নুসরাত, তনু নাকি নির্ভয়া?

Send
মাসুদ কামাল
প্রকাশিত : ১৪:১৯, এপ্রিল ১৭, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৪:২৩, এপ্রিল ১৭, ২০১৯

মাসুদ কামালদীপু ভাইয়ের এসএমএস পেলাম। তিনি লিখেছেন, ‘মেয়েটার ভিডিও কি এভাবে ব্রডকাস্ট হতে পারে? ভিডিও ধারণ যদি অন্যায় হয়ে থাকে, তাহলে তা ব্রডকাস্ট করা কেন অনুচিত হবে না?’
দিন কয়েক আগের কথা। তখন মধ্যরাত। আমি ছিলাম একাত্তর টেলিভিশনের টকশো- একাত্তর জার্নালে। আলোচনা হচ্ছিলো ফেনীর নুসরাত হত্যাকাণ্ড নিয়ে। একটু আগেই সেই আলোচিত ভিডিওটি চালানো হলো, তাতে দেখা গেলো অগ্নিদগ্ধ হওয়ার আগে নুসরাত কীভাবে থানায় গিয়ে অভিযোগ করেছিল। পুলিশের কাছে একজন মেয়ে তার সঙ্গে করা হয়রানির বর্ণনা দিচ্ছে, লজ্জায় অপমানে মেয়েটি কথা বলতে পারছে না, তার কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে যাচ্ছে। আর পুলিশের লোকগুলো যেন পুরো বিষয়টিকে তড়িয়ে তড়িয়ে উপভোগ করছে।
যে রাতের কথা বলছি, তার আগের দিনই মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে হেরে গেছে নুসরাত নামের সেই সাহসী মেয়েটি। টকশো’র উপস্থাপনায় ছিলেন ফারজানা রূপা। বিরতির সময় আমি তাকে জিজ্ঞাসা করলাম দীপুভাইয়ের (মোস্তফা ফিরোজ, বাংলাভিশনের হেড অব নিউজ) করা ওই প্রশ্নটি। এভাবে ভিডিওটি টেলিভিশনের পর্দায় প্রচার করা কি ঠিক হলো?

রূপার তাৎক্ষণিক উত্তর, কেন হবে না? মেয়েটা তো লড়াই করতে করতে মারা গেছে। যে অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে সে লড়াই করছিল, তাতে জয়ের জন্য এই ভিডিওটি অস্ত্র হিসাবে কাজে লাগবে। এ ধরনের আরও কোনও ডকুমেন্ট থাকলে সেগুলোও পাবলিক করা যেতে পারে। আর তাছাড়া, এটা প্রচারের ফলে মেয়েটি তো সামাজিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে না। উপরন্তু তার লড়াকু মনোভাবটি প্রকাশিত হচ্ছে, পুলিশের ন্যক্কারজনক আচরণের বিষয়টি মানুষ জানতে পারছে।

এ যুক্তিকে আমরা অস্বীকার করবো কীভাবে? আমার মনে হয়, ধর্ষণ বা যৌন হয়রানির ক্ষেত্রে ভিকটিমের নাম পরিচয় প্রকাশ কতক্ষণ পর্যন্ত করা যাবে না, তা নিয়ে নতুন করে আলোচনার সময় বোধকরি এসে গেছে। আলোচনার কথা বললাম এ কারণে, এ সংক্রান্ত একটি আইন দেশে এখন বলবৎ আছে। সে আইনে নির্যাতিত নারী বা শিশুর পরিচয় প্রকাশের ব্যাপারে বাধানিষেধ দেওয়া হয়েছে।

আইনটি হচ্ছে ‘নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন-২০০০’। এই আইনের ১৪(১) ধারায় বলা হয়েছে, ‘এই আইনে বর্ণিত অপরাধের শিকার হইয়াছেন এইরূপ নারী বা শিশুর ব্যাপারে সংঘটিত অপরাধ বা তৎসম্পর্কিত কার্যধারার সংবাদ বা তথ্য বা নাম-ঠিকানা বা অন্যবিধ তথ্য কোনও সংবাদপত্রে বা অন্য কোনও সংবাদমাধ্যমে এমনভাবে প্রকাশ বা পরিবেশন করা যাইবে যাহাতে উক্ত নারী বা শিশুর পরিচয় প্রকাশ না পায়।’ এ আইনের ব্যত্যয় ঘটিয়ে সংবাদমাধ্যমে নির্যাতিত নারী ও শিশুর পরিচয় প্রকাশ করলে শাস্তির বিধানও রয়েছে। ১৪(২) ধারায় উল্লেখ করা হয়েছে, ‘উপধারা (১)-এর বিধান লঙ্ঘন করা হইলে উক্ত লঙ্ঘনের জন্য দায়ী ব্যক্তি বা ব্যক্তিবর্গের প্রত্যেকে অনধিক দুই বৎসর কারাদণ্ডে বা অনূর্ধ্ব এক লক্ষ টাকা অর্থদণ্ডে বা উভয় দণ্ডে দণ্ডনীয় হইবেন।’

এই আইনটি মানলে দীপু ভাইয়ের উদ্বেগ নিয়ে কোনও আপত্তি করা যায় না। কিন্তু ফারজানা রূপার যুক্তিটিকেই বা উপেক্ষা করবো কীভাবে? কেবল ভিডিও’র কথাই বা বলছি কেন, নির্যাতিতা (কী যৌন প্রস্তাবের মাধ্যমে হোক, কিংবা গায়ে আগুন দেওয়ার কারণেই হোক) মেয়েটির নাম যে নুসরাত- সেটাও তো একেবারে শুরুর দিন থেকেই বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়েছে। কেবল নাম নয়, পরিচয় ঠিকানা এমনকি ছবি পর্যন্ত দেখেছে সবাই। তাহলে এই সবই কি বেআইনি হয়েছে? অন্যায় হয়েছে? আবার অন্যদিক দিয়ে ভাবলে, এভাবে নাম পরিচয় প্রকাশিত না হলে কি বিষয়টি নিয়ে এত চাপ তৈরি হতো?

এই জায়গায় কেউ কেউ হয়তো নির্ভয়ার উদাহরণ দিতে চাইবেন। ২০১২ সালে দিল্লিতে বাসের মধ্যে গণধর্ষণের শিকার হওয়া সেই মেয়েটির প্রকৃত নাম কিন্তু দীর্ঘদিন কেউ জানতে পারেনি। পরিচিত হয়েছিল সে নির্ভয়া নামে। দেশজুড়ে নির্ভয়ার জন্য আন্দোলন হয়েছিল। অপরাধী ছয় ধর্ষকই গ্রেফতার হয়েছিল, তাদের চরম দণ্ডও হয়েছিল। কিন্তু নির্ভয়া এসব দেখে যেতে পারেনি। অধিকতর উন্নত চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুর নিয়ে যাওয়ার পরও তাকে বাঁচানো যায়নি। তার মৃত্যুরও অনেক পরে প্রকাশিত হয়েছে তার প্রকৃত নাম। এই যে নামটি গোপন রাখা, এজন্য কিন্তু তার বিচারে কোনও ঘাটতি হয়নি, অপরাধীদের চরম শাস্তি হয়েছে। আবার এর বাইরে, এই দিল্লিতেই অনেক ধর্ষণ কিন্তু এরপরও হয়েছে। ২০১৮ সালের এক হিসাবে দেখা যায়, দিল্লিতে প্রতিদিন পাঁচজন করে নারী ধর্ষিতা হয়ে থাকে। এটা অনেক বছর ধরে সেখানে চলতে থাকা একটা চিত্র। কিন্তু এর মধ্যে সুষ্ঠু বিচার হয়েছে কয়টার? কয়টি ঘটনা নিয়েই বা নির্ভয়ার মতো এত আলোড়ন হয়েছে?

কেবল দিল্লিতেই নয়, আমাদের দেশেও দেখা যাচ্ছে একই চিত্র। এই যে বিচার না হওয়া, নিশ্চয়ই তার পেছনে কোনও কারণ আছে। কিন্তু বৃহত্তর সে আলোচনায় না গিয়ে আজ  বরং ওই নাম পরিচয় প্রকাশ করা না করার নৈতিকতার মধ্যেই আমাদের আলোচনা সীমাবদ্ধ রাখি।

আমরা তনু হত্যাকাণ্ডের কথা স্মরণ করতে পারি। ২০১৬ সালের ঘটনা ছিল সেটা। কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজের ছাত্রী ছিল সোহাগী জাহান তনু। তাকে ধর্ষণ ও হত্যা করা হয়। বিষয়টি একেবারে প্রথম দিন থেকেই ব্যাপক আলোচনায় আসে। শুরুতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে, পরে দ্রুতই সকল প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ায়। এরপর লাগাতার চলতে থাকে প্রতিবাদ, বিক্ষোভ, মানববন্ধন। দেশজুড়ে ব্যাপক জনমত তৈরি হয়। তখন এই যে তনুর নাম পরিচয় প্রকাশ করা হলো, তার ছবিও প্রকাশিত হলো, কেউ কি তাতে কোনও আপত্তি করেছিলো? এমনকি তনুর পরিবারও কিন্তু করেনি। বরং ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের বিচারের দাবিটি জোরালো হয়েছিল।

অথবা সিলেটের শিশু রাজন হত্যার কথাই ভাবুন। রাজনকে জাস্ট পিটিয়ে মেরে ফেলা হয়েছিল। শিশুটিকে মেরে, পুলিশকে হাত করে, দ্রুতই দেশ থেকে পালিয়েছিল ঘাতক কামরুল। পেটানোর সেই ভিডিওটি প্রথম যখন ফেসবুকে দেখি, সেটি এতটাই নির্মম ছিল যে, আমি পুরোটা দেখতেই পারিনি, বন্ধ করে দিয়েছি। পরিচিত যতজনকে জিজ্ঞাসা করেছি, তারা দেখতে পারেননি পুরোটা। এমন একটা ভয়ঙ্কর ভিডিও যিনি প্রথম আপ করেছিলেন সোশ্যাল মিডিয়ায়, তিনি কি আসলে একটি বেআইনি কাজ করেননি? কিন্তু ওই কাজটি না করলে কি শেষ পর্যন্ত ঘাতক কামরুলকে সৌদি আরব থেকে ধরে আনার মতো দুরূহ (অথচ প্রয়োজনীয়) কাজটি করা যেতো? রাজন হত্যার বিচার কি হতো?

তাহলে আমরা কী করবো? আইন ভাঙবো, নাকি আইনটিকে পুনর্মূল্যায়ন করবো? মনে হয় বিষয়টি নিয়ে নতুন করে চিন্তার, আলোচনার সময় এসেছে।

এখানে আরও একটা বিষয় উল্লেখ করতে চাই। এই গত মাসে, আন্তর্জাতিক নারী দিবসে, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী গণমাধ্যমগুলোর প্রতি একটা গুরুত্বপূর্ণ আহ্বান জানান। তিনি ধর্ষিতার পরিচয় গোপন রাখার পাশাপাশি ধর্ষকের ছবি ও পরিচয় বেশি বেশি করে প্রচার করার জন্য বলেন। যেন সেই ধর্ষক সামাজিকভাবে সমালোচনার মুখে পড়ে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর এ বক্তব্যের মধ্যে আন্তরিকতার যে ছোঁয়া রয়েছে, তা নিশ্চয়ই সকলকে স্পর্শ করবে। কিন্তু আইন এখানে কী বলে? ধর্ষণের অভিযোগ আর ধর্ষণ কি একই বিষয়? কেউ একজন কোনও ব্যক্তির বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ আনলেন, তাহলেই কি ধরে নিতে হবে ওই অভিযোগ সম্পূর্ণ সত্য? যদি ধরেই নেওয়া যায়, তাহলে আর এ নিয়ে বিচার সালিশের কী দরকার। অভিযোগ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই সাজা দিয়ে দিলে হয়। কিন্তু বাস্তবে সেরকম তো আর করা যাবে না। তাহলে আমরা কী করে বুঝবো কে প্রকৃত ধর্ষক? কার ছবি ও পরিচয় গণমাধ্যমে বেশি বেশি করে প্রচার করতে থাকবো? কেউ কেউ হয়তো বলবেন- পুলিশি তদন্তে প্রমাণিত হওয়ার পর তার ছবি প্রচার করা যায়। কিন্তু সেটাও কি ঠিক হবে? বিচারের সময় পুলিশি তদন্তের ফলকে কিন্তু আদালতও সম্পূর্ণ সঠিক বলে সবসময় বিবেচনায় নেন না। পুলিশও পক্ষপাতমূলক আচরণ করতে পারে। তদন্তেও গাফিলতি থাকতে পারে। আর পারে বলেই নুসরাত যে পুলিশের কাছে প্রথমে হয়রানির বিরুদ্ধে অভিযোগ করতে গিয়েছিল, সেই ওসিকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। তদন্তের গাফিলতির বিষয়টি তো বহু ঘটনায় বহুবার প্রমাণিত হয়েছে। প্রায় তিন বছর পার হয়ে গেলেও তনু হত্যার তদন্ত শেষ করা যায়নি। সাগর-রুনি হত্যার তদন্ত শেষ হয়নি সাত বছরেও।    

আসলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এই বক্তব্যের মধ্যেই রয়ে গেছে শুরুতে যে আইনগত উভয়সঙ্কটের কথা তুলেছিলাম- তার সমাধানের ইঙ্গিত। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তার আন্তরিকতা থেকে ধর্ষকের ছবি বেশি বেশি করে প্রকাশের কথা বলেছেন। নুসরাত বা রাজনের ভিডিও কারও না কারও আন্তরিকতার জোরেই সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে গেছে। ব্যক্তিগত সেই উদ্যোগ সমষ্টির আন্তরিকতায় ভাইরাল হয়েছে। ফলে অবধারিতভাবে তৈরি হয়েছে জনমত। কিন্তু কঠিন সত্য হচ্ছে- এই আন্তরিকতা, এই সহমর্মিতার পেছনে কিন্তু আইনি সমর্থন তেমন একটা নেই। বরং একে বেআইনিই বলা যায়। আর সে কারণেই মনে করি, আইনের ধারাগুলো পুনর্মূল্যায়নের সময় এসেছে।

লেখক: সিনিয়র নিউজ এডিটর, বাংলা ভিশন 

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ