গণমাধ্যমের স্বাস্থ্যের যত্ন নেবে কে?

Send
তুষার আবদুল্লাহ
প্রকাশিত : ১৫:০৫, এপ্রিল ২৭, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:২২, এপ্রিল ২৭, ২০১৯

তুষার আবদুল্লাহটেলিভিশন রুগ্‌ণ শিল্প। তাহলে সংবাদপত্র নিশ্চয়ই নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র? অস্বীকার করার উপায় নেই দেশের সাতশ’ সংবাদপত্রের মধ্যে হাতেগোনা কয়েকটি ছাড়া বাকি সবক’টি কৃত্রিম শ্বাস-প্রশ্বাস নিয়ে বেঁচে আছে। দৈনিক, সাপ্তাহিক, পাক্ষিক, মাসিক সবার স্বাস্থ্যের অবস্থা একই। পত্রিকার মলাট বা ছাপার চাকচিক্য দেখে ভেতরের ক্ষয়রোগ বোঝার উপায় নেই। কোনও কোনোটি কিছুদিন একটা দাপুটে ভাব দেখিয়ে, তারপরই নেতিয়ে পড়ছে। কারণ কী? প্রথম কারণ হিসেবে অনেকে অনলাইন সংস্করণ বা ওয়েবপোর্টালকে দায়ী করছে। পাঠকরা সরে আসছে সনাতন কাগুজে পত্রিকার পাতা উল্টানোর অভ্যাস থেকে।
দৈনিক পত্রিকার জন্য ভোর অবধি অপেক্ষার ধৈর্য হারাতে বাধ্য করা হয়েছে পাঠককে। ওয়েবপোর্টাল এই মুহূর্তের খবর এখনই জানিয়ে দিচ্ছে। ফলে পাঠক বলছে এখনই জানাও আমাকে। হুম এখনই, পাঠকের এই দাবি পূরণ করতে গিয়ে ওয়েবপোর্টালকেও হিমশিম খেতে হচ্ছে। এই অস্থির পাঠক সামাল দেওয়ার মুরোদ নেই সনাতন পত্রিকার। কারণ ওয়েবপোর্টাল বা অনলাইন সংস্করণের একই খবর নিয়ে তারা পরদিন পাঠকের দরজায় কড়া নাড়ছে। পাঠক সাড়া দিচ্ছেন না এই ডাকে। সনাতন পত্রিকা পাঠককে সঙ্গে রাখতেই পারতো, যদি আগের দিনে-রাতে অনলাইন সংস্করণে প্রকাশিত খবরের পেছনের খবর, ঘটনাকে অন্য দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা বা অনুসন্ধানী খবর নিয়ে পাঠকের পাতে পরিবেশন করা হতো। সংবাদপত্র এই কাজটি করতে পারেনি, পারছে না এজন্য, তার যে পুঁজির জোগানদাতা এবং রাজনৈতিক স্বজন তাদের তুষ্ট রাখতে চাইলে পাঠক-পছন্দ খবর পরিবেশন করা সম্ভব নয়। ফলে দিনের ঘটে যাওয়া সাধারণ খবরেই তাকে কাগজে ছাপতে হচ্ছে। পাঠক সেটি হাতে তুলে নিচ্ছে না বলে হচ্ছে কাগজের অপচয়। সংবাদপত্র ব্যবসা করতে পারছে না। যার ফল হলো লোকসান গুনতে হচ্ছে। লোকসানের ফলে সাংবাদিক কর্মচারীরা প্রত্যাশিত বেতনভাতা পাচ্ছে না। অনেক সংবাদপত্রেই সময়মতো বেতন হচ্ছে না। কোনও কোনও সংবাদপত্র বন্ধ করে দিচ্ছেন মালিকরা। জেলা পর্যায়ে তো বটেই, জাতীয় পর্যায়েও এই দৃষ্টান্ত প্রায় নিয়মিত হয়ে দাঁড়িয়েছে। সংবাদপত্রের এই কাহিল অবস্থার জন্য এই খাতে দক্ষ জনবল তৈরি না হওয়াকেও দায়ী করা যায়।

শুক্রবার প্রধানমন্ত্রী বরাবর সাংবাদিকরা সংবাদপত্রের এই করুণদশার কথা তুলে ধরেছেন। প্রধানমন্ত্রী তথ্যপ্রযুক্তিবান্ধব হয়ে অনলাইনে অভ্যস্ত হওয়ার কথা বললেন। তিনি বিভিন্ন দেশে সংবাদপত্র বন্ধ হয়ে যাওয়ার উদাহরণও তুলে ধরেছেন। কিন্তু আমাদের এখানে সমস্যা হলো সংবাদপত্রের মতো অনলাইন সাংবাদিকতাতেও দক্ষ জনবল তৈরি হচ্ছে না। রাজধানীসহ সারাদেশে যে অনলাইন পত্রিকার প্রায় ‘পারমাণবিক’ বিস্ফোরণ ঘটেছে, সেটি সাংবাদিকতার নৈতিকতা, সততা ও পেশাদারিত্বের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রধানমন্ত্রী পরামর্শ দিয়েছেন প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে। এই ব্যবস্থাপত্র যথাযথ ঠিক। কিন্তু অনিয়ন্ত্রিত অনলাইন এরই মধ্যে মাঠপর্যায়ে পেশাদারি সাংবাদিকতার জন্য যে হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে, সেটি গণমাধ্যমকর্মীসহ সব পেশার মানুষই জানেন। একই সঙ্গে অনলাইন সংস্করণ বা ওয়েবপোর্টালের চটকদার, প্রতারণামূলক সংবাদ কপি ও প্রতিলেপন প্রবণতা ভোক্তাকে এরই মধ্যে অনলাইন বিমুখ করতে শুরু করেছে।

টেলিভিশনে কর্মরত গণমাধ্যমকর্মীদের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রীকে জানানো হয়েছে–এই খাত এখন রুগ্‌ণ শিল্পের মতো ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। বিজ্ঞাপনের বাজারটা চারিদিকে ছড়িয়ে গেছে। বিদেশি চ্যানেলে বিজ্ঞাপন প্রচার হচ্ছিল দেশের আইন ভঙ্গ করে। এছাড়া নতুন নতুন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম চালু হয়েছে ফেসবুক, ইউটিউব। এগুলোতে অনেক বিজ্ঞাপন চলে যাচ্ছে। আর এতে বাংলাদেশের টেলিভিশন চ্যানেলগুলো আর্থিক সংকটে রুগ্‌ণ হয়ে পড়ছে। এই তথ্য শুনে প্রধানমন্ত্রী হয়তো অবাক হয়েছেন। কারণটা তার প্রতিক্রিয়া থেকেই বুঝা গেলো-রুগ্‌ণ হলে এখনও অনেকে টেলিভিশন চ্যানেল চাচ্ছে কেন? টেলিভিশনের বেলায়ও সংবাদপত্রের জন্য বলে আসা কথাগুলোই বলতে হবে। পুরনোতে না ফিরে শুধু বলতে পারি-এখানকার টেলিভিশন এখন টিকে আছে অনলাইন বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ঘাড়ে চেপে। মানুষ চারকোনা বাক্সের টেলিভিশন সেটের সামনে বসছে না। ভোক্তাকে কোনও খবর বা অনুষ্ঠান দেখাতে হলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের শরণাপন্ন হতে হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লিঙ্ক দেখে যদি কারো ইচ্ছে জাগে–তবে খবর বা অনুষ্ঠানের অংশটি দেখছে মানুষ। মানুষ তার যাপিত জীবনে যে অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, টেলিভিশন সংবাদে তা যথাযথভাবে উঠে আসছে না। ফলে মানুষ দেখছে টেলিভিশনে সে এবং তার প্রতিবেশ নেই। ফলে দর্শক টেলিভিশন সংবাদ থেকে চোখ সরিয়ে নিচ্ছে। কতিপয় রাজনৈতিক সংগঠন, নেতা, কিছু দফতরের রুটিন কাজে ঠাসা টেলিভিশন খবর। সেখানে অনুসন্ধানী ও ফলোআপ সংবাদ নেই। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে শক্তি সঞ্চয় করে কোনও কোনও জনগুরুত্বপূর্ণ খবর প্রচারের সিদ্ধান্ত নিচ্ছে টেলিভিশন। এই বাস্তবতায় দর্শক কমাটাই স্বাভাবিক। যেখানে দর্শক নেই সেখানে বিজ্ঞাপনও থাকবে না। পাশাপাশি ইউটিউবসহ ডিজিটাল মিডিয়ার ভোক্তা বাড়াতে বিজ্ঞাপনদাতাদের বিনিয়োগে সেদিকেই যাচ্ছে। কেবল সংবাদ কেন? অনুষ্ঠান তৈরিতে অনুকরণপ্রবণতা ও কম বাজেট বরাদ্দ থাকায় মানসম্মত অনুষ্ঠানও তৈরি হচ্ছে না। ফলে এখানকার টেলিভিশনের অনুষ্ঠানও এখন প্রায় দর্শকহারা। এই বাস্তবতায় টেলিভিশনের রুগ্‌ণ না হয়ে উপায় কী? উদ্যোক্তারা টেলিভিশনের মালিকানার বিষয়ে যতটা তাড়না বোধ করেছেন, ততটা তাঁর ছিটেফোঁটাও তাড়িত হননি দক্ষ লোকবল ও খবর, অনুষ্ঠানের মান রক্ষায়। ফলে এই খাতেও অদক্ষ, আধাদক্ষ জনবলের ভিড় বা চাপই বেড়েছে কেবল। নতুন যারা টেলিভিশন চাইছেন, সবাইকে টেলিভিশন দিয়ে দিতে বলেছেন প্রধানমন্ত্রী। আর কিছু না হোক কিছু মানুষের চাকরি তো হবে, কাজ তো পাবে অনেকে। প্রধানমন্ত্রী যে বিবেচনায় লাইসেন্স দেওয়ার বিষয়ে উদার হচ্ছেন, উদ্যোক্তারা কি সেই বিবেচনায় দক্ষ জনবল তৈরির উদ্যোগ নেবেন? সংবাদ ও অনুষ্ঠানের মানরক্ষা বা বাড়াতে উদার হবেন? যদি হোন তবেই রুগ্‌ণদশা কাটবে। জনপ্রত্যাশিত সংবাদ ও অনুষ্ঠান তৈরি করে দেখুন, কারও করুণায় আপনাকে টিকে থাকতে হবে না। কাঁধে ভর রাখতে হবে না সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের। ভোক্তা আপনার দিকে ছুটবেই। প্রযুক্তির পরিবর্তনের কারণে ভোক্তা হয়তো চারকোনা বাক্সের বদলে মুঠোফোনে আপনার নির্মাণ দেখবে। আকার যাই হোক সে তো টেলিভিশনই থাকছে, তাই না?

লেখক: বার্তা প্রধান, সময় টিভি

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ