অনাবিষ্কৃত রাজস্ব ভাণ্ডার হলো ক্যাবল টিভি

Send
সাইফুল হাসান
প্রকাশিত : ১৫:২৫, এপ্রিল ২০, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:২৬, এপ্রিল ২০, ২০১৯

সাইফুল হাসাননিজেদের প্রস্তুত না করেই, ১৯৯২ সালে আকাশ খুলে দিয়েছিলো বাংলাদেশ। ক্যাবল নিউজ নেটওয়ার্ক বা সিএনএন দিয়ে শুরু। এরপর স্টার, জিটিভি, এমটিভির মতো শত শত স্যাটেলাইট চ্যানেল বৈশ্বিক সংস্কৃতির ঝাঁপি নিয়ে ঢুকে পড়ে এদেশের আঙিনায়। মানুষের মনে-মগজে। এতে সাংস্কৃতিক আগ্রাসন বাড়লেও, বাংলাদেশ টেলিভিশনের একঘেয়েমি থেকে মুক্তি পায় মানুষ। বিদেশি চ্যানেলগুলো পোক্তভাবে গেড়ে বসার পর বেসরকারি খাতে টেলিভিশন চ্যানেলের অনুমতি দেয় সরকার। ততদিনে বিশ্ব মিউজিক, নাটক, সিনেমা, ফ্যাশন, সেলিব্রেটি, অনুষ্ঠানসহ বহু কিছুর সঙ্গে পরিচিত দেশের মানুষ।
শুরুতে ব্যয়বহুল হলেও, ক্যাবলে সংযোগ দেওয়া শুরু হলে, স্যাটেলাইট চ্যানেল দেখার খরচ সব শ্রেণির মানুষের নাগালের মধ্যে চলে আসে। কম খরচ এবং ঝক্কিঝামেলাহীন হওয়ায় দ্রুত জনপ্রিয়তা পায় ডিশ বা ক্যাবল টিভি। এবং দ্রুত তা সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ে। বর্তমানে গ্রাহকপ্রতি মাসিক খরচ শহরে সর্বোচ্চ ৬০০ এবং প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে সর্বনিম্ন ১০০ টাকা। এক্ষেত্রে মোট চ্যানেল সংখ্যার তারতম্যও ব্যাপক।

মোবাইল নেটওয়ার্কের মতোই ডিশ বা ক্যাবল দেশের প্রান্তিক পর্যন্ত বিস্তৃত। সবার অগোচরে, ক্যাবল বড় খাতে পরিণত হয়েছে। প্রতিমাসে নগদ লেনদেন শত শত কোটি টাকা। বনেদি নয় বলেই হয়তো সরকার এবং জনগণ খাতটির প্রতি উদাসীন। অথচ, এখাত থেকে প্রতিবছর হাজার কোটি টাকারও বেশি রাজস্ব পেতে পারে সরকার।

অপারেটর কত

যাত্রার প্রায় তিন দশক হতে চললেও, ক্যাবল খাতটি অনিয়ন্ত্রিত, অরক্ষিত এবং অনাবিষ্কৃত। দেশের মোট ক্যাবল সংযোগ কত? কতজন অপারেটর জনগণকে টেলিভিশন সেবা দেয়? এসবের প্রকৃত তথ্যও নেই কোথাও। ক্যাবল অপারেটরদের সংগঠন কোয়াবের হিসাবে, দেশে অপারেটর সংখ্যা সর্বোচ্চ চার হাজার। কিন্তু খাত সংশ্লিষ্ট এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার মতে, ক্যাবল ও ফিড মিলিয়ে অপারেটর সংখ্যা ৮ হাজারের বেশি হবে।

খাতটির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে– ঘরে বসে একজন অপারেটরের পক্ষে বলা সম্ভব নয় তার গ্রাহক কত। এনালগ সিস্টেমের কারণে অপারেটর নির্ভর করে লাইনম্যানের ওপর। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এই লাইনম্যানরা এক একজন খুদে অপারেটর। খাতটিতে মূল অপারেটর, সাব অপারেটর, সাবের সাব, তার সাবসহ অপারেটরের অভাব নেই। প্রযুক্তিগত দুর্বলতা, নিয়ন্ত্রণ ও জবাবদিহিতা না থাকায় এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয় মূল অপারেটরদেরই। কেননা বিনিয়োগ তার, আর আয় খেয়ে নিচ্ছে অন্য কেউ। চাপ নেই, ফলে অনেকেই লাইসেন্স নিতে আগ্রহ দেখায় না। এ কারণেই বহু অপারেটর রয়ে গেছে হিসেবের বাইরে।

অপারেটরদের লাইসেন্সিং কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশ টেলিভিশন। বিটিভির লাইসেন্স শাখা জানিয়েছে, ২০১৮ সাল পর্যন্ত দেশে নিবন্ধিত অপারেটরের সংখ্যা ৩১৫৮। এর মধ্যে ১৭শ’ ফিড, বাকিরা ক্যাবল অপারেটর। বিটিভির কর্মকর্তারা মনে করেন, প্রকৃত অপারেটরের সংখ্যা অনেক অনেক বেশি। কিন্তু লোকবলের অভাবে দেশজুড়ে নজরদারি সম্ভব হয় না। তাই অনেকেই লাইসেন্স ছাড়াই ব্যবসা করছে। এবং সরকার বঞ্চিত হচ্ছে লাইসেন্স ফি থেকে। যেখানে বিদ্যুৎ আছে সেখানেই ক্যাবল টিভি সংযোগ এবং অপারেটর আছে। অবশ্য বিদ্যুৎহীন কিছু এলাকায় জেনারেটরের মাধ্যমেও স্যাটেলাইট চ্যানেল দেখানো হয় বলে জেনেছি।

গ্রাহক কত ক্যাবল টিভির?

কঠিন প্রশ্ন, যার উত্তর কেউ জানে না। কারও কাছে সঠিক কোনও তথ্য নেই। সবাই অনুমাননির্ভর। গ্রাহক নিয়ে, অপারেটরদের দাবি এবং বাস্তবতার তফাৎ আকাশ পাতাল। অপারেটরদের দাবি, গ্রাহক সর্বোচ্চ ৪০ লাখ। অন্যদিকে সাধারণ মানুষ, স্থানীয় চ্যানেল মালিক ও কর্মীদের ধারণা, এই সংখ্যা তিন থেকে সোয়া তিন কোটি। অপারেটরদের দাবি যে ডাহা ভুল এ নিয়ে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই। ধারণা করি, সারাদেশের চায়ের দোকান আর সেলুনে যে ক্যাবল সংযোগ আছে, সেই সংখ্যাও অপারেটরদের দাবির চার ভাগের এক ভাগ হবে। অন্যান্য হিসাব বাদই গেলো।

সবশেষ আদমশুমারি, অর্থনৈতিক শুমারি-১৩, জাতীয় প্রবৃদ্ধি, মাথাপিছু আয়, লেবার ফোর্স সার্ভে, দারিদ্র্য বিমোচন সূচক, বিদ্যুৎ পরিস্থিতি, জনসংখ্যা প্রবৃদ্ধি, টেলিভিশন বিক্রির হার সহ আরও কিছু সরকারি তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ব্রডকাস্টারদের অনুমান মোটামুটি যৌক্তিক। যদিও প্রকৃত গ্রাহকসংখ্যা আরও বেশি বলে আমার বিশ্বাস।   

সরকারি হিসেবে, দেশের ৯৩ ভাগ এলাকা বিদ্যুতের আওতাধীন। অর্থাৎ ক্যাবলের আওতায়ও আছে সমপরিমাণ এলাকার মানুষ। গড় হিসেবে, অত্র এলাকায় ১৪ কোটি ৮৮ লাখ মানুষের বাস (১৬ কোটি ধরে; যদিও প্রকৃত জনসংখ্যা অনেক বেশি)। খানা জরিপ অনুযায়ী, দেশে পরিবার প্রতি সদস্যসংখ্যা ৪.৫ জন। এ হিসেবে ৩ কোটি ৩০ লাখের কিছু বেশি পরিবার বিদ্যুৎ সুবিধাধীন। এমনও হতে পারে, বিদ্যুৎ সংযোগকে ভিত্তি ধরেই সোয়া তিন কোটি গ্রাহক দাবি করছেন ব্রডকাস্টাররা। বিদ্যুৎ সংযোগ থাকলেই ক্যাবল টিভি থাকবে এমন নয়। তবে, বিদ্যুৎ সংযোগ আছে, এমন ৯০ ভাগ পরিবারে ক্যাবলে সংযুক্ত, এই দাবি করা যায়। কেননা, পরিসংখ্যান বলছে, দেশের দরিদ্র মাত্র ০.২৩% পরিবারের টিভি নেই।

২০১২ সালে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) একটি পকেটবুক প্রকাশ করে। যেখানে উল্লেখ আছে, ২০১১ সালের মার্চ পর্যন্ত, দেশে ১ কোটি ৮৬ লাখ ৭৬ হাজার পরিবারে টেলিভিশন ছিল। ওই সময়ে দেশে বিদ্যুতাধীন পরিবার ছিল ১ কোটি ৯২ লাখ ৫৫ হাজার। জনসংখ্যা ও মাথাপিছু আয়ের প্রবৃদ্ধি, দারিদ্র্য বিমোচন এবং টেলিভিশন বিক্রির হিসাব বিবেচনায় নিলে, ক্যাবল গ্রাহক সন্দেহাতীতভাবে তিন কোটি ছাড়াবে। তবে, গ্রাহক কতটি চ্যানেল, কত টাকায় এবং কতটা মানসম্পন্ন টেলিভিশন দেখছে সেটি ভিন্ন আলোচনা।

২০১৩ সালে, দৈনিক সমকালের এক প্রতিবেদনে বলা হয় ২০১২-১৩ অর্থবছরে সাড়ে ১৪ লাখ টেলিভিশন সেট বিক্রি হয়েছিলো। এবং চাহিদা বছরে ১০/১২ শতাংশ হারে বাড়ছে। বর্তমানে গড়ে বছরে ব্র্যান্ড-নন ব্র্যান্ড মিলিয়ে ২০ লাখ টেলিভিশন সেট বিক্রি হয়। এসব তথ্যের সঙ্গে ২০১৩ সালে বিবিএস প্রকাশিত অর্থনৈতিক শুমারি বিবেচনায় প্রকৃত ক্যাবল গ্রাহকসংখ্যা সাড়ে ৩ কোটি ছাড়িয়ে যাবে। অর্থনৈতিক শুমারি অনুযায়ী, ওই সময় দেশে অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ছিল প্রায় ৮১ লাখ। বর্তমানে যা এক কোটির বেশি। উচ্চবিত্ত, উচ্চ-মধ্যবিত্ত, মধ্যবিত্ত অনেক পরিবারে একাধিক টেলিভিশন আছে। সে সংখ্যাও এক দেড় মিলিয়নের কম হবে না। এসব তথ্যের ভিত্তিতে কেউ যদি সংখ্যাটা সাড়ে ৩ কোটির বেশি দাবি করেন, তা মেনে নেওয়া ছাড়া কোনও পথ থাকবে না।

উল্লেখিত সকল সংখ্যায় অনুমিত। ডিজিটাইজেশন ছাড়া প্রকৃত সংখ্যা বের করা সম্ভব হবে না। তবে দেশের আর্থসামাজিক অবস্থা, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও উন্নয়ন সর্বোচ্চ সংখ্যক টিভি গ্রাহককেই সমর্থন করে। তবে বলে রাখা ভালো, ডিজিটাইজেশন হলে, শুরুতে সর্বোচ্চ এক থেকে সোয়া কোটির গ্রাহক পাওয়া যেতে পারে। কারণ তিন-সাড়ে তিন হাজার টাকার সেটটপ বক্স। এত টাকা দিয়ে শুরুতে সবাই বক্স কিনবে তেমন আশা করা উচিত হবে না। গ্রাহককে সচেতন ও প্রস্তুত করতে হবে। তাদের স্বার্থরক্ষার প্রশ্নটিও গুরুত্বপূর্ণ। তবে, পর্যায়ক্রমে পুরো দেশের মানুষ ডিজিটাইজেশনকে স্বাগত জানাবে।

অনাবিষ্কৃত রাজস্ব ভাণ্ডার   

সব হিসেব বাদ দিয়ে ধরা যাক, দেশে এ মুহূর্তে মোট ডিশ সংযোগ ২ কোটি। এজন্য গ্রাহক মাসে গড়ে ২০০ টাকা খরচ করে। এ হিসেবেও অপারেটররা বছরে ৪৮০০ কোটি টাকা আয় করে। যেখান থেকে সরকারের এখনই ন্যূনতম কয়েকশ কোটি টাকা রাজস্ব পাওয়ার কথা। কিন্তু সরকার কি তা পাচ্ছে? যে কেউ শুনলে অবাক হবেন, এখাতে সরকারের আয় সর্বোচ্চ ২০ থেকে ২৫ কোটি টাকা। আমার ধারণা ২০ কোটি টাকারও কম।। অবশ্য স্থানীয় চ্যানেলগুলো বিজ্ঞাপন আয় থেকে যে ভ্যাট দেয়, তা এখানে ধরা হয়নি। অথচ চোখের সামনে থাকা খাতটি অনাবিষ্কৃত পড়ে আছে বছরের পর বছর।

এখন সম্ভবত সময় এসেছে খাতটির দিকে নজর দেওয়ার। বাজেট সামনে, এ দিকটায় নজর দিতে পারেন অর্থমন্ত্রী। শুধু প্রয়োজন সিগন্যাল ডিজিটালের সরকারি নীতি। এতে যদি প্রাথমিকভাবে ১ কোটি গ্রাহক পাওয়া যায়, তাতেও বছরে সরকার রাজস্ব পাবে হাজার কোটি টাকার বেশি। সেক্ষেত্রে সংযোগপ্রতি অপারেটরদের আয় করতে হবে মাসে মাত্র ৩০০ টাকা। এর সঙ্গে লাইসেন্স ও এর নবায়ন ফি, উৎসে কর, এসডি, শিল্প সুরক্ষা, বিনোদন কর– ইত্যাদি যোগ হলে অবস্থা কী দাঁড়াবে, রাজস্ব বোর্ড ভেবে দেখতে পারে।

তবে ডিজিটাইজেশন ছাড়া এই টাকা পাওয়া যাবে না। ডিজিটাইজেশন অর্থই হচ্ছে মানসম্মত টেলিভিশনের নিশ্চয়তা। আমার বিশ্বাস, এজন্য প্রয়োজনে মাসে ৫০/১০০ টাকা বাড়িয়ে দিতেও দ্বিধা করবে না কোনও গ্রাহক। ফলে সিদ্ধান্ত সরকারের; খাতটিকে ডিজিটাইজ করে আয় বাড়াবে, না শৃঙ্খলাহীন ফেলে রাখবে।

সময় বয়ে যাচ্ছে

টেলিভিশন গণমাধ্যমের এমন এক উপাদান, যা বিশ্বের বিভিন্ন ভাষাভাষী মানুষ ও সংস্কৃতির মধ্যে সবচেয়ে কার্যকর যোগাযোগ গড়ে তোলে। এজন্যই অন্য যে কোনও মাধ্যমের চেয়ে টেলিভিশনের আবেদন স্বতন্ত্র, সাবলীল ও সৃজনশীল। বাংলাদেশের নাগরিক বা গ্রামীণ কাঠামোতে টেলিভিশন গুরুত্বপূর্ণ ও জনপ্রিয় মাধ্যমের একটি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে স্যাটেলাইট বা ক্যাবল টিভির চাহিদা বাড়ছে। আর পাল্লা দিয়ে বাড়ছে দেশি-বিদেশি চ্যানেল ও দর্শক।

অন্যদিকে পৃথিবীব্যাপী ডিজিটাল অর্থনীতির হিস্যা বাড়ছে। যার বড় অংশীদার ক্যাবল টিভি। টেলিভিশন লড়াই করছে নেটফ্লিক্স, অ্যামাজন, ইউটিউবের মতো ভার্চুয়াল দানবের সাথে। তাই বলে টিভির আবেদন কমছে এমন নয়। কিন্তু ভার্চুয়াল ওইসব প্রতিষ্ঠানের বাড়বাড়ন্ত লক্ষণীয়। এমন পরিস্থিতিতে, টেলিভিশন খাতকে স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগ করে দিতে হবে। ছোট ছোট অনেক দেশ, সঠিক নীতি ও দৃষ্টিভঙ্গির কারণে ক্যাবল খাত থেকে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার আয় করছে। সেখানে প্রায় ১৭ কোটি লোকের দেশ হয়েও বাংলাদেশ কেন পিছিয়ে থাকবে?

লেখক: সাংবাদিক

saiful.hasan@gmail.com

 

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ