ব্রিটেনের ব্রেক্সিট পাগলামি

Send
বখতিয়ার উদ্দীন চৌধুরী
প্রকাশিত : ১৫:২০, এপ্রিল ০৪, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:২১, এপ্রিল ০৪, ২০১৯

বখতিয়ার উদ্দীন চৌধুরীইউরোপীয় বিষয়ক ফরাসি মন্ত্রী নাথালি লোয়েসো তার বিড়ালের নাম রেখেছেন ‘ব্রেক্সিট’। স্থানীয় একটি পত্রিকাকে এই নামকরণ নিয়ে তিনি বলেছেন, ‘আমার বিড়ালটি প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে জেগেই ম্যাঁও ম্যাঁও করে বাইরে যেতে চায়। তারপর আমি দরজা খুলে দিলে সে মাঝামাঝি দাঁড়িয়ে থাকে, সিদ্ধান্তহীনতায় ভোগে এবং আমি যখন তাকে বের করে দেই তখন আমার দিকে একটা শয়তানি চাহনি দেয়।’
ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে যাওয়া নিয়ে গত ক’বছর ব্রিটেন ওই বিড়ালটির মতোই আচরণ করছে। তাদের অবস্থা বুঝানোর জন্য আমাকেও ফরাসি মন্ত্রীর বক্তব্যের আশ্রয় নিতে হলো। এর চেয়ে উৎকৃষ্ট কোনও উপমা পাচ্ছি না। ব্রিটেনের রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ সাধারণত কোনও রাজনৈতিক বক্তব্য প্রদান করেন না। তিনিও গত কয়দিন আগে ব্রেক্সিট নিয়ে পার্লামেন্টে অচলাবস্থা দেখে উভয়পক্ষকে পরামর্শ দিয়েছেন সুষ্ঠু কোনও সিদ্ধান্তে উপনীত হতে। পার্লামেন্টের ক্ষমতাসীন রক্ষণশীল দল এবং বিরোধী লেবার পার্টির সদস্যরা উভয়ে একের পর এক ভোট দিচ্ছেন একটা নিখুঁত পরিকল্পনার উদ্দেশ্যে, যা দিয়ে তারা ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) থেকে ব্যথামুক্ত প্রস্থান লাভ করতে পারেন।

২০১৬ সালের ব্রেক্সিট গণভোটের রায় অনুযায়ী গত ২৯ মার্চ ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্যপদ ত্যাগ করার কথা ছিল যুক্তরাজ্যের। ২০১৬ সালের ২৩ জুন যুক্তরাজ্যের ১ কোটি ৭৪ লাখ ভোটার ইউনিয়ন ত্যাগ করার পক্ষে ভোট দিয়েছিল (৫১.৮৯%), আর ১ কোটি ৬১ (৪৮.১১%) লাখ ভোটার ইউনিয়নের সদস্য পদ অব্যাহত রাখার পক্ষে ভোট প্রদান করেছিল। এ গণভোটের পরপরই ব্রেক্সিটবিরোধী প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন পদত্যাগ করেছিলেন, আর তার দলের থেরেসা মে প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন।

ব্রিটেন ইউরোপীয় ইউনিয়নের এক শক্তিশালী সদস্য। দীর্ঘদিন একসঙ্গে কাজ করার ফলে বহু বিষয়ে এক প্রক্রিয়ার মাঝে থেকে কাজ করার নিয়ম অনুসরণ করা হয়েছিল। এখন ব্রিটেন ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলে সে বিষয়গুলো কোন নিয়মকানুন অনুসরণ করে চলবে, পণ্য চলাচলে কাস্টম ইত্যাদি কীভাবে, কোন পদ্ধতিতে নিরূপণ করা হবে সেসব বিষয়ে উভয়ের মাঝে একটা চুক্তি থাকা প্রয়োজন বলে উভয়পক্ষ গত দু’বছর চিন্তাভাবনা করে চুক্তির একটি খসড়া তৈরি করেছিল। এ খসড়া চুক্তিটি প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে ব্রিটিশ পার্লামেন্টে পেশ করেছিলেন পাস করিয়ে নেওয়ার জন্য। কিন্তু চুক্তিটি ব্রিটিশ পার্লামেন্ট পাস করেনি। একবার নয়, তিনবার পাসে ব্যর্থ হয়েছে।

ইউরোপীয় ইউনিয়ন বলেছে, খসড়া চুক্তিটির ব্যাপক কোনও রদবদল তারা মানবেন না। ইউনিয়নের বাকি ২৭ সদস্য এখন ব্রেক্সিটের অরিজিনাল সময় ২৯ মার্চকে স্থগিত করে ১২ এপ্রিলের মধ্যে তালাকনামাটি চূড়ান্ত করতে বলেছে, নয়তো নতুন পরিকল্পনা নিয়ে আসতে বলেছে। অবশ্য, থেরেসা মে মঙ্গলবার বলেছেন, ব্রিটেন ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে প্রস্থানের ব্যাপারে আরও বিলম্বিত করার চেষ্টা করবে এবং ব্রেক্সিট সংঘাত ভেঙে দেওয়ার জন্য রাজনৈতিক বিরোধীদের সঙ্গে একমত হতে চান তিনি।

থেরেসা মে চুক্তিটি নিয়ে কঠিন এক সংকটের সম্মুখীন হয়েছেন। তার নিজ দলের ৩৪ এমপি প্রকাশ্যে বিদ্রোহ করেছেন। সুতরাং চুক্তিটি পাস করানো কোনোভাবেই সম্ভব হচ্ছে না। পার্লামেন্টের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্য চুক্তির বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছেন। এমন পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রী সাধারণত পদত্যাগ করে থাকেন। কিন্তু রক্ষণশীল দলের সদস্যরা আবার তাকে আস্থা ভোটে জিতিয়ে দিয়েছেন। রক্ষণশীল দলে মরিয়া হয়ে রবিস জনসন, ডেভিড দাভিস, অ্যাম্বার রাড, ডমিনিক রাব, জেরিন হান্ট, সাজিদ জাভেদ, মাইকেল গোভ ও ম্যাট হ্যানকক প্রধানমন্ত্রীর প্রার্থী। অনেক বিশ্লেষক বলছেন, প্রধানমন্ত্রীর প্রার্থী বেশি থাকায় থেরসা মে আস্থা ভোটে জিতেছেন।

মার্গারেট থ্যাচারের পর দ্বিতীয় নারী হিসেবে যুক্তরাজ্যের সরকারপ্রধানের দায়িত্ব পালন করছেন থেরেসা মে। ২০১৬ সালের জুলাই মাসে ডাউনিং স্ট্রিটে পা রেখেছেন। সে থেকে অদ্যাবধি তিনি কোনও উল্লেখযোগ্য সফলতা দেখাতে পারেননি। পার্লামেন্টের অন্যান্য সদস্য থেকে প্রধানমন্ত্রীর কিছু অধিক গুণাবলি থাকে যে কারণে তাকে নেতা নির্বাচিত করা হয়, কিন্তু থেরেসা মে’র কাছে এমন কোনও গুণাবলি লক্ষ করা যায়নি।

জেরেমি করবিন হচ্ছেন বিরোধী লেবার পার্টির নেতা। সরকারি দল ইইউ’র সঙ্গে পরামর্শ করে চুক্তির যে খসড়া তৈরি করেছে এমন একটি চুক্তির খসড়া লেবার পার্টির পক্ষ থেকে করবিনও পেশ করেছেন। তিনিও তার খসড়া নিয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়ন নেতাদের সঙ্গে কথাবার্তা বলেছেন।

উচিত ছিল করবিন এবং থেরেসা মে’র চুক্তি পার্লামেন্টে যথাযথ আলোচনা করে প্রয়োজনীয় সংশোধনীর পর পাস করে দেওয়া। কিন্তু তা না করে দীর্ঘদিনব্যাপী বিষয়টাকে ঝুলিয়ে রাখা জাতীয় স্বার্থের অনুকূলে হচ্ছে বলে মনে হয় না। সর্বসম্মত একটা চুক্তি তৈরি করতে পার্লামেন্ট এক অভূতপূর্ব সিদ্ধান্ত গত ২৫ মার্চ নিয়েছিল। তারা ব্রেক্সিট বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে এক দিনের জন্য সরকারের কাছ থেকে এ সংক্রান্ত পার্লামেন্টারি সব কার্যক্রম কেড়ে নিয়েছিল। তাতেও পার্লামেন্ট কোনও ফলপ্রসূ সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারেনি।

এখন সাধারণ মানুষও বেক্সিটের পক্ষে-বিপক্ষে সোচ্চার হয়েছে। প্রত্যেক দিন ওয়েস্টমিনস্টার হাউসের সম্মুখে বিক্ষোভ হচ্ছে। অনেক লোক পুনরায় গণভোট দাবি করছে। এমনকি গণভোটের পক্ষে দশ লাখ লোকের মিছিলও হয়েছে। ব্রেক্সিটের পক্ষে লোকেরাও সোচ্চার রয়েছে। তাদের কথা হচ্ছে ত্যাগ ত্যাগই। ত্যাগ সম্পর্কে ২০১৬ সালে গণভোটে যে সিদ্ধান্ত হয়েছে তা কার্যকর করতে হবে। আবার যারা ইউনিয়ন ত্যাগ সম্পর্কে পুনরায় গণভোট চাচ্ছেন তারা বলছেন, ২০১৬ সালে নেতারা সাধারণ মানুষকে ভুল বুঝিয়ে ছিলেন। পুনরায় গণভোট হলে সম্ভবত ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে থাকার পক্ষেই জনসাধারণ রায় দেবে।

সব মিলিয়ে লন্ডনজুড়ে এখন চলছে চূড়ান্ত পাগলামি। একটি দেশ যা অর্থনৈতিক আত্মহত্যা করার জন্য দৃঢ়প্রতিজ্ঞ, কিন্তু নিজেকে হত্যা করার ব্যাপারেও একমত হতে পারছে না। যেন রাজনৈতিক নেতৃত্বের এক মহাকাব্যিক ব্যর্থতা।

২০১৬ সালে গণভোটের সময় প্রধানমন্ত্রী ক্যামেরন আর বিরোধী নেতা করবিন উভয়ে ইউনিয়নের সঙ্গে থাকার পক্ষে ছিলেন। তারা সভা-সমাবেশে থাকার পক্ষে তাদের বক্তব্যও পেশ করেছিলেন। কিন্তু জনসাধারণ তাদের কথায় সায় দেয়নি। ইতিহাস পর্যালোচনা করলে মনে হয় ২০১৬ সালের রায়ই সঠিক ছিল। কারণ ব্রিটেন ইউরোপীয় রাষ্ট্র হলেও সে কখনও মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে ব্যাপক কোনও কর্মকাণ্ডে শরিক ছিল না। বরং অনেকের সঙ্গে ব্যাপক যুদ্ধ-বিগ্রহে লিপ্ত ছিল, বিশেষ করে ফরাসিদের সঙ্গে।

প্রথম শিল্পবিপ্লব হয়েছিল ব্রিটেনে। ফরাসি সম্রাট নেপোলিয়ন মহাদেশীয় অবরোধ স্থাপন করেছিলেন ব্রিটিশের বিরুদ্ধে যেন ব্রিটেনের কোনও মালামাল বৈধপথে ইউরোপের মূল ভূখণ্ডে প্রবেশ না করে। ব্রিটেনের মালামাল ছিল সুন্দর, টেকসই ও আরামদায়ক। যে কারণে রাশিয়া আক্রমণের সময় ফরাসি সৈন্যরা সম্রাটের কাছে ব্রিটেনের বুটের আবদার পেশ করেছিল। সম্রাট নেপোলিয়ন চোরাপথে ব্রিটিশ থেকে তার সৈন্যবাহিনীর জন্য হাজার হাজার জোড়া বুট আনার ব্যবস্থা করেছিলেন।

মনমানসিকতার দিক থেকে মূল ভূখণ্ডের মানুষের সঙ্গে ব্রিটেনের মানুষের ঐক্য কম। বরং ব্রিটেনের মানুষের সঙ্গে তার উপনিবেশের মানুষের ঐক্য অধিক। ইউরোপীয় ইউনিয়ন যখন তাদের নিজস্ব মুদ্রা ইউরো চালু করে তখন ব্রিটেন ইউনিয়নের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে তারা তাদের নিজস্ব মুদ্রা চালু রেখেছিল। একটা সার্বভৌম দেশের নিজস্ব মুদ্রা না থাকাকে ব্রিটেনের মানুষ অপমান বলে মনে করত। ব্রিটেন দীর্ঘ চারশত বছর বিশ্বের এক-চতুর্থাংশ এলাকার শাসন করেছে, ইউরোপের আর কোনও জাতির সে সৌভাগ্য হয়নি। যে কারণে মূল ভূখণ্ডের মানুষের সঙ্গে ব্রিটেনের মানুষের বহু বিষয়ে স্বতন্ত্রতা রয়েছে।

ইউরোপের প্রতিটি জাতি আধুনিক শিল্প-কারখানার তালিম পেয়েছে ব্রিটিশের হাতে। বলতে গেলে যুক্তরাজ্য বিশ্বের পঞ্চম বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ, যারা উচ্চতর আধুনিক সংসদীয় গণতন্ত্র, আধুনিক ব্যাংকিং, শিল্পবিপ্লব এবং বিশ্বায়নের সমগ্র ধারণা তৈরি করেছে। অথচ তারা এখন ইউরোপীয় ইউনিয়ন ত্যাগের কোনও বিকল্প চুক্তির রূপরেখাও দিতে পারছে না। এতে মাদার পার্লামেন্টের দেউলিয়াত্ব প্রকাশ পেয়েছে। অথচ এ পার্লামেন্ট বিশ্বকে শত শত বছরব্যাপী গণতন্ত্রের ছবক দিয়েছে।

আবার এ বিষয়টাও প্রতিষ্ঠিত হলো যে পার্লামেন্টে শক্তিশালী নেতৃত্ব অনুপস্থিত, বিশেষ করে ক্ষমতাসীন রক্ষণশীল দলে। লেবার পার্টির নেতা করবিন তো গরিব মানুষের নেতা, মার্ক্সবাদে দিক্ষীত। তিনি সাতবার পার্লামেন্টে নির্বাচিত নেতা। লেবার পার্টির কোনও প্রধানমন্ত্রী তাকে কখনও মন্ত্রী করেননি। এমনকি কখনও ছায়া মন্ত্রিসভার মন্ত্রীও ছিলেন না তিনি। কারণ তিনি সম্পদ পুঞ্জীভূত করে মানুষের কষ্ট বাড়ানোর বিরুদ্ধের নেতা। লেবার পার্টি প্রতিষ্ঠালগ্নের নীতিই ধারণ করেন তিনি। টনি ব্লেয়ারের মতো খোলস বদলানো নেতা নন করবিন।

এখন রাজনীতিবিদরা যদি একে অপরের সঙ্গে মিলে, বাস্তবতাকে ব্রেক্সিট নিয়ে সিদ্ধান্তে আসতে না পারেন তাহলে গুরুতর রাজনৈতিক এবং ভয়ঙ্কর অর্থনৈতিক সমস্যার মুখে পড়তে পারে ব্রিটেন।

লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলাম লেখক

bakhtiaruddinchowdhury@gmail.com

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ