জঙ্গিবাদ: বহুরূপে সম্মুখে সবার

Send
সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা
প্রকাশিত : ১৪:৫৭, এপ্রিল ২৪, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৪:৫৮, এপ্রিল ২৪, ২০১৯

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজাশ্রীলঙ্কায় মুসলিম, খ্রিস্টান বৈরিতা নেই। দ্বীপ দেশের এই দুই সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সঙ্গে বৈরিতা বা বিবাদ যা আছে, তা মূলত সংখ্যালঘু সিংহলি বৌদ্ধদের সঙ্গে। শ্রীলঙ্কায় খ্রিস্টান এবং মুসলিমরা কখনও পরস্পরের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়ায়নি, তাদের মধ্যে সম্পর্কটা শত্রুতারও নয়। তাহলে কারা করলো, কেন করলো এমন বর্বরোচিত হামলা? জবাব দিলো জঙ্গিগোষ্ঠী আইএস নিজেই। মঙ্গলবার নিজস্ব বার্তা সংস্থা আমাক-এ প্রকাশিত এক বিবৃতিতে শ্রীলঙ্কায় চার গির্জা, তিন হোটেল ও এক বাড়িতে বোমা হামলার দায় স্বীকার করেছে জঙ্গিগোষ্ঠী আইএস। লঙ্কান কর্তৃপক্ষ শুরু থেকেই ‘ন্যাশনাল তৌহিদ জামাত’– এনটিজে নামের একটা মুসলিম মৌলবাদী সংগঠনকে এর সঙ্গে জড়িত বলে সন্দেহ করে আসছে।
আগে থেকেই সতর্কবার্তা ছিল, পুলিশ প্রধানের নির্দেশনাও ছিল। কিন্তু রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে সম্পর্ক ভালো না থাকায় কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এখন সেখানে চলছে পাল্টাপাল্টি দোষারোপ। তবে প্রায় সবাই একমত, এমন একটি হামলা স্থানীয়ভাবে পরিকল্পনা করে করা সম্ভব নয়। এই হামলার ইন্ধন বা প্রভাব এসেছে বাইরে থেকে। এনটিজে’কে ইসলামিক স্টেট বা আইএসেরই একটি শাখা সংগঠন বলে মনে করা হয়। অনেকেই বলছিল, কলম্বোর ধারাবাহিক বিস্ফোরণটা আসলে আইএসের কাজ। নিজেদের ‘শ্রীলঙ্কা শাখা’র সঙ্গে হাত মিলিয়েই এই কাণ্ড ঘটিয়েছে তারা। 

ঘটনার তিনদিন পর ২৩ এপ্রিল শ্রীলঙ্কা বলছে নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চের মসজিদে গুলি চালানোর ঘটনার প্রতিশোধ নিতেই কলম্বোয় ইস্টার সানডে উদযাপনের সময় একের পর এক বোমা হামলা চালানো হয়। শ্রীলঙ্কার পার্লামেন্টে এক অধিবেশনে দেশের প্রতিরক্ষা প্রতিমন্ত্রী রুয়ান বিজয়বর্ধন এ মন্তব্য করেন। রবিবারের ওই হামলায় ৩২০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়।

এর মাধ্যমে এক নতুন মাত্রা পেলো এই ঘটনা। ক্রাইস্টচার্চের বদলা কিনা তা তদন্তেই প্রমাণিত হবে। তবে নানাদেশে সন্ত্রাসী হামলার ধরন থেকে এটা বোঝা যায়, প্রায় সব সন্ত্রাসী আক্রমণেরই একটি বহুজাতিক চরিত্র থাকে। আবার সন্ত্রাস আর জঙ্গিবাদের বহুজাতিক চরিত্র থাকলেও এগুলো প্রকৃতপক্ষে পরিচালিত হয় স্থানীয়ভাবে। সন্ত্রাসের গডফাদাররা স্থানীয় রাজনীতির সুযোগ নেয়। শাসনব্যবস্থার রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক স্তরে দুর্বলতা থাকলে, ধর্মভিত্তিক রাজনীতির সহিংস আদর্শ দ্রুতই জায়গা নিয়ে নিতে পারে।

শ্রীলঙ্কায় তিন দশকের গৃহযুদ্ধের সমাপ্তি হয়েছে ২০০৯-এ। কিন্তু এই দশ বছরে দেশটি বহুত্ববাদের পথ ধরে এগুতে গিয়ে বারবার হোঁচট খেয়েছে। লঙ্কার ইতিহাসে জাতিগত ও সাম্প্রদায়িক অসহিষ্ণুতা নতুন ঘটনা নয়। তিন দশকের গৃহযুদ্ধে আত্মঘাতী বোমা হামলার সঙ্গেও বারবার পরিচিতি ঘটেছে মানুষের। গত দশ বছরে একাধিকবার সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হয়েছে বৌদ্ধদের সঙ্গে খ্রিস্টান ও মুসলিমদের। ইস্টার সানডের দিনে চার্চ ও পাঁচতারকা হোটেলে সিরিজ বোমা হামলা প্রমাণ করে কালক্রমে এই সাম্প্রদায়িকতা এবং বিরোধের পথ জঙ্গিবাদের দিকে প্রশস্ত হয়েছে।

আন্তর্জাতিক যোগাযোগ আছে মানেই সীমানা পেরিয়ে দেশে ঢুকে জঙ্গি নেতৃত্বের সংস্পর্শে সবাই আসবে বা আসতে পারবে এমন নয়। দেশের অভ্যন্তরে বা বাইরে, এই রাজনীতি যারা করে, সেই নেতৃত্বের মধ্যে আদর্শিক মিলটাই বড় যোগসূত্র হিসেবে কাজ করে। এসব জঙ্গি দলে দলে বিভক্ত হয়ে কাজ করে স্থানীয় নেতৃত্বের নির্দেশে, তবে তাদের আসল মুরব্বি তারাই, যারা জঙ্গিবাদকে লালন করছে বিশ্বের বিভিন্ন জনপদে।

ইরাক এবং সিরিয়ায় আইএসের প্রাথমিক সাফল্য দেশে দেশে মুসলিম তরুণ-তরুণীদের উৎসাহিত করেছিল এই জঙ্গিদের দলে যোগ দিতে। শুধু মুসলিম দেশ থেকে নয়, ইউরোপীয় অমুসলিম দেশের মুসলিম তরুণ-তরুণীও যোগ দিয়েছিল দলে দলে। সেসময় শ্রীলঙ্কা থেকেও আইএসে যোগ দেওয়ার দৃষ্টান্ত আছে। আশঙ্কা এই, ইরাক এবং সিরিয়ায় পরাজয়ের পর আইএস নেতৃত্ব এখন যেখানে সম্ভব, সেখানেই তার অবস্থান জানান দিতে কোনও নির্দিষ্ট দেশ বা এলাকা নয়, নানা দেশকে বেছে নিতে পারে আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু হিসেবে।

ক্রাইস্টচার্চ বা কলম্বো, মৌলবাদ যে রঙেরই হোক, যে দেশেই ঘটুক, তা ভয়ানক। ঘটনা ঘটেছে শ্রীলঙ্কায়, তবে শিক্ষা সবার জন্য। শাসনব্যবস্থায় এমন এক দর্শন আনতে হবে যেন সব মানুষ বুঝতে পারে জাতিগত বা ধর্মীয় পরিচিতিই মানুষের একমাত্র পরিচিতি নয়। রাষ্ট্রের বহুত্ববাদী ভাবমূর্তি উজ্জ্বল না হলে চরমপন্থিরা সুযোগ নিতে ছাড়ে না। ভালো শাসনব্যবস্থা মানেই সংখ্যালঘুদের ধর্মীয় পরিচিতির একক পরিসর থেকে বের করে বৃহত্তর সত্তায় তাদের ছড়িয়ে দেওয়া। সেটা না করতে পারলে ধর্মীয় বৈরিতা এমন এক পরিস্থিতির সৃষ্টি করে, যেখানে আন্তর্জাতিক জঙ্গিগোষ্ঠী সুযোগ নেবে বড় ঘটনা ঘটানোর।

জঙ্গিবাদ স্থানীয়ভাবে গড়ে উঠলেও আন্তর্জাতিক অর্থায়ন সহজলভ্য হওয়ায় এগুলোর বিস্তার ঘটছে দ্রুত। শ্রীলঙ্কার এই হামলার ক্ষেত্রেও তেমনটি উড়িয়ে দেওয়া যায় না। আরেকটি হলো দেশের অভ্যন্তরে সমাজ ও রাজনীতি থেকে সমর্থন না পেলে কোনও সংগঠনের পক্ষেই বাড়বাড়ন্ত সম্ভব হয় না। আশা করি লঙ্কার সরকার ভালোভাবে অনুসন্ধান করবে, গভীরে প্রবেশ করে কারণ বের করবে। তবে জঙ্গিরা তাদের শক্তির জানান দিলো, সরকার এবং সমাজকে দুর্বল করার চেষ্টায় প্রথম আঘাতেই সফল হলো। সরকার দুর্বল হলে রাজনৈতিকভাবে যারা লাভবান হয় তাদের দিক থেকেও সমর্থন আছে কিনা তা বেশি করে খতিয়ে দেখার সময় এখন।

লেখক: প্রধান সম্পাদক, জিটিভি ও সারাবাংলা

 

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ