অভিযান চক্র

Send
তুষার আবদুল্লাহ
প্রকাশিত : ১৪:৩৮, এপ্রিল ০৬, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৪:৩৯, এপ্রিল ০৬, ২০১৯

তুষার আবদুল্লাহবাংলাদেশ এখন অভিযান ঘূর্ণিতে হাবুডুবু খাচ্ছে। দশদিকে অভিযান। রেস্তোরাঁ-দোকানের অভিযান টপকে এখন ইমারতে অভিযান উঠে গেছে শীর্ষে। রাজধানীসহ সারাদেশে এত উঁচু দালান উঠে গেল সুপারি গাছের মতো, বাগানের মালিরা টেরই পেলেন না। এখন যখন ভূমি কাঁপলে বা আগুনে বিপর্যয় নেমে আসে, তখন তারা ফুঁসে ওঠে বলেন-সব অবৈধ। কোনও ইমারতই নিয়ম মেনে তোলা হয়নি। কথা ছিল একশ ফুট উচ্চতার দালান হবে। হয়ে গেছে দুইশ ফুট উচ্চতার দালান। দালানের ভেতর-বাইর যেভাবে তৈরির কথা ছিল, সেভাবে হয়নি। ইমারতের চারদিকে যতটুকু  উন্মুক্ত থাকার কথা, মানা হয়নি তার এক ছটাকও। সব হয়তো সত্য। সাধারণের সাদা চোখ তাই বলে। এজন্য রাষ্ট্রের কোনও দফতরকে নথি বা আইন বের করে দেখাতে হবে না। তথাকথিত বিশেষজ্ঞদের টকশোর ছবক নেওয়ারও প্রয়োজন নেই। কিন্তু  আপনি, আপনারা এতদিন কোথায় ছিলেন?
সাধারণ নাগরিকদের প্রশ্ন সরকারের দফতরগুলোর কাছে-শহরের কোনও ভবন নিয়ম মেনে হয়নি, কোন নকশা অনুমোদনের সময় কেমন ছিল, সবই তো আপনাদের জানা। তবে আপনারা কেন এতদিন নিদ্রাকুসুম তেলে বিভোর ঘুমে ছিলেন? আপনারা চাইছিলেন এমন একটা সময় আসুক, যখন অভিযানের উছিলা খুঁজে পাওয়া যাবে। তারপর দলবেঁধে শহরে নেমে পড়বেন অভিযানে। দফতরগুলোর দিক থেকে সাফাই গাওয়া হয়, কেউ কেউ সেই সাফাইতে বাতাসও দেন-লোকবল সংকটের কারণে রাজউক ঝুঁকিপূর্ণ বা নকশা না মেনে গড়ে ওঠা দালানে অভিযান চালাতে পারেনি বা পারছে না। ভালো কথা। তাদের হয়তো একাধিক অভিযান দিয়ে শহর কাঁপানোর সক্ষমতা নেই। কিন্তু তারা একটি দালানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছেন, নকশাভঙ্গ করা কোনও দালান নিজ উদ্যোগে খুঁজে বের করে ভেঙে ফেলেছেন, এমন উদাহরণ কি দেখাতে পারবেন? পারবেন না। বরং নথি ঘাঁটলে দেখা যাবে এক দালানকেই তারা  এক সময় বলেছেন বৈধ বা ঝুঁকিমুক্ত, আরেকবার বলেছেন অতি ঝুঁকিপূর্ণ। কোনও কোনও দালানের ক্ষেত্রে রাজউককে একাধিকবার এমন আচরণ করতে দেখা গেছে। এবার এফ আর টাওয়ারে আগুনের পর যে অভিযান শুরু করেছে রাজউক, তা নিয়ে এক প্রকার উৎসব শুরু হয়ে গেছে। কারণ তাদের প্রশ্রয়ে নিয়মভঙ্গ করে গড়ে ওঠা দালানের মালিকদের চাপে ফেলার মওকা পেয়ে গেছেন তারা। নিয়ম ভাঙার সময়ে একরকম বকশিশ আদায় করেছেন। এখন অভিযানে তোপের মুখে ফেলে আরেকবার বকশিশ নেওয়ার সুযোগ পেলেন। অভিযানে কোনও কোনও অসহায় দালান মালিক দরকষাকষিতে হেরে গিয়ে বলির শিকার হবেন। আবার অভিযান কিনে ফেলে অতিঝুঁকিপূর্ণ দালানও পেয়ে যেতে পারে সন্তোষজনক সনদ। রাজউক, সিটি করপোরেশন, বিআইডব্লিউটিএ, ভোক্তা সংরক্ষণ দফতর, বিআরটিএ,বিআইএসটিএ’র মতো দফতরগুলো যে অভিযান চালায়, বা তার যে চালকচক্র আছে তাদের কাছে মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীরা পর্যন্ত অসহায়। কারণ এই দফতরগুলো চড়া দামে আগে থেকেই এমনভাবে বিক্রি হয়ে আসছে যে, মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের নির্দেশ-অনুশাসনও অকার্যকর হতে বাধ্য। এমন দফতরগুলোতে যদি কোনও আপসহীন কর্তা  ভুলক্রমে চলে আসেন, তখন তাকে ঝেঁটিয়ে বিদায় করার জন্য দলবেঁধে সকলে নেমে পড়ে। রাষ্ট্রও কখনও কখনও সেই আপসহীনকে শেষ পর্যন্ত রক্ষা করতে পারে না।

ফলে এই যে অভিযান উৎসব শুরু হয়েছে তাতে রাষ্ট্রজুড়ে সকল অবৈধ, অনিয়ম বৈধ বা নিয়মের আওতায় আসবে তা বলা যাবে না। এক রাতে পরিবর্তন হবে ধরা যাবে না সেই বাজিও। বরং রমজান ও ঈদকে সামনে রেখে সড়কে, দালানে, দোকানে, কারখানায় অভিযানের তীব্রতা বাড়বে। আমরা কিন্তু ভেজাল খাবারই খাব, চড়া দামের পণ্যই কিনব, ঝুঁকি নিয়ে সড়কে চলব এবং দালানে অফিস ও বসবাস করব। সুতরাং অভিযান উৎসব দেখে কোনও রাঙা ভোরের স্বপ্ন দেখা বারণ।

লেখক: বার্তা প্রধান, সময় টিভি

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ