এত রক্ত কেন?

Send
অঞ্জন রায়
প্রকাশিত : ১৪:৩৩, এপ্রিল ২৩, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:১১, এপ্রিল ২৩, ২০১৯

অঞ্জন রায়সমরেশ মজুমদারের একটি বিখ্যাত বইয়ের নাম ছিল ‘এত রক্ত কেন’? যতদূর মনে পড়ছে গত শতকে লেখা। শতক পেরিয়েছে, সভ্যতা অরেকটু সভ্য হয়েছে, এমন দাবিও আমরা করি। হাতে হাতে অ্যানড্রয়েড, অন্তর্জালে পৃথিবী এখন বিশ্বগ্রাম। কোক পেপসি, রিবক, নাইকি, ডেমোক্র্যাট-রিপাবলিকান এমনই দুই অপশনের একটি গ্রহে আমাদের বসতি। বাস করছি ভোগবাদ আর কনজিউমারিজমের রমরমা সময়ে। পাড়ার আড্ডা এখন ক্যাফেকফি আর মেসেঞ্জার-হোয়াটসঅ্যাপে। আয় বেড়েছে মানুষের, বেড়েছে ভ্রমণসহ বিবিধ বিনোদন। মগজ কি বেড়েছে?
না বাড়েনি। বাড়েনি বলেই ১৯১৭ সালে রুশ বিপ্লব হওয়া গ্রহটিতে ২০১৭ সালে অসহিষ্ণুতাকে সামনে এনে চেয়ারে বসেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। বাবা আম্বেদকারের ভারতে আজ রমরমা শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের দর্শন। আমার স্বদেশেও দেখেছি হলি আর্টিজান বেকারির তাণ্ডব। দেখেছি ব্লগার, পীর, যাজক, পুরোহিতের সারিবদ্ধ লাশ। নিউজিল্যান্ডের মসজিদে হামলায় নিহতদের লাশের পাশে গতকাল স্তূপ হলো শ্রীলঙ্কায় নিহতদের লাশ। প্রতিটি হত্যার পেছনেই কমন একটি শক্তি- আছে বিশ্বাসের নামে অস্ত্র বোমা চাপাতি বা গ্রেনেড হাতে এমন কিছু মানুষ, যারা এ পরিচয়ের উপযুক্ত নয়।
শ্রীলঙ্কায় যারা নিহত হলেন, তারা কেউ জানতেন না মৃত্যুর কতটা কাছাকাছি তারা দাঁড়িয়ে রয়েছেন, জানতেন না, মানুষ না এমন কয়েকজন দ্বিপদী এখন মানবকুলের সবচেয়ে বড় প্রতিপক্ষ। জানতেন না বলেই কেউ নিহত হলেন যিশুর কাছে নতজানু হয়ে শ্রদ্ধা জানাতে গিয়ে। কেউ নিহত হন নামাজে দাঁড়িয়ে। তাহলে কি মৃত্যুই অনিবার্যতা মেনে নিতে নিতে আমরা সবাই অপেক্ষমাণ থাকবো কসাইখানার সারিবদ্ধ মৃত্যুর অপেক্ষমাণ প্রাণীদের মতো?
না। এটি কখনো অনিবার্যতা, এমনটা আমি বিশ্বাস করি না। করি না বলেই আমি বিশ্বাস করি সেই পৃথিবীতে, যেখানে আর যা-ই হোক, একজন মানুষও খুন হবে না ধর্মান্ধদের হামলায়। যেখানে প্রতিটি মানুষ তাদের ভাবনা মগজে ধারণ করবে নিশ্চিন্তে। যে যার বিশ্বাসমতো তার বিশ্বাসের প্রতিষ্ঠানে যেতে পারবে- প্রার্থনা করতে পারবে নিশ্চিন্তে। আচমকা কোনও বোমা বুলেট বা গ্রেনেডে থেমে যাবে না জীবন। কিন্তু চারদিকে যখন দানবের এই আস্ফালন, তখন কি চাইলেই এমন নিরাপদ একটা পৃথিবী মিলে যাবে?
যাবে না, যায় না। এটাই ইতিহাসের শিক্ষা। ইতিহাস আরও শেখায়, দানবের সাথে চূড়ান্ত লড়াইয়েই আসে সমাপ্তি। আর সেই কারণেই কোনও সুযোগ নেই মধ্যপন্থার, সুযোগ নেই উটপাখির মতো বালিতে মাথা গুঁজে ঝড় এড়িয়ে যাওয়ার। রাষ্ট্রপর্যায়ে যেমন ভাবার দরকার তেমনই ভাবনার দরকার ব্যক্তিপর্যায়েও। সেই পর্যায়টি হতে হবে সমাজের উঁচু থেকে প্রান্তিক পর্যন্ত। কারণ, অসুখটা এতই ছড়িয়েছে, আংশিক চিকিৎসায় এর সমাধান সম্ভব না। যদি আমাদের দেশের কথাই ভাবি, আমরা দেখেছি হলি আর্টিজান বেকারির হামলার সময়ে কীভাবে ঢাকার অন্যতম দামি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আর বগুড়ার মাদ্রাসাছাত্র একসাথে একই অভিযানে অস্ত্র হাতে তুলে নিয়েছিলো।

কলম্বো, বন, মিউনিখ, লন্ডন বা ঢাকাকে এখন আলাদা কোনও জনপদ ভাবার সুযোগ নেই। যেমন সুযোগ নেই ধর্মান্ধদের আলাদা কোনও পরিচয়ে চিনে নেওয়ার। ফ্রান্স বা কলম্বোতে নিহতদের রক্ত যেমন একই রকম লাল- তেমনই লাল আইএস, আলকায়দা, বজরং দল বা আরএসএসের লোকগুলোরও। তাদের একমাত্র অস্ত্রের নাম ধর্মান্ধতা। আর সে কারণেই সবার মিলিত লড়াই এই ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধেই ধাবমান করতে হবে। মনে রাখতে হবে, আমরা এই নতুন শতকের দ্বিতীয় দশকে এমন একটা সময় পার হচ্ছি, যখন আমাদের পুরো গ্রহটিই এক চ্যালেঞ্জের মুখে। বমুরানের বৌদ্ধমূর্তি থেকে নিউজিল্যান্ডের মসজিদ অথবা শ্রীলঙ্কার চার্চ থেকে ঢাকার বইমেলায় অভিজিত রায়। আক্রমণের ক্যানভাসটা এমনই।

আক্রমণের ক্যানভাসের এই ব্যাপ্তিই আমাদের জানান দেয় প্রতিরোধের লড়াইয়ের শক্তি কতটা হতে হবে। শক্তিটি হতে হবে অন্ধকারের বিরুদ্ধে সব হাতের সম্মিলিত। দেশে দেশে যদি একসাথে প্রতিরোধ না গড়ে ওঠে, তাহলে কোনোভাবেই শেষ হবে না এই অন্ধকারের মুখপাত্র ধর্মান্ধদের তাণ্ডব। বন্ধ হবে না দেশে দেশে মানুষের লাশের স্তূপ। বন্ধ হবে না টেলিভিশনগুলোর ব্রেকিং নিউজের ধারাবাহিকতা। এখন সময়টা প্রতিরোধের। এই প্রতিরোধের মধ্য দিয়েই সব সম্ভব। অন্ধকার অপশক্তিকে তাদের পুরনো গর্তে ঢুকিয়ে দিতে পারলেই আসবে স্বস্তি। বাঁচবে মানবকুল। আর না পারলে আরও অনেক মৃত্যু আরও রক্ত আমাদের জন্য অপেক্ষমাণ। কে জানে, আমি অথবা আপনি, কার জন্য কোথাও বানানো হচ্ছে চাপাতি, বানানো হচ্ছে বোমা, গ্রেনেড বা বন্দুক।

লেখক: গণমাধ্যমকর্মী।

anjanroy.dhaka@gmail.com

/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ