‘আমি চাই ধর্ম বলতে মানুষ বুঝবে মানুষ শুধু’

Send
প্রভাষ আমিন
প্রকাশিত : ১৬:০০, এপ্রিল ২৫, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:০৭, এপ্রিল ২৫, ২০১৯

প্রভাষ আমিনগভীর বেদনায় আচ্ছন্ন হয়ে আছে হৃদয়। শ্রীলঙ্কায় ৩২১ নিরীহ মানুষের মৃত্যুর চেয়েও বড় বেদনার মৃত্যু পরবর্তী প্রতিক্রিয়া, বদলে যাওয়া বিশ্ব নিয়ে শঙ্কা। বারবার একেকটা ধাক্কা আসে, আর আমরা ইতিবাচকরা ভাবি, এটাই বুঝি শেষ। রাত পোহালো বলে, টানেলের শেষ প্রান্তে বুঝি আলোর রেখা দেখা যাচ্ছে। কিন্তু কোনও আলোর রেখা দেখতে পাচ্ছি না। বরং অন্ধকার যেন আরও গাঢ় হয়ে আসছে। নিউজিল্যান্ডে মসজিদে সশস্ত্র হামলায় পঞ্চাশজনের মৃত্যুর দগদগে ঘা শুকানোর আগেই শ্রীলঙ্কায় হামলা। এবারও টার্গেট ধর্মপরিচয়। শ্রীলঙ্কায় মূল হামলা হয়েছে খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বীদের উপাসনালয়ে। নিউজিল্যান্ডে হামলা হয়েছিল ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের উপাসনালয়ে। সব ধর্মই শান্তির কথা বলে। আবার এইসব জঙ্গি হামলা হয় ধর্মেরই নামে। কী অদ্ভুত বৈপরীত্য!
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে একটা শান্তি ও কল্যাণের বিশ্ব গড়ে তোলার একটা আকাঙ্ক্ষা ছিল। সে ধারা এগোচ্ছিলও। কিন্তু ’৯০-এর দশকে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন ভেঙে দেয় সব ভারসাম্য। যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে এককেন্দ্রিক বিশ্বে আবার চাঙা হয় নানান সমস্যা। বিশেষ করে গত তিন দশকে বিশ্বের নানাপ্রান্তে সন্ত্রাসী চক্র দানা বাঁধে। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের শক্তি প্রদর্শন করতে কিছু ছায়া শত্রু তৈরি করে নেয়। যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি করা এই শত্রুগুলোই পরে দানব হয়ে যায়। এই ফ্রাঙ্কেনস্টাইন দানবই হানে পাল্টা আঘাত। ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর টুইন টাওয়ার ধ্বংসের ঘটনায় পাল্টে যায় গোটা বিশ্বই। সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধের নামে বিশ্বকে নরক বানানোর চেষ্টায় নামে যুক্তরাষ্ট্র। আফগানিস্তান, ইরাক, সিরিয়া, লিবিয়া- একের পর এক দেশ আক্ষরিক অর্থেই ধ্বংস করে দেয় যুক্তরাষ্ট্র। তাতে চেইন রিঅ্যাকশনে সন্ত্রাসের বিশ্বায়ন ঘটে। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, বাংলাদেশ, নিউজিল্যান্ড, শ্রীলঙ্কা- বিশ্বের কোনও দেশই আর নিরাপদ নয়। সন্ত্রাসের এই বিস্তার গোটা বিশ্বকেই অস্থির, অসহিষ্ণু, সহিংস করে তুলেছে। ক্রমাগত নির্যাতনে মুসলমানদের কেউ কেউ পাল্টা আঘাত হানে। তাতে ভারসাম্য হারায় ইউরোপ-আমেরিকার শ্বেত আধিপত্য। অভিবাসীদের জোয়ারে নিশ্চিন্ত হারানোর শঙ্কায় হাতে অস্ত্র তুলে নেয় খ্রিস্টান সন্ত্রাসী টারান্ট। এখনও নিশ্চিত নয়, তবে কেউ কেউ বলছেন, শ্রীলঙ্কার হামলা নিউজিল্যান্ডে হামলার প্রতিশোধ। ঘটনার দু’দিন পর আইএস দায় স্বীকার করেছে। সন্দেহ করা হচ্ছে শ্রীলঙ্কার ন্যাশনাল তাওহিদ জামাতকেও। হয়তো স্থানীয় সন্ত্রাসীদের সঙ্গে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসীরা মিলে ঘটিয়েছে এই হত্যাযজ্ঞ। কে বা কারা ঘটিয়েছে, সেটা নিয়ে নিশ্চয়ই অনেক তদন্ত হবে, ইতোমধ্যে অনেককে গ্রেফতারও করা হয়েছে। কিন্তু ৩২১ জনকে আর ফিরে পাওয়া যাবে না। তার চেয়ে বড় শঙ্কা শ্রীলঙ্কায় যদি নিউজিল্যান্ডের প্রতিশোধ হয়, তবে শ্রীলঙ্কার প্রতিশোধ হবে কোথায়? আমরা চোখের জল না শুকিয়ে অপেক্ষা করবো নতুন কোনও ট্র্যাজেডির জন্য?

আগেই বলেছি বিশ্বটা বদলে গেছে। যতটা দৃশ্যমান, তারচেয়ে অনেক বেশি ভেতরে ভেতরে। ডোনাল্ড ট্রাম্প বা নরেন্দ্র মোদির মতো কট্টর জাতীয়তাবাদী মৌলবাদী নেতাদের ক্ষমতায় আসাই শুধু নয়, বিশ্বের অনেক কট্টর ডানপন্থি প্রভাবশালী হয়ে উঠছে। একটা সময় বর্ণবাদী মন্তব্য করাটা অপরাধ ছিল, লজ্জার ছিল। কিন্তু বিশ্বের অনেকেই অবলীলায় বর্ণবাদী মন্তব্য করে, শ্বেতাঙ্গ আধিপত্য চায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিশ্ব যতটা এগিয়েছিল, গত তিন দশকে ভূতের পায়ে হেঁটে বিশ্ব কি তারচেয়েও পিছিয়ে গেলো? আমেরিকাকে আবার গ্রেট বানানোর স্লোগান দিয়ে ক্ষমতায় চলে আসেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। কট্টর হিন্দুত্বের স্লোগান নির্বাচনি বৈতরণী পার হতে চান নরেন্দ্র মোদি। ভারতীয় শিল্পী কবির সুমন গেয়েছিলেন, ‘আমি চাই বিজেপি নেতার সালমা খাতুন পুত্রবধূ, আমি চাই ধর্ম বলতে মানুষ বুঝবে মানুষ শুধু।’ কিন্তু তার চাওয়া পূরণ হয়নি। আমরা এখন মানুষকে আগে ধর্ম, বর্ণ, জাতি, ভাষা দিয়ে বিবেচনা করি; মানবতা বিবেচনাতেই আসে না। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছিলেন, ‘ভগবান, তুমি যুগে যুগে দূত, পাঠায়েছ বারেবারে দয়াহীন সংসারে, তারা বলে গেল ‘ক্ষমা করো সবে’, বলে গেল ভালোবাসো’– অন্তর হতে বিদ্বেষবিষ নাশো’।

কিন্তু বিদ্বেষবিষ আমরা নাশ করতে পারিনি। আমাদের অন্তর বিদ্বেষের বিষে পূর্ণ। কেউ কাউকে সইতে পারি না। সবাই একেকজন কট্টর মৌলবাদী। মুখে গণতন্ত্রের কথা বলি বটে। কিন্তু ভিন্নমত একেবারে সইতে পারি না। যাদের ক্ষমতা আছে, তারা চাপাতি বা বোমা নিয়ে প্রতিপক্ষের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ি। না পারলে কুৎসিৎ ভাষায় প্রতিপক্ষকে আক্রমণ করি। ফেসবুক ভাসিয়ে দেই বিদ্বেষবিষে।

শ্রীলঙ্কার হামলায় আমি যতটা কষ্ট পেয়েছি; তারচেয়ে বেশি শঙ্কিত হয়েছি, কষ্ট পেয়েছি এর প্রতিক্রিয়া দেখে। যেদিন শ্রীলঙ্কায় চার্চে হামলা হয়েছে, সেদিন ছিল খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম ধর্মীয় উৎসব ইস্টার সানডে। সেদিন রাতেই ছিল ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের ধর্মীয় উৎসব পবিত্র শবে বরাত। আমি আশা করেছিলাম সেদিন বাংলাদেশের প্রতিটি মসজিদে শ্রীলঙ্কা হামলার নিন্দা হবে। নিহতদের জন্য প্রার্থনা হবে। কিন্তু বিস্ময়কর বেদনায় আমি দেখলাম তেমন কিছু ঘটেনি। শ্রীলঙ্কা হামলার চেয়ে বাংলাদেশের মাওলানাদের এই নীরবতা আমাকে কম কষ্ট দেয়নি। নিউজিল্যান্ডে হামলার পর সে দেশের  প্রধানমন্ত্রী জাসিন্ডা আরডার্ন যে গভীর মমতায় মুসলমানদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন, তা ঊর্ধ্বে তুলে ধরেছিল মানবতাকে। আমি আশা করেছিলাম, শ্রীলঙ্কার ঘটনার পর কোনও মুসলমান ধর্মগুরু আক্রান্ত খ্রিস্টানদের পাশে দাঁড়াবেন। এই ঘটনায়, পবিত্র শবে বরাতের রাতে ইসলামের মানবতা ও শান্তির পতাকা ঊর্ধ্বে তুলে ধরার সুযোগ ছিল। যে সুযোগটি আমরা হেলায় হারিয়েছি। এটা আমার বড় আফসোস। সন্ত্রাসের সাথে ইসলামকে জড়িয়ে ফেলার পশ্চিমা ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে এটা হতে পারতো মোক্ষম জবাব। সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে বায়তুল মোকাররমের দক্ষিণ গেটে সোচ্চার প্রতিবাদ হতে পারতো। হয়নি। বরং কারো কারো মধ্যে একটা গোপন উল্লাস দেখেছি, নিউজিল্যান্ডে মসজিদে হামলার একটা উপযুক্ত জবাব দেওয়া গেছে বুঝি। আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল লিখেছিলেন, ‘হিন্দু না ওরা মুসলিম? ওই জিজ্ঞাসে কোন জন? কান্ডারী! বল, ডুবিছে মানুষ, সন্তান মোর মার।’ কিন্তু আমরা কি তেমনভাবে ধর্মের ঊর্ধ্বে উঠে আক্রান্ত মানবতার পাশে দাঁড়াতে পারছি? এমনিতে হিন্দুদের ওপর হামলা হলে হিন্দুরাই প্রতিবাদ করে, মুসলমানদের ওপর হামলা হলে মুসলমানরা, বৌদ্ধদের ওপর হলে বৌদ্ধরাই প্রতিবাদ করে। সাধারণত সংখ্যালঘুরাই হামলার শিকার হয় বেশি। তাই তাদের প্রতিবাদও তেমন সোচ্চার হয় না। কিন্তু আমি চাই ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই আক্রান্তের পাশে থাকবে, ন্যায়ের পক্ষে লড়বে, সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে সোচ্চার থাকবে। ধর্ম, বর্ণ বা জাতি নয়; ঘটনা বিবেচনায় প্রতিবাদের ঝড় উঠবে পৃথিবীর সব প্রান্তে।

বাংলাদেশে ধর্মগুরুদের মধ্যে সবচেয়ে সম্মানিত হেফাজতে ইসলামের আমির আল্লামা শাহ আহমেদ শফি। প্রায়ই তিনি বিভিন্ন বিষয়ে ফতোয়া দেন। দেশের পাঠ্যপুস্তক, ভাস্কর্য স্থাপনা, নারী শিক্ষা- সব বিষয়েই তার মতামত থাকে। কয়েকদিন আগে তিনি কাদিয়ানিদের অমুসলিম ঘোষণার দাবি তুলেছেন। কিন্তু শ্রীলঙ্কায় ধর্মীয় উপাসনালয়ে হামলার বিষয়ে তিনি কিছু বলেননি। তিনি কি যারা ইসলামের নামে সন্ত্রাস করে তাদের অমুসলিম ঘোষণার দাবি তুলতে পারেন না? ধর্মগুরুরাই তো পারেন ধর্মের আসল বাণী, মূল চেতনা ছড়িয়ে দিতে। আমরা বারবার বলি, ইসলাম শান্তির ধর্ম। কিন্তু পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে ইসলামের নামে কিছু লোক সন্ত্রাস করছে। অল্পকিছু সন্ত্রাসীর জন্য সারাবিশ্বে শান্তির ধর্ম ইসলামকে হেয় করা হচ্ছে। খ্রিস্টান ধর্মও শান্তির কথাই বলে। কিন্তু এক টারান্ট নিউজিল্যান্ডে হামলা চালিয়ে কলঙ্কিত করেছে খ্রিস্টধর্মকেই। হিন্দুধর্মেও সন্ত্রাসের কথা নেই। কিন্তু তারাও সুযোগ পেলে গরু খাওয়ার অপরাধে মানুষকে পিটিয়ে মেরে ফেলে। বৌদ্ধধর্মের মূল চেতনাই অহিংসা। কিন্তু এই অহিংস বৌদ্ধরাই মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের ওপর কী গণহত্যা চালিয়েছে, তা গোটা বিশ্ব দেখেছে। কোনও ধর্মেই সন্ত্রাসের কথা বলা নেই। কিন্তু বিশ্বজুড়ে ধর্মের নামেই হানাহানি হয় বেশি। বিভিন্ন ধর্মের শীর্ষ ব্যক্তিদের বিষয়টি নিয়ে ভাবা দরকার। সবাই মিলে যদি ধর্মীয় মূল্যবোধটাকে ছড়িয়ে দিতে পারেন, শান্তির বাণী ছড়িয়ে দিতে পারেন, মানবতাকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরতে পারেন; তাহলেই শুধু এই অন্ধকার সময় শেষ হওয়া সম্ভব। কিন্তু মনে হচ্ছে সে সম্ভাবনা সুদূর পরাহত। এতদিন জানতাম, রাত যদি গভীর হয়, ভোর তত নিকটে আসে। কিন্তু অন্ধকার আরও তীব্র হচ্ছে যেন। পাঞ্জেরিও জানে না, রাত পোহাতে কত দেরি।

কিন্তু এই আঁধার কাটিয়ে আলো আনতে আমাদেরও নজরুলের মতো সাম্যের গান গাইতে হবে

‘গাহি সাম্যের গান

যেখানে আসিয়া এক হয়ে গেছে সব বাধা-ব্যবধান,

যেখানে মিশেছে হিন্দু-বৌদ্ধ-মুসলিম-ক্রীশ্চান।

...

গাহি সাম্যের গান

মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহিয়ান,

নাই দেশ-কাল-পাত্রের ভেদ, অভেদ ধর্ম-জাতি

সব দেশে-সবকালে, ঘরে-ঘরে মানুষের জ্ঞাতি।’

লেখা শেষ করছি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রশ্ন দিয়েই, ‘যাহারা তোমার বিষাইছে বায়ু, নিভাইছে তব আলো,

তুমি কি তাদের ক্ষমা করিয়াছ, তুমি কি বেসেছো ভালো?’

কিন্তু যারা আমাদের শান্তির আলো নিভিয়েছে, তারা যে ধর্মের নামধারীই হোক, তাদের জন্য ভালোবাসা নয়, ঘৃণা। আমরা চাই, সবাই নিজ নিজ ধর্মের মূল চেতনায় ফিরে গড়ে তুলুক শান্তির পৃথিবী। তখন সবাই সবাইকে ভালোবাসবে, ক্ষমা করে দেবে।

লেখক: হেড অব নিউজ, এটিএন নিউজ

 

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ