নুসরাত রাফির মৃত্যু এবং একটি যৌক্তিক ‘বাঘ রচনা’

Send
ডা. জাহেদ উর রহমান
প্রকাশিত : ১৫:২৬, এপ্রিল ২১, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ২১:২৯, এপ্রিল ২১, ২০১৯

ডা. জাহেদ উর রহমানকোনও ইস্যুর মূলে না গিয়ে ভাসা ভাসা ধরনের আলোচনা করা আমাদের খুব নিয়মিত চর্চা। প্রতিবার বাংলাদেশে এক একটা ঘটনা ঘটে আর আমরা ভীষণ ভাসা ভাসা ধরনের আলোচনা সমাজে চালিয়ে যাই।  প্রায় সব ক্ষেত্রে আমাদের সাধারণ প্রবণতা হলো উপসর্গকে রোগ মনে করে চিকিৎসা দেওয়ার চেষ্টা করা। রোগ থেকে যায় রোগের জায়গায় আর তাই মাঝে মাঝেই এই উপসর্গগুলো আবার সামনে চলে আসে।
নুসরাত রাফির হত্যাকাণ্ড এখনও গণমাধ্যমের বড় জায়গা দখল করে আছে। আমরা যারা এই দেশের ন্যূনতম খোঁজখবর রাখি তারা জানি, নুসরাতের মতো ভিকটিম এই দেশে অনেক। গায়ে আগুন লাগিয়ে হত্যা খুব বেশি না হলেও এমন ঘটনায় হত্যা এই রাষ্ট্রের ইতিহাসে আকছার ঘটেছে, এখনও ঘটে। কিন্তু নুসরাত পেলো ভীষণ মনোযোগ; রীতিমত মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর মনোযোগ পেয়েছে সে। শারীরিক অবস্থা ফিট ছিল না বলে নেওয়া যায়নি, কিন্তু নুসরাতকে সিঙ্গাপুরে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছিলেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী। এরকম সৌভাগ্য একই রকম অসংখ্য ভিকটিমের ভাগ্যে ঘটেনি। নুসরাতের ভাইকে চাকরি দেওয়া হলো। এমনকি নুসরাত হত্যার বিচারের কেউ ছাড় পাবে না বলে খুব শক্ত হুঁশিয়ারি দিয়েছেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী।  শুধু তাই না, আমাদের উচ্চ আদালতও বলেছেন- তারা নুসরাত হত্যার বিচারের দিকে খেয়াল রাখবেন। 

নুসরাত রাফির হত্যাকাণ্ড নিয়ে অভিযুক্ত অধ্যক্ষ’র সরকারি দলের সঙ্গে যোগাযোগের কথা এসেছে। পুলিশের যথাযথ পদক্ষেপ না নেওয়ার কথা আমরা জেনেছি। এসেছে বিচারহীনতার সংস্কৃতির কথা। যথারীতি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন তদন্ত কমিটি গঠিত হয়েছে। কিছু প্রাথমিক ব্যবস্থাও গৃহীত হয়েছে। ওই থানার কিছু পুলিশের বদলি দেখলাম আমরা, নুসরাতের জবানবন্দি রেকর্ড করে সামাজিক মাধ্যমে ছেড়ে দেওয়ার দায়ে পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্টে মামলা দেখলাম আমরা। দেখলাম আইন মন্ত্রীর আশ্বাস– দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে নুসরাতের হত্যার বিচার করা হবে। ভাবটা এমন এই হত্যাকাণ্ডটির বিচার নিশ্চিত করতে পারলেই আমরা এই ধরনের সমস্যা থেকে মুক্তি পেয়ে যাবো।

নুসরাত হত্যাকে আবার কেউ কেউ উপসর্গ হিসাবে দেখেছেন, এবং এর রোগ হিসাবে দেখাচ্ছেন বিচারহীনতার সংস্কৃতিকে। মজাটা হলো এটা রোগ নয়, বরং বিচারহীনতার সংস্কৃতি নিজেই একটা উপসর্গ। যারা এটা করছেন, তারা কম জানেন, সেটা না, তারা এটা করেন সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে নিয়ে। সেই উদ্দেশ্য এবং নুসরাত রাফি হত্যা এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতি উপসর্গের মূল রোগ নিয়ে আলোচনার আগে আরেকটি দিক থেকে ঘুরে আসা যাক।

ড্যারন ওসেমাগ্লু এবং জেমস রবিনসন লিখিত বিশ্বখ্যাত ‘হোয়াই ন্যাশন্স ফেইল: দ্য অরিজিন্স অব পাওয়ার, প্রসপারিটি অ্যান্ড পভার্টি’ নানা কারণে খুবই গুরুত্বপূর্ণ এক বই। এই বইটির নানা দিক জাতি হিসাবে আমাদের খুব গুরুত্বপূর্ণ দিক-নির্দেশনা দিতে পারে। সেই আলোচনা কখনও করবো হয়তো, কিন্তু আজ এই বইয়ে খুব গুরুত্বপূর্ণ একটা উদাহরণ হিসেবে আসা একটা দেশ বতসোয়ানার কথা আনছি প্রাসঙ্গিক বিষয় হিসাবে। শ্রদ্ধেয় অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেনও বতসোয়ানার কথা তার নানা আলোচনায় উদাহরণ হিসেবে টানেন। 

সাব-সাহারান দেশ বতসোয়ানা স্বাধীন হয় বাংলাদেশের সামান্য আগে, ১৯৬৬ সালে। সেই সময় ওই দেশে পাকা রাস্তা ছিল ১২ কিলোমিটার, বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রিধারী গ্রাজুয়েট সংখ্যা ছিল ২২ জন, হাই স্কুল পাস করা মানুষ ছিল ১০০ জন। 

২০১৭ সালে এই দেশটির মাথাপিছু আয় বিশ্বব্যাংকের হিসেবে ৭ হাজার ৫৯৫ ডলার। একটু তুলনা করি, একই সময়ে বিশ্বব্যাংকের হিসেবে বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় ১ হাজার ৫১৬ ডলার। আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ সূচক এখানে উল্লেখ করা দরকার। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের দুর্নীতির সূচকে ২০১৮ সালে বতসোয়ানার অবস্থান ৩৪; এই সালেই বাংলাদেশের অবস্থান ১৪৯ তম।

এই তো গেলো বাংলাদেশের সঙ্গে মাত্র দুইটি ক্ষেত্রে বতসোয়ানার তুলনা। আরও অনেক কিছু নিয়ে এটা দেখানো যায়, প্রায় কাছাকাছি সময়ে স্বাধীন হওয়া দু’টো দেশ আজ কতটা ভিন্ন অবস্থানে দাঁড়িয়ে আছে। আলোচ্য বইটিতে বতসোয়ানার সঙ্গে সীমান্ত থাকা জিম্বাবুয়ের সঙ্গে তুলনা করে দেখানো হয়েছে সেই দেশের তুলনায় বতসোয়ানা কতটা উন্নতি করেছে। আর সাব-সাহারান আফ্রিকার অন্যান্য অনেক রাষ্ট্রের তো কোনও তুলনাই চলে না বতসোয়ানার সাথে। 

বতসোয়ানার ক্ষেত্রে এই ম্যাজিক কেন হলো, সেটার কারণ দেখানোর জন্য ওসেমাগ্লু এবং রবিনসন যুক্তি দেন এভাবে - এই দেশটি খুব শক্তিশালী রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে। সেই প্রতিষ্ঠানগুলোই এই রাষ্ট্রকে এই রকম ঈর্ষণীয় জায়গায় নিয়ে গেছে। লেখকদ্বয় এখানেই থেমে থাকেননি, এই রাষ্ট্রটি কেন এমন সব অসাধারণ প্রতিষ্ঠান তৈরি করতে পেরেছে, সেটার অন্তর্গত কারণও দেখিয়েছেন তারা। 

১৯৬৬ সালে স্বাধীনতা অর্জনের পর বতসোয়ানার প্রতিটি নির্বাচন হয়েছে অবাধ, স্বচ্ছ, অংশগ্রহণমূলক, গ্রহণযোগ্য। তারা জানান এভাবে ক্রমাগত সুষ্ঠু ক্ষমতার পরিবর্তন ধীরে ধীরে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করে তোলে, এবং সেই প্রতিষ্ঠানগুলোই শেষ পর্যন্ত জনগণের স্বার্থ রক্ষা করেছে। তার মানে সেই রাষ্ট্রটি শুধুমাত্র একটা সাম্রাজ্যে পরিণত না হয়ে একটা সত্যিকার রাষ্ট্রে পরিণত হওয়ার পেছনে মূল ফ্যাক্টর ক্রমাগত অংশগ্রহণমূলক, গ্রহণযোগ্য নির্বাচন করে যেতে পারা। 

এর ঠিক উল্টোটা ঘটছে বাংলাদেশে। ২০০১ এর বিএনপি সরকারের সময় থেকেই প্রতিটা সরকার নির্বাচন ব্যবস্থাকে ভণ্ডুল করে ক্ষমতায় থেকে যাওয়ার স্বপ্ন দেখতে শুরু করে। যার অনিবার্য ফল হলো দেশের সব রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল হতে শুরু করে ২০০১ এর পর থেকেই। এরপর বিশেষ করে ২০১৪ সালে একেবারে নির্বাচনহীন একটা সরকার গঠিত হওয়ার পর প্রতিষ্ঠানগুলো একেবারেই ভেঙে পড়তে শুরু করেছিলো। বলা বাহুল্য ২০১৮ সালের তথাকথিত নির্বাচনটির পরে এই রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রতিষ্ঠান প্রায় পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে।

জনগণের ম্যান্ডেটহীনভাবে ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার পূর্বশর্তই হলো, রাষ্ট্রের একটা টোটালিটারিয়ান চরিত্র তৈরি করতে হবে, যেখানে সব রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ভেঙে গিয়ে এক হয়ে উঠবে। আট শতাব্দীরও বেশি আগে ম্যাগনাকার্টার সময় জনগণের কল্যাণের জন্য যে সেপারেশন অব পাওয়ারের ধারণার চর্চা শুরু হয়, সেটার বিকাশ বাদ দিয়ে বিদ্যমান বাংলাদেশ হাঁটা দিয়েছে সেই আট শতাব্দী আগের সময়ে। আমাদের যাত্রা বহুদিন থেকেই আধুনিক রাষ্ট্র গঠনের পথে নেই, এর যাত্রা বরং সাম্রাজ্যের দিকে।

আজ কেন এই দেশে একজন তরুণী যৌন হয়রানির মামলা প্রত্যাহার না করলে অভিযুক্ত মানুষ তরুণীটিকে আগুনে পুড়িয়ে মেরে ফেলার দুঃসাহস পায়, কেন স্থানীয় পুলিশ এবং ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের নেতারা তার পক্ষ নিয়ে ভিকটিমের বিপক্ষে দাঁড়ায়, কেন শুধু একটি ঘটনা আলোচিত হওয়ার কারণে রাষ্ট্রযন্ত্রের সব বিভাগ বিচারের ব্যাপারে নড়েচড়ে বসে, এছাড়া এমন ঘটে যাওয়া শত শত ঘটনা থেকে যায় মনোযোগের একেবারে বাইরে, সব প্রশ্নের জবাব পাওয়া যাবে রাষ্ট্রীয় সব প্রতিষ্ঠানের ভেঙে পড়ার মধ্য দিয়ে। আর একটা রাষ্ট্রে এটা ঘটে জনগণের প্রত্যক্ষ ম্যান্ডেট ব্যতীত কোনও সরকার ক্ষমতায় থাকার কারণে। 

ছোটবেলায় একটা মজার গল্প কিছুটা এদিক-সেদিক করে সবাই শুনেছি। এক ছাত্র পরীক্ষার জন্য শুধু বাঘ রচনাটিই পড়েছে। তাই যে রচনাই তাকে লিখতে বলা হোক না কেন, সে বাঘ রচনাটি লিখে ফেলে। সেটা বন্ধ করার জন্য এমনকি তাকে উড়োজাহাজ নিয়ে রচনা লিখতে দিলেও সে সেটাকে মাটিতে নামিয়ে এনে বাঘ নিয়ে এসে বাঘ রচনা লিখে ফেলে। বিষয়টা ভীষণ অযৌক্তিক, সেজন্যই এটা মজার।

এই গল্পটার কথা মনে পড়লো কারণ, আমাকে কেউ যদি বাংলাদেশের যে কোনও সমস্যা নিয়ে অনেকগুলো রচনা লিখতে বলে, তবে সবগুলোই একেকটা ‘বাঘ রচনা’ হয়ে দাঁড়াবে। হ্যাঁ, সেটা দেশে জন প্রতিনিধিত্বহীন সরকার ক্ষমতায় থাকাজনিত ‘বাঘ রচনা’। ড্যারন ওসেমাগ্লু এবং জেমস রবিনসনের ‘হোয়াই নেশন্স ফেইল: দ্য অরিজিন্স অব পাওয়ার, প্রসপারিটি এন্ড পভার্টি’ বইয়ে উল্লিখিত বতসোয়ানার সাথে বর্তমান বাংলাদেশের তুলনা করলে এটা নিশ্চয়ই প্রমাণিত হয়– আমার ‘বাঘ রচনাটি’ হাসির উদ্রেক করবে না, কারণ এটা যৌক্তিক। 

লেখক:  সদস্য, স্টিয়ারিং কমিটি, জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ও সদস্য, কেন্দ্রীয় কমিটি, নাগরিক ঐক্য

 

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ