যেমন ওসি তেমন এসপি!

Send
হারুন উর রশীদ
প্রকাশিত : ০০:০৬, এপ্রিল ১৯, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ২১:৫০, এপ্রিল ১৯, ২০১৯





হারুন উর রশীদএকটা প্রবাদ আছে ‘বাপ কা বেটা’, ‘সিপাই কা ঘোড়া’। কিন্তু ফেনীর সোনাগাজীতে নুসরাত হত্যার ঘটনায় এখন হয়তো আধুনিক আরেকটি প্রবাদের জন্ম হলো- ‘যেমন ওসি তেমন এসপি’। প্রাচীন ও বহুল প্রচলিত ওই দু’টি প্রবাদে কিন্তু গুরু শিষ্যের একটা ব্যাপার আছে, সিনিয়র জুনিয়রের ব্যাপার আছে। যেমন, বাবার মতো ছেলে। আর সিপাহীর মতো ঘোড়া। কিন্তু সর্বশেষ যে আধুনিক প্রবাদের কথা বললাম সেখানে কিন্তু গুরু শিষ্যের অনুগামী। অর্থাৎ ‘যেমন শিষ্য তেমন গুরু’। এখনকার বিষয়টি হলো ‘গুরু মারা শিষ্য’। ‘গুণে’ গুরু শিষ্যের অনুগামী হয়েছেন!


আমরা ফেনীর সোনাগাজী থানার সদ্য প্রত্যাহার হওয়া ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোয়াজ্জেম হোসেনের কীর্তির কথা এরইমধ্যে সবাই জেনে গেছি। তিনি ধর্ষণ চেষ্টার ঘটনাকে কীভাবে ‘নাটক’ বানানোর চেষ্টা করেছেন। আগুনে পুড়িয়ে হত্যাচেষ্টার ঘটনা কীভাবে আত্মহত্যা চেষ্টা বলে চালাতে চেষ্টা করেছেন। এসবই আমাদের জানা। কিন্তু আগে কিছুটা সন্দেহ হলেও এবার প্রকাশ পেয়েছে ওসি সাহেবের বস ফেনীর পুলিশ সুপার (এসপি) জাহাঙ্গীর আলম সরকারের কাহিনি। সংবাদমাধ্যমে সর্বশেষ প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী পুলিশ সদর দফতরে তিনি একটি প্রতিবেদন দিয়েছেন। তাতে ওসি সাহেবকে রক্ষা এবং তাকে ধোয়া তুলসী পাতা প্রমাণে সর্বাত্মক চেষ্টা করেছেন তিনি। এসপি’র প্রতিবেদনের যা বলা হয়েছে তাতে নুসরাতের গায়ে আগুন উড়ে এসে লেগেছে বা ভূতে লাগিয়েছে।
সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, নুসরাতের গায়ে আগুন দেওয়ার ঘটনা নিয়ে ফেনীর এসপি জাহাঙ্গীর আলম সরকার নুসরাত জাহান রাফির মৃত্যুর পরদিন ১১ এপ্রিল পুলিশ সদর দফতরে যে প্রতিবেদন দেন, তাতে বলা হয়েছে,‘ঘটনার দিন নুসরাত মাদ্রাসায় যান। এরপর তাঁর বসার স্থানে ফাইলপত্র রেখে সাইক্লোন শেল্টারের ছাদের ওপরে বাথরুমের কাছে যান। কিছুক্ষণ পর গায়ে আগুন লাগা অবস্থায় সিঁড়ি দিয়ে চিৎকার করতে করতে নেমে আসেন। তখন কেন্দ্রে দায়িত্বরত পুলিশ সদস্য ও মাদ্রাসার কর্মচারীরা আগুন নিভিয়ে ফেলেন। ঘটনার পর পুলিশের পক্ষ থেকে পরিবারকে বারবার অনুরোধ করা হলেও তারা মামলা করতে কালক্ষেপণ করে। পুলিশ নুসরাতের চাচাকে বাদী করে মামলা করতে গেলে নুসরাতের ভাই মাহমুদুল হাসান আপত্তি জানান। তিনি দু’বার এজাহার বদল করেন।’ (প্রথম আলো,১৭ এপ্রিল,২০১৯)
এটা সংবাদমাধ্যমে প্রতিবেদনের প্রকাশিত অংশ। হয়তো প্রতিবেদনে আরও কিছু বলা হয়ে থাকতে পারে। তবে এখানে তিনি যা বলেছেন তাতেই তার উদ্দেশ্য স্পষ্ট হয়েছে। তার উদ্দেশ্য বুঝতে প্রতিবেদনের এই তথ্য একটু আলাদা আলাদা করে দেখা যাক।
১. নুসরাত পরীক্ষার হলে ফাইলপত্র রেখে নিজেই সাইক্লোন শেল্টারের ছাদের ওপরে বাথরুমের কাছে যান। (কেউ তাকে ছাদে ডেকে নিয়ে যায়নি!)
২. গায়ে আগুন লাগা অবস্থায় নুসরাত সিঁড়ি দিয়ে চিৎকার করতে করতে নেমে আসে। (কেউ তাকে আগুন দেয়নি!)
৩. পুলিশ বারবার অনুরোধ করলেও নুসরাতের পরিবার মামলা করতে কালক্ষেপণ করে। (নুসরাতের পরিবার নিরীহ লোকজনকে ফাঁসাতে ষড়যন্ত্র করছিল!)
৪. নুসরাতের ভাই দু’বার এজাহার পরিবর্তন করেন। (পুলিশের কথামতো এজাহার দায়ের করলেই ভালো হতো?)
এসপি সাহেবের প্রতিবেদনের প্রথম দু’টি পয়েন্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে নুসরাতকে ছাদে ডেকে নিয়ে দুর্বৃত্তরা আগুন দেয়নি। সেখানে সে নিজেই আপন মনে গিয়েছে এবং শরীরে আগুন নিয়ে নিচে নেমে এসেছে। আর পরের দু’টি পয়েন্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে নুসরাতের পরিবার মামলা নিয়ে নাটক করেছে। তাহলে এসপি সাহেব কি বলতে চাইছেন আগুনে পুড়িয়ে হত্যার অভিযোগ যথার্থ নয়? আগুন এমনি এমনিই লেগেছে। আর পুলিশ বা থানার ওসি কোনও অবহেলা করেনি। আসলে তার প্রতিবেদনের ভাষাই বলে দেয় তিনি কি বলতে চাচ্ছেন।
গত ৬ এপ্রিল নুসরাতকে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে হত্যার চেষ্টা করা হয়। আর ওই দিন ঘটনার পর কিন্তু ওসি সাহেব এটাকে আত্মহত্যার চেষ্টার ঘটনা বলে প্রচার চালিয়েছেন। সংবাদমাধ্যমকেও বলেছেন। ১০ এপ্রিল রাতে ঢাকা মেডিক্যালের বার্ন ইউনিটে নুসরাত মারা যায়। আর এসপি ১১ এপ্রিলে দেওয়া প্রতিবেদনেও নুসরাতকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যা চেষ্টার কোনও তথ্য পেলেন না। তাহলে আমরা কী বুঝবো? কে কাকে অনুসরণ করছেন? এসপি সাহেব ওসিকে, না ওসি সাহেব এসপিকে। না দু’জনই একই উদ্দেশ্য নিয়ে গোড়া থেকেই কাজ করছেন?
এজাহার পরিবর্তন নিয়ে এসপি’র কেন এত ক্ষোভ?
ওসি সাহেব যে তার ইচ্ছেমতো এজাহার তৈরি করে তা দায়ের করাতে চেয়েছিলেন তাও চেপে গেলেন এসপি সাহেব। ওসি সাহেবের তৈরি করা এজাহারে কিন্তু মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলা, ওয়ার্ড কাউন্সিলর মাকসুদ আলমসহ গুরুত্বপূর্ণ আরও কয়েকজন আসামির কথা বলা হয়নি। বলা হয়েছে অজ্ঞাত আসামির কথা। শুধু তা-ই নয়, ওসির তৈরি করা এজাহারে ঘটনাস্থল এদিক-ওদিক করে দেওয়া হয়েছিল। ঘটনার বর্ণনায় ইচ্ছে করে অনেক ‘লুপ হোল’ তৈরি করা হয়েছিল। নুসরাতকে যে হাত-পা বেঁধে আগুন লাগিয়ে দেওয়া হয় তাও বলা হয়নি। তার মানে হলো, ওসির করা এজাহার গ্রহণ করলে মূল আসামিরা বাদ পড়ে যেতো, হত্যা না আত্মহত্যা সেই প্রশ্ন থেকে যেতো। ওসি’র আসল উদ্দেশ্য পূরণ হতো। আর তা না হওয়ায় মনে হয় এসপি সাহেব ক্ষুব্ধ হয়েছেন। তাই তিনি এজাহার নিয়ে নুসরাতের পরিবারের কালক্ষেপণ, এজাহার পরিবর্তন এসব বিষয়ে গুরুত্ব দিয়েছেন। কিন্তু এসব বলতে গিয়ে আসলে নিজের অজান্তেই প্রমাণ করেছেন তিনি ওসি সাহেবেরই লোক। একই উদ্দেশ্যে কাজ করেছেন। আর এখন ওসি সাহেবকে বাঁচাতে তৎপর আছেন। সর্বশেষ দৈনিক ইত্তেফাকের ১৮ এপ্রিলের খবরে এও জানা যাচ্ছে যে ওসি সাহেবের মতো এসপি সাহেবও ঘটনার দিন পুলিশ সদর দফতরকে নুসরাতকে পুড়িয়ে হত্যাচেষ্টার ঘটনাকে আত্মহত্যা চেষ্টা বলে জানিয়েছিলেন।
এসপি সাহেব যে ওসি সাহেবেরই লোক তার আরও প্রমাণ আছে। ঘটনার একদিন পর যখন পুলিশ সদর দফতর জানায় যে ওসিকে প্রত্যাহার করা হয়েছে তখন এসপি সাহেবের কিন্তু প্রত্যাহার শব্দে ঘোর আপত্তি ছিল। তিনি তখন স্থানীয় সাংবাদিকদের জানান, প্রত্যাহার নয়, বদলি করা হয়েছে। নিয়মিত বদলি।
বেরিয়ে আসছে ভয়ঙ্কর তথ্য:
পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)-এর তদন্তে এখন নুসরাতকে পুড়িয়ে হত্যার ঘটনা পুরোপুরি স্পষ্ট হয়েছে। পরিকল্পনা, কারা হত্যায় অংশ নিয়েছে, ঘটনার সময় কে কোথায় ছিল, কত লিটার কোরোসিন কেনা হয়েছে, বোরকা কোথা থেকে কেনা হয়, ছাদে কতজন নারী ও কতজন পুরুষ ছিল, তারা কীভাবে পালিয়ে যায় যায়, টাকার লেনদেন কীভাবে হয়; নেপথ্যে কারা ছিল, সবকিছু। আরও যে ভয়াবহ তথ্য পাওয়া গেছে তা হলো স্থানীয় পর্যায়ে সাংবাদিক ম্যানেজ। ওসি সাংবাদিকদের ঘটনাটিকে আত্মহত্যা চেষ্টা বলে খবর দেওয়ার জন্য ম্যানেজের চেষ্টা করেন। কেউ কেউ সেই লাইনে খবরও পাঠিয়েছিলেন। কয়েকজন সাংবাদিক আত্মহত্যা চেষ্টা বলে ফেসবুকে পোস্টও দিয়েছিলেন। তাদের মধ্যে একজন সাংবাদিককে এরইমধ্যে তার প্রতিষ্ঠান থেকে বরখাস্তও করা হয়েছে। ওয়ার্ড কাউন্সিলর মাকসুদ আলম এবং উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি রুহুল আমীনও স্থানীয় সাংবাদিকদের ওপর চাপ সৃষ্টি ও অর্থ দিয়ে ম্যানেজ করার চেষ্টা করেন বলে অভিযোগ আছে।
পিবিআই বৃহস্পতিবার বলেছে, তারা দ্রুতই এই মামলার চার্জশিট দিতে পারবে। আর পুলিশ সদর নুসরাতের ঘটনায় পুলিশের ভূমিকা নিয়ে তদন্ত শুরু করেছে। তারা তদন্তে সোনাগাজীও গিয়েছেন। আমার কথা হলো দায়িত্বে অবহেলা এবং অপরাধে সহযোগিতা করা বা অপরাধীদের রক্ষার চেষ্টা এক নয়। অপরাধীদের সহযোগিতা করা বা তাদের রক্ষার চেষ্টা করা মূল অপরাধেরই সমান। আমরা এখন পর্যন্ত আসামিদের গ্রেফতারে তার প্রতিফলন পুরো দেখতে পাচ্ছি না। ওসি এবং এসপি এই দুই পুলিশ কর্মকর্তার যেসব ভূমিকার কথা আমরা জানতে পারছি তা কি শুধুই দায়িত্বে অবহেলা না ফৌজদারি অপরাধ? আমার মনে হয় ফৌজদারি অপরাধ। তাহলে তারা কেন এখনও আইনের আওতায় আসছে না?
আইন কি গতি হারাবে?
২৭ মার্চ মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলা তার নিজ অফিস কক্ষে নুসরাতকে যৌন হয়রানি করে ওই দিনই গ্রেফতার হন। কিন্তু ওসি সাহেব ওই ঘটনায় নুসরাতকে আপত্তিকর প্রশ্নের মাধ্যমে জেরা করে ঘটনাটিকে নাটক বানানোর চেষ্টা করেন। সে হাত দিয়ে মুখ ঢেকে রাখলেও হাত সরাতে বাধ্য করেন। শুধু তা-ই নয়, সেটা ভিডিও করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছেড়ে দেন। তার এই জঘন্য অপরাধে পুলিশ কোনও ব্যবস্থা নেয়নি। একজন আইনজীবী পরে ডিজিটাল আইনে মামলা করেছেন। তারপরও তাকে গ্রেফতার করা হয়নি। আর হত্যাচেষ্টাকে আত্মহত্যা চেষ্টা বলে চালানোর ঘটনায়ও কোনও ব্যবস্থা আমরা এখনও দেখতে পাচ্ছি না। বদলি বা প্রত্যাহার তো কোনও শাস্তি নয়। ওসি তো এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত বলে স্পষ্ট। কিন্তু তারপরও তিনি আসামি নন। তার জায়গা এখনও কারাগারে হয়নি। তিনি চাকরিতেই আছেন। তিনি পুলিশ না হয়ে আমজনতা হলে কি কারাগারের বাইরে থাকতে পারতেন?
আর পুলিশ সুপার সাহেবের যে ঘটনা জানা যাচ্ছে, তার প্রতিবেদনে যে উদ্দেশ্য প্রকাশ পাচ্ছে তাতে এই সুপার পুলিশের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়ার সময় আসেনি? তিনি কি এরপরও পুলিশ সুপার থাকবেন? তিনি কি ফৌজদারি অপরাধের আওতায় আসবেন না?
তাহলে আইন কোথায় থাকবে?

একই মালার ‘ফুল”
বৃহস্পতিবার পুলিশ সদর দফতরের ডিআইজি মো. রুহুল আমীন বলেছেন, প্রাথমিকভাবে ওসি মোয়াজ্জেমের দায়িত্বে অবহেলার প্রমাণ মিলেছে। নুসরাতের কাছ থেকে যৌন হয়রানির অভিযোগ যথাযথভাবে আমলে নিলে তাকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যার ঘটনা এড়ানো যেতো। ওসিসহ পুলিশের অন্য কর্মকর্তাদের গাফিলতির বিষয়ে গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে।
কিন্তু প্রশ্ন হলো এসপি’র নাম তারা মুখে আনছেন না কেন? তার বিরুদ্ধে কি তদন্ত হচ্ছে না? ঘটনা প্রবাহ প্রমাণ করছে ওসি এবং এসপি ‘একই মালার দু’টি ফুল’। তাহলে আরেক ‘ফুলের’ কী হবে?

 

লেখক: সাংবাদিক

ইমেইল:swapansg@yahoo.com

/টিটি/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ