সোনাগাজীর সোনার কন্যা নুসরাত তোমাকে সালাম

Send
মো. জাকির হোসেন
প্রকাশিত : ১৬:১৩, এপ্রিল ১৫, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ২০:৩৭, এপ্রিল ১৫, ২০১৯

মো. জাকির হোসেননুসরাত তোমাকে সালাম। জানি সালাম গ্রহণ করার ও জবাব দেয়ার ঊর্ধ্বে তুমি এখন। ইসলামের বিধান মতে জীবিত ও কবরবাসী উভয়কে সালাম দেওয়া তথা তাঁর জন্য শান্তিবর্ষণের দোয়া করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, কদাকার, কুৎসিত, নির্মম, যন্ত্রণাময় এ পৃথিবী ছেড়ে তুমি জান্নাতের এমন অনাবিল সুখ-শান্তি আস্বাদন করতে শুরু করেছো, যা কোনও চোখ দেখেনি, কোনও অন্তর কল্পনাও করতে পারেনি কখনও। আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহ তা’আলা বলেন, আমি আমার নেক বান্দাদের জন্য (জান্নাতে) এমন জিনিস প্রস্তত করে রেখেছি, যা কখনও কোনও চক্ষু দেখেনি, কোনও কান শোনেনি এবং কোনও অন্তর কখনও কল্পনাও করেনি’ (বুখারি, মুসলিম, মিশকাত)। যদিও জান্নাত-জাহান্নামের অধিবাসী হওয়ার চূড়ান্ত ফয়সালা হবে পুনরুত্থান দিবসে সকল মানুষকে আখিরাতের ময়দানে একত্রিত করে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিচার সম্পাদনের পর। ইসলাম বলে পুণ্যাত্মাদের কবর জীবনের শুরু থেকেই কবরের সাথে জান্নাতের সংযোগ করে দেয়া হয়, আর পাপী-গুনাহগারদের জাহান্নামের সাথে যুক্ত করে দেয়া হয়। পুণ্যবান বান্দারা কবরঘরে বাস করে জান্নাতের অনেক নিয়ামত ভোগ করতে থাকবেন। বিচার শেষে তাঁরা জান্নাতে প্রবেশ করে জান্নাতের পরিপূর্ণ নিয়ামতরাজি ভোগ করবেন।

নুসরাত তুমি পুণ্যবানদের দলে। নেক বান্দাদের কাতারে। ৮৫ শতাংশ পোড়া দেহ নিয়ে তুমি বেঁচে থাকলে তোমাকে আমরা সোনাগাজীর গাজী বলে ডাকতাম। আর পোড়াদেহের যন্ত্রণা, ক্লেশ-কষ্টকে চিরবিদায় জানিয়ে তুমি এখন শহীদদের তালিকাভুক্ত। হজরত জাবের বিন আতিক (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহর পথে মৃত্যুবরণ করা ছাড়াও সাত প্রকার শহীদ রয়েছে- ১. মহামারিতে মৃত্যুবরণকারী শহীদ; ২. পানিতে নিমজ্জিত শহীদ; ৩. শয্যাশায়ী অবস্থায় চল্লিশবার ‌লা ইলাহা ইল্লা আন্তা সুবহানাকা ইন্নি কন্তু মিনায যলিমীন' পড়ে মৃত শহীদ; ৪. পেটের পীড়ায় মৃত্যুবরণকারী শহীদ; ৫. অগ্নিদগ্ধ ব্যক্তি শহীদ; ৬. যে ব্যক্তি ধ্বংসাবশেষের নিচে পড়ে মারা যায় সেও শহীদ এবং ৭. সন্তান প্রসব করতে মারা যাওয়া নারীও শহীদ’। (আবুদাঊদ হা/৩১১১; সহীহ নাসাঈ হা/১৮৪৬ মুয়াত্তা মালিক, হাদিস নং-৫৫৪, ৮০২, আল মু’জামুল কাবীর, হাদিস নং-১৭৮০, সহীহ কুনুজু সুন্নাতিন নাবাবিয়্যাহ, হাদিস নং-২৩)। অন্য হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, ‘কুমারী অবস্থায় মৃত্যুবরণকারী শহীদ’। (সুনানে ইবনে মাজাহ-৩/৩৬৬ পৃ. হা: ২৮০৩) ‘জালিমের সঙ্গে অথবা নিজ পরিবার হেফাজতের লড়াইয়ে মৃত্যুবরণকারী শহীদ’। (আহমদ-১/১৯০ পৃ: হা: ১৬৫৭) যে ব্যক্তি তার ন্যায্য অধিকার রক্ষায় নিহত হয়, সে ব্যক্তি শহীদ (আবু ইয়া’লা হা/৬৭৭৫)। ইলমে দীন চর্চায় লিপ্ত অবস্থায় মৃত্যুবরণকারীও শহীদ। (উমদাতুল ক্বারি-১০/১৪৫) ইসলামের মানদণ্ডে বেশ ক’টি শ্রেণিতে নুসরাত তুমি হুকমি বা বিধানগত শহীদ। যেমন, অগ্নিদগ্ধ শহীদ, কুমারী শহীদ, জালিমের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে শহীদ, ন্যায্য অধিকার রক্ষার লড়াইয়ে শহীদ, ইলমে দীনচর্চায় লিপ্ত অবস্থায় শহীদ। সৃষ্টিকর্তার কাছে শহীদের অবস্থান পুণ্যবানদের মধ্যে বিশেষ মর্যাদাসম্পন্ন।

আমার সংক্ষিপ্ত জীবনে অসংখ্যবার দেখেছি প্রতিবাদ করার শক্তি-সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও অনেকেই ব্যক্তিস্বার্থের বিবেচনায় অন্যায়কারীর সাথে আপস করেছে। তার পক্ষাবলম্বন করেছে। অন্যায়ের প্রতিবাদ না করার পক্ষে অজস্র খোঁড়া যুক্তি উপস্থাপন করে নিজের দায়-দায়িত্ব এড়ানোর কৌশল অবলম্বন করেছে। অপরাধীরা ভয়ঙ্কর, সংখ্যায় অনেক ও শক্তিশালী জেনেও নুসরাত তুমি তোমার লাড়াইয়ে দমে যাওনি। সোনাগাজী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা তোমার লড়াইয়ের বিপক্ষে জেনেও তুমি অন্যায়ের প্রতিবাদ বন্ধ করোনি। পুরো শরীর আগুনে পুড়ে যাওয়ায় নিশ্চিত মৃত্যু জেনেও শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত প্রতিবাদ অব্যাহত রেখেছো তুমি। হজরত আবু সাঈদ খুদরী (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের কেউ যদি কোনও অন্যায় কাজ সম্পাদিত হতে দেখে, সে যেন তা তার হাত দ্বারা (শক্তি প্রয়োগ করে) প্রতিহত করে, এতে সমর্থ না হলে মৌখিকভাবে তা প্রতিহত করবে, এতেও সমর্থ না হলে অন্তরে (ঘৃণার মাধ্যমে) প্রত্যাখ্যান করবে। আর এটা দুর্বলতর ইমানের পরিচায়ক’।(সহীহ মুসলিম) নবী (সা.) অন্তরের প্রতিবাদকে দুর্বল ইমানের পরিচয় বলেছেন। হাত দিয়ে শক্তভাবে বাধা দেয়া আর কঠোর ভাষায় প্রতিবাদ করা সবল ইমানের পরিচায়ক বলে উল্লেখ করেছেন। কি দুর্বিনীত সাহস আর শক্তিশালী ইমান তোমার নুসরাত। তোমাকে সালাম।

অন্তরের অন্তস্তল থেকে নুসরাত তোমাকে স্যালুট। তুমি আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়ে গিয়েছো ইসলামের চর্চাকেন্দ্র, নিরাপদ জায়গা হিসাবে পরিচিত মাদ্রাসার মধ্যে ইসলামের লেবাসধারী মোনাফেকরা রয়েছে। এ মোনাফেকরা একা নয়, এরা সংঘবদ্ধ, সংগঠিত। ইসলামের ভেকধারী এসব মোনাফেক, ধর্ষকের মুখোশ খুলে দিয়ে তুমি অনেক নারীর সম্ভ্রম বাঁচাতে পেরেছো এ জন্য তোমাকে সালাম নুসরাত। অপরাধের বিরুদ্ধে দ্রোহের এক ভয়ঙ্কর ঝড় তুলে গিয়েছো তুমি নুসরাত। সেই ঝড়ের ঝাপটায় একের পর এক বেরিয়ে আসছে ধর্মশিক্ষার আড়ালে কিছু মাদ্রাসার নানা অনাচার, অযাচার, যৌনাচার, শিশুকামিতা-সমকামিতা, হত্যা, নিপীড়ন ও নির্যাতনের চিত্র। তোমাকে সালাম, হে সোনার কন্যা নুসরাত!

অ্যাকশন এইড বাংলাদেশের এক জরিপে এ দেশে নারীদের জীবনে যৌন হয়রানির বীভৎস চিত্র উঠে এসেছে। জরিপে অংশগ্রহণকারী ৮৫ শতাংশ নারী বলেছেন, তারা মর্যাদাহানিকর উক্তির শিকার হয়েছেন। ৪৬ শতাংশ নারী যৌনতাপূর্ণ অশ্লীল ভাষার মুখোমুখি হয়েছেন। ৪৮ শতাংশ নারী বাসের চালক বা ভাড়া আদায়কারীর মুখে অবমাননাকর ভাষা শোনার অভিজ্ঞতা হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন। উত্তরদাতাদের ৮৮ শতাংশ বলেছেন, বাজার বা বিপণিবিতানে সাধারণ মানুষও নারীদের উদ্দেশে অশ্লীল কথা বলেন। ৬৯ শতাংশ বলেছেন, দোকানের কর্মচারী বা বিক্রেতারা তাদের দেখে অশ্লীল মন্তব্য করেন। জরিপে বেরিয়ে এসেছে, জনসমক্ষে যৌন হয়রানির শিকার হয়েও নারীরা পুলিশের কাছে যান না। ওই জরিপে ৮১ শতাংশ উত্তরদাতা বলেছেন, তারা পুলিশের সহায়তা চান না। তাদের ৯৫ শতাংশ মনে করেন, পুলিশকে ঘটনা জানালে সমস্যা বাড়ে। সমাজ-রাষ্ট্র নারীবান্ধব নয়, বরং নারীর প্রতি বৈরী জেনেও নুসরাত তুমি প্রতিবাদ করেছো। শিখিয়ে দিয়ে গেছো অন্যায়ের প্রতিবাদ করতেই হবে। আগুনে ঝলসে মৃত্যু হবে জেনেও প্রতিবাদ চালিয়ে যেতে হবে। আমাদের মতো আধমরাদের ঘা মেরে অতল সাহস ও দ্রোহের যে আগুন তুমি জ্বেলে দিয়ে গেছো, সে জন্য তোমাকে সশ্রদ্ধ সালাম, নুসরাত।

অসংখ্য মানুষ সোনাগাজীর পৈশাচিকতার আগে তোমাকে কখনোই দেখেনি। তোমার সাথে তাদের পরিচয় ছিল না কখনও। তোমার সাহস, অন্যায়ের বিরুদ্ধে তোমার প্রতিবাদ আর তোমার শেষ পরিণতিতে তাদের অবিরল অশ্রুধারা বিসর্জন দিতে দেখেছি। তোমাকে ভালোবাসায় সিক্ত করতে দেখেছি। তুমি এখন আর কেবল সোনাগাজীর নও। তুমি এখন বাংলাদেশের কন্যা। জল ছলছল চোখে তোমাকে বিদায় দিয়েছি। ওপারে তুমি শান্তিতে ঘুমাও নুসরাত। এপারে আমরা জেগে আছি তোমার সাহসে সাহসী হয়ে, তোমার প্রতিবাদের উত্তরাধিকারী হয়ে দ্রোহের আগুন চারদিকে ছড়িয়ে দিতে। তোমার সম্মানহানি ও হত্যার বদলা নিতে।

লেখক: অধ্যাপক, আইন বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

ই-মেইল: zhossain1965@gmail.com

 

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ