পাটের ব্যাগ, পাটের সাজ, তবুও দুর্দিন

Send
জোবাইদা নাসরীন
প্রকাশিত : ১৫:৪৯, এপ্রিল ১৮, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:৫১, এপ্রিল ১৮, ২০১৯

জোবাইদা নাসরীনপাটকল শ্রমিকদের নয় দফা দাবি আদায়ের লক্ষ্যে ৯৬ ঘণ্টার ধর্মঘট শুরু হয়েছিল ১৫ এপ্রিল। যদিও ওই দিন রাতেই ধর্মঘট স্থগিত করা হয়। মূলত রাষ্ট্রীয় পাটকলে উৎপাদন বন্ধ রেখে শ্রমিকরা এই ধর্মঘটের ডাক দেয়। এই নয় দফা বাস্তবায়নের দাবিতে গত কয়েক বছর ধরে আন্দোলন করছেন বাংলাদেশের পাটকল শ্রমিকরা।
এমনকি এই মাসের দুই, তিন এবং চার তারিখে তারা ৭২ ঘণ্টা ধর্মঘট এবং চার ঘণ্টা করে রাজপথ, রেলপথ অবরোধ কর্মসূচি পালন করেছে। এই নয় দফার মধ্যে রয়েছে, জাতীয় মজুরি কমিশন-২০১৫-এর বাস্তবায়ন, পাট কেনার জন্য অর্থ বরাদ্দ, বদলি শ্রমিকদের স্থায়ী করা, শ্রমিকদের প্রতি সপ্তাহে মজুরি পরিশোধসহ সব বকেয়া মজুরি প্রদান, অবসরপ্রাপ্ত শ্রমিক, কর্মচারী এবং কর্মকর্তাদের সব বকেয়া পরিশোধ, বকেয়া মজুরি, খালিশপুর এবং দৌলতপুর জুট মিলের শ্রমিকদের বিজেএমসির অন্যান্য মিলের মতো সব সুযোগ-সবিধা প্রদানসহ আরও কিছু ইস্যু। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন, রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্প প্রতিষ্ঠানে শ্রমিকদের মজুরি নির্ধারণে ‘জাতীয় মজুরি ও উৎপাদশীল কমিশন-২০১৫’ গঠন করা হয়।

এক সময় সোনালি আঁশের দেশ বলে খ্যাত বাংলাদেশে বেশ কয়েকটি পাটকল বন্ধ ঘোষণা এবং শ্রমিকদের আন্দোলনে সরকারি দেখভালকৃত পাটশিল্পের অবস্থা বেশ নাজুকই। অন্যান্য খাতের শ্রমিকদের মতো এই খাতের শ্রমিকরাও নানা ভোগান্তির শিকার। বাংলাদেশে মোট পাটকলের সংখ্যা ৩১৪টি, তার মধ্যে বন্ধ রয়েছে ৬৩টি পাটকল। বাংলাদেশ পাটকল সংস্থা (বিজেএমসি) নিয়ন্ত্রণাধীন পাটকলের সংখ্যা ২৭টি। এর মধ্যে তিনটি ননজুট কল রয়েছে। তবে বর্তমানে আরও ছয়টি পাটকল পুনঃগ্রহণ করায় মোট সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩৩টি, এর মধ্যে বন্ধ সাতটি। এর মধ্যে ২৮টি প্রতিষ্ঠান চলছে লোকসানে। বেসরকারি পাটকলের সংখ্যা ২৮১, যার মধ্যে বন্ধ রয়েছে ৫৬টি। একসময়কার এশিয়ার বৃহত্তম পাটকল হিসেবে ১৯৫১ সালে প্রতিষ্ঠিত হওয়া আদমজী জুট মিল ২০০২ সালে বন্ধ হয়ে যায়। বর্তমানে বিজেএমসির আওতাধীন পাটকলগুলোতে কর্মরত আছেন প্রায় ৮৫ হাজার শ্রমিক।

তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এই, পাট নিয়ে বাংলাদেশে দুই ধরনের চিত্র আছে। সরকারি পাটকলগুলোর দরজা একে একে বন্ধ হলেও আয় বাড়ছে বেসরকারি পাটগুলোর। বিশেষ করে ২০১০ সালের ১৬ জুন বাংলাদেশে পাটের জিনোম সিকোয়েন্স আবিষ্কারের ঘোষণার পর বেশ কিছুটা হারিয়ে যাওয়া বাংলাদেশের পাট নিয়ে দেশে এবং বিদেশে নতুন মাত্রায় আগ্রহ শুরু হয়। বলা হচ্ছে বিশ্ববাজারে পাটের চাহিদা এতটাই বেড়েছে যে গত নয় বছরে এর রফতানি বেড়েছে দ্বিগুণ। তাই দেশে পাটের চাষ বেড়েছে। আর বাড়ছে পাট চাষের জমির পরিমাণও। পাট থেকে তৈরি হওয়া নানা সামগ্রী নিয়ে গড়ে উঠেছে বিভিন্ন শিল্প প্রতিষ্ঠান। আগ্রহ দেখাচ্ছেন বিদেশি বিনিয়োগকারীরাও। দুই দশক আগেও বাংলাদেশে দড়ি, কার্পেট আর বস্তার বাইরে পাটকে অন্যভাবে কাজে লাগাতে পারে তা ভাবেনি। অথচ এখন পাটের তৈরি নানা ধরনের ব্যাগ, বাহারি গহনা, পুতুলসহ নানা ধরনের শোপিস। বেশ কিছুদিন থেকে দৈনন্দিন কেনাকাটায় পলিথিনের ব্যাগের জায়গায় স্থান পেয়েছে পাটের তৈরি ব্যাগ। নতুনভাবে পাটের পাতা থেকে তৈরিকৃত চা বিদেশে রফতানি হচ্ছে, আঁশ দিয়ে তৈরি হচ্ছে নানা ধরনের উন্নতমানের দৈনন্দিন ব্যবহার্য উপকরণ। এই চিত্র কিছুতেই ধুঁকে থাকা পাটকলগুলোর সঙ্গে মেলে না।

তবে রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, বেসরকারি পর্যায়ে পাট খাত থেকে আয় প্রতিবছরই বাড়ছে। গত ২০১৭-১৮ অর্থবছরের জুলাই-জানুয়ারি সময়ে পাট ও পাটজাত পণ্য রফতানির মাধ্যমে ৬৬ কোটি ডলার আয় করেছে বাংলাদেশ, হিসাবে যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে ১৭ দশমিক ৩৬ শতাংশ বেশি। তবে বেসরকারি পাটকলগুলোতে লাভ হলেও ২০১৬-১৭ অর্থবছের বিজেএমসির আওতাধীন পাটকলগুলোতে লোকসানের পরিমাণ ছিল ৪৮১ কোটি টাকা। প্রতিষ্ঠানটির বর্তমান লোকসান দাঁড়িয়েছে ৬১৯ কোটি ১৩ লাখ টাকা। বেসরকারিভাবে আয় বাড়লেও সরকারি প্রতিষ্ঠানটির লোকসানের পেছনে অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনাকে দীর্ঘদিন ধরে চিহ্নিত করা হয়েছে। কিন্তু এ বিষয়ে কোনও ধরনের কার্যকরী পদক্ষেপ যে নেওয়া হয়নি তা বোঝাই যাচ্ছে। পাট নিয়ে বেসরকারিভাবে যখন এত সাফল্যের কথা জানা যাচ্ছে, সেখানে সরকারি প্রতিষ্ঠানটি কেন লোকসানে– এবং সেই পাটকলগুলোর শ্রমিকরা যখন দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলনরত, তখন বোঝাই যায় সেখানে গভীর সমস্যা রয়েছে। এমনকি পাটের সঠিক মৌসুমেও দেখা গেছে, সরকারি এ প্রতিষ্ঠানটি বাজার নিয়ন্ত্রণেও ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে।

২০০৮ সালের আওয়ামী লীগের নির্বাচনি ইশতেহারেই ছিল পাটকে লাভজনক করার অঙ্গীকার। তাই বিজেএমসিকে লাভজনক করার জন্য প্রথম দফায় পাঁচ হাজার ২৪১ কোটি টাকা দেনা পরিশোধ করে। তবে শর্ত দেওয়া হয়েছিল, পরে বিজেএমসি সরকার থেকে কোনও ধরনের আর্থিক সহায়তা নেবে না। এরপর বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়া খুলনার খালিশপুর জুট মিলস, দৌলতপুর জুট মিলস, সিরাজগঞ্জের জাতীয় জুট মিলস, চট্টগ্রামের কর্ণফুলী জুট মিলস ও ফোরাম কারপেটস ফ্যাক্টরি ফিরিয়ে নিয়ে চালু করে।

তবে শ্রমিকরা হয়ে পড়ছে দুই পক্ষেরই ব্যর্থতা দেখানোর পুঁজি। সরকার বলছে, ‘শ্রমিকদের স্বার্থেই লোকসান দিয়ে পাটকল চালু রাখতে হচ্ছে। অন্যদিকে তদারকি সংস্থা বিজেএমসি বলছে, ‘লোকসানের জন্য শ্রমিকদের বেশি মজুরি ও অধিক সংখ্যা দায়ী’। রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলে লোকসানের কারণ হিসেবে যে বিষয়গুলো বিভিন্ন সময় আলোচিত হয়েছে, তা হলো অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতি। অধিকন্তু তারা পাট কেনে দেরিতে ও বেশি দামে।

সরকারি এবং বেসরকারি পাটকলগুলোর চিত্র এতটাই বিপরীত যে, সেখানে এই বৈপরীত্যের কারণগুলোও স্পষ্ট প্রতীয়মান হয়। এই পার্থক্যই আমাদের কাছে আরও খোলাসা করে কেন এই শ্রমিক আন্দোলন? কেন সরকারি পাটকলগুলো ধুঁকে ধুঁকে মরছে। কেন একের পর এক পাটকল বন্ধ হচ্ছে। সরকার পাটের ওপর গুরুত্ব দিলেও কেন সরকারি পাটকলগুলো বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, সেই বিষয়ে গুরুত্ব দিচ্ছে না। কেন বেসরকারি পাটকলগুলো লাভ করলেও সরকারি পাটকলগুলো লোকসান গুনছে, সেটির জন্য বড় ধরনের হস্তক্ষেপ প্রয়োজন। শ্রমিকদের ঘাড়ে দোষ চাপিয়ে লোকসানের ফিরিস্তি দেওয়া থেকে বের হয়ে এসে অন্য সমস্যাগুলোতে চোখ রাখলেই হয়তো মূল সমস্যাগুলো সামনে আসবে। মূলত পাটকলকে কেন্দ্র করেই এদেশে ট্রেড ইউনিয়ন এবং শ্রমিক সংগঠনগুলো গড়ে উঠেছিল, তারাও হয়তো লড়ছেন তাদের মতো করেই। শ্রমিকদের নয় দফা বাস্তবায়নের পাশাপাশি অন্যান্য  সমস্যাকে সত্যিকারভাবে চিহ্নিত করে লাভের মুখ দেখাই সরকারি পাটকলগুলোর বড় চ্যালেঞ্জ। এটাতে জিততেই হবে।

লেখক: শিক্ষক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
ইমেইল: zobaidanasreen@gmail.com

 

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ