রাজনীতিতে সহমতের কেউটে

Send
তুষার আবদুল্লাহ
প্রকাশিত : ১৪:১৫, এপ্রিল ২০, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৪:২০, এপ্রিল ২০, ২০১৯

তুষার আবদুল্লাহএকটা সময় ছিল যখন সফরে নানা রাজনৈতিক মতের মানুষের দেখা পেতাম। এক চায়ের টেবিলে আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টি, বাম এবং জামায়াতের মতাদর্শের মানুষকে পাওয়া যেত। পথের পাশের চায়ের দোকান, প্রেস ক্লাব বা অন্য যেকোনও আড্ডায় ভিন্ন মতের কথা শুনতাম। কৃষক, মজুর থেকে শুরু করে নানা পেশার মানুষ তর্ক-বিতর্কে যোগ দিতেন। যুক্তি এবং অন্ধত্বের মিশেল ছিল এসব আড্ডায়। তারপরও এমন তর্ক ছিল প্রাণবন্ত। ক্ষণিক উত্তাপ ছড়িয়ে পড়লেও, খানিক বাদেই সকল মতের মধ্যে সম্প্রীতি লক্ষ করেছি। সফরে এখনও আছি। পথে এখনও আড্ডা জমে। মুশকিল হলো বিচিত্র মত, এক মতে রূপ নিয়েছে। কোনও ভিন্ন মত পাই না। সবাই যেন এক আদর্শকে ধারণ করে আছে। সবাই মিলে যোগ দিয়েছে আওয়ামী লীগে। কোথাও বিএনপি নেই, জাতীয় পার্টি নেই, বাম নেই। আমার কাছে মতের এই একীভূত হওয়াটা ভয়ংকর মনে হচ্ছে। আমি আতঙ্কিত। সফরে থাকার অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, যারা এক মতে এসে হাজির হয়েছেন, সেই কোনও কোনও মুখ তো আমার পরিচিত। চায়ের দোকান, বন্ধুর বাড়ি, নদীর পাড়, প্রেস ক্লাব, রেস্টুরেন্টে বছর পাঁচেক আগেও তারা কোনও মত ও দল নিয়ে বাজি ধরে গেছেন, সেই স্মৃতি এখনও টাটকা। সেই মুখ ও কণ্ঠগুলো সব আওয়ামী বন্দনায় উচ্ছল এবং কাতর। তাদের এই উচ্ছলতায় হালাল আওয়ামী মুখ ও কণ্ঠগুলো কোণঠাসা। বিশেষ করে ৩০ ডিসেম্বরের পরে এখন আওয়ামী লীগ ছাড়া ভিন্নমত পথে দুর্লভ।

সফরের পর্যবেক্ষণ হলো জনতা বিএনপি নিয়ে আপাতত কোনও বাজি ধরতে রাজি নয়। তাদের কাছে বিএনপির রাজনীতি নিয়ে আস্থা রাখার মতো কোনও পূর্বাভাসও নেই। নেতৃত্বকেও তারা ছত্রভঙ্গ দেখতে পাচ্ছে। জাতীয় পার্টিকেও তারা রাজনীতির অংকের খাতায় তুলতে নারাজি। বাম নিজেই তো ক্ষমতার কাছে নতজানু। জামায়াত অদৃশ্য। এই বাস্তবতায় রাজনীতি যাদের যাপিত জীবনের প্রধান মুদ্রা, তারা আপাতত আওয়ামী লীগ বেছে নিয়েছে। ভিড়ে গেছে তারা আওয়ামী লীগের সঙ্গে। এতটাই মিশে গেছে যে দুধের ভেতর থেকে জল আলাদা করার মতোই কঠিন তাদের চিহ্নিত করা। এই ‘জল’দের দাপট এখন রাজনীতির মাঠে। তাদের সঙ্গে যোগ দিয়েছে আওয়ামী লীগের বঞ্চিত বা পরিত্যক্ত নেতাকর্মীরা। এরা এক জোট হয়ে 'ইঁদুরে' রূপ নিয়েছে। কাটছে দলের ঐক্য। 'ইঁদুর' যে তৎপর সেটা আমরা উপজেলার ভোটে দেখতে পেয়েছি। সামনে যে আরও নানা প্রকারের ভোট আছে সেখানেও দেখতে পাবো।

রাজনীতির মাঠের বাইরে অফিস আদালতেও একই চালচিত্র। সবাই যেন আওয়ামী লীগ আদর্শকে বাস্তবায়িত করার জন্যই কোমর বেঁধে নেমেছে। আসলে বাস্তবতা হলো পদ-পদবি-পুরস্কার বগলদাবা করা। ক্ষমতার মেরুকরণ, পালাবদল হয় কিন্তু তারা লক্ষ্যচ্যুত হন না। ফায়দা লুটতে ভোল পাল্টে ফেলেন মুহূর্তেই। এখন সর্বত্র তাদের পদ ও কণ্ঠভারে প্রকম্পিত হচ্ছে। তাদের আওয়াজে সঙ্কুচিত হালাল আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা।

সংকটের দিক দুই দিকে। প্রথমত আওয়ামী লীগ  এবং দ্বিতীয়ত রাজনীতি। আওয়ামী লীগ আচমকা আত্মপ্রকাশ করা কোনও রাজনৈতিক দল নয়। মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব দেওয়া ছাড়াও দলটি নানা ঘাত-প্রতিঘাত-ষড়যন্ত্র ডিঙিয়ে বর্তমান অবস্থানে পৌঁছেছে। ক্ষমতায় টানা তৃতীয়বারের মতো আসার বাইরেও সাংগঠনিক ভিত্তি দৃঢ় হয়েছে। এই ভিতের যদি ক্ষয় শুরু হয়, তাহলে শুধু দল হিসেবে আওয়ামী লীগ নয় বাংলাদেশের রাজনীতির ভিতের চিড় ধরবে। বাংলাদেশের রাজনীতিকে এক আওয়ামী মতে রূপদান করাও রাজনৈতিক শুদ্ধতার জন্য উপকারী হবে না। বরং নানা মতের সঙ্গে রাজনীতির মাঠে লড়াইয়ের সুযোগ না পেলে, সাংগঠনিক অসাড়তা আসার সুযোগ থাকে। দলের সাংগঠনিক বুনন মজবুত থাকলে বিরোধী মত সামাল দেওয়া আওয়ামী লীগের জন্য পেরেশানের হওয়ার কথা নয়। বরং আওয়ামী লীগকে সতর্ক থাকা দরকার– বহিরাগত যারা সহমতের ভান ধরে আছে, তারা যে কোনও সময় ভয়ংকর হয়ে উঠতে পারে। এদের অনেকে এক সময় বিএনপি-জামায়াতের সহমত দেখিয়ে পরে ছোবল দিতে ভুল করেনি। বিএনপি হয়তো এখনও ভুলতে পারেনি সেই দংশনের জ্বালা। সফরে সেই ‘কেউটে’দের দেখি আর আতংকিত হই। এরা আওয়ামী লীগের নয়, বিএনপির নয়। এরা রাজনীতিরই নয়। ক্ষমতার ‘মিঠাই’ কেবল তাদের খাবার। তারা যে একেবারে রাজনীতির ময়দানের অপরিচিত কেউ, তা নয়। তারপরও আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো তাদের সামনেই বাড়িয়ে দেন প্রসাদের থালা।

গত তিন দশকে বাংলাদেশের রাজনীতির অবনতির দিকটি হলো-এখন সকল পেশা-শ্রেণির মানুষ সেই প্রসাদের থালায় ভাগ বসাতে শিখে গেছে। কারণ এই তিন দশকের রাজনীতি বুঝিয়ে দিয়েছে রাজনীতির মতাদর্শতে কেবল চিড়ে ভোজনযোগ্য হয় না। নগদ যেটুকু মিঠাই পাওয়া যায়, তাই পেটে পুরে নেওয়া ভালো। সেই বুঝ থেকেই এখন ঘরে মাঠেঘাটে সবাই এক মতের ভান ধরে বসে আছে। আবারও বলছি রাজনীতির জন্য এই ভান ভয়ঙ্কর।

লেখক: বার্তা প্রধান, সময় টিভি

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ