যতই রুখিবে ততই বাড়িবে

Send
লীনা পারভীন
প্রকাশিত : ১৫:২৫, এপ্রিল ২৬, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:৩৪, এপ্রিল ২৬, ২০১৯






লীনা পারভীনসাম্প্রতিক বছরগুলোতে নারী উন্নয়ন, নারী স্বাধীনতা এবং নারীকে টেনে ধরে ঘরে আটকানোর চেষ্টা যেন প্রায় হাত ধরাধরি করে চলছে। একদিকে সরকারের ঐকান্তিক চেষ্টা, যেখানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রায় একক কমিটমেন্ট বা জেদ নারীদের এগিয়ে নিতে, আরেকদিকে সমাজের আনাচে কানাচে গজিয়ে ওঠা উগ্র ধর্মীয় মৌলবাদী গোষ্ঠী, যারা নারীকে পিছিয়ে রাখতে চায় তারা।




আমরা সবাই জানি, ২০১৩ সালে হেফাজতে ইসলামী ঘোষিতে নীতিমালার বেশিরভাগই ছিল নারীবিদ্বেষী, যেখানে তারা সরকারের নারী নীতিমালাকে চ্যালেঞ্জ করতে চেয়েছিলো। পাঠ্যপুস্তকে নারীর ক্ষমতায়ন বিরোধী বক্তব্যকে সংযোজনের দাবি তাদের অনেক আগে থেকেই। নারীদের লেখাপড়া করানোরও বিরোধী এই গোষ্ঠীটি। কিন্তু ছোটখাটো কিছু অর্জন থাকলেও বৃহৎ অংশে তারা কোনদিক দিয়েই নারী অগ্রগতিকে আটকে রাখতে পারেনি। বরং দিনে দিনে নারীরা আরও অনেক বেশি প্রশাসনিক পদে আসীন হচ্ছে।

বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই আমরা নারীর প্রশাসনিক ক্ষমতায়নের বিরাট সাফল্য দেখতে পাচ্ছি। যা কিছু আগে ঘটেনি তা-ই ঘটতে লাগলো একের পর এক। ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশের সংসদের স্পিকার হলেন একজন নারী। বিচারপতির আসনেও এলেন নারীরা। পুলিশের উচ্চপদেও যোগ্যতার প্রমাণ দিতে লাগলেন এ দেশের নারীরা। বিমানের পাইলট হিসাবে যাত্রা শুরু করলেন সাহসী কিছু নারী। সেসব এখন আমাদের সবার কাছেই উদাহরণ হিসাবে আছে।

এতদিন কেবল আমরা কিছু নিয়মতান্ত্রিক পজিশনে নারীদের দেখে এসেছিলাম। কিন্তু এবার যে ইতিহাস রচিত হলো সেটি অনেক দিক থেকে ব্যতিক্রম। ব্যতিক্রম এই কারণে যে সমাজে প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী নারীরা ব্যবসা বাণিজ্য বোঝে না। নারীদের মগজ হচ্ছে মুরগির মগজ, যেখানে ধারণ ক্ষমতাই নেই। ব্যবসার মতো একটি জটিল বিষয় বোঝা নারীদের কর্ম নয়। আমি এমন পরিবারও জানি, যারা যুগের পর যুগ ব্যবসা করে যাচ্ছেন এই দেশে কিন্তু পরিবারের নারীদের জন্য প্রায় ঘোষণা দিয়ে নিষিদ্ধ করা আছে তারা যেন কোনোভাবেই ব্যবসায়িক কর্মের সাথে যুক্ত না হতে পারেন। এমনকি কোনও প্রকার ব্যাংকিং লেনদেনের সাথেও জড়িত করা হয় না অথচ হয়তো লোন নেয়া হচ্ছে পরিবারের কোন একজন নারীর নামেই। ঋণের ভাগিদার হচ্ছে কিন্তু এর ভেতরের অন্য কোনও তথ্যই জানতে পারছেন না সেই নারীরা।

কী অদ্ভুত আমাদের মানসিকতা। আমি নিশ্চিত সেই পরিবারগুলোর পুরুষরাও বিশ্বাস করে নারীরা এই কাজের যোগ্য নয়। তাদের জন্য কেবল সংসার সন্তান লালনই উপযুক্ত কাজ আর মাসে মাসে স্বামীর কাছ থেকে টাকা বুঝে নেয়াতেই সীমাবদ্ধ তাদের অধিকারের চর্চা।

এই যখন সামাজিক পরিস্থিতি তখন বিজিএমইএ’র মতো দেশের সবচেয়ে ব্যবসায়িক সংগঠনের প্রধান হওয়া কম যোগ্যতার প্রমাণ নয়। বাংলাদেশের মতো একটি পিছিয়ে পড়া মানসিকতার দেশে হাজার হাজার পুরুষ ব্যবসায়ীকে সামলাবেন একজন নারী, নেতৃত্ব দিবেন একজন নারী, সিদ্ধান্ত দিবেন একজন নারী আর সেইসব পুরুষদের প্রতিষ্ঠানের ভালোমন্দের সিদ্ধান্তের সাথেও যুক্ত থাকবেন একজন নারী। ভাবতেই পারছি না। কেমন করে সম্ভব এটা মেনে নেয়া। আমি ব্যক্তিগতভাবে অত্যন্ত আনন্দিত যে গোটা বিশ্বে আমরা নারীর ক্ষমতায়নের আরেকটি পালক যুক্ত করলাম বলে। বাইরের দেশেও এটাই বুঝবে যে বাংলাদেশে মৌলবাদী গোষ্ঠীর লম্ফজম্ফ কেবল কাগজে কলমেই আছে,  বাস্তবে এর কোনও প্রতিফলন নেই।

বিজিএমইএ আমাদের দেশের গার্মেন্ট শিল্পকে নিয়ন্ত্রণ করে। আর এ খাতটি এই মুহূর্তে আমাদের অর্থনীতির প্রধান চালক কে না জানি। কৃষিনির্ভর অর্থনীতিকে ধীরে ধীরে শিল্পনির্ভর করতে এই সংগঠনের বাস্তবতাকে অস্বীকার করা যাবে না। প্রধানমন্ত্রী তাঁর বক্তৃতায় বলেছেন, আমাদের ধীরে ধীরে শিল্পায়নের দিকে আগাতে হবে। আর গ্লোবালাইজেশনের এই যুগে শিল্পের অগ্রগতি ছাড়া টেকসই অর্থনীতি করা প্রায় অসম্ভব। কৃষিকে বাঁচিয়ে রেখেই শিল্পের দিকে নজর দিতে হবে আর কৃষির অগ্রগতিতেও যে শিল্পের অবদান দরকার এটাও নিশ্চয়ই আমরা মেনে নেবো।

আমাদের সামনে প্রয়াত আনিসুল হক কিছু উদাহরণ সেট করে গেছেন। তিনি যেমন সফল একজন নেতা ছিলেন, তেমনি ছিলেন সফল একজন নগরপিতাও। একজন নেতা যদি দেশপ্রেমিক ও সৎ উদ্দেশ্যের হয় তাহলে তিনি যেখানেই থাকবেন সেখানেই সুফল নিয়ে আসবেন দেশের জন্য। আমরা বিশ্বাস করি রুবানা হক সেই ধারাবাহিকতাকেই বহন করবেন। তিনি আজকে যে জায়গাটিকে জয় করেছেন সেটি করেছেন নিজের যোগ্যতার সাক্ষ্য রেখেই। তাঁর সম্পর্কে যতটুকু জেনেছি তিনি একদিকে একজন ব্রিলিয়ান্ট শিক্ষার্থী , অন্যদিকে একজন ব্রিলিয়ান্ট সংগঠকও বটে। আছে অনেক মানবিক গুণাবলির মিলন। একজন মানবিক মানুষ সব জায়গাতেই মানবিক হবেন। বিজিএমইএ’কে আরও বেশি কার্যকর ও শক্তিশালী করতে তাঁর নিজস্ব যে স্টাইল আছে সেটিকেই সবার মতের ভিত্তিতে বাস্তবায়ন করবেন নিশ্চয়ই। তিনি তাঁর বক্তব্যে বলেছেন টিম ওয়ার্কে বিশ্বাস করেন। গার্মেন্টস শিল্পে অনেক জায়গা আছে যেখানে কাজ করার আছে প্রচুর। দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলা তার মধ্যে একটি অন্যতম। অদক্ষ শ্রমভিত্তিক এই বাজারটিকে আধুনিকায়নের দিকে নজর না দিলে মার্কেট হারানোর মতো বিপদও আছে আমাদের সামনে। অদক্ষ শ্রমিক মানেই স্বল্প মজুরিভিত্তিক শ্রম কিন্তু যদি কোয়ালিটি কাজ ও কোয়ালিটি প্রোডাকশনের কথা ভাবা হয় তাহলে অদক্ষ শ্রম আর স্বল্প মজুরি দিয়ে বেশিদূর আগানো সম্ভব নয়। আর এই জায়গাটিকে যদি আমরা একবার হারিয়ে ফেলি তাহলে ফিরে পাওয়া সম্ভব হবে না।

প্রতিযোগিতার এই বাজারে আমাদেরও এখন প্রতিযোগিতা করেই কাজ পেতে হচ্ছে। যেখানে কমপ্লায়েন্স হয়ে গেছে অন্যতম একটি মাপকাঠি। এই একটি জায়গাতে আমাদের পাস নম্বর অনেক কম। রানা প্লাজা ঘটনার পর যদিও আমরা কিছুটা এগিয়েছি কিন্তু এই আগানোর কৃতিত্ব পুরোটাই বিদেশিদের। আমাদের অভ্যন্তরীণ বাজারে কতজন বিশেষজ্ঞ তৈরি হয়েছে সেটিও ভেবে দেখা দরকার। অভ্যন্তরীণ শক্তি যদি প্রতিষ্ঠিত না হয় তাহলে বিদেশিনির্ভরতা আমাদের জন্য অনেক বেশি কস্টলি এবং কস্ট ইফেক্টিভ নয়। বিদেশিদের পালতে গিয়ে আমাদের নিজেদের মানবসম্পদের দিকে রয়েছে অবহেলা।


এমন অনেক জায়গা আছে যেগুলো নিয়ে কাজ করতে হবে বিজিএমইএ’কে। এর জন্য প্রয়োজন একজন দক্ষ প্রশাসকের, যিনি একদিকে নিজেদের স্বার্থ দেখবেন, অন্যদিকে সবচেয়ে আগে দেখবেন দেশের স্বার্থকে।


আমরা আশা করছি রুবানা হক একজন তেমনি প্রশাসক হয়ে কেবল দেশেই নয়, গোটা বিশ্বের সামনে নজির স্থাপন করবেন। এই বিজিএমইএ’র কর্মকাণ্ডের ওপর নির্ভর করে কতটা ব্যবসা আনা যাবে।



আবারও অভিনন্দন রুবানা হক আপনাকে। আমাদের দেশের অসহায় ও পিছিয়ে পড়া নারীদের বাতিঘর হয়ে সামনে রইবেন- এই প্রত্যাশাও রইলো আপনার কাছে।

লেখক: কলামিস্ট  

.

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ