জ্বালানি নিয়ে উদ্বিগ্ন জাতি

Send
বখতিয়ার উদ্দীন চৌধুরী
প্রকাশিত : ১৪:২২, মার্চ ২৮, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৪:২৫, মার্চ ২৮, ২০১৯

বখতিয়ার উদ্দীন চৌধুরীতরল গ্যাস আমদানি করে গত নয় মাসে পেট্রোবাংলা নাকি ৯ হাজার কোটি টাকা লোকসান দিয়েছে। জ্বালানি খাতে এত লোকসান সরকার সহ্য করতে পারবে কিনা তা সরকারের স্থির করা দরকার। লোকসান কমাতে গেলে গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি ছাড়া উপায় নেই। আবার এই মূল্যবৃদ্ধির খবরে সারাদেশের মানুষের মধ্যে একটা উদ্বেগ কাজ করছে। সরকারি পদক্ষেপ কী হয় তাতে চোখ রাখছে সাধারণ গৃহস্থ থেকে ব্যবসায়ী, শিল্প কলকারখানার মালিকরা। পুরো জ্বালানি খাত নিয়ে সরকার যদি সঠিক সিদ্ধান্ত না নিতে পারে এই উদ্বেগ হয়তো বিস্ফোরক হয়ে দেখা দিতে পারে।
দেখা যাচ্ছে মূলত তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (Liquefied natural gas) বা এলএনজি  আমদানির প্রভাবে জ্বালানি খাতে অস্থিরতা বাড়ছে। আমরা দেখছি ধীরে ধীরে দেশের জ্বালানি ব্যবস্থা আমদানি নির্ভর হয়ে উঠছে। যেটুকু প্রকৃতিক গ্যাস ছিল, এতদিন সেই গ্যাস দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন, কলকারখানা ও গৃহস্থালি কাজে সরবরাহ করে তা সচল রাখা হয়েছিলো। কোনও নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার হয়নি। ফলে দেশ এখন ১৪ টিসিএফ মজুত গ্যাসের ওপর নির্ভর। আমাদের বর্তমান সংযোগ ব্যবস্থা সচল রাখতে বার্ষিক ১ টিসিএফ গ্যাস প্রয়োজন। নতুন নতুন সংযোগের চাহিদা বাড়ছে। যদি নাও বাড়ে এই মজুতে আগামী ১০ বছর চলা কঠিন।

দেশ চলতে হলে তো নতুন সংযোগ না দিয়ে পারা যাবে না। দেশের শিল্প উন্নয়নের জন্য গ্যাস ও বিদ্যুতের প্রয়োজন। সুতরাং সঙ্গত কারণেই সরকার এলএনজি আমদানির সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তরল গ্যাস সরবরাহের জন্য দুটি স্টেশন পায়রা বন্দর ও মাতারবাড়িতে স্থাপন করা হচ্ছে। সেখান থেকে গ্যাস পাইপ লাইন দিয়ে কেন্দ্রীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হবে। খুবই সুন্দর ও সুচারু ব্যবস্থা। কিন্তু পরিস্থিতি জটিল করে তুলেছে তরল গ্যাসের মূল্য।

আমদানিকৃত এক ঘনফুট তরল গ্যাসের মূল্য পড়ছে ৩২ টাকা। এত উচ্চমূল্যে গ্যাস কিনে বিদ্যুৎ উৎপাদন করলে বা সার উৎপাদন করলে বা কলকারখানা সরবরাহ করলে উৎপাদন মূল্য যা পড়বে তা সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে থাকবে না। বিদেশেও এখন তরল গ্যাস দিয়ে বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন লাভজনক প্রমাণিত হচ্ছে না। বাংলাদেশ বেসরকারি খাতে এলএনজি গ্যাস দিয়ে কোনও বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করলে ওই বিদ্যুৎ বাজারজাত করা সম্ভব হবে না। কেননা, প্রতি ইউনিটে উৎপাদন খরচ যা স্থির করা হবে তা মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে থাকবে না।

পায়রা, মাতারবাড়ী, বাঁশখালী, রামপাল ইত্যাদি স্থানে তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের জন্য কাজ চলছে। এবং সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কয়লা আমদানি করে সরবরাহ করার জন্য। আমদানি করা কয়লার মূল্য ২২০ ডলার প্রতি টন আর স্থানীয় কয়লার মূল্য পড়ে ১২০ ডলার প্রতিটন। কিন্তু কয়লা উত্তোলন ‘আন্ডার গ্রাউন্ড’ হবে না ‘ওপেন পিট’ হবে এ বিতর্কে উত্তোলন কাজ বন্ধ হয়ে আছে। অথচ আমাদের আবিষ্কৃত কয়লা খনিতে ৭ হাজার ৯৬২ মিলিয়ন টন কয়লা মজুত আছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, উত্তোলনযোগ্য এ কয়লা দিয়ে ৫০ বছরব্যাপী দৈনিক ১০ হাজার মেগাওয়াট করে বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব। অনুসন্ধান চালালে রংপুর, দিনাজপুর ও বগুড়ায় আরও কয়লা খনি পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

বলা যায় আন্দোলনকারী সংগঠন তেল গ্যাস বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির আন্দোলনের চাপে এখন সরকার কয়লা উত্তোলনের বিষয়টি স্থগিত করে রেখেছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০০৮ সালে ক্ষমতায় আসার পর কয়লা তোলার প্রক্রিয়া শুরুর উদ্যোগ নেয় পেট্রোবাংলা। কিন্তু ওই মেয়াদেই তিনি আপাতত কয়লা উত্তোলন না করার নির্দেশ দেন। আন্দোলনকারীদের সঙ্গে একটা রাজনৈতিক সমঝোতা করে কয়লা উত্তোলনের ব্যবস্থা করা খুবই জরুরি। আন্দোলনকারী সংগঠন তেল গ্যাস বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটি ২০০৪ সালে আন্দোলন করেছিলো মূলত এশিয়া এনার্জিকে কম মূল্যে কয়লা খনি লিজ দিতে চেয়েছিলো, সে জন্য। বেগম খালেদা  জিয়ার সরকারের সেই উদ্যোগ তারা বন্ধ করতে সফল  হয়েছিলো। আন্দোলনে তিনজন লোকও প্রাণ হারিয়েছিলো।

বর্তমান সরকার বলছে কয়লা আমদানি করে তাপবিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো চালানো হবে। নিজের দেশে ৫০-৬০ বছরের কয়লা মজুত রেখে কয়লা আমদানি করা বিজ্ঞজনোচিত কাজ হবে কিনা চিন্তা করা দরকার। আমাদের দেশে সাশ্রয়ী মূল্যে বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে হবে যেন বিদ্যুতের ক্রয়ক্ষমতা সাধারণ মানুষের নাগালে থাকে। রেগুলেটরি কমিশন যে গণশুনানি করেছে এবং সেখানে শিল্পের জন্য যে মূল্য স্থির করেছে তাতে মিল মালিকেরা বলছেন, বিদ্যুৎ বাবদ প্রতিকেজি সুতায় তাদের বাড়তি ব্যয় হবে ৭.৭২ টাকা। মিল মালিকরা বলছেন, তারা লোকসান দিয়ে মিল চালু রাখতে পারবেন না। মিল কারখানা যদি চালু রাখা সম্ভব না হয় তবে এত আয়োজন কিসের জন্য!

সমুদ্রে গ্যাস অনুসন্ধানের ব্যাপারে সরকার গত তিন বছর সিদ্ধান্ত নিয়ে বসে আছে অথচ মিয়ানমার ও ভারত তাদের স্ব-স্ব এলাকায় অনুসন্ধানের কাজ শেষ করে গ্যাস উত্তোলন শুরু করেছে। পেট্রোবাংলা বলছে সমুদ্রে অনুসন্ধানের কাজে বাংলাদেশের কাছে অভিজ্ঞ জনশক্তি নেই। অভিজ্ঞ জনশক্তি না থাকলে বিদেশ থেকে আনেন। এ কারণে তো বসে থাকা যায় না।  ব্লু ইকোনমির কথা বলে অনেক সময় উচ্ছ্বাস প্রকাশ করা হয়। কোনও সুষ্ঠু পদক্ষেপ না নিয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশে লাভ কী?

এদিকে, সরকার বিদ্যমান ইপিজেডগুলো ছাড়াও আরও একশ’ ইপিজেড প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছে। প্রত্যেক ইপিজেডে গ্যাস-বিদ্যুৎ প্রয়োজন। আমরা যদি সুষ্ঠু অবকাঠামোর উন্নয়ন ঘটাতে পারি তবে এক দশকের মধ্যে একশ’ ইপিজেডে শিল্প কারখানা গড়ে ওঠে একটা মিনি শিল্প বিপ্লব ঘটে যাবে। কারণ, শিল্পোন্নত পুরনো রাষ্ট্রগুলো নিজ দেশে বহুবিধ সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে। গত শতাব্দীর আট দশকে চীনের সাংহাই ইপিজেড ভর্তি হয়ে গিয়েছিলো। কারণ, আমেরিকার মিল মালিকেরা তাদের বন্ধ হয়ে যাওয়া মিলগুলো রাতারাতি সাংহাইয়ে নিয়ে এসেছিলো। গ্যাস বিদ্যুৎ আর  অবকাঠামোগত উন্নয়ন সুবিধা বিরাজ করলে বিদেশি উদ্যোক্তারা হেসেখেলে আসবেন।

কোরিয়ানেরা চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলায় দেয়াং পাহাড় সংলগ্ন এলাকায় কোরিয়ান ইপিজেড স্থাপন করেছে। এখন কোরিয়ান ইপিজেডের সংলগ্ন এলাকায় চীনও তার নিজস্ব ইপিজেড স্থাপনের কথা বলছে। ভারত, জাপানও  ইপিজেড স্থাপনের ইচ্ছা ব্যক্ত করেছে। ভারতকে নাকি মিরসরাই ইপিজেডে জায়গা প্রদান করা হবে। দেখা যাচ্ছে, প্রত্যেক শিল্প কারখানার জন্য গ্যাস বিদ্যুৎ দরকার।

আমরা আশা করবো সরকার অবিলম্বে সমুদ্রে গ্যাস অনুসন্ধানের কাজ আরম্ভ করবে। সরকার টানা ক্ষমতায় থাকলে দেশের অগ্রগতির জন্য সুবিধা হয়। আওয়ামী লীগ সরকার টানা গত দশ বছর ক্ষমতায় ছিল। এখন পুনরায় পাঁচ বছরের জন্য নির্বাচিত হয়েছে। উন্নয়ন ছাড়া সরকার দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকলে জনগণের মাঝে সরকার সম্পর্কে বিরূপ প্রতিক্রিয়া হয়। আশা করি সরকার সে সম্পর্কে সজাগ থাকবে। প্রয়োজনে আন্দোলনকারী শক্তি, বিরোধী দল, সবার সঙ্গে বসে এর একটা গ্রহণযোগ্য সমাধান খুঁজতে হবে।

লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলাম লেখক

bakhtiaruddinchowdhury@gmail.com

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ