‘ভালো ডাক্তার হতে হলে আগে ভালো মানুষ হতে হবে’

Send
চিররঞ্জন সরকার
প্রকাশিত : ১৪:৫১, এপ্রিল ২২, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৪:৫৩, এপ্রিল ২২, ২০১৯

চিররঞ্জন সরকারবাংলাদেশে কোনও দেশের রাষ্ট্রপতি কিংবা প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রীয় সফরে এলে যে ধরনের প্রচার-প্রপাগান্ডা-মাতামাতি হয়, ভুটানের প্রধানমন্ত্রী ডা. লোটে শেরিংকে নিয়ে তেমনটা হয়নি। তাছাড়া ফেনীর মাদ্রাসা শিক্ষার্থী নুসরাতকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যা, পহেলা বৈশাখে মঙ্গল শোভাযাত্রা প্রতিহত করার ঘোষণা, বৈশাখ পালনের উন্মত্ততার ডামাডোলে আমরা তেমনভাবে খেয়াল করিনি এই ভদ্রলোকের আগমন। অথচ এই ব্যক্তিটির কাছে আমাদের অনেক কিছু শেখার আছে। বাংলাদেশে এসে নিজের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজে গিয়েছিলেন। সেখানে তিনি যে বক্তব্য দেন, তা আমাদের জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
১৯৯১ সালের নভেম্বরে বাংলাদেশের এই চিকিৎসা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ২৮তম ব্যাচের শিক্ষার্থী হয়ে এসেছিলেন তিনি। এরপর এমবিবিএস পাস করে জেনারেল সার্জারি নিয়ে লোটে শেরিং এফসিপিএস করেছিলেন ঢাকাতেই। ময়মনসিংহ মেডিক্যালের পাশাপাশি কিছুদিন হাতে-কলমে কাজ করেছেন ঢাকার স্যার সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল কলেজেও।
এরপর ২০০২ সালে দেশে ফিরে কয়েক বছর চাকরির পর রাজনীতিতে আসেন বন্ধু টান্ডি দর্জির প্রতিষ্ঠিত দলে যোগ দেওয়ার মাধ্যমে। মি. দর্জি বর্তমানে ভুটানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনিও লোটে শেরিংয়ের মতো ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ থেকেই এমবিবিএস করেছেন। আর দু’জন কলেজ ছাত্রাবাসের একই কক্ষে থাকতেন।
২০১৩ সালের নির্বাচনে তাদের দল হেরে গেলেও ২০১৮ সালের নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে দেশটির ক্ষমতায় যায় তাদের দল ও প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন লোটে শেরিং।
ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজের প্রাক্তন শিক্ষার্থী ভুটানের প্রধানমন্ত্রী ডা. লোটে শেরিং তার স্মৃতিবিজড়িত ক্যাম্পাস পরিদর্শনকালে শিক্ষার্থীদের কাছে ক্যাম্পাস-স্মৃতি তুলে ধরে বক্তব্য রাখেন। তিনি বলেন, ‘ভালো ডাক্তার হতে হলে আগে ভালো মানুষ হতে হবে। মানুষের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করে তাদের মন জয় করতে হবে। মানবিক হতে হবে। মানুষের জন্য কাজ করার অনেক সুযোগ আছে ডাক্তারদের। শুধু চিকিৎসাসেবা নয় সামাজিক-রাজনৈতিক অনেক ক্ষেত্রেই ডাক্তারদের অবদান রাখার সুযোগ আছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমি চাকরি ছেড়ে রাজনীতিতে এসেছি। কিন্তু আমার পেশাকে ছাড়তে পারিনি। ২০১৩ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত আমি চাকরি না করে, বিদেশে না গিয়ে ভুটানের মানুষকে নিয়ে ভেবেছি। তাদেরকে বুঝতে চেষ্টা করেছি। তাদেরকে নিয়ে কাজ করেছি। তাই আজ আমি ভুটানের প্রধানমন্ত্রী।’
শুরুতেই তিনি শিক্ষার্থীদের পড়ালেখার প্রস্তুতি বিষয়ে তার অভিজ্ঞতা শেয়ার করেন। ‘শিক্ষক কাল যা পড়াবে তা আমি আগের রাতেই একবার দেখে নিতাম। পরদিন ক্লাসে গেলে স্যার ডেমো দেবে। এবং এর পরেই বন্ধুদের নিয়ে আলোচনা করতাম। ফলে বিষয়টি দু’তিনবার পড়া হয়ে যেতো’।
ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজের সাবেক এই শিক্ষার্থী বলেন, এ থেকে শিক্ষাটা হলো- আমরা যদি শিখতে চাই সেটা পড়িয়ে নয়, আলোচনা করতে হবে। শেখার সেরা উপায় হলো আলোচনা করা।
নিজের অসুস্থ হওয়ার পর হাসপাতালে চিকিৎসার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে তিনি বলেন, ‘চতুর্থ বর্ষে থাকার সময় তার পেটে ব্যথা ও অনেক বমি হচ্ছিলো। পরে হাসপাতালের আউটডোরে গিয়েও কাজ হয়নি এবং একপর্যায়ে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছিলো। কিন্তু তাতেও লাভ হচ্ছিলো না। দিন দিনে অবস্থা খারাপ হচ্ছিলো। একদিন বিকেলে একজন এলেন। আমাকে দেখে বললেন, আরে এ ছেলেটাকে এভাবে রাখার কোনও মানে হলো! এটা তো অ্যাপেন্ডিসাইটিস। আমাদের বললেই হতো। এরপর আমাকে তিনি বললেন প্লিজ ডোন্ট অরি। আমি অপারেশন করবো। কোনও সমস্যা হবে না। তোমার বাবা-মা দূরে। রাতে অপারেশন হলো এবং দু’সপ্তাহ পর সব ঠিক হলো।’
তিনি বলেন, নিজের এ অভিজ্ঞতা থেকে যা তার মাথায় এলো, তা হলো রোগী দেখতে হলে ভালো করেই দেখতে হবে। ‘হুট করে প্রেসক্রিপশন দিলে ডায়াগনসিস মিস হতে পারে এবং আমরা আমাদের কাজ হালকাভাবে নিলে আরেকজনের জীবনের ক্ষতি হতে পারে। রোগীর সঙ্গে সকাল-সন্ধ্যা, রাত-দিন ডিল করি। আমরা মানিয়ে নিই, কারণ এটা আমাদের কাজ।’
পুরো বক্তৃতায় নানা উদাহরণ তুলে ধরে ভুটানের প্রধানমন্ত্রী চিকিৎসকদের উদ্দেশে আরও যেসব পরামর্শ দেন তা হলো–
ক. সার্জন হওয়া বা না হওয়া গুরুত্বপূর্ণ নয়, গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ভালো সার্জন হওয়া;
খ. আর ভালো সার্জন হতে হলে প্রথমে ভালো মানুষ হতে হবে;
গ. আমাদের সবার মতামত দেওয়ার অধিকার আছে। কোনও বক্তব্য ভুল বা সঠিক বলে চূড়ান্ত রায় দেওয়ার কিছু নেই, যেকোনও বিষয়ে ভিন্নমত থাকতেই পারে;
ঘ. আমরা রোগীর সঙ্গে সব সময় থাকি, কিন্তু রোগীরা সব সময় আমাদের সঙ্গে থাকে না। হয়তো একজন রোগী একবারই আসেন। সেজন্য প্রত্যেক রোগীর প্রতি সর্বোচ্চ মনোযোগ দিতে হবে;
ঙ. আমরা শুধু মানুষের জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময়ে কাজ করি। এটা মনে রাখতে পারলে তা হবে সেরা অর্জন;
চ. উচ্চাভিলাষী হওয়ার দরকার নেই, নিজের সেরাটা দিন, বাকিটা ঈশ্বর আপনাকে দেবেন।
তার পুরো বক্তব্যটিই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি স্বীয় পেশার গুরুত্ব ও মর্যাদার কথা বলেছেন। তিনি রাজনীতিতে এসেছেন ঠিক, কিন্তু পেশাকে বাদ দিয়ে নয়। পেশার প্রতি এমন সততা ও নিষ্ঠা প্রত্যেকেরই থাকা উচিত। তিনি চিকিৎসকদের দায়িত্ব-কর্তব্যের কথা যেমন বলেছেন, একই সঙ্গে উচ্চশিক্ষার পদ্ধতি নিয়েও কথা বলেছেন। উচ্চশিক্ষা ক্ষেত্রে একজন শিক্ষক শিক্ষার্থীকে ‘পড়াতে’ বা ‘শেখাতে’ পারেন না; বরং শিক্ষক-শিক্ষার্থী মিলে আলোচনা করে বিষয়টি সম্পর্কে আগ্রহ তৈরি করতে পারেন। সহজবোধ্য করে তুলতে পারেন। এই আলোচনা হতে পারে শিক্ষার্থী-শিক্ষার্থী মিলেও। উচ্চশিক্ষা স্তরে আলোচনার মাধ্যমে শিক্ষা অত্যন্ত কার্যকর। তিনি পরস্পরকে জানা-বোঝা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার ওপরও জোর দিয়েছেন। পরস্পরকে না বুঝলে বা পারস্পরিক শ্রদ্ধা না থাকলে লেখাপড়ার কাজটি আসলে অসম্পূর্ণই থেকে যায়। এটা বড় বেশি লাগসই বা কার্যকর হয় না।
ভুটানের প্রধানমন্ত্রী ডা. লোটে শেরিংয়ের সব কথাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও শিক্ষণীয়। তবে তিনি সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ যে কথাটি বলেছেন তা হলো, ‘ভালো ডাক্তার হতে হলে আগে ভালো মানুষ হতে হবে।’ এটা অবশ্য শুধু ডাক্তার নয়, সব পেশার ক্ষেত্রেই প্রয়োজ্য। আমাদের দেশে বর্তমানে সবেচেয়ে বেশি আকাল ভালো মানুষের। মানবিক, সহানুভূতিশীল, অকপট মানুষের সংখ্যা দেশে আশঙ্কাজনকভাবে হ্রাস পাচ্ছে। দেশে প্রচুর নামজাদা ডাক্তার, আমলা, প্রশাসক, বিচারক, আইনজীবী, মন্ত্রী, নেতা, এমপি, প্রকৌশলী, গবেষক, শিক্ষক, সাংবাদিক, ধার্মিক, বিশেষজ্ঞ, ব্যবসায়ী, পুঁজিপতি, টেকনিশিয়ান, প্রযুক্তিবিদ তৈরি হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু ভালো মানুষের সংখ্যা তেমনভাবে বাড়ছে না। সবাই যান্ত্রিক হয়ে পড়ছি। নিজেদের লাভ-লোভ-স্বার্থ-সুবিধার বাইরে আমরা কেউই খুব একটা পা-বাড়াচ্ছি না। ফলে মানবিক সমাজ নির্মাণের পথে আমরা ক্রমেই পিছিয়ে পড়ছি।
ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় বলতে পারি, আমার জীবনে ভালো মানুষ খুব বেশি দেখিনি। আপনি দেখেছেন কি? আমার তো মনে হয় ‘ভালো মানুষ’ কথাটি এখন ‘ইউটোপিয়া’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সমাজে ভালো মানুষের দেখা পাওয়া ক্রমেই সৌভাগ্যের ব্যাপার হয়ে দাঁড়াচ্ছে। কোনও মানুষের সঙ্গে যখন পরিচিত হই, তখন মনে হয়, এই বুঝি একজন ভালো মানুষের সন্ধান পেয়ে গেলাম। কথাবার্তা, চালচলন, সাজ-পোশাক সব ভালো। কিন্তু আস্তে আস্তে তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে মিশতে থাকলে দেখা যায়, মানুষটি আসলে ভালো নয়। সংকীর্ণতা, স্বার্থপরতা, সংস্কার, লোভ-লাভ-মোহ-কাম-ক্রোধ-লালসা তাকেও আচ্ছন্ন করে রেখেছে। অর্থাৎ দূর থেকে দেখে কাউকে ভালো মানুষ মনে হলেও, কাছে গিয়ে দেখা যায় তার দোষের অন্ত নেই। গুণের পাল্লার চেয়ে দোষের পাল্লাই ভারি। তারপরও বিশ্বাস করতে চাই, সমাজে ভালো মানুষ নিশ্চয়ই আছে। আমরা হয়তো তাকে খুঁজে পাচ্ছি না।
অনেকে প্রশ্ন করতে পারেন, ভালো মানুষের সংজ্ঞা কী? আমার কাছে ভালো মানুষের সংজ্ঞা খুবই সাধারণ। যিনি নিজের কাজটি যথাযথভাবে করেন, স্বার্থ-সুবিধা-লোভ-কাম-ক্রোধকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন, অন্যের ব্যাপারে সহানুভূতিশীল, যার দ্বারা কেউ কখনও ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি, তিনিই ভালো মানুষ।
একজন মানুষ অন্য মানুষকে ঠকান না, ক্ষতি করেন না, লাভ-লোভের ঊর্ধ্বে উঠে অন্যের উপকারে কিছু করেন-এর চেয়ে বড় গুণ আর হয় না। আমার মতে, ভালো মানুষ হওয়ার জন্য এই গুণগুলোই যথেষ্ট। কিন্তু হায়! এই সামান্য কয়েকটা মাত্র গুণ আমরা কতজন অর্জন করতে পারছি? দেখুন না আপনিও নিজের বিচার করে, আপনি কি জীবনে কারো একটুও ক্ষতি করেননি? কাউকে কি কখনো ঠকাননি? কারো মনে ব্যথা দেননি? কেউ আপনার দ্বারা কষ্ট পায়নি? একবার অন্তত দেখুন না, নিজেকে বিশ্লেষণ করে। আপনি কি ভালো মানুষ?
হ্যাঁ, আমরা সবাই যে খারাপ, এমনটাও বলছি না। তবে আমরা সহজেই প্রায় সবাই ভালো মানুষ হতে পারি। বিশেষত লেখাপড়া জানা লোকেরা। আসুন না, আমরা প্রত্যেকেই ভালো মানুষ হওয়ার চেষ্টা করি। ভুটানের প্রধানমন্ত্রী ডা. লোটে শেরিং বলেছেন বলেই নয়, নিজেদের বিবেকের কাছে স্বচ্ছ থাকার জন্য হলেও ভালো মানুষ হওয়ার চেষ্টা করি! ভালো মানুষ হই!

লেখক: কলামিস্ট

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ