সাংবাদিকতাই অ্যাসাঞ্জের অপরাধ

Send
বাধন অধিকারী
প্রকাশিত : ১৯:০৮, এপ্রিল ১৭, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ২৩:৫৮, এপ্রিল ১৭, ২০১৯

বাধন অধিকারীউইকিলিকস-এর জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ বাস্তবত যুক্তরাষ্ট্র-যুক্তরাজ্য-ইকুয়েডর ও সুইডেনের চোখে ‘অপরাধী’। হ্যাকিং, আদালত অবমাননা, ধর্ষণ আর দূতাবাসের নিয়ম ভঙ্গের অভিযোগ তার বিরুদ্ধে। বিভিন্ন রাষ্ট্রের গোপন নথি জনসম্মুখে এনে অ্যাসাঞ্জ আর তার বন্ধুদের উইকিলিকস উন্মোচন করে দিয়েছে সাম্রাজ্যবাদী শক্তির যুদ্ধবাজি, মানবতাবিরোধী অপরাধ, দুর্নীতি আর গণহত্যার চিত্র। অভিযোগগুলো যে স্রেফ তাকে শায়েস্তা করার স্বার্থেই, সেটা অ্যাসাঞ্জ সম্পর্কে খোঁজ-খবর রাখা মানুষদের সবাই কমবেশি জানেন। পাশ্চাত্য জগতে যারা অ্যাসাঞ্জের সহমর্মী, যারা ন্যয়-সমতা আর মত প্রকাশের স্বাধীনতার জন্য লড়ছেন; তারা এই ঘটনাকে মত প্রকাশের স্বাধীনতা হরণ হিসেবেই দেখছেন। বলছেন, কণ্ঠরোধের স্বার্থেই অ্যাসাঞ্জকে আইনি পথে শায়েস্তা করার চিন্তাভাবনা হচ্ছে। সাংবাদিকতাই অ্যাসাঞ্জের অপরাধ! কিন্তু মানতে চান না সবাই। তবে আমিও বলতে চাই, অ্যাসাঞ্জ যা করেছেন তা-ই প্রকৃত সাংবাদিকতা। আর সেটাই তার একমাত্র অপরাধ। বাদবাকি অভিযোগ স্রেফ ভুয়া।
যারা অ্যাসাঞ্জকে সাংবাদিক মানতে নারাজ, তাদের কেউ কেউ বলতে চান, উইকিলিকস বড়জোর ‘সংবাদমূল্যে ভরপুর’ তথ্য সামনে এনেছে। তারা খেয়াল করতে ব্যর্থ, সংবাদের উৎসকে পরিপূর্ণ গোপনীয়তার নিশ্চয়তা বিধান করে অ্যাসাঞ্জদের উইকিলিকস ‘ঘটনার হুবহু উপস্থাপন’ করেছে যে কোনও কথিত নিরপেক্ষ সংবাদমাধ্যমের থেকে অনেক বেশি নিরপেক্ষভাবে, বলতে গেলে প্রায় সম্পাদনাবিহীন। তবে উইকিলিকস কিন্তু সম্পাদনাবিহীন কোনও প্রতিষ্ঠান না। যা পাই তুলে দিই টাইপ জিনিস না। হুবহু উপস্থাপনের স্বার্থে দরকারহীন সম্পাদনা না করা তাদের নীতিগত অবস্থান।

লন্ডনের সিটি ইউনিভার্সিটির সাংবাদিকতা বিভাগের ‘অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা-কেন্দ্র’ সেন্টার ফর ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিজম-সিআইজে, কমিটি টু প্রোটেক্ট জার্নালিস্টস (সিপিজে)  এবং সাংবাদিকদের আন্তর্জাতিক সংগঠন ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব জার্নালিস্টস আইএফজে’র মতো প্রতিষ্ঠান উইকিলিকস-কে সংবাদমাধ্যম ও অ্যাসাঞ্জকে প্রকাশক স্বীকৃতি দিয়েছে। আমি আর নতুন করে কী বলবো। আসলে অ্যাসাঞ্জকে সাংবাদিক প্রমাণ করার জন্য আমি লিখতে বসিনি। বসেছি, তাকে 'সাংবাদিক নয়' প্রমাণ করার রাজনীতি নিয়ে কথা বলতে।

ইকুয়েডরের কাছে অ্যাসাঞ্জ বিধিভঙ্গকারী। যুক্তরাজ্যের কাছে তিনি আদালত অবমাননাকারী। সুইডেনের কাছে অ্যাসাঞ্জ ধর্ষক। দুই নারী তার বিরুদ্ধে ‘ঘটনা’র দুই বছর পর ধর্ষণের অভিযোগ এনেছেন। কখন এনেছেন? যখন তিনি যুক্তরাষ্ট্র-যুক্তরাজ্যের প্রচুর গোপন নথি ফাঁস করে দিয়েছেন। ওই দুই নারীর নিজস্ব ভাষ্য অনুযায়ীই তারা দুজনই কিন্তু তার সঙ্গে সম্মতিমূলক যৌন সম্পর্ক যাপন করেছেন। তাহলে অভিযোগ কী? তাদের অভিযোগ জন্মপ্রতিরোধক ব্যবহার করা না করা নিয়ে। এই অভিযোগ যে স্রেফ ভুয়া আর হাস্যকর, তা বিশ্ববাসী জানেন।

যুক্তরাষ্ট্রের চোখে অ্যাসাঞ্জ একজন ‘হ্যাকার’। ২০১০ সালে পেন্টাগন ও যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের লাখ লাখ সামরিক ও কূটনৈতিক গোপন নথি ফাঁস করেছিল তার উইকিলিকস। ওইসব নথির মধ্যে মার্কিন বাহিনীর বিরুদ্ধে আফগান যুদ্ধ সম্পর্কিত ৭৬ হাজার এবং ইরাক যুদ্ধ সম্পর্কিত আরও ৪০ হাজার নথি ছিল, যা যুক্তরাষ্ট্র সরকার ও পেন্টাগনকে চরম বেকায়দায় ফেলে দেয়। কী ছিল সেসব নথিতে? অ্যাসাঞ্জ নথি ফাঁসের পর এক সংবাদ সম্মেলনে নিজেই বলেছিলেন, ইরাক যুদ্ধের আগে থেকেই সত্যকে আড়াল করার চেষ্টা করা হয়েছে এবং সেটি এখনও চলছে। এবং এই দলিল ফাঁস করে দিয়ে সেই সত্যটিকেই মানুষের সামনে তুলে ধরা হয়েছে। তিনি জানিয়েছেন, ২০০৪ সাল থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত মার্কিন সেনারা এক লাখ নয় হাজার মানুষের মৃত্যুর ঘটনা লিপিবদ্ধ করেছে, যার মধ্যে ৬৬ হাজার হচ্ছে বেসামরিক নাগরিক। মার্কিন সেনাদের হাতে এত হতাহতের ঘটনা ঘটলেও সেসব চেপে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছিল পেন্টাগন।

উইকিলিকস-এ মার্কিন সেনা গোয়েন্দা সংস্থার সাবেক বিশ্লেষক চেলসি ম্যানিং কর্তৃক ফাঁস করে দেওয়া তথ্যে দেখা গেছে, মার্কিন সেনাবাহিনী আফগানিস্তানে শত শত বেসামরিক নাগরিক হত্যা করেছে। ২০১০ সালে উইকিলিকস-এর ফাঁসকৃত তথ্যের মধ্যে ছিল একটি ভিডিও, যাতে দেখা গেছে ইরাকের বাগদাদে মার্কিন হেলিকপ্টার থেকে চালানো হামলায় কীভাবে বেসামরিক নাগরিকদের মরতে হয়েছে। ভিডিওতে একটি কণ্ঠ শোনা গেছে। সেই কণ্ঠকে বলতে শোনা গেছে, ‘সবাইকে জ্বালিয়ে দাও’। এরপরই বিভিন্ন ব্যক্তিকে লক্ষ করে হেলিকপ্টার থেকে গুলি ছোড়া হয়। আহতদের উদ্ধারে একটি গাড়ি এগিয়ে এসেছিলো। সেটিকে লক্ষ্য করেও গুলি ছোড়া হয়েছিলো। সেই হামলায় রয়টার্সের একজন আলোকচিত্রী ও তার সহকারী প্রাণ হারিয়েছিলেন।

প্রশ্ন হলো, মার্কিন জনগণসহ বিশ্ববাসীকে অন্ধকারে রাখা ইরাক ও আফগান আগ্রাসনের রক্তাক্ত বাস্তবতার দলিল ফাঁস করা কি স্রেফ হ্যাকিং? আড়াল করে রাখা রক্তাক্ত ভূমি, বীভৎস খুনের মহোৎসব, নির্জলা মিথ্যা প্রচারণা, সাম্রাজ্যের শকুনি লোভাতুর কূটনীতিকে জনসম্মুখে নিয়ে আসা কি স্রেফ হ্যাকিং? সাংবাদিকতা তাহলে কোনটা? যেটা বিবিসি-সিএনএন-রয়টার্স করেছে ইরাক-আফগান যুদ্ধের সময়, সেই ‘এমবেডেড জার্নালিজম’?
কী সাংবাদিকতা করেছে বিবিসি সিএনএন সে সময়? পাঠক, মূলধারার একজন সাংবাদিক জন পিলজারকে উদ্ধৃত করেই বলছি। ২০০৩ সালের এপ্রিলে তিনি ‘সাংবাদিকতা?’ শিরোনামে একটি নিবন্ধ লেখেন বিকল্প সংবাদমাধ্যম জি-নেটে। অবজারভার পত্রিকাকে উদ্ধৃত করে তিনি সেখানে বলেন, ইরাক যুদ্ধের কাভারেজ থেকে ২০ মিলিয়ন ডলার মুনাফার পরিকল্পনা করছে রয়টার্স। কাছাকাছি সময়ে বিবিসি’র তখনকার প্রধান নির্বাহী সমালোচনা করেছিলেন মার্কিন মিডিয়ার যুদ্ধভিত্তিক কাভারেজের। এক গবেষণার উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি বলেছিলেন, ইরাক আক্রমণকালে মার্কিন মিডিয়ায় সাক্ষাৎকার দেওয়া ৮৪০ জন বিশেষজ্ঞের মধ্যে যুদ্ধবিরোধিতা করতে দেখা গেছে মাত্র ৪ জনকে। লন্ডনভিত্তিক নিউ স্টেটসম্যান পত্রিকায় লেখা অপর এক নিবন্ধে পিলজার পরিসংখ্যান হাজির করে দেখিয়েছিলেন, ইরাকযুদ্ধের সময় যুদ্ধবিরোধী কাভারেজ না দেওয়ার তালিকায় দ্বিতীয় নিকৃষ্ট অবস্থানটি মার্কিন মিডিয়া এবিসি টেলিভিশনের। তবে শীর্ষ অবস্থানটি বিবিসিরই ছিল। তাদের যুদ্ধবিরোধী কাভারেজের হার ছিল ২ শতাংশ। এখানেই শেষ নয়। গার্ডিয়ান পত্রিকার তথ্যানুসারে, ১৯৯১ সালে বিবিসি তার সংবাদকর্মীদের বেসামরিক ক্ষয়ক্ষতি ও মৃত্যুর ছবি দেখানোর ব্যাপারে ‘সতর্ক’ থাকতে নির্দেশ দিয়েছিল। কিছুদিন পরেই ১৯৯১ সালের ক্রিসমাসের আগে লন্ডনের মেডিক্যাল এডুকেশন ট্রাস্ট জানায় যে ‘নিখুঁত আঘাত’ এবং এর পরবর্তী প্রতিক্রিয়ায় দুই লাখেরও বেশি ইরাকি নারী-পুরুষ-শিশু মারা গিয়েছে। পিলজার বলেছিলেন, এই চরম সত্যসংক্রান্ত একটি সংবাদও বিবিসি প্রচার করেনি। একইভাবে ইরাকে ১৩ বছরের অবরোধের ফলাফল সম্পর্কিত এক বিবিসি রিপোর্টও পাওয়া যায়নি।   

তো যারা অ্যাসাঞ্জকে সাংবাদিক মানতে নারাজ, তারা কি প্রকারান্তরে এটাই বলতে চান না যে, বিবিসি-রয়টার্সের মতো যুদ্ধবাজি করাই সাংবাদিকতা? লাশ গোপন করাই সাংবাদিকতা? হত্যাযজ্ঞ আর যুদ্ধাপরাধ আড়াল করাই সাংবাদিকতা? আর অ্যাসাঞ্জের মতো যুদ্ধাপরাধ ফাঁস করা, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাশক্তির মুনাফালিপ্সা আর যুদ্ধোন্মদনা ফাঁস করা হ্যাকিং? আসল কথাটা হলো, অ্যাসাঞ্জের অনন্য সাংবাদকিতার ভূমিকাকে স্বীকৃতি দিতে গেলে তাহলে তাকে হ্যাকার বানিয়ে শায়েস্তা করার রাস্তা থাকে না। নিজেও অ্যাসাঞ্জ একবার এ কথা বলেছিলেন যে, সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে অ্যাকটিভিস্ট হিসেবে সুরক্ষার যে সুযোগ রয়েছে, তা থেকে বঞ্চিত করাই তার হ্যাকার পরিচয়টি সামনে আনার উদ্দেশ্য।

করপোরেট সংবাদমাধ্যম সংবাদ নির্মাণে তার নিজস্ব মুনাফামুখীন দৃষ্টিভঙ্গি আর সামগ্রিক নব্য উদারবাদী বাজার ব্যবস্থার পক্ষে যে নিত্য প্রচারণা জারি রেখেছে একটি ক্রম-কর্তৃত্বতান্ত্রিক কর্তৃপক্ষীয় ব্যবস্থাপনার মধ্য দিয়ে, অ্যাসাঞ্জের উইকিলিকস তার বিপরীতে জনগণের মিডিয়া আকারে হাজির হওয়া এক অনন্য সংবাদপ্রতিষ্ঠান, যেখানে সংবাদসূত্র হতে পারেন সবাই। অগ্রসর প্রযুক্তির যুগে দক্ষ প্রযুক্তিবিদ হিসেবে উইকিলিকস-এর কারিগরেরা এমন একটি যোগাযোগ পদ্ধতি আবিষ্কার করেছেন, যেখানে কোনও রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা বাহিনীর প্রযুক্তি দক্ষতায় পৌঁছাতে পারে না। কে উইকিলিকসকে তথ্য দিলো, তা আজও যান্ত্রিক পদ্ধতিতে বের করা যায়নি। উইকিলিকস তার সংবাদসূত্রের শতভাগ গোপনীয়তা নিশ্চিত করে কোনও ধরনের সেন্সরশিপ ও তথ্যগত সম্পাদনা ছাড়া জনসম্মুখে হাজির করে।

আসলে অ্যাসাঞ্জ তার সহযোগীদের সঙ্গে মিলে যা করেছেন, সেটার নাম সাংবাদিকতা। আমরা যা করি সেটার নাম পাবলিক রিলেশন। এ কারণেই বিবিসি-সিএনএন-এর সাংবাদিকেরা ‘মহা মহা অনুসন্ধান’ করে নিরাপদে বেতন নিয়ে বাড়ি যান আর ধর্ষণ, আদালত অবমাননা আর হ্যাকিংয়ের দায়ে জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জের কপালে জোটে 'ক্রিমিনাল' তকমা।

লেখক: সহ-বার্তা সম্পাদক ও ইন্টারন্যাশনাল ডেস্ক ইনচার্জ, বাংলা ট্রিবিউন

 

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ