লোভের আগুন

Send
তুষার আবদুল্লাহ
প্রকাশিত : ১৪:০১, মার্চ ৩০, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:৩৩, মার্চ ৩০, ২০১৯

তুষার আবদুল্লাহআগুনে পুড়ছে নগর। চুড়িহাট্টা, বনানী হয়ে আজ গুলশান। আগুনের বিভিন্ন কারণের কথা বলা হচ্ছে। সেগুলো দৃশ্যত কারণ। মূল কারণ লোভ। আমরা পুড়ছি লোভের আগুনে। নিমতলী, চুড়িহাট্টা, তাজরিন হয়ে কামাল আতাতুর্ক এভিনিউতে প্রবেশ করেছে আগুন। এফ আর টাওয়ারে আগুনের রাত থেকে অনেকের মধ্যে দেখেছি স্তব্ধতা। বিষণ্নতা কাটছে না তাদের। বৃহস্পতিবার (২৮ মার্চ) রাতের ভয়াবহতা তারা শুক্রবার রাতেও কাটিয়ে উঠতে পারেননি।
রাত ভোর না হতেই আগুন চলে এলো গুলশানে। গুলশান ডিএনসিসি মার্কেটে ২০১৭ সালের ৩ জানুয়ারিও ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড হয়েছিল। সেই আগুনের পর গঠিত তদন্ত কমিটি একপ্রস্থ সুপারিশ দিয়েছিল। কিন্তু সেগুলোর এক ছটাকও বাস্তবায়ন করা হয়নি। আগুন নির্বাপণের ব্যবস্থা নিশ্চিত না করে আবারও মার্কেটটি চালু করা হয়। দমকল বিভাগের কোনও সতর্কতাকে পাত্তা দেননি মার্কেটের ব্যবসায়ীরা। ফলে আজকের আগুন নিয়ে সমবেদনা দেখানো বা হাপিত্যেশ করার আর অবকাশ কোথায়?
বনানীর কামাল আতাতুর্ক এভিনিউয়ের এফ আর টাওয়ারে ফিরে গেলে দেখবো– অগ্নিকাণ্ডে ২৫ প্রাণ ভস্মিভূত হওয়ার পর রাজউক, সিটি করপোরেশন ও বিভিন্ন দফতর বলতে শুরু করেছে ভবনটিতে অগ্নিনির্বাপণ কিংবা কোনও নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছিল না। ভবন নির্মাণ বিধিমতো হয়নি। এমন অভিযোগ চুড়িহাট্টা, নিমতলীসহ সব অগ্নিকাণ্ডের সময়েই আমরা লক্ষ্য করেছি। বরাবরই সাধারণ মানুষের পক্ষ থেকে প্রশ্ন ওঠে– ওই বিপণি বিতান অর্থাৎ ভবনটি তো নগরের মধ্যেই ছিল। রাজউক ও সিটি করপোরেশনের নজরে কেন এই ভবন আর বিপণি বিতানের অনিয়ম চোখে পড়েনি? এই স্থাপনাগুলোর অনুমোদন তো রাজউকের কাছ থেকেই নেওয়া। প্রতিটি এলাকার জন্য তো একজন অনুমোদিত কর্মকর্তা থাকেন। তিনি কি এই স্থাপনা পরিদর্শন না করেই নকশার অনুমোদন দিয়েছেন? স্থাপনা নির্মাণ শেষে রাজউক ও সিটি করপোরেশন কি একবারও পরিদর্শনের সময় পেলো না? তাদের দিক থেকে সাফাই বা অজুহাত ওঠে– পর্যাপ্ত লোকবল নেই। ফলে কীভাবে এত বড় নগরের দেখভাল করবেন তারা? যদিও এই অজুহাত ধোপে টেকে না। কারণ কোনও একটি ভবনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নজির রাখতে পারেনি তারা। বরং অসংখ্য প্রমাণসহ অভিযোগ রয়েছে– রাজউক, সিটি করপোরেশন ও পরিবেশ অধিদফতরের কতিপয় কর্তাদের প্রশ্রয়েই বিধি না মেনে ভবন বা স্থাপনা তৈরি হয়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে দুর্ঘটনা ও অগ্নিকাণ্ডের পর গঠিত তদন্ত কমিটির সুপারিশ আর নিষেধাজ্ঞা তোয়াক্কা না করে পুনরায় আগের মতোই চলতে থাকে আগুনের ঝুঁকি নিয়ে বসবাস ও ব্যবসা।

আমরা যারা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, টক শোতে উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা ও আবেগ বিতরণ করছি, তারা কি নিজেদের বসতবাড়ি, ব্যবসা ও কাজের জায়গাটির সুরক্ষা নিশ্চিত করেছি? অগ্নিকাণ্ড কিংবা ভূমিকম্পের সময় দ্রুত নেমে আসার সিঁড়ি আছে কয়টি বাড়ি ও অফিসে? দমকলের গাড়ি ও অ্যাম্বুলেন্স সহজে আসতে পারবে এমন কয়টি গলিপথ আছে এই শহরে? চারতলার ভিত দিয়ে তৈরি করে ফেলছি আটতলা। একই ভবনে দশ রকমের বাণিজ্যিক কার্যালয়কে ভাড়া দিয়ে টাকা গুনছি। কখনও টাকা, কখনও ক্ষমতার দাপট ও লোভে অনিয়মের ফাইলে চোখ বুঁজে স্বাক্ষর দিয়েছি। এখন সেই দফতরের সমালোচনায় মুখর আমরা। কত কী যে করার আছে অবসরের পর মনে পড়ে আমাদের।

গণমাধ্যম যেভাবে বিভিন্ন দফতর ও ভবনের অগ্নিনিরাপত্তা নিয়ে কথা বলছে, তাদের দিকে আঙুল তুলে দেখাবে কে? তারাও তো একাধিকবার তাদের অসচেতনতার প্রমাণ দিয়েছে। আর আগুনের পর কর্তাব্যক্তিরা যত তপ্ত কথা ও নির্দেশই দেন না কেন, সেগুলোও মুহূর্তেই ভিজে যায়। যখন কর্তারা ওই ভবন বা স্থাপনার ক্ষমতাধর মালিকের নামটি জানতে পারেন। কোনও কোনও ভবন মালিকের নাম উচ্চারণ করার সাহসও তো রাজউক, দমকল এমনকি গণমাধ্যমের ক্ষমতায় কুলোয় না।

এফ আর টাওয়ারে অগ্নিকাণ্ডে যারা মুষড়ে পড়েছেন তাদের এই বিষণ্নতা ও বিপন্নতাকে অশ্রদ্ধা করছি না। তবে কেন যেন মনে হয় আমরা হয়তো এখন সত্যি আঁতকে ওঠেছি এই ভেবে যে, আগুন তো নিজ করিডোরে চলে এলো!

আগুনের এই দৈত্য তো আমাদের হাতেই তৈরি। যে মেয়েটি, ছেলেটি বা যারা পুড়ে মরলো তারা ছিল আমার সহপাঠী বা সহকর্মী। আমিও তো থাকতে পারতাম মরদেহের সারিতে। এতদিন চিন্তার জায়গাটা ছিল এমন– আমাদের লোভের আগুনে শুধু তাজরিনের পোশাককর্মী, নিমতলীর শ্রমিক ও বস্তির মানুষেরাই পুড়বে। কিন্তু দৈত্য এখন নিজ দরজায়। বাবা, চাচা, মামা, স্বামী কিংবা আমার নিজের লোভ আজ এই নাজুক অবস্থায় এনে দাঁড় করিয়েছে শহরকে। যেখান থেকে আমার নিজেরই বাঁচার উপায় নেই। তাই লোভের আগুন দেখে বিধ্বস্ত আমি, আমরা।

তারপরও অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, ক্ষণস্থায়ী শোক ও বিষণ্নতা কাটিয়ে আবারও আমরা লোভের দিকেই ছুটবো। সুতরাং লোভের আগুন অনির্বাণ হচ্ছেই।

লেখক: বার্তা প্রধান, সময় টিভি

/এসএএস/জেএইচ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ