নুরের সত্যিকারের বন্ধু ছাত্রলীগ!

Send
প্রভাষ আমিন
প্রকাশিত : ১৫:৩৯, এপ্রিল ০৫, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:৪৭, এপ্রিল ০৫, ২০১৯

 

প্রভাষ আমিনডাকসু ভিপি নুরুল হক নুরকে নিন্দুকেরা শিবিরকর্মী প্রমাণের অনেক চেষ্টা করেছেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত প্রমাণিত হয়েছে, তিনি শিবির নন, ছাত্রলীগেরই শিবিরকর্মী। তিনি মুহসীন হল শাখা ছাত্রলীগের কমিটিতেও ছিলেন। পরে ছাত্রলীগের নানা অপকর্মে বিরক্ত হয়ে সংগঠন ত্যাগ করেন। নুরুল হক দাবি করেছেন, তিনি ক্লাস সিক্স থেকেই ছাত্রলীগের রাজনীতির সাথে জড়িত। এখনও তিনি বঙ্গবন্ধুকে হৃদয়ে ধারণ করেন। ডাকসু নির্বাচনের পর গণভবনে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মধ্যে মায়ের প্রতিচ্ছবি খুঁজে পেয়েছিলেন নুর এবং অনুমতি নিয়ে প্রধানমন্ত্রীকে সালাম করেছেন। ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগের নানা কাজের সমালোচনা করলেও নুর বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ছেড়ে যাননি। তবে নুরুল হক নুর ছাত্রলীগ ছাড়লেও ছাত্রলীগ তাকে ছাড়েনি বলেই মনে হচ্ছে। বরং দেখেশুনে মনে হচ্ছে, ছাত্রলীগ নুরুল হক নুরের সবচেয়ে বড় শুভাকাঙ্ক্ষী ও বন্ধু। একজন সাধারণ ছাত্র থেকে নুরের ডাকসুর ভিপি বনে যাওয়ার রাস্তাটা তৈরি করতে ছাত্রলীগের বিশাল অবদান। বারবার আক্রমণ করে ছাত্রলীগই তাকে নির্যাতিত ছাত্রনেতা বানিয়েছে।

বরিশাল থেকে আসা নুরুল হক নুরের মধ্যে এখনও গ্রামের মাটির গন্ধ রয়ে গেছে। শহুরে স্মার্টনেস এখনও রপ্ত করতে পারেননি। বরং তার কিছু ভুল উচ্চারণ, ‘আনস্মার্টনেস’ নিয়ে অনেকে হাসাহাসি করে। কিন্তু এসবকে পাত্তা না দিয়ে নুরুল হক তার কাজ করে গেছেন, সবাইকে টেক্কা দিয়ে, কোনও প্রথাগত রাজনৈতিক দল বা ছাত্র সংগঠনের আশীর্বাদ ছাড়াই তিনি ডাকসুর ভিপি বনে গেছেন। গেঁয়ো, আনস্মার্ট হলেও সাধারণ শিক্ষার্থীদের হৃদয় জয় করতে অসুবিধা হয়নি তার। ব্যক্তিগতভাবে আমি কোটা সংস্কার আন্দোলনের বিপক্ষে হলেও ইস্যুটি খুব জনপ্রিয়। সেই জনপ্রিয় ইস্যুকে সিঁড়ি হিসেবে ব্যবহার করে নুরও পৌঁছে যান জনপ্রিয়তার শীর্ষে। এই যাত্রায় তাকে সবচেয়ে বেশি সহায়তা করেছে তার সাবেক সংগঠন ছাত্রলীগ। যত তারা গায়ের জোরে ক্যাম্পাস থেকে কোটা আন্দোলনকারীদের মূলোৎপাটন করতে চেয়েছে, ততই তার শেকড় আরো বিস্তৃত হয়েছে। ছাত্রলীগ নুরের ওপর যত হামলা করেছে, তত তার জনপ্রিয়তার পারদ ঊর্ধ্বে উঠেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় লাইব্রেরির সামনে ছাত্রলীগের হামলা থেকে বাঁচতে এক শিক্ষকের পা জড়িয়ে রাখা নুরের ছবি তো রীতিমতো ইতিহাস হয়ে গেছে। কোটা আন্দোলনের সময় তো মামলা-হামলা সয়েছেনই, ডাকসু নির্বাচনেও আবার হামলার শিকার হয়েছেন। ডাকসু নির্বাচনের দিন দুপুরে রোকেয়া হলের সামনে ছাত্রলীগের নারী কর্মীদের হালকা ধাক্কায় অজ্ঞান হয়ে যান নুর। অনেকে এটাকে নাটক বললেও, এই হামলায় নিমেষেই সহানুভূতির পাল্লা ঝুঁকে যায় তার দিকে। ভিপি নির্বাচিত হওয়ার পরদিন টিএসসিতে এসে আবার ছাত্রলীগের হামলার শিকার হন নুর। শারীরিক হামলার পাশাপাশি তার বিরুদ্ধে চলে ব্যাপক অপপ্রচার। তাকে শিবির বানানোর নানা চেষ্টা হয়েছে। আসলে নুরের মতো কাউকে ভিপি হিসেবে মেনে নিতে পারছিলেন না ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। কিন্তু ছাত্রলীগ সভাপতি এবং নুরের কাছে পরাজিত ভিপি প্রার্থী শোভন তাকে অভিনন্দন জানিয়ে বুকে জড়িয়ে ধরলে ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা তাকে বাহ্যত মেনে নিতে বাধ্য হয়।

আসলে ছাত্রলীগ যত ঠেকাতে চেয়েছে, নুর তত এগিয়েছেন। সর্বশেষ গত মঙ্গলবার এক ছাত্রের ওপর ছাত্রলীগের হামলার প্রতিবাদ করতে এসএম হলে গিয়েছিলেন নুরুল হক নুর। সেখানে ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা তাকে অবরুদ্ধ করে রাখে, লাঞ্ছিত করে ও ডিম ছুড়ে মারে। পরে সেখান থেকে তিনি হামলাকারীদের বিচারের দাবিতে ভিসির বাসভবনের সামনে অবস্থান নেন। রাতভর সেখানে অবস্থানের পর বুধবার ভিসির আশ্বাসে সোমবার পর্যন্ত বিক্ষোভ স্থগিত রাখেন। এসএম হলে ডিম হামলার শিকার হয়ে, ভিসির বাসায় ডিম-পরোটা নাশতা খেয়ে বাড়ি ফিরেছেন নুরুল হক নুর।

তবে ডাকসুর এজিএস ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক সাদ্দাম হোসেন এসএম হলে নুর ও তার সাথে থাকা ছাত্রছাত্রীদের ওপর হামলার অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, ‘এগুলো আকাশ-কুসুম অভিযোগ। হামলার প্রশ্নই আসে না। হামলার নাটক সাজিয়ে ছাত্রলীগের চরিত্রহননের চেষ্টা করা হচ্ছে।’ এর আগে নির্বাচনের দিন রোকেয়া হলের সামনে নুরের অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার ঘটনাকেও ছাত্রলীগ নাটক বলেছিল। এখন সাদ্দামের কাছে আমার প্রশ্ন, আপনারা যদি জানেনই নুরুল হক নুরের মধ্যে নাটক করার একটা প্রবণতা আছে, তাহলে তাকে আপনারা সে সুযোগ দেন কেন? নুর যদি প্রভোস্টের কাছে ফরিদ হাসানের ওপর হামলার বিচার চেয়ে সঙ্গী-সাথীদের নিয়ে চলে আসতেন, তাহলে কী হতো? কিছুই হতো না। আর সেই কিছু না হওয়ার সম্ভাবনাকে বিশাল ইস্যু বানিয়ে দিয়েছে ছাত্রলীগ। নুর যদি সত্যি নাটকই করে থাকেন, তবে সেই নাটকের মঞ্চ প্রস্তুত করে দেওয়ার কৃতিত্ব অবশ্যই ছাত্রলীগের। নুর সম্পর্কে সাদ্দাম বলেছেন, ‘জনপ্রিয়তা কাড়ার একটা প্রবণতা তার আছে। এ বিষয়টি রপ্ত করেই তিনি ডাকসু ভিপি নির্বাচিত হয়েছেন।' ভালো কথা। রাজনীতি করলে, নির্বাচন করলে; জনপ্রিয়তা কাড়তে আপনি চাইবেনই। একেকজন একেক স্টাইলে চাইবেন, নুর চাইছেন তার মতো করে। এতে তো দোষের কিছু দেখি না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনও শিক্ষার্থী কোথাও হামলার শিকার হলে ডাকসুর ভিপি হিসেবে নুরের দায়িত্ব সেখানে ছুটে যাওয়া, তাকে সাহস দেওয়া, হামলাকারীদের বিচার চাওয়া। তিনি না গেলে বা দেরি করে গেলে বরং আমরা সমালোচনা করতাম। ভিপি হিসেবে তিনি ঠিক কাজটিই করেছেন। দলবল নিয়ে যদি তিনি কোনও নিয়মের ব্যত্যয় ঘটিয়ে থাকেন বা শৃঙ্খলাবিরোধী কিছু করে থাকেন, ছাত্রলীগ সেটা দেখবে কেন? তারা তো হল কর্তৃপক্ষও নয়, প্রক্টরিয়াল টিমের সদস্যও নয়। তারপরও তারা ভিসি বা প্রক্টরের কাছে অভিযোগ জানাতে পারত। সেক্ষেত্রে নুর হতেন শৃঙ্খলা ভঙ্গকারী আর ছাত্রলীগ হতে পারত শৃঙ্খলা রক্ষাকারী। কিন্তু আইন হাতে তুলে নিয়ে পাশার দান উল্টে দিয়েছে ছাত্রলীগই। নুরুল হক নুর খুব কৌশলে নিজেকে নির্যাতিত আর ছাত্রলীগকে হামলাকারী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছেন। সাদ্দাম যতই হামলার অভিযোগ অস্বীকার করুন, এ ধারণা পাল্টানো সহজ হবে না।

সাদ্দাম হামলার কথা অস্বীকার করলেও ডিম ছুড়ে মারার কথা স্বীকার করেছেন, এর নিন্দা করেছেন, তবে তিনি মনে করেন, ডিম ছুড়ে মারা প্রতিবাদের একটি ভাষা। সাদ্দাম ঠিক বলেছেন। বিশ্বজুড়ে ডিম ছুড়ে মারা অবশ্যই একটি প্রতিবাদের ভাষা। কিন্তু সেটি প্রয়োগ করতে হবে স্থান-কাল-পাত্র ভেদে। ডিমথেরাপির ভুল প্রয়োগে হিতে-বিপরীত হতে পারে। ক্রাইস্টচার্চে হামলাকারীর পক্ষ নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্য করেছিলেন অস্ট্রেলিয়ার সিনেটর ফ্রেজার অ্যানিং। তাৎক্ষণিকভাবে তার মাথায় ডিম ভাঙে উইল কনোলি। অস্ট্রেলিয়ায় কারো মাথায় ডিম ভাঙলে আপনি হিরো বনে যাবেন। আর বাংলাদেশে যিনি হামলার শিকার তিনিই নায়ক। রাতভর গায়ে লেপ্টে থাকা ডিম নিয়েই নুর ভিসির বাসার সামনে ছিলেন।

এখন বলুন নুরুল হক নুরকে নায়ক বানানো, জনপ্রিয় করার মূল কৃতিত্ব কার? অবশ্যই তার সাবেক সংগঠন ছাত্রলীগের।

ছাত্রলীগের হাতে মার খেতে খেতে নুর ডাকসু ভিপি হলেন। ছাত্রলীগ মনে হয় তাকে আরও কিছু বানাতে চায়। নইলে ডাকসুর নির্বাচিত ভিপির গায়ে ডিম ছুড়ে মারা, হামলা করার ঘটনা ছাত্রলীগ ঘটিয়েই যাচ্ছে কেন?

লেখক: হেড অব নিউজ, এটিএন নিউজ

 

/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ