আগুন আর কতটুকু পোড়ে?

Send
আহসান কবির
প্রকাশিত : ১৬:২৭, এপ্রিল ০৪, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:৩৫, এপ্রিল ০৪, ২০১৯

আহসান কবিরদাবানলে পাখিরাও পুড়ে যায়!                                         
পুড়ে যায় ধাবমান মায়াবী হরিণ।                                         
নিয়মিত বিরতিতে আততায়ী হয়ে আসে আগুনের দিন।                             
চোখ পুড়লে কী মানুষ চেনা যায়?
যতোটুকু পুড়ে গেলে মুখ চেনা যায়                                          
ততোটুকু আগুনে পুড়ে আমি মরে যেতে চাই!
কয়লা হয়ে নয় বুক ভর্তি আগুন নিয়ে আমি মা’র কাছে যাব!

যে সভ্যতার শুরুতে আগুন আলো হয়ে এসেছিল সেই আগুনে পুড়ে খাঁটি হয়ে কি আমাদের মরে যেতে হবে? মরে যাওয়ার আগে কি মা’র কাছে মোবাইল করে বলতে হবে, ‘মা তুমি কি কিছু করতে পারবা মা? আমি শ্বাস নিতে পারছি না। মা খুব কষ্ট হচ্ছে মা…’ বনানীর ফারুক রূপায়ণ টাওয়ারের অগ্নিকাণ্ডে (২৮ মার্চ,২০১৯) নিহত রংপুরের মোস্তাফিজুর মরে যাওয়ার আগে তার মা’র সঙ্গে এমন করে কথা বলছিলেন। আজীবন এই মা তার ছেলের সাথে শেষ সংলাপ ভুলতে পারবেন না। জানি না আগুনে পুড়ে না ফেরার দেশে চলে গেলে তাকে কেউ চিনতে পারে কি না।

বাবা,ভাই আর বন্ধুরা মিলে খুঁজছিলেন আবদুল্লাহ আল ফারুককে। এফ আর টাওয়ারের নয়তলার একটা অফিসে চাকরি করতেন তিনি। স্ত্রী মুন্নীকে মোবাইলে রিং দিয়ে বলেছিলেন, ‘দোয়া কর। আমি যেন বেঁচে আসতে পারি।’ সব প্রার্থনা বিধাতা সম্ভবত কবুল করলেন না। বাবা,স্ত্রী,ভাই আর বন্ধুদের প্রার্থনায় চোখের জল হয়ে আসে,ফারুক আর এফ আর টাওয়ার থেকে বেরিয়ে আসতে পারেন না। তার ছবি ভেসে বেড়ায় যোগাযোগ মাধ্যমে। সবশেষে জানা যায় ফারুকের দেহের নব্বই ভাগ পুড়ে গেছে,কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে তার মৃতদেহ আছে। জানি না তার বাবা মকবুল হোসেন সন্তানের মুখটা দেখেছেন কি না!

মিথির মুখটা তার বাবা কিংবা স্বামী হৃদয় থেকে নামাতে পারবেন না। বগুড়ার মেয়ে তানজিলা মৌলি মিথি ভার্সিটির পড়ালেখা শেষ করে চাকরিতে যোগ দিয়েছিলেন। ফারুক রূপায়ণ টাওয়ারে আগুনবন্দি হয়ে মিথিও টেলিফোন দিয়েছিলেন বাবাকে,স্বামীকে। মিথির বাবা কিংবা স্বামী মিথির আর্তনাদ শুনেছেন, কিছু করতে পারেননি। যে বাবা মিথিকে একদিন স্কুলে নিয়ে গিয়েছিলেন কিংবা সাজিয়ে গুজিয়ে চোখের জলে মিথিকে তুলে দিয়েছিলেন স্বামীর হাতে,সেই বাবা তাকে কবরে শুইয়ে দেবেন। জানি না পুড়ে যাওয়ার পর মিথিকে তিনি এক নজর দেখেছেন কি না।

মোস্তাফিজ, ফারুক কিংবা মিথির মতো ফারুক রূপায়ণ টাওয়ারের মানুষখেকো আগুনের পেটে যাওয়া ২৬ জনের গল্প এমনই। হয়তো এই সংখ্যা বাড়বে। এমন ৮১টা গল্প ছিল পুরান ঢাকার চকবাজারের চুড়িহাট্টা অগ্নিকাণ্ডের (২১ ফেব্রুয়ারি,২০১৯) ঘটনায়। দীর্ঘশ্বাস আর দেহ পোড়ার এই গল্প আসলে সব হারানোর গল্প। সব হারানোর এসব গল্পে মাতম,কান্না কিংবা বিলাপ সবকিছু চলে যায় আগুনের পেটে। মানুষ পুড়ে অঙ্গার হয় এসব গল্পে। অঙ্গার হলে মানুষ কবরে যায় না,কবরে যায় কয়লার কঙ্কাল।

চকবাজারের চুড়িহাট্টার ওয়াহেদ ম্যানসনের সামনের জায়গাটা ছিল গল্পের জায়গা। মুক্ত নিঃশ্বাস নেওয়ার জায়গা। চা খাওয়া আর আড্ডার জায়গা। আগুনের নদী চুড়িহাট্টাকে মৃত নগরী বানিয়েছে। গল্প আর স্মৃতি ছাড়া কিছু নেই আর। যে মানুষ পুড়ে যায় তার কিছু গল্প জমে থাকে নিকটজনের কাছে। জীবনের পরাজয় জমে থাকে গল্পে। নাসিরুদ্দিন তার মেয়েকে হারিয়েছিলেন ক্যানসারে। চুড়িহাট্টার আগুন কেড়ে নেয় তার ছেলেকে। যে চার বন্ধু প্রতিদিন আড্ডা দিতেন, চা বিস্কিট খেতেন সেই আড্ডাতেই তারা পুড়ে মরেছিলেন।একুশের অনুষ্ঠানে কবিতা আবৃত্তি করে ফিরছিলেন দুই বান্ধবী দোলা আর বর্ষা। তারা আর ফেরেননি। আগুন কবিতার মতো এই দুজন মানুষকেও পুড়িয়ে মেরেছিল। আগুন কবিতা জানে না পোড়াতেই জানে। কিন্তু আগুন যতটা পোড়ে তার চেয়ে নাকি বহুগুণ বেশি পোড়ে মানুষ। দোলা আর বর্ষা হেলাল হাফিজের মানবানল কবিতাটা কী পরেছিল কখনও?

মানুষের মতো আর অত নয় আগুনের সোনালি সন্ত্রাস

আগুনে পোড়ালে তবু কিছু রাখে

কিছু থাকে

হোক না তা শ্যামল রঙ ছাই

মানুষে পোড়ালে আর কিছুই রাখে না

কিচ্ছু থাকে না...

আগুনের গল্পে মানুষগুলোর কিছু এখন আর নেই। এই আগুন কি মানুষের সৃষ্ট আগুন নয়? লোভে পড়া মানুষগুলোর লোভাতুর জিহবা কি ওই আগুনের শিখা নয়? কেন ১৮তলা ভবন ২৩তলা হবে? কেন নকশার সবটা মেনে ভবন নির্মিত হবে না? কেন এইসব উঁচুতল ভবনে ফায়ার এক্সিট থাকবে না? থাকলেও কেন সেটা খুবই অপরিসর কিংবা বন্ধ করা থাকবে? আগুন নির্বাপণের যন্ত্রপাতি কেন কাজ করবে না? ভবনটা বাসযোগ্য করে গড়ে না তুলে বর্গফুট হিসেবে ভাড়া দেওয়াটাই কি আসল? মালিক ছাড়া আর সবার জীবন কি এমন আগুন হাতছানির?

চুড়িহাট্টার ওয়াহেদ ম্যানসনের মালিক ওয়াহেদ সাহেব আগেই মারা গিয়েছেন। তার দুই ছেলে হাসান ও সোহেল এই ভবনের মালিক। চুড়িহাট্টার আগুনে এই দুই ভাইয়ের পরিবারের কেউ মারা যায়নি। পালিয়ে থেকেই তারা জামিন নেন হাইকোর্ট থেকে। এই দুই মালিক পার্ল ট্রেডিং ইন্টারন্যাশনালের কাছে কেমিক্যাল গোডাউন ভাড়া দিয়েছিলেন। তিনটি তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী এই গোডাউন থেকেই আগুনের সূত্রপাত হয়েছিল,আগুনে পুড়ে মারা গিয়েছিলেন ৮১ জন। সাধারণ ভাড়াটেদের কাছে বাসা ভাড়া দেওয়ার চেয়ে কেমিক্যাল গোডাউনের জন্য ভাড়া দেওয়াই ভালো। টাকা পাওয়া যাবে বেশি। টাকাই সব। আগুন লেগে সাধারণ মানুষ মারা গেলেও মালিকদের বাঁচাবে এই টাকাই!

ওয়াহেদ ম্যানসনের দুই মালিক হাসান ও সোহেলের কাছ থেকে গোডাউন ভাড়া নিয়েছিলেন পার্ল ট্রেডিংয়ের মালিকরা। হাতিরপুলে এদের মূল অফিস। পার্লের নির্বাহী পরিচালক মো.কাশিফ। এ ছাড়া দুজন পরিচালকও রয়েছেন যাদের নাম ইমতিয়াজ আহমেদ ও মুজাম্মেল ইকবাল। আগুনের ঘটনার পর তারা লাপাত্তা। সম্ভবত আজও তারা জিজ্ঞাসাবাদ কিংবা গ্রেফতারের মুখোমুখি হননি। শতকোটি টাকার ব্যবসা রয়েছে তাদের। পারফিউম বা সুগন্ধির ব্যবসা করে পার্ল ট্রেডিং। দেশে তৈরি ভেজাল পারফিউম বিদেশি ব্র্যান্ডের নামে বাজারজাত করার অভিযোগ ছিল পার্লের বিরুদ্ধে। ভবিষ্যতে হয়তো আগুনে পোড়া গন্ধকে আড়াল করে দিতে পারে পার্লের সুগন্ধির ঘ্রাণ!

ফারুক রূপায়ণ টাওয়ারের জমির মালিক এইচ এস আই ফারুক এবং বিএনপি নেতা তাসভিরুল হক গ্রেফতার হয়েছেন। ১৯৯৬ সালে অনুমোদন পাওয়া ১৮তলা ভবনকে এই দুইজন ২৩তলায় উন্নীত করেন। ২০০১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর ভবনের নকশা পরিবর্তন করে রাজউকে জমা দেওয়া হয়। রাজউক কোনও ব্যবস্থা নিয়েছে কি না জানা যায়নি। নকশা পরিবর্তন করে ভবন করলে তার শাস্তি কী? নাকি রাজউকের শাস্তি দেওয়ার এখতিয়ার নেই? তাজরীন ফ্যাশনসের অগ্নিকাণ্ড থেকে শুরু করে অন্যান্য অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় কয়জনের শাস্তি হয়েছে? টাকার জোরে কি এই গ্রেফতারকৃতরাও বেরিয়ে এসে দিব্যি সুখে বসবাস করবেন?

আর এই ঢাকা শহরের ভবন মালিকদের অগ্নি প্রতিরোধের সচেতনতা কেমন? গত দশ বছরে দশ হাজারের চেয়ে বেশি বাড়ি হয়েছে ঢাকা শহরে। কিন্তু নিরাপত্তা ব্যবহার (বসবাসের জন্য) সনদ নিয়েছেন মাত্র ১৬২ জন মালিক!

বলা হয়ে থাকে রোম যখন পুড়ছিল নীরো তখন বাঁশি বাজাচ্ছিলেন। এদেশের সব আগুনের ঘটনায় রাষ্ট্রযন্ত্র রাস্তায় নামে দেরিতে আর মানুষ মরে যাওয়ার পর সবাই মিলে বলে, ‘ওরা নিয়ম মানেনি’। আগুন নিয়ে গ্রিক মিথটা অন্যরকম। মানুষ ভালোবাসে এমন এক বিপ্লবী টাইটান দেবতার নাম প্রমিথিউস। মৌরি গাছের ডালে করে স্বর্গ থেকে আগুন এনে উনি মানুষকে বিলিয়েছিলেন। মানুষের খুব বেশি আগুন দরকার ছিল তখন। অন্ধকারে অনেক রোগ শোক মানুষকে ঘিরে ধরেছিল। ব্যাপারটা টের পেয়ে যায় দেবতাদের রাজা জিউস। তিনি প্রমিথিউসকে ককাশস পাহাড়ের চূড়ায় বন্দি করে রাখেন। তাতেও মন শান্ত হয় না জিউসের। নতুন শাস্তি জারি হয়। প্রতিদিন এক ক্ষুধার্ত ঈগল এসে খেয়ে যেত প্রমিথিউসের হৃদয় (কারো কারো মতে যকৃৎ!)তবে রাতভর নতুন হৃদয় জন্ম নিত। কিন্তু পরদিন আবারও সেই ক্ষুধার্ত ঈগল প্রমিথিউসের হৃদয় খুঁড়ে খুঁড়ে খেত। (জানি না এই ঘটনা থেকেই জীবনানন্দ লিখেছিলেন কি না-কে হায় হৃদয় খুঁড়ে বেদনা জাগাতে ভালোবাসে!) বহু বছর পরে হারকিউলিস প্রমিথিউসকে উদ্ধার করেন।

বাংলাদেশে সব পুড়ে যাওয়া মানুষের গল্পই যেন প্রমিথিউসের গল্প। আগুন মানুষের হৃদয়টা পুড়িয়ে খায়। এদেশে কোনও হারকিউলিসের সন্ধান মেলে না যে এসে আগুন নেভাবে আর সাধারণ মানুষরূপী প্রমিথিউসকে উদ্ধার করবে। রবীন্দ্রনাথের ‘সামান্য ক্ষতি’ কবিতার সেই রাজাকে যদি পেতাম তাহলে নিয়ে আসতাম বাংলাদেশে। কবিতা অনুসারে-মাঘ মাসের শীতে স্বচ্ছ সলিলা বরুনা নদীর তীরে গিয়েছিলেন রাজার মহিষী করুনা। সইদের নিয়ে স্নান শেষে তার শীত লাগছিল। এরপর নদীর পাশের গরিব প্রজাদের ঘর জ্বালিয়ে তিনি আগুন পোহালেন। রাজা এই ঘটনা জানার পর মহিষীর উত্তর ছিল এত সামান্য ক্ষতি!গরিব প্রজাদের কুটিরের দাম আর কত? রাজা উচিত শাস্তি দিয়েছিলেন মহিষীকে। ভিখারির পোশাক পরিয়ে তাকে রাস্তায় নামিয়ে দেওয়া হয়েছিল। যতদিন মহিষী গরিবদের পুড়ে যাওয়া কুটির তৈরি করে দিতে না পারবেন ততদিন তাকে ভিখারিই থাকতে হবে!

মানুষের অবহেলা আর লোভের কারণে যে আগুন সেই ‘আগুন মালিক’দের ভিখারি হওয়ার শাস্তি দিতে পারেন যে রাজা,এদেশের মানুষ যেন সেই রাজার অপেক্ষাতেই বসে আছে!

লেখক: রম্যলেখক

 

 

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ