কী হবে ভারতের লোকসভার নির্বাচনি ফল

Send
বখতিয়ার উদ্দীন চৌধুরী
প্রকাশিত : ১৩:৪৪, মে ০২, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ২০:১৪, মে ০২, ২০১৯

বখতিয়ার উদ্দীন চৌধুরী২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদি হঠাৎ করে কেন্দ্রীয় রাজনীতির দৃশ্যপটে এসে স্বপ্নের ফেরিওয়ালা সেজে নির্বাচনের দৃশ্যটাই বদলে দিয়েছিলেন। ধনবাদী গোষ্ঠী তার পেছনে খুবই দৃঢ়ভাবে সমর্থন জুগিয়েছিল, গোয়ায় অনুষ্ঠিত বিজেপির চিন্তন বৈঠকে ধনবাদীরাই বিজেপিকে বাধ্য করেছিলো নরেন্দ্র মোদিকে প্রধানমন্ত্রীর প্রার্থী হিসেবে প্রদর্শন করার জন্য। বিদেশি পত্রিকা টাইমস, ইকোনমিস্ট ইত্যাদিতে দেখেছি ধনবাদী গোষ্ঠী নাকি নরেন্দ্র মোদিকে জিতিয়ে আনার জন্য ৭/৮ হাজার কোটি টাকা খরচও জোগান দিয়েছিলো। মোদির ব্যবসায়ী বন্ধু আম্বানির একাই ৪০টির বেশি টিভি চ্যানেল রয়েছে, যার সংবাদ চ্যানেলগুলো নানা ভাষায় মুখ্যত নরেন্দ্র মোদিকে নিয়ে সারাক্ষণ ব্যস্ত থাকতো।
শেষ পর্যন্ত বিজেপি এককভাবে ২৮২ আসন পেয়ে জিতেছিল। সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজন ২৭২ আসন। জোটগতভাবে বিজেপি পেয়েছিলো ৩৩৬ আসন। নরেন্দ্র মোদি একক আদিপত্যবাদী মানুষ। গত পাঁচ বছরে তিনি বিজেপির কোনও প্রবীণ নেতাকেই দৃশ্যপটে রাখেননি। লাল কৃষ্ণ আদভানি, মুরলি মনোহর যোশী, উমা ভারতী প্রমুখকে নিষ্ক্রিয় করেছেন। সুষমা স্বরাজ আর উমা ভারতী তার মন্ত্রিসভায় মন্ত্রী থাকলেও নরেন্দ্র মোদির হুকুমে মন্ত্রণালয় দুটি চলেছে। সপ্তদশ লোকসভা নির্বাচনে অনেক প্রবীণ নেতাকে মনোনয়ন পর্যন্ত দেওয়া হয়নি। আরও একটা বিষয় দেখলে কৌতূহল জাগে যে নরেন্দ্র মোদি এবারের সপ্তদশ লোকসভা নির্বাচনকে ‘মোদি ভার্সেস আদার্স’ হিসেবে রূপান্তর করেছেন।

কেন্দ্রে কেন্দ্রে বিজেপির প্রার্থীরা গৌণ হয়ে গেছে। পার্টিও মুখ্য কোনও বিষয় না। নরেন্দ্র মোদি একাই সবকিছু। দলের নামে নয়, নরেন্দ্র মোদির নামেই নির্বাচন হচ্ছে। মোদি গত পাঁচ বছর নিজেকে প্রদর্শন করে এই ইমেজ তৈরি করেছেন। এটা যেন নরেন্দ্র মোদির ওপর গণভোট। এভাবে যদি নরেন্দ্র মোদি সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন পেয়ে মন্ত্রিসভা গঠন করতে পারেন, তবে তিনি হয়তো ক’দিন পরে ‘আমিই রাষ্ট্র’ বলতে দ্বিধা করবেন না। এখন তো মোদির বিরোধিতাকারীদের, হিন্দু মৌলবাদের বিরোধিতাকারীদের তিনি এবং সংঘ পরিবারের লোকেরা রাষ্ট্রদ্রোহী হিসেবে চিত্রিত করছেন। গত পাঁচ বছর নরেন্দ্র মোদি একক কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্র পরিচালনার নজির স্থাপন করেছেন। এমনকি সুপ্রিম কোর্টের আদেশ পর্যন্ত অমান্য করেছেন।

রাফেল মামলার নথি তলব করেছিলেন সুপ্রিম কোর্ট। নথি পাওয়া যাচ্ছে না বলে এখনও নথি সুপ্রিম কোর্টকে প্রদান করেননি। অথচ রাফেল বিমান ক্রয়ের বিষয়টা সাম্প্রতিক বিষয়। দেশরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সেরেস্তায় এ নথি না পাওয়ার কথা নয়। রাফেল ক্রয়ে নয় ছয় হয়েছে, তা নির্বাচনের আগে প্রকাশ যেন না হয় সম্ভবত সে কারণে সুপ্রিম কোর্টকে নথি পাওয়া না যাওয়ার কথা বলে বিলম্ব করার চেষ্টা করছেন। কয়দিন আগে প্রধান বিচারপতি রঞ্জন গগৈর বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টের এক মহিলা কর্মচারী শ্লীলতাহানির চেষ্টা করেছে বলে অভিযোগ উত্থাপন করেছে। রঞ্জন গগৈ ফুল বেঞ্চ ডেকে অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন আমার কোর্টে কিছু গুরুত্বপূর্ণ মামলা রয়েছে তার বিষয়ে আমাকে চাপে রাখার জন্য হয়তো কোনও পক্ষ এ বানোয়াট অভিযোগ সৃষ্টি করছে।

কিছুদিন আগে সাংবাদিক গোরি লস্কেশকে, যুক্তিবাদী চিন্তাবিদ কাল বুর্নি এবং চিন্তাবিদ গোবিন্দ পানসারেকে হত্যা করা হয়েছে। কারা মুক্তচিন্তার এ অসাম্প্রদায়িক তিন চিন্তাবিদকে হত্যা করল তার কোনও কিনারা এখনও উদঘাটন করা সম্ভব হয়নি। গত শতাব্দীর চার দশকে জার্মানি ও ইতালিতে ফ্যাসিবাদ আর নাৎসিবাদ প্রতিষ্ঠার আগে অনুরূপ ঘটনা ঘটতে দেখা যেত। কয়দিন আগে এক বক্তৃতায় নরেন্দ্র মোদি হিন্দু সম্প্রদায়ের মাঝে কোনও সন্ত্রাসী নেই বলে দাবি করেছেন। তাই যদি হয় তবে গান্ধীকে যে নাথুরাম গডসে গোষ্ঠী হত্যা করেছে তারা কে?

ওপরে যে তিন বুদ্ধিজীবী হত্যার কথা বললাম, তাদেরকে যারা হত্যা করেছে তারা কে? গো-মাংস রাখার মিথ্যা অজুহাতে আখলাককে যারা পিটিয়ে হত্যা করলো তারা কে? ইন্দিরা গান্ধী প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর গান্ধী হত্যা সম্পর্কে জনগণের অভিযোগ ছিল তদন্ত নিরপেক্ষ হয়নি। সুতরাং পুনরায় তদন্ত কমিশন গঠন করা হোক। ইন্দিরা গান্ধী পুনরায় একটা তদন্ত কমিশন গঠন করছিলেন। ওই তদন্ত কমিশন বলেছে, গান্ধী হত্যার মূল সন্ত্রাসী হলো সাভারকার, যিনি আরএসএস-এর প্রতিষ্ঠাতা। এমনকি প্রার্থনা সভায় তিনদিন আগে যে বোমা হামলা হয়েছিলো তারপরও বিরালা মন্দিরের নিরাপত্তা জোরদার না করার জন্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সর্দ্দার ভল্লব ভাই পেটেলেরও ভর্ৎসনা করেছে সে কমিশন।

যা হোক, লিখছিলাম ভারতের সপ্তদশ লোকসভা নির্বাচন নিয়ে পর্যালোচনা। আমরা ভারতের লোকসভা নির্বাচনে প্রত্যক্ষভাবে সম্পৃক্ত নই। মিডিয়ার তথ্য-উপাত্তের ওপর নির্ভর করে পর্যালোচনা লিখি। টিভি মিডিয়া মোদি ওয়েব ভালোভাবেই তুলে ধরছে। মোদি ঘেঁষা কলামিস্টরা বলতে চাচ্ছেন, পালওয়ামার ঘটনার পর ভারতীয় বিমানবাহিনী যে সার্জিক্যাল স্ট্রাইক হেনেছিলো তাতে নাকি হিন্দি বলয়ে মোদির প্রতি মানুষের সহানুভূতি, সমর্থন বেড়েছে। কিন্তু সার্জিক্যাল স্ট্রাইকে সামান্যতমও কিছু অর্জন যদি মোদির থেকে থাকে তবে পাকিস্তান কর্তৃক পাইলট জীবন্ত ধলার আর বিমান বিধ্বস্ত করার পর তা কখনও কার্যকর থাকতে পারে না। লজিক তা বলে না।

মোদি নিজেও জনসভায় দাবি করছেন, যেই সেই সরকার নয় তার সরকার। শত্রুর ঘরে ঢুকে তাকে হত্যা করে, গুলির বিনিময়ে গুলি করতে জানে। ১ মে ২০১৯ জইশ-ই-মুহম্মদের প্রধান মাসুদ আজহারকে জাতিসংঘ আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদীর তকমা দিয়েছে। এবার মোদি এটাকে তার সরকারের কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে প্রচার শুরু করেছেন। মোদি বলেন, এ তো শুধু শুরু। আগে আরও অনেক কিছু হবে।

নরেন্দ্র মোদি গত পাঁচ বছর ভারতের মতো বিশাল রাষ্ট্রের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। তিনি যখন গুজরাট রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন তখন ২০০২ সালে ব্যাপক দাঙ্গা হয়। তিনি আর বিজেপির বর্তমান সভাপতি অমিত শাহ এই দাঙ্গার জন্য দায়ী- অনুরূপ অভিযোগ রয়েছে। তিনি এবং আমিত শাহ কিশোর বয়স থেকে আরএসএস-এর ক্যাডার। অবশ্য নরেন্দ্র মোদির মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শিল্পবান্ধব বলেও খ্যাতি রয়েছে। গুজরাট ব্রিটিশের সময় থেকে শিল্প সমৃদ্ধ, আহামদাবাদকে তখনও বস্ত্র শিল্পের নগরী হিসেবে বলা হতো।

ভারতের রফতানি বাণিজ্যের ১৭ শতাংশ গুজরাটের অবদান। সে কারণে ধনবাদীরা ২০১৪ সালের নির্বাচনে নরেন্দ্র মোদিকে প্রধানমন্ত্রীর প্রার্থী করেছিলেন। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নরেন্দ্র মোদি নিষ্ফলা প্রধানমন্ত্রী। একটা প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবায়ন করতে পারেনি। গত পাঁচ বছরে গোটা ভারতে কয়েক হাজার কৃষক আত্মহত্যা করেছে কৃষি ঋণের যন্ত্রণায়। কৃষকরা লং মার্চ করেছে বোম্বেতে, দিল্লিতে। সেজন্যই মনে করেছি যে নরেন্দ্র মোদির এবার প্রধানমন্ত্রী হওয়া কঠিন।

প্রধানমন্ত্রী হওয়ার মতো সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন তিনি পাবেন না। অবশ্য ইভিএম মেশিন নিয়ে এরই মাঝে বহু অভিযোগ উঠেছে। অন্ধ্রের মুখ্যমন্ত্রী চন্দ্র বাবু নাইড়ু তো তার রাজ্যে ইভিএম ব্যবহারে কারচুপির কথা দিল্লিতে গিয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনকে বলে এসেছেন। ইভিএমে কোনও অনিয়ম না হলে নরেন্দ্র মোদির পক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন পাওয়া খুবই কঠিন হবে। প্রকাশ থাকে যে, প্রধান নির্বাচন কমিশনার মোদির রাজ্যের সচিব ছিলেন, আর তখন মোদিই ওই রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন।

আমরা আরও একটা গুরুতর অভিযোগের কথা শুনেছি। ভারতের সামরিক গ্যারিসনে নাকি যে অস্ত্র মজুত আছে কারও সঙ্গে যুদ্ধ হলে তা দিয়ে ভারত এক সপ্তাহের ওপরে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে পারবে না। অথচ চীন এবং পাকিস্তানের মতো দুই প্রতিবেশী আছে যাদের সঙ্গে যে কোনও সময় ভারতের যুদ্ধ লাগা বিচিত্র নয়। প্রধানমন্ত্রীর ৫৬ ইঞ্চি বুকের ছাতা থাকলে তো কেউ সমীহ করবে না। যুদ্ধের জন্য প্রয়োজনীয় সমরাস্ত্র প্রয়োজন।

যদিও রাজনৈতিক কাঠামোতে এক রাষ্ট্র দেখা যায়, গত পাঁচ বছর মোদির হিন্দুত্ববাদী শাসনে ভারত জাত-পাতে, বর্ণে-ধর্মে টুকরো টুকরো হয়ে আছে। দুনিয়ার বৃহত্তম গণতন্ত্রের দেশ ভারতের নির্বাচনের স্বচ্ছতা প্রশ্নের মুখে পড়েছে। সপ্তদশ লোকসভা নির্বাচন ১১ এপ্রিল থেকে শুরু হয়ে সাত পর্বে ১৯ মে পর্যন্ত চলবে। বলা যায় ইতিহাসের কঠিন এক বাঁকে আছে ভারত। ভারতের জনগণ যদি ভুল করে ভারতকে তার চরম মূল্য দিতে হবে। গণতন্ত্র সংহতি, বৈচিত্র্যের মাঝে ঐক্য ইত্যাদি হারিয়ে ভারতকে চরম কলহের মধ্যে লিপ্ত হতে হবে। ২৩ মে বুঝা যাবে ভারতীয় জনগণ কী বেছে নিলো।

লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলাম লেখক

bakhtiaruddinchowdhury@gmail.com

 

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ