এই দৌড়টা যদি আমাদের সিনেমার জন্য হতো!

Send
রেজানুর রহমান
প্রকাশিত : ১৫:৫১, এপ্রিল ২৮, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:০৪, এপ্রিল ২৮, ২০১৯

রেজানুর রহমানরুদ্ধশ্বাসে দৌড়াচ্ছে তরুণ-তরুণীরা। সংখ্যায় অনেক। শত শত তরুণ-তরুণী দৌড়াচ্ছে একটি টিকিটের আশায়। তাও আবার লটারির টিকিট নয় যে মিললেই লাখ লাখ টাকার পুরস্কারও নিশ্চিত। সিনেমার একটি টিকিটের জন্য এত আকুলতা। অনেকে গভীর রাতে রাস্তার ওপর অথবা ফুটপাতে আস্তানা গেড়েছে যাতে টিকিট বিক্রির সংবাদ পাওয়া মাত্র দৌড়ে গিয়ে টিকিট কাউন্টারের সামনে সহজেই দাঁড়ানো যায়। অবিশ্বাস্য ঘটনা। বিদেশি সিনেমার একটি টিকিটের জন্য এতো সংগ্রাম? তাহলে আমাদের সিনেমার এত দুর্দিন যাচ্ছে কেন? হলের চেয়ার খালি পড়ে থাকে। ‘আসেন ভাই আসেন আমাদের সিনেমা দেখেন’ সদরঘাটের লঞ্চে যাত্রীবোঝাই করার স্টাইলে ডাক দিয়েও হলে দর্শক পাওয়া যায় না। মুক্তিপ্রাপ্ত নতুন ছবির ক্ষেত্রে প্রথম সপ্তাহেও হলের চেয়ার খালি পড়ে থাকে। কোথাও কোথাও একজন দু’জন দর্শকের জন্যও সিনেমার একটি শো চালাতে হয়। কী করুণ অবস্থা। সেখানে একটি সিনেমার টিকিট পাওয়ার জন্য কী দৌড়টাই না দিচ্ছে আমাদের তরুণ ছেলেমেয়েরা। আন্দাজে তাদের সংখ্যা গণনা করে মনে হলো এদের মধ্য থেকে শতকরা ২০-২৫ ভাগও যদি আমাদের দেশীয় সিনেমার জন্য এমন আগ্রহ দেখাতো তাহলে আমাদের ঐতিহ্য ও অহংকারের জায়গাটা এভাবে নিঃশেষ হয়ে যেত না।

বলছি মার্ভেল কমিকসের সুপার হিরোদের শেষ কর্মকাণ্ড নিয়ে সাজানো ‘অ্যাভেঞ্জার্স: এন্ডগেম’ ছবির কথা। পৃথিবীর অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও একই সাথে মুক্তি পেয়েছে ছবিটি। সিনেমা হলে একটি ছবি মুক্তি পেয়েছে, ভালো কথা। শুভ সংবাদ। কিন্তু তার টিকিট সংগ্রহের জন্য এত পাগল হয়ে যেতে হবে? আমার পরিবারেও এমন পাগলামি শুরু হয়েছে। প্রায় এক সপ্তাহ ধরে আমার মেয়ের মুখে শুনছি অ্যাভেঞ্জারের কথা। বন্ধুদের সঙ্গে মোবাইল ফোনে রীতিমতো বৈঠক করেছে কয়েক দফা। যে কোনও মূল্যে অ্যাভেঞ্জার্স দেখতেই হবে। কৌতূহলবশত মেয়েকে জিজ্ঞেস করলাম, তোমরা কী শুরু করেছ বল তো। একটা সিনেমা দেখার জন্য এতো পরিকল্পনা সাজাচ্ছো? ঘটনা কী? মেয়ে মুখে উত্তর না দিয়ে ফেসবুকের একটি লিংক ধরিয়ে দিয়ে বলল, যা লেখা আছে তার পুরোটাই পড়ো। তাহলে প্রকৃত ঘটনা জানতে পারবে। আমি অবাক বিস্ময়ে লেখাটি পড়তে থাকলাম।

তানিম চৌধুরী নামে একজন লিখেছেন, ‘আমরা যখন ছোট ছিলাম, বড় ভাইদের কাছে শুনতাম রাওয়া ক্লাবে বামবার কনসার্টে পাবলিক টিকেট পায় নাই বলে দেয়াল টপকে ভেন্যুতে ঢুকে গেছে। পুলিশ লাঠিচার্জ করতে এলে পুলিশের সঙ্গে মারামারি করেছে। এসব শুনে আমরা খুব অবাক হতাম। মনে করতাম, বড় হলে আমরাও এরকম অ্যাডভ্যাঞ্চার করে কনসার্ট দেখবো। বড় হয়ে আমরা আসলেই ধাক্কাধাক্কি করে কনসার্টের সামনের রো-তে ‘হেডব্যাং’ করেছি। সিনিয়র জুনিয়র কোনও ইস্যু ছিল না। যেইভাবে ইচ্ছা ‘মশিং’ করেছি। আবার কনসার্টের পরে এক সাথে পানিও শেয়ার করে খেয়েছি। গলা ফাটিয়ে এক সাথে গানও গেয়েছি। এখন বয়স হয়েছে। তাই ‘মশিং’ ‘হেডব্যাং’ না করলেও ওই সময়টাকে আসলেই মিস করি। ‘অ্যাভেঞ্জার্স: এন্ডগেম’-এর টিকিটের জন্য দৌড়ের ভিডিও দেখে অনেক মুরুব্বিদের দেখলাম কমেন্ট করতে। ‘এতো পাগল হবার কী আছে? পোলা পাইনের খায়া-দায়া কাজ নাই ইত্যাদি। ভাই ইস্যুটা আর কিছু না। ইস্যুটা হলো আপনারা বুড়ো হয়ে গেছেন। তরুণেরা এখন কী চায় সেটা আপনাদের চিন্তা-ভাবনায় খুব একটা স্থান পায় না। কাজেই তরুণদের দোষ দিবেন না।’

তানিম চৌধুরীর লেখা পড়ে আমি অভিভূত। তরুণবেলার কথা মনে পড়ে গেলো। তখনকার দিনে আনন্দ-বিনোদনের খোরাক বলতেই ছিল সিনেমা। প্রতি সপ্তাহে আমাদের সৈয়দপুর শহরের সিনেমা হলে নতুন সিনেমা মুক্তি পেতো। সিনেমার একটি টিকিট সংগ্রহের জন্য কী প্রাণান্তকর চেষ্টাই না করতে হতো। মনে আছে প্রয়াত গুণী চিত্র পরিচালক আমজাদ হোসেনের ‘গোলাপী এখন ট্রেনে’ সিনেমাটি দেখার জন্য এক সপ্তাহ অপেক্ষা করতে হয়েছে। ছবিটি মুক্তির প্রথম সপ্তাহের টিকিট আগেই বিক্রি হয়ে যায়। পরের সপ্তাহে এক টিকিট ব্ল্যাকারকে ধরে টিকিট সংগ্রহ করা সম্ভব হয়। তার মানে সিনেমার টিকিট সংগ্রহের জন্য দৌড়ঝাঁপ করার ঘটনা অতীতেও ঘটেছে। কিন্তু অতীতে আমরা দৌড়ঝাঁপ করতাম নিজেদের সিনেমার জন্য। এখন দৌড়ঝাঁপ করছি অন্য দেশের সিনেমার জন্য। ’৮০, ’৯০-এর দশকেও দেশে নতুন সিনেমা মুক্তি পাওয়ার দিন থেকেই গোটা দেশে উৎসবের আমেজ শুরু হয়ে যেত। লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে, পুলিশের লাঠিচার্জ, টিয়ার গ্যাস উপেক্ষা করেও এই দেশের মানুষ নিজেদের সিনেমার জন্য টিকিট কিনেছে। এখন নিজেদের সিনেমার কথা একদম ভাবেই না। সবার আগ্রহ যেন বাইরের দেশের প্রতি। কেন? এজন্য কি দর্শকরাই দায়ী? এই যে ‘অ্যাভেঞ্জার্স: এন্ডগেম’ দেখার জন্য দেশের তরুণ-তরুণীরা এত পাগল হয়ে গেছে এর কারণ কী? এরাই তো এক সময় দেশের সিনেমার দর্শক ছিল। এখন কেন তাদেরকে দেশের সিনেমা টানে না? এজন্য কি তারা দায়ী?

অ্যাভেঞ্জার্স সিনেমা সিরিজের আওতায় ১১ বছরে ২২টি সিনেমা নির্মিত হয়েছে। ‘এভেঞ্জার্স: এন্ড গেম’ এই সিরিজের শেষ ছবি। তাই ছবিটি দেখার জন্য দেশের তরুণ-তরুণীরা এত আগ্রহ দেখাচ্ছে। কোনও বিষয়ের ওপর যখন মানুষের আগ্রহ তৈরি হয় মানুষ তখন তার পেছনে লেগেই থাকে। অনেকে মন্তব্য করেন আমাদের তরুণদের মাঝে বই পড়ার আগ্রহ নাকি কমে গেছে। কথাটি মোটেই ঠিক নয়। কাজী আনোয়ার হোসেনের ‘মাসুদ রানা’ সিরিজ গ্রন্থ এখনও তরুণ পাঠকের আগ্রহের বিষয়। সুযোগ পেলেই অনেকে বলে থাকেন আমাদের টেলিভিশন অনুষ্ঠানের দর্শক নাকি কমে গেছে। কিন্তু একথাও সত্য নয়। গুণী নির্মাতা হানিফ সংকেতের ‘ইত্যাদি’ এখনও সমান জনপ্রিয়। বিটিভি বছরের পর বছর ধরে অনুষ্ঠানটি প্রচার করছে। তরুণ-তরুণীরাই মূলত এই অনুষ্ঠানটির মূল প্রেরণা। তার মানে আমাদের তরুণ-তরুণীরা নিজেদের ভালো কিছু দেখতে চায়। জাতীয় দলের ক্রিকেট খেলা থাকলে তাদেরকে তো বলতে হয় না, চলো খেলা দেখতে যাই। বরং তরুণ-তরুণীরাই নিজেরা দল বেঁধে আগেভাগেই স্টেডিয়ামের গ্যালারি দখল করে নেয়। কম্পিউটার মেলা শুরুর আগে তাদেরকে তো বলে দিতে হয় না। নিজেরাই খবর পেয়ে যায়। টিকিট কিনে কম্পিউটার মেলায় ঢুকে যায়। কেন যায়? ভালো কিছু দেখবে বলে, ভালো কিছু শিখবে বলে যায়।

অনেকেই হয়তো দ্বিমত পোষণ করবেন। তবুও বলি। বর্তমান সময়ে কী শেখাচ্ছে আমাদের দেশীয় চলচ্চিত্র? ধরে নিলাম চলচ্চিত্র কিছুই শেখায় না। কিন্তু বিনোদন তো দেয়। আমরা কি সেই অর্থে চলচ্চিত্রের মাধ্যমে বিনোদনও কি দিতে পারছি? একটা সময় ছিল দেশের সাধারণ দর্শক চলচ্চিত্রের পর্দায় যা দেখতো তাই বিশ্বাস করতো। কিন্তু এখন সেভাবে বিশ্বাস করে না। কারণ বিশ্বাসের অনেক কথাই চলচ্চিত্রের পর্দায় দেখার আগে সামাজিক গণমাধ্যমে দেখার সহজ সুযোগ পাচ্ছে তারা। অতীতকালে অন্যের ধার করা কাহিনি (কোনও কোনও ক্ষেত্রে চুরিও বলা যায়) নিয়ে এই দেশে অনেক ব্যবসা সফল সিনেমা নির্মিত হয়েছে। তখনকার দিনের দর্শক সেটা ধরতে পারেনি বলে বিশ্বাস করেছে। কিন্তু বর্তমান সময়ে অনেকেই অন্য দেশের সিনেমার কাহিনি চুরি করতে গিয়ে ধরা খাচ্ছেন। এই ছবি থেকে একটু ওই ছবি থেকে আরেকটু নিয়ে সিনেমার গল্প সাজিয়েও পার পাচ্ছেন না কেউ। কারণ এখনকার তরুণ-তরুণীরা অনেক বেশি সচেতন। কোথাও বিশ্বাস ভঙ্গ হচ্ছে দেখলে সহজেই তরুণদের পাওয়া যায় না। আমাদের দেশে এখন যারা সিনেমা নির্মাণে ব্যস্ত তাদের অনেকেই বোধকরি এসব বিষয়ে মোটেই মাথা ঘামান না। আর তাই অ্যাভেঞ্জার্স: এন্ড গেমের প্রতি তরুণদের আগ্রহ দেখে খুশি হতে পারছেন না অনেকে। তাদের উদ্দেশে বিনীতভাবে একটা কথা বলি। যে ছেলেমেয়েরা অ্যাভেঞ্জার্সের জন্য পাগল হয়ে উঠেছে তারা তো আপনার আমার, আমাদেরই সন্তান। কিন্তু তারা কেন আমাদের সিনেমার প্রতি আগ্রহী হচ্ছে না। ক্রিকেটে আগ্রহী হচ্ছে। তথ্যপ্রযুক্তিতে তাদের আগ্রহ ব্যাপক। সেই তুলনায় কেন সিনেমার প্রতি আগ্রহী হচ্ছে না? এর কারণ কি তলিয়ে দেখেছি?

শেষে একটা কথা বলি। আমাদের তরুণ-ছেলেমেয়েরা অনেক মেধাবী। তারা বিভাজন পছন্দ করে না। অথচ আমাদের চলচ্চিত্র পরিবারে অনেক বিভাজন চলছে। এফডিসিতে বর্তমান সময়ে ১০টি পৃথক সংগঠন ক্রিয়াশীল। চলচ্চিত্রের উন্নয়নের স্বার্থেই প্রতিটি সংগঠনের জন্ম হয়েছে। অথচ চলচ্চিত্রের উন্নয়নধারায় কারও তেমন কোনও কর্মসূচি নাই। দিনে দিনে বিভেদের বেড়াজাল বড় হচ্ছে। এককালের পর্দা কাঁপানো চিত্রনায়িকা শবনম কয়েকদিন আগে একটি পত্রিকায় দুঃখ প্রকাশ করে বলেছেন, আমাদের চলচ্চিত্র দিনে দিনে ধ্বংস হতে চলেছে। চলচ্চিত্রের সেই পরিবার এখন আর নাই। কেউ কাউকে শ্রদ্ধা করে না। মানে না। গ্রাহ্যও করে না। একদিন সবার অজান্তে বোরকা পরে এফডিসিতে গিয়ে একা দাঁড়িয়ে থেকে অনেক কেঁদেছেন শবনম। একথা উল্লেখ করে বলেছেন, মৃত্যুর পর তার লাশ যেন এফডিসিতে না নেওয়া হয়।

গুণী অভিনেত্রী শবনমের বক্তব্য এই লেখায় জুড়ে দেওয়া কতটা প্রাসঙ্গিক হলো এই ব্যাপারে অনেকে প্রশ্ন তুলতে পারেন। তাদের উদ্দেশে একটাই নিবেদন, আমাদের চলচ্চিত্রকে সত্যি সত্যি বাঁচাতে হলে এফডিসিতে বিভিন্ন সংগঠনের মধ্যে বিভেদের বেড়াজাল ভাঙতে হবে। আর কিছু না শুধু তরুণদের কথা ভেবে দেশীয় চলচ্চিত্র নির্মাণ করুন, দেখবেন অ্যাভেঞ্জার্সের চেয়েও বড় ঢল নামবে। সেজন্য আমরা প্রস্তুত কি? দেশীয় চলচ্চিত্রের জয় হোক।

লেখক: কথাসাহিত্যিক, নাট্যকার, সম্পাদক আনন্দ আলো।

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ