সংযমে কেন কৃপণতা?

Send
তুষার আবদুল্লাহ
প্রকাশিত : ১৫:০৫, মে ০৪, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:০৯, মে ০৪, ২০১৯

তুষার আবদুল্লাহরমজান চলে এলো। মাসটিকে সংযমের মাস বলা হয়। ধর্মীয় তাৎপর্য বিবেচনায় মানুষকে শৃঙ্খলা, দায়িত্ববোধের কাঠামোতে ফিরিয়ে আনার এক অনুশীলন মাস বলা যেতে পারে রমজানকে। মুসলমান প্রধান দেশ হিসেবে ধর্মীয় এই অনুশাসনের প্রভাব বাংলাদেশও দেখতে পাওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে এর উপস্থিতি নেই। এই অনুশাসন কেবল দৃশ্যমান ইবাদতে সীমাবদ্ধ। সংযমের কথা যে বলা হয়, সে কি শুধু সেহরি থেকে ইফতার পর্যন্ত খাওয়া-দাওয়া বন্ধ রাখা, তারপর খাবারের ওপর ঝাঁপ দেওয়া? পাকস্থলী প্রায় উগরে না ওঠা পর্যন্ত ভক্ষণ চলে। ইফতারে যে পরিমাণ খাবার নিয়ে বসা হয়, সেহরিতেও পাতে খাবারের উচ্চতা যেমন করে বাড়ে, তাতে যিনি বা যারা রোজা রেখেছিলেন, তাদের সংযমের পরিচয় পাওয়া যায় না। পাওয়া যায় অপব্যয়ের। মাসজুড়ে খাবারে মুসলমানদের অন্য মাসের চেয়ে অতিরিক্ত ব্যয় হয়। এই ব্যয় ঈদ উদযাপনকাল পর্যন্ত চলে। কে কোথায় কেমন করে কত জাঁকজমক করে ঈদ উদযাপন করছে সেটা এখন প্রদর্শনের বিষয়। দেশের চেয়ে বিদেশে গিয়ে ঈদ উদযাপনে টাকা উড়াতে পারার মধ্যেও বনেদিপনা আছে। আছে লোক দেখানো জাকাত ও ইফতার পার্টির মহোৎসব। রমজান শুরু না হতেই এই অপচয় উৎসব শুরু হয়ে যাবে। প্রস্তুতি দাওয়াত বিনিময় শুরু হয়ে গেছে এরই মধ্যে। রোজা রাখছেন যারা, তারা যতটা না ইবাদত করেন তার চেয়ে আয়োজন বেশি। অফিসে-কাজের জায়গায় ইবাদতের নামে কাজ কম করা। রোজা রেখেছেন এই অজুহাতে মেজাজ তিরিক্ষি করে রাখা। রোজা রেখেছেন তা প্রমাণের জন্য অকারণে মানুষের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার। এই যে ব্যক্তি বা সমাজের যে আচরণের কথা বললাম-তা ইসলাম সমর্থন করে না। কিন্তু মানুষ যে এখন ভোগ ধর্মেরই মূল অনুসারী।

বলছিলাম ব্যক্তির অসংযমের কথা। সামগ্রিকভাবে সমাজ এবং রাষ্ট্রও কি সংযমের গণ্ডিতে থাকে? মোটেও তা নয়। আমরা দেখতে পাই রমজান আসার আগে পণ্যের দাম বাড়তে থাকে। পণ্যের উৎপাদক ও বিতরণকারীরা রমজান মাসজুড়ে বিলবোর্ডে ও গণমাধ্যমে  নানারকম ধর্মীয় বাণী প্রচার করেন। ঢাকঢোল পিটিয়ে জাকাত বিলি করেন। এতিম-দুস্থদের সঙ্গে ইফতার করেন, অন্যদিকে মুনাফা কামাতে বেছে নেন এই মাসটিকেই। মুনাফা করতে এক, দুই, পাঁচ টাকা বেশি নিয়েই ক্ষান্ত হন না। পণ্যে, খাবারে নকল-ভেজাল কম দিতেও  দয়ালু হন না মোটেও। বরং ভেজাল-নকল চলে আরও ব্যাপকভাবে। নকল-ভেজাল প্রতিরোধে  যে বিভিন্ন দফতর মাঠে নামে, তাদের বশে আনতে বরং ব্যবসায়ীরা উদারতা দেখান। শুধু যে খাবারে ভেজাল, উচ্চমূল্য তা নয়। কাপড়, জুতা থেকে শুরু করে সব ব্যবসায়ীই একটি মাস থেকেই বাকি এগারো মাসের মুনাফা তুলে নিতে উন্মাদনা দেখাতে থাকে। তাই রমজান মাস ধর্মীয় অনুশাসনমতো সংযমের মাস হলেও  ব্যক্তি ও সমষ্টিগত অনুশীলনে আমরা সেই নীতি থেকে অনেক দূরে।

অথচ বিশ্বের অন্যান্য মুসলমান প্রধান দেশে রমজান প্রকৃত অর্থেই ত্যাগ ও সংযমের মাস হিসেবেই আসে। কোনও কোনও দেশে ব্যবসায়ীরা এই মাসে পণ্য কম দামে বিক্রি করেন। রাষ্ট্রের বিভিন্ন ও সংস্থা তাদের সেবা আরও সহজ ও দুর্ভোগমুক্ত রাখার উদ্যোগ নেয়। কিন্তু আমরা চলছি উল্টো পথে। সমাজের কতিপয় মানুষ সচ্ছল হয়েছে ঠিক, কিন্তু সেই সচ্ছলতাকে হজম করার মতো শক্তি তারা সঞ্চয় করতে পারেনি। যারা বিত্তের আরও ওপরে তারাও বেসামাল হয়ে বারবার পিছলে পড়ছে। সবাই এখন দেখাদেখির দুনিয়ার মানুষ। কে কাকে টপকে যাবে ভোগের বেলায়, সেই লড়াই এখন তুঙ্গে। এই লড়াইতে কবে ক্লান্তি আসবে বলা মুশকিল। না আসা পর্যন্ত রমজান মানে সংযমের মাস। তা অনুভব করা, চর্চা করা মনে হয়  হয়ে উঠবে না।

লেখক: বার্তা প্রধান, সময় টিভি

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ