতিরোধের জন্ম দিচ্ছে তাকেও ডুবিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলছে স্বৈরাচারী অভিযানে। সংসদীয় ব্যবস্থা, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাতন্ত্র্য ও নিরপেক্ষতাকে আঁস্তাকুড়ে নিক্ষিপ্ত করা হচ্ছে। প্রশাসনিক, আইনশৃঙ্খলা, তদন্তকারী সংস্থাগুলোর ভূমিকা সবকিছুই ব্যবহার করা হচ্ছে গণতন্ত্রকে পদদলিত করতে। সামগ্রিকভাবেই স্বৈরাচারের পদধ্বনি তীক্ষ্ণ আর কর্কশ। বলার অপেক্ষা রাখে না, সংবিধান এবং স্বাধীনতার মূল কাঠামোটাই চূড়ান্ত সংকটের সম্মুখীন। বিপন্ন।

এ পরিস্থিতিতে তাই প্রতিরোধ জরুরি। মানুষের রুটি-রুজি রক্ষায় বিভাজন আর মেরুকরণের বিরুদ্ধে স্বৈরাচার আর গণতন্ত্রের জন্যে গগনভেদী উচ্চারণ। হেলাল হাফিজের স্বপ্নের শিশুরা বেঁচে থাক, মানুষের ঐক্য আর সংহতিতে সুন্দর হোক প্রিয় স্বদেশভূমি। এই বার্তার ডাক পাঠাক এবারের স্বাধীনতা দিবস।

লেখক: কলামিস্ট

 

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ