রাজউক: নিজে খেলোয়াড়, নিজেই রেফারি

Send
সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা
প্রকাশিত : ১৩:৫২, এপ্রিল ০৩, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৩:৫৪, এপ্রিল ০৩, ২০১৯

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজাগৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষকে (রাজউক) একটি কাজ দিয়েছেন। বলেছেন, রাজউকের ২৪টি টিম বহুতল ভবনসহ সব ভবন পরিদর্শন করবে। সবাইকে বিল্ডিং কোডের আওতায় আনতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অনুমোদনের বাইরে কোনও অবকাঠামো থাকার সুযোগ রাখা হবে না।
রাজউক একটি কাজ পেল নাকি কাজের নামে এই সংস্থার দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তারা আরেকটি বড় সুযোগ পেলেন অর্থ আয়ের, সেটা নিশ্চয়ই আমরা বুঝব একটা সময় পার করে।
রাজউকের আসল কাজ রাজধানী যেন পরিকল্পিতভাবে উন্নয়নের পথে চলে, সেটা দেখা। আর এজন্যই তার কাছে ভবনের নকশা, উচ্চতা, আগুনসহ নানা ঝুঁকি আছে কি না সেসব বিষয়ে ছাড়পত্র নিতে হয়। একটি করে ঘটনা ঘটে, আমরা জানতে পারি, সেই ভবন বা স্থাপনা নির্মাণে রাজউকের নিয়ম মানা হয়নি বা দুর্নীতির মাধ্যমে সব অনুমোদন আদায় করে নিয়েছেন নির্মাতা বা ভবন মালিকরা।

রাজউক একটি সেবাধর্মী সরকারি প্রতিষ্ঠান। কিন্তু অভিযোগ আছে, এখানে সেবা পেতে এর কর্মকর্তাদের দ্বারা পদে পদে হয়রানির শিকার হতে হয়। সব স্তরের কর্মকর্তা ও কর্মীর বিরুদ্ধে দুর্নীতির বিস্তর অভিযোগ। রাজউক সম্পর্কে অভিজ্ঞতা বা অনভিজ্ঞতা রয়েছে এমন, কাউকে যদি এই সংস্থা সম্পর্কে কিছু বলতে বলা হয়, তাহলে এক কথায় উত্তর হবে– অনিয়ম, দুর্নীতি ও হয়রানির আখড়া রাজউক।

হামেশাই আমরা শুনি রাজধানীর এখানে-ওখানে অবৈধ স্থাপনা, কোনোটি হেলে পড়েছে, কোনোটি ধসে পড়েছে। কোনোটি প্ল্যানের বাইরে গিয়ে উঁচু করা হয়েছে, কোনোটির কোনও অনুমোদনই নেই। সবই ঘটছে রাজউকের চোখের সামনেই। একটা বড় ঘটনা ঘটলে কিছু কথাবার্তা হয়, কিছু বড় বড় নির্দেশনা আসে, যেমন এখন এসেছে নতুন পূর্তমন্ত্রী থেকে। কিছু সময় কিছু চিৎকার হবে, তারপর সবাই নীরব। আমরা অবশ্য দেখলাম মন্ত্রীর সশব্দ হুঁশিয়ারির মধ্যে তার পেছনেই ঘুমাচ্ছেন রাজউকের দুই কর্মকর্তা।

আগুনের গ্রাসে চলে যাওয়া বনানীর এফ আর টাওয়ারে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড আবারও সবার সামনে এই নগরীর বীভৎসতাকে নিয়ে এসেছে। একটা মৃত নগরীতে যে কী করে দুই কোটি মানুষ জীবিত আছে, সেটা এক বড় জিজ্ঞাসা। এ শহরের মানুষ জেনে গেছে, এটাই তার জীবন। এখানে কোথাও কোনও সুরক্ষা নেই।

আগেও বলা হয়েছে, ফের বলা শুরু হয়েছে যে রাজধানীর স্থাপনাগুলোকে অগ্নিকাণ্ডের হাত থেকে বাঁচাতে পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে। খুব শিগগিরই তা ফলপ্রসূ করা হবে। এ নিয়ে আমরা টিপ্পনি কাটতে চাই না, তবে এসব আশ্বাসে প্রকৃতপক্ষে কাজ হবে কি না সে সন্দেহ থেকেই যাচ্ছে। আমরা জানি শহরের বহুতলে বা বাজারে, দোকানে আগুন লাগা বা ধসে পড়া রোধে বিভিন্ন কর্তৃপক্ষ কখনও উদ্যোগী বা উদ্যমী ছিল না, এখনও নেই।

শহরের জলাশয়, পার্ক, খেলার মাঠ দখল হয়ে যায়। যেনতেনভাবে গড়ে ওঠে ভবন। মানুষ হতাশ এসব দেখতে দেখতে। পরিকল্পিত নগর উন্নয়নে রাজউকের কোনও ভূমিকা নেই। নিমতলী থেকে শুরু হয়ে চকবাজারের চুড়িহাট্টা, বনানীর এফ আর টাওয়ার থেকে গুলশান কাঁচাবাজার– গত এক দশকে শহরের একাধিক বড় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় বারবার বিব্রত হতে হয়েছে সরকার ও প্রশাসনকে। নিজেদের প্রচেষ্টা বাড়িয়েছে দমকল বাহিনী। কিন্তু নির্বিকার রাজউক। ধরাছোঁয়ার বাইরে রাজউক।

অপরিকল্পিত ও অবৈধভাবে গড়ে ওঠা ভবনগুলো একেকটি মৃত্যুফাঁদ। পর পর বেশ কয়েকটি আগুনের ঘটনা নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনিয়ম, গাফিলতি ও স্বেচ্ছাচারিতার বিষয়গুলো সামনে নিয়ে আসে। বলা হচ্ছে ঢাকার ৯০ শতাংশ ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে কোনও নিয়ম মানা হয় না। অভিভাবক প্রতিষ্ঠান হিসেবে বড় দায় রাজউকের। ভবনের নকশা ও অনুমোদনের প্রক্রিয়া পুরোটাই দুর্নীতিগ্রস্ত। আগুনসহ অন্যান্য দুর্ঘটনায় যেখানে আগে থেকে প্রস্তুতি আর পরিকল্পনা থাকলে হতাহতের সংখ্যা কম হতে পারত, সেখানে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা বাড়তে থাকে। জনসাধারণ কেন নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনিয়ম ও দুর্নীতির ফল ভোগ করবে? এক্ষেত্রে রাজউকের জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি।

প্রায় এক যুগ আগে রাজধানীতে ভবন তৈরিতে ইমারত নির্মাণ বিধিমালা প্রণয়ন করা হয়। নতুন আইনটি সবদিক দিয়ে মানসম্মত ও পরিবেশবান্ধব হলেও রাজউকের কর্মকর্তাদের সহযোগিতায় পুরনো বিধিমালা অনুসরণ করেই নগরীতে আবাসিক ও বহুতল বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে। রাজউকের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিতের পাশাপাশি দুর্বলতাগুলো চিহ্নিত করে উপযুক্ত ব্যবস্থা নেওয়ার বিকল্প নেই।

আসলে রাজউকের কোন কাজটি করা দরকার আর কোনটি নয়, সেই হিসেব করার সময় এসেছে। সংস্থা হিসেবে রাজউকের নিজস্ব দায়িত্ব হলো পরিকল্পিত নগরায়ণ। কিন্তু এ কাজে তার মন নেই। এখানকার প্রতিটি স্তরের কর্মীরাই উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের নামে প্লট আর ফ্ল্যাটের ব্যবসায় জড়িত। রাজউক নিয়ন্ত্রকের ভূমিকায় থেকে ভবনের নকশা ও নিরাপত্তার ব্যবস্থার অনুমোদন দেয়, আবার সে নিজেই প্লট-ফ্ল্যাটের বাণিজ্যে লিপ্ত এবং সেখানেই বেশি আগ্রহ কর্মকর্তা ও কর্মীদের।

রাজউক যে একটি নিয়ন্ত্রক সংস্থা, সেটা তারা ভুলেই গেছে। সেক্ষেত্রে তারা যদি প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ করে, তাহলে কাজের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা সম্ভব নয়। কারণ রাজউকের কাঠামো নিয়ন্ত্রকের আদলে তৈরি। তাই প্লট বা ফ্ল্যাটের বাণিজ্য করতে গিয়ে জনবল-স্বল্পতাসহ বহু চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছে সংস্থাটি। আর যেহেতু এদের হাতে প্লট আর ফ্ল্যাটের ক্ষমতা, ফলে রাজনৈতিক নেতা, আমলাসহ প্রশাসনের লোকজন, বুদ্ধিজীবী সবাই এদের তোষামোদ করে চলে একটা প্লট বা ফ্ল্যাটের জন্য। আর এ কারণে এরাও কোনও দায়বদ্ধতা অনুভব করে না, কোনও অপরাধের জন্য অনুশোচনা বোধ করে না। 

রাজউকের স্বেচ্ছাচারিতা, অনিয়ম, দুর্নীতি ও লুটপাট বন্ধ করতে হলে এর প্লট আর ফ্ল্যাটের বাণিজ্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বন্ধ করে দিতে হবে। এখন দেশে হাজারো প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে ব্যক্তিখাতে, যারা জমি ও ফ্ল্যাটের ব্যবসা করছে। এদের নিয়ন্ত্রকও রাজউক। যে রেফারি সে যদি নিজেই মাঠের খেলোয়াড় হয় তবে কি কোনও ন্যায্যতা থাকে? বিষয়টি নীতিনির্ধারকরা যত দ্রুত আমলে নেবেন, তত রাজউকের দুর্নীতি কমবে।

লেখক: প্রধান সম্পাদক, জিটিভি ও সারাবাংলা

 

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ