নুসরাত কেন চলে যাবে...

Send
হারুন উর রশীদ
প্রকাশিত : ০৮:২১, এপ্রিল ১১, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৩:১০, মে ১৪, ২০১৯

হারুন উর রশীদফেনীর মাদ্রাসা শিক্ষার্থী নুসরাত জাহান রাফি শেষ পর্যন্ত চলেই গেলেন। সব প্রার্থনা আর চিকিৎসকদের সব চেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়ে তিনি চলে গেলেন অনন্তলোকে। বার্ন ইউনিটের সমন্বয়ক ড. সামন্তলাল সেনকে যখন রাতে ফোন করি তখন তার কণ্ঠও ছিল কান্নায় ভারি। এই মৃত্যুকে কেউই মানতে পারছেন না। এই মৃত্যু মানা যায় না। মানি না।
এক ঘৃণ্য এবং অশুভ সন্ধির শিকার এই নুসরাত। এক মাদ্রাসা অধ্যক্ষের বিকৃত যৌন মানসিকতার শিকার এই নুসরাত। এক নষ্ট সমাজের নষ্ট রাজনীতির শিকার এই নুসরাত। এখানে মাদ্রাসা অধ্যক্ষ, স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা, পুলিশ আর প্রশাসন সবাই মিলে এক শিক্ষার্থী, এক নারীকে পরপারে পাঠিয়ে দিলো। তাদের কাছে মানবিকতা, শুভবুদ্ধি, ধর্ম কোনোটাই মুখ্য হয়ে ওঠেনি। মুখ্য হয়ে উঠেছে লালসা। মুখ্য হয়ে উঠেছে টাকা। মুখ্য হয়ে উঠেছে রাজনীতি। আর সবকিছুর কেন্দ্রীভূত ফলাফল একজন নুসরাতের চলে যাওয়া।
নুসরাতকে নিয়ে রাজনীতি হয়েছে। নুসরাতকে নিয়ে খেলা হয়েছে। নুসরাতকে নিয়ে ব্যবসার নতুন প্লট তৈরি হয়েছে। কোনও মানবিক আচরণ তার সাথে করা হয়নি। তাকে ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়েছে। আর তার প্রতিবাদ করায়, বিচার চাওয়ায় তাকে হত্যা করা হয়েছে। আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়েছে। যুগে যুগে আমরা এরকম প্রতিবাদী নুসরাতদের পুড়িয়ে হত্যার কাহিনি জানি। নষ্টরা নুসরাতদের বাঁচতে দেয় না। তারা পুড়িয়ে মারতে চায়, মারে।

একজন ছাত্রীকে নিজের কক্ষে ডেকে যৌন হয়রানি করলো ফেনীর সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ মাওলানা সিরাজউদ্দৌলা। আর নুসরাতের প্রতিবাদে সেই অধ্যক্ষকে গ্রেফতার করা হলো, মামলা হলো। কিন্তু হায়! নুসরাত হয়তো জানতো না ওই যৌন বিকৃত অধ্যক্ষের টাকার কাছে সবাই ধরা। থানার ওসি ধরা, স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতারা ধরা। ধরা জেলা প্রশাসন। তাই অধ্যক্ষ সাবেক জামায়াত নেতা হলেও দোষ নেই। আগে আরও যৌন হয়রানির অভিযোগ থাকলেও দোষ নেই। ৬টি মামলা থাকলেও দোষ নেই।

যৌন হয়রানির ঘটনাকে ওসি মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন সাজানো নাটক। আর ঘটনার ১২ দিন পর যখন তাকে মাদ্রাসার ছাদে পুড়িয়ে হত্যার চেষ্টা করা হয়, ওই একই ওসি এটাকে বলেন আত্মহত্যার চেষ্টা। যৌন হয়রানির পর যখন গ্রেফতার করা হয় মাদ্রাসার অধ্যক্ষকে, তখন আবার তার মুক্তির দাবিতে মিছিল বের করা হয়। সেই মিছিলের আয়োজন করেন আওয়ামী লীগ নেতা। সেখানে মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের বাধ্য করা হয় অংশ নিতে। সোনাগাজী পৌর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও ওয়ার্ড কাউন্সিলর মাকসুদুর রহমান সাবেক এই জামায়াত নেতার অর্থের কাছে নিজেকে সঁপে দিলেন। তিনি গভর্নিং বডির সদস্য হয়েও ছাত্রীটির পরিবারকে হুমকি দিলেন। মামলা তুলে নিতে চাপ দিলেন। নুসরাতের পরিবার তার নিরাপত্তা চেয়েও পায়নি। পুলিশ দেয়নি, গভর্নিং কমিটি দেয়নি, জেলা প্রশাসন দেয়নি।

ফেনীর অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক টি কে এনামুল করিম মাদ্রাসার গভর্নিং কমিটির প্রধান। তিনি নাকি সময়ই পাননি নুসরাতের বিষয়টি দেখার। আর মাদ্রাসা অধ্যক্ষ যে এত খারাপ লোক তা নাকি তার জানাই ছিল না। ফেনীর এসপি এস এম জাহাঙ্গীর আলম সরকার সাহেবও সময় পাননি। নুশরাতকে রক্ষায় সময় না পেলেও পোষা ওসি’র পক্ষে সাফাই গাইতে তার সময়ের অভাব হয়নি। তিনি আর ওসি মিলেই হয়তো নুশরাতকে পুড়িয়ে হত্যা চেষ্টার মামলার এজাহারে নানা পরিবর্তনের চেষ্টা করেন। অধ্যক্ষের নাম বাদ দেয়ারও চেষ্টা ছিল। তাই ওসিকে বাঁচাতে এসপি ছিলেন মরিয়া। বুধবার ওসিকে প্রত্যাহার করা হলেও এসপি তাতে নারাজ ছিলেন। তিনি বলেন,‘ প্রত্যাহার নয়, বদলি।’

এখানে আমরা দেখলাম দুর্বৃত্তের সন্ধি। এই সন্ধিতে পুলিশ আছে, প্রশাসন আছে, রাজনৈতিক নেতা আছে। আর সবাই এক হয়ে কাজ করেছে এক যৌন বিকৃত সাবেক জামায়াত নেতার জন্য।

এটা আমাদের বলে দিচ্ছে রাজনীতি, প্রশাসন আর দুর্বৃত্তের সন্ধির কথা। অশুভের বন্ধুত্বের কথা। বলে দিচ্ছে রাষ্ট্র ও সমাজের অধঃপতনের কথা। বলে দিচ্ছে পিশাচের অটুট মিত্রতার কথা।

কিন্তু এটা তো হওয়ার কথা নয়। প্রতিবাদী নুসরাতেরই তো জয় হওয়ার কথা। সে তো এই সময়ের জোয়ান অব আর্ক। বীর কন্যা। সে তো এক প্রতিবাদী নারী, যে যৌন সন্ত্রাসকে রুখে দিতে চেয়েছে। রাষ্ট্রে বা সমাজে এমন কোনও শুভবুদ্ধি কি ছিল না, যা নুসরাতকে বাঁচাতে পারতো! তার পক্ষে দাঁড়াতে পারতো। সাহস দিতে পারতো। তার জীবনকে বাঁচাতে পারতো যৌন বিকৃত অধ্যক্ষ ও তার সহযোগীদের হাত থেকে?

ছিল না বলেই নুসরাতকে চলে যেতে হলো। সে জীবন দিয়ে জানিয়ে গেলো কত বড় অন্ধকার আমাদের গ্রাস করছে।

কিন্তু নুসরাতরা না থাকলে তো আঁধার আরও বড় হবে। আমাদের সবাইকে গ্রাস করবে। তাই নুসরাতরা তো চলে যেতে পারে না। তারাই তো আলো জ্বালাবে। নুসরাতরা কেন চলে যাবে?

লেখক: সাংবাদিক

ইমেইল: swapansg@yahoo.com

/আইএ/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ