নৌকাবিহীন উন্মুক্ত নির্বাচন হলে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হতো

Send
সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা
প্রকাশিত : ১৪:৩৭, মার্চ ২৭, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৪:৩৮, মার্চ ২৭, ২০১৯

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজাদেশজুড়ে উপজেলা নির্বাচনের ভোট চলছে কয়েকটি ধাপে। কিন্তু ভোটের দামামা বলতে যা বোঝায় তা এবার দেখা যায়নি। সাধারণ ভোটারদের দিক থেকে কেমন এক নিরাসক্ত আয়োজন এই ভোট। স্থানীয় সরকার নির্বাচন এমন এক বিষয়, এই দেশে যেখানে যত বিভেদই থাকুক না কেন, সামাজিক, ধর্মীয় বা অন্য যে কোনও উৎসবের মতো ভোটও এক উৎসবে পরিণত হয়। কারণ, এই ভোটে নির্বাচিতরা কাজ করেন একটি সুনির্দিষ্ট জনগোষ্ঠী ও নির্দিষ্ট ভৌগোলিক এলাকার মধ্যে। কিন্তু এবার সেই উৎসব হয়নি।
কেন হয়নি? দৃশ্য ও অদৃশ্য হরেকরকম কৌশলের তরবারিতে শান দেওয়া রাজনীতির কাছে পরাজিত হয়েছে ভোট। তবে অন্য কারণও আছে? একটা কারণ তো খুবই দৃশ্যমান, ভোটকে কেন্দ্র করে সব রাজনৈতিক দল মাঠে নামেনি। বিশেষ করে বিএনপি ও তার নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট এই নির্বাচনে অংশ নেয়নি। ফলে ভোটের দামামা বলে যে বিষয়ের সঙ্গে বাংলাদেশের মানুষ পরিচিত, তার বাজনা পাওয়া যায়নি। বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতার এক ফাঁদে পড়েছে শাসক দল আওয়ামী লীগ ও দেশ। যেহেতু ভোটের লড়াই শুধুমাত্র এক দলের মাঝেই সীমিত থাকলো, তাই ভোটাররা কোনও উৎসাহ পায়নি ভোটকে উৎসব মনে করে ভোটকেন্দ্রে যেতে।

নিজের ভোট নিজে দিন, নিজের প্রচার নিজে করুন-এই হলো ভোটের মূলমন্ত্র। কিন্তু যে নির্বাচনে একটিই দল অংশ নেয় এবং দল আবার তাদের মাঝ থেকে একজনকে তার দলীয় প্রতীক দিয়ে নিজের করে নেয়, তখন দলেই অন্যরা অবহেলা অনুভব করেন। বুঝতে পারেন দল করে তারা মূল্যায়িত হয়নি। তখন তার সমর্থকরাও হতাশায় নিমজ্জিত হয়ে ভোটের উৎসবে বিষাদের সুর খুঁজে পায়। বিনা ভোটে নির্বাচিত হওয়ার খায়েশ জাগে প্রভাবশালীদের মধ্যে। কারণ, এতে তার কোনও অর্থও খরচ হয় না। এই মানসিকতাও ভোটকেন্দ্র জনমানবহীন করে রাখতে ভূমিকা রাখছে। যেহেতু বিএনপি এবং তার সমর্থকরা এই ভোটে অংশ নেবে না বলে আগেই জানিয়েছিল, আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের উচিত ছিল এবার আর দলীয় প্রতীক কাউকে উপহার না দেওয়া। নৌকাবিহীন উন্মুক্ত নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে কিছুটা হলেও প্রতিদ্বন্দ্বিতার আমেজ থাকতো। দলের নেতাকর্মীরা লড়াই করার একটা উপলক্ষ অনুসন্ধান করতেন।

দলীয় প্রতীকে স্থানীয় নির্বাচন কতটা যৌক্তিক সেই বিতর্ক আরেকবার উচ্চারিত হলো। স্থানীয় নির্বাচনে রাজনীতির ভূমিকা একসময় বড় ছিল না, ছিল গ্রহণযোগ্য মানুষের গুরুত্ব। কিন্তু দলীয় প্রতীকে নির্বাচন হতে থাকায় এখন স্থানীয় প্রশাসন ও স্থানীয় রাজনীতির সম্পর্কে এক নতুন বাস্তবতা উপস্থিত হয়েছে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাপনায়। শুধু মেয়র বা চেয়ারম্যান পদে দলীয় প্রতীক দেওয়ায় পুরো প্রক্রিয়াটি প্রশ্নবিদ্ধ থেকে যাচ্ছে। যিনি প্রতীক পাচ্ছেন তিনিই হয়ে উঠছেন দলের একমাত্র প্রতিনিধি। বাকিদের তিনি মনে করতে পারেন তারা দলের কেউ নন। দলীয় প্রতীক যদি বাস্তবতাই হয়, তাহলে বাকি পদগুলোতেও নির্বাচন সেভাবেই হয় না কেন?

সংসদ নির্বাচনের পর পর এসেছে এই স্থানীয় সরকার নির্বাচন। ফলে একটা বড় চ্যালেঞ্জ ছিল কমিশনের জন্য– যে কোনোভাবে ভাবমূর্তির একটা ইতিবাচক দিক আনা যায় কিনা। সবাই আশা করেন নির্বাচন সুষ্ঠু ও অবাধ হবে। কিন্তু এ দেশে গ্রহণযোগ্য ও সুষ্ঠু নির্বাচন করা এখন খুব কঠিন কাজ। কারণ, রাজনীতিতে আস্থার সংকট ভয়াবহ। বর্তমান নির্বাচন কমিশন নিয়ে সংসদ নির্বাচনের আগে থেকে যে বিতর্ক শুরু হয়েছে তা এখনও চলছে। বিএনপি যেমন বলছে, সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরাও বলছেন, কোনও কোনও ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনকে সরকার থেকে আলাদা করা যায় না।

গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় রাজনৈতিক দলের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। তাই রাজনীতির ধরন কী হবে তা নিয়ে ভাবনা জরুরি। আগেও যা বলেছি, তা এখনও আবার বলতে হচ্ছে, শুধু চেয়ারম্যানকে বা মেয়রকে দলীয়ভাবে এনে তাকে স্থানীয় পর্যায়ে স্বৈরশাসক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার এক নতুন সংস্কৃতি চালু হয়েছে। আমাদের দেশে বরাবরই স্থানীয় সরকার নির্বাচন হয় রাষ্ট্রপতি নির্বাচন কাঠামোয়। অর্থাৎ দলীয় হোক বা না হোক চেয়ারম্যান-মেয়রই সকাল ক্ষমতার উৎস। বর্তমান পদ্ধতি বিদ্যমান রেখে দলীয় প্রতীকে এ নির্বাচন হওয়ায় বাস্তবে তৃণমূলের রাজনীতি আরো বিভাজিত হয়েছে। তাই সরকারকে আইন পরিবর্তন করে এ কাঠামো পরিবর্তন করে সংসদীয় কাঠামো করতে হবে। যখন সংসদীয় পদ্ধতিতে স্থানীয় সরকার নির্বাচন হবে, তখন স্বয়ংক্রিয়ভাবে মানুষ এর সুফল পেতে শুরু করবে, তাদের অংশগ্রহণ বাড়বে।

কোনও নির্বাচন দলীয়ভাবে করতে হলে তা পুরোপুরি দলীয় হওয়া বাঞ্ছনীয়। কিন্তু সরকার স্থানীয় সরকার নির্বাচনের সংশোধিত যে আইনটি করেছে, তার অনেক সংশোধনী প্রয়োজন। মেয়র বা চেয়ারম্যানরা দলীয়, কাউন্সিলররা নির্দলীয়। এমন এক ব্যবস্থায় যিনি ক্ষমতাসীন দল থেকে মেয়র-চেয়ারম্যান হবেন, তিনি আসলে কাউকে ভূমিকা রাখার কোনও সুযোগ দেন না। গত কয়েক বছরে এটি প্রমাণিত হয়েছে। দলীয়ভাবে কাউন্সিলর হলে কে কোন দলের তা বোঝা সহজ হতো জনগণের জন্য। যদি মেয়র-চেয়ারম্যানের কোনও সিদ্ধান্ত পছন্দ না হয়, তাহলে তারা কি অনাস্থা আনতে পারবেন তার বিরুদ্ধে? না, তেমন প্রথা রাখা হয়নি। রাখা হলে সেটাই হতো ক্ষমতার ভারসাম্যের সবচেয়ে বড় সুযোগ। এখন পদ্ধতিটা এমন যে, তাতে উপজেলা-ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানের কাজ পছন্দ না হলে তাকে কিছু করাও যাবে না। একই অবস্থা পৌরসভা-সিটি করপোরেশনের ক্ষেত্রেও।

স্থানীয় নির্বাচন অনেক দেশেই দলীয়ভাবে হয়। কিন্তু এমনভাবে নয় যে, রাজনৈতিক দল শুধু একজন প্রধান ব্যক্তিকে স্বীকৃতি দিচ্ছে তার দলীয় লোক হিসেবে। এমন পদ্ধতি দিয়ে কোনও নির্বাচনই উৎসবমুখর করা সম্ভব হবে না। স্থানীয় পর্যায়ের উপযুক্ত লোক যদি নির্বাচনে কোনও কারণে অংশ নিতে না পারেন, তাহলে এসব নির্বাচনে শুধু দল করে, পেশী আর অর্থশক্তি আছে, এমন ব্যক্তিরাই দখলে রাখবেন। দলেরও অনেক যোগ্য প্রার্থী এদের কারণে নির্বাচন করতে পারবেন না।

লেখক: প্রধান সম্পাদক, জিটিভি ও সারাবাংলা

 

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ