চোখের সামনে ডুবে যাচ্ছে মানুষ!

Send
আমীন আল রশীদ
প্রকাশিত : ১৫:২১, মার্চ ২৭, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:২৯, মার্চ ২৭, ২০১৯

আমীন আল রশীদচোখের সামনে মানুষ ডুবে যাবে এবং আমরা মোবাইল ফোনে সেই ডুবে যাওয়ার ভিডিও ধারণ করে তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেবো; কারণ আমরা অনেক সামাজিক!
ঘটনা গত বৃহস্পতিবারের। ভোলার চরফ্যাশন উপজেলার বেতুয়া লঞ্চঘাটে। বিকেল পাঁচটার দিকে মেঘনা নদীর তীরে লঞ্চঘাট থেকে এমভি ফারহান-৫ নামে লঞ্চটি ছেড়ে দেয়। ঘাটে তখনও কর্ণফুলী-১২ লঞ্চটি ছিল। হানিফ (৬৮) নামের এক যাত্রী ফারহান লঞ্চে তার নাতিকে বসিয়ে রেখে আসরের নামাজ আদায় করতে যান। নামাজ শেষে ফিরে এসে দেখেন ফারহান-৫ লঞ্চটি ছেড়ে দিয়েছে। তিনি দৌড়ে কর্ণফুলী লঞ্চে ওঠেন। লাফ দিয়ে ফারহান লঞ্চে উঠতে গেলে নদীতে পড়ে যান। জোয়ারের স্রোতে কিছুক্ষণ সাঁতরে ভেসে থাকার পর তলিয়ে যান হানিফ। শত শত মানুষ তাকিয়ে তাকিয়ে হানিফের ডুবে যাওয়ার ‍দৃশ্য দেখেছেন। কিন্তু কেউ তাকে বাঁচাতে এগিয়ে আসেননি। ভেসে যাওয়ার সময় লোকটি হাত উঠিয়ে বাঁচার আকুতিও জানান। কিন্তু কেউ সেই আকুতিতে সাড়া দেননি। ঘাটে অবস্থানরত কর্ণফুলী-১২ এবং ছেড়ে যাওয়া ফারহান-৫ লঞ্চে দক্ষ ডুবুরি ছিলেন, বয়া ছিল, দড়ি ছিল। কিন্তু কোনও সাড়া মেলেনি।

এই ঘটনার দু’দিন আগেই বৈশ্বিক সুখের মান তথা হ্যাপিনেস ইনডেক্স প্রকাশ করেছে জাতিসংঘ, যেখানে দেখা যাচ্ছে সুখী দেশের তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান ক্রমেই নিচে নামছে। গত বছর অর্থাৎ ২০১৮ সালে এই তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১১৫। এবার ১০ ধাপ নেমে তা হয়েছে ১২৫। এর আগে ২০১৭ সালে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১১০। অর্থাৎ দেখা যাচ্ছে বাংলাদেশের সুখের সূচক ক্রমনিম্নগামী। বাংলাদেশের মানুষ কি তাহলে ক্রমেই আরও বেশি অসুখী হচ্ছে?

বলা হয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মানুষ যত বেশি আসক্ত হচ্ছে, তার অসুখী হওয়ার প্রবণতাও তত বাড়ছে। বিশেষ করে তরুণরা এখন সোশ্যাল মিডিয়ায় অনেক কিছু দেখছে, যা না দেখলেও তাদের কোনও ক্ষতি নেই। কিন্তু অস্বস্তিকর সেসব দেখে তারা তাৎক্ষণিকভাবে অসুখী হচ্ছে। আবার তারা অনেক ছবি ও পোস্ট শেয়ার করছে এবং বন্ধুদের কাছ থেকে লাইক পাওয়ার অপেক্ষায় থাকছে। অনেক লাইক পেলে তারা তাৎক্ষণিকভাবে আনন্দিত হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু কাঙ্ক্ষিত পরিমাণ লাইক ও কমেন্ট না পেলে কিংবা তার একজন বন্ধুর পোস্টে অনেক লাইক অথচ তার পোস্টে লাইক কম, এরকম হীনম্মন্যতাও তাকে অসুখী করছে।

তরুণদের ব্যক্তিতে ব্যক্তিতে যোগাযোগ কমছে। ক্যাম্পাসের ভেতরেই একসাথে দশজন সহপাঠী বসে আছে কিন্তু প্রত্যেকেই তার মোবাইল ফোনে ব্যস্ত; যেন একসঙ্গে অনেকগুলো মানুষ একা একা। তারা প্রত্যেকেই নিজের জগতে ব্যস্ত। এমনও হয়, এক জায়গায় বসে একজন আরেকজনের ফেসবুক স্ট্যাটাসে কমেন্ট করছে। অথচ চোখ তুলে তাকালেই তাকে দেখতে পারে। হাত বাড়ালেই যাকে ছোঁয়া যায়, তার সাথেই যেন শত মাইলের দূরত্ব।   

যুক্তরাষ্ট্রে ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান এবং কগনিটিভ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক লরি স্যান্টোস সুখী হওয়ার কিছু তরিকা বাতলে দিয়েছেন। তার মধ্যে তিনি ইন্টারনেটে সামাজিক যোগাযোগ কমিয়ে ব্যক্তিতে ব্যক্তিতে সরাসরি যোগাযোগ বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছেন। কেননা, মানুষের সঙ্গে মানুষের সরাসরি যোগাযোগ শিথিল করেছে ইন্টারনেট। ফলে এখন মানুষ তার পরিচিত বা বন্ধু অথবা আত্মীয়কে ফেসবুকেই জন্মদিন, বিবাহবার্ষিকী বা অন্য কোনও বিশেষ দিনের শুভেচ্ছা জানায়। সশরীরে ব্যক্তির কাছে ব্যক্তির যাওয়ার পরিমাণ ও প্রবণতা কমছে। মানুষের সঙ্গে মানুষের এই যোগাযোগ শিথিল হচ্ছে বলে মানুষের সংবেদনশীলতা এবং অন্যের প্রতি দরদ ও মায়াও ক্রমক্ষয়িষ্ণু।

মানুষকে নিজের ভেতরে গুটিয়ে থাকা বা নিজে নিজে ভালো থাকার মন্ত্র শেখায় সোশ্যাল মিডিয়া বা ইন্টারনেট। যে কারণে তার চোখের সামনে একজন মানুষ নদীতে ডুবে যাচ্ছে সেই দৃশ্য দেখে তাৎক্ষণিকভাবে পকেট থেকে মোবাইল ফোন বের করে সেটি ভিডিও করে সঙ্গে সঙ্গে ফেসবুকে আপ করে হাজার হাজার রিঅ্যাকশন ও কমেন্ট পাওয়াকেই তিনি তার দায়িত্ব মনে করছেন। এটি ঠিক দায়িত্বও নয়। বরং এটিও এক ধরনের আত্মপ্রচার। অর্থাৎ তিনি একটি গুরুত্বপূর্ণ জিনিস ফেসবুকের মাধ্যমে হাজার হাজার মানুষকে জানাতে পারলেন—এর মধ্য দিয়ে নিজে এক ধরনের আত্মতৃপ্তিতে ভোগেন। অনেক সময় নিজেকে সেলিব্রিটিও ভাবতে পারেন। কিন্তু চোখের সামনে মানুষটির ডুবে যাওয়া দেখে তাকে উদ্ধারের জন্য নিজে পানিতে ঝাঁপ না দিতে পারলেও অন্তত কী করা যায় সেটি নিয়ে যদি ভাবতেন বা পদক্ষেপ নিতেন, সেটি অনেক বেশি মানবিক হতো। কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়ার মানুষ এখন যতটা না মানবিক, তার চেয়ে বেশি আত্মমুখী এবং এই আত্মমুখিনতার ভেতর দিয়েই তিনি নিজেকে সুখী ভাবার চেষ্টা করেন।

তবে মোবাইল ফোনে ভিডিও করার পক্ষেও যুক্তি আছে। কারণ, এযাবৎ অনেক ঘটনাই ঘটেছে, যার ভিডিও ছিল বলেই সামাজিক চাপ তৈরি হয়েছে এবং দ্রুত বিচারও হয়েছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় সিলেটের শিশু রাজনকে পিটিয়ে হত্যা কিংবা কলেজছাত্রী খাদিজাকে প্রকাশ্যে কোপানোর ঘটনা। ওই দুটি নৃশংসতার ভিডিও সেখানে উপস্থিত লোকেরাই তাদের মোবাইল ফোনে ধারণ করেছিলেন এবং ফেসবুকে ছড়িয়ে দেওয়ার ফলে সারা দেশে তোলপাড় শুরু হয়। নড়েচড়ে বসে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। বিচারকাজ শেষ হয় দ্রুততম সময়ের মধ্যে। রাজধানীতে একজন রিকশাচালককে বেদম মারধর করেছিলেন ক্ষমতাসীন দলের একজন ওয়ার্ড নেতা। সেই দৃশ্যও মোবাইল ফোনে ক্যামেরাবন্দি হয়েছিল এবং ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ার পরে মারধরকারী ওই নারীর বিরুদ্ধে জনমত তৈরি হয়। তাকে তাৎক্ষণিকভাবে দল থেকেও বহিষ্কার করা হয়। কিন্তু এই ঘটনাগুলোর ভিডিও না থাকলে আখেরে এসব ধামাচাপা পড়ে যেতো বলেই ধারণা করা যায়। আবার ভোলার লঞ্চঘাটে যে মানুষটি ডুবে গেলেন, সেই দৃশ্য ক্যামেরাবন্দি না হলে বা এ নিয়ে সংবাদ প্রকাশিত না হলে হয়তো লঞ্চের অব্যবস্থাপনার বিষয়টি সেভাবে আলোচিত হতো না। 

তার মানে একদিকে স্মার্টফোন ও ইন্টারনেট মানুষকে মানুষের কাছে থেকে দূরে ঠেলে দিচ্ছে, অন্যদিকে অনেক ঘটনা বা অপরাধের বিচার সহজ করার ক্ষেত্রেও ভূমিকা রাখছে। এখন অপরাধ করে পার পাওয়া কঠিন। কারণ, কে কখন কোথায় কী ভিডিও করছেন তা বলা মুশকিল। আর কোনও ছবি একবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে সেটির যে প্রতিক্রিয়া হয়, তারও একটি সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় গুরুত্ব আছে। অর্থাৎ এরকম একটি ডায়ালেকটিকের ভেতর দিয়েই আমাদের ব্যক্তিগত অসামাজিকীকরণ এবং সোশ্যাল মিডিয়ার শক্তির বহিঃপ্রকাশ ঘটছে।

শেষ কথা হলো, মেঘনায় হানিফ নামে ওই বৃদ্ধের ডুবে যাওয়ার দৃশ্য দেখে তাকে উদ্ধারের চেষ্টা না করে আমরা যেমন সেই ঘটনার ভিডিও ধারণ করে তা সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে দেওয়াকেই ‍গুরুত্বপূর্ণ ভাবছি, এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে আগামীকাল আমার ডুবে যাওয়া কিন্তু দুর্ঘটনার শিকার হয়ে রাস্তায় পড়ে থাকার দৃশ্যও আরেকজন ভিডিও করে ফেসবুকে ছড়িয়ে দিয়ে কয়েক হাজার রিঅ্যাকশন বা মন্তব্য পাবেন ঠিকই—আখেরে আমাকে বাঁচানো যাবে না।

লেখক: সাংবাদিক

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ