একজন কানহাইয়া কুমার!

Send
চিররঞ্জন সরকার
প্রকাশিত : ১৬:২০, মে ০৬, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:২৭, মে ০৬, ২০১৯

চিররঞ্জন সরকারভারতের জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের (জেএনইউ) ছাত্র সংগঠনের সাবেক সভাপতি কানহাইয়া কুমার। তাকে চিনতো জেএনইউ ক্যাম্পাস। বিহার ভোটে তাকে কিছুটা চিনেছিল বেগুসরাই। কিন্তু ক্রমে তিনি জাতীয় রাজনীতির নতুন তারকায় পরিণত হন। ২০১৬ সালের মার্চে দেশদ্রোহিতার অভিযোগে অভিযুক্ত হয়ে তিন সপ্তাহ তিহাড় জেলে কাটিয়েছেন। দিল্লি হাইকোর্টের আদেশে অন্তর্বর্তী জামিনপেয়ে মুক্ত হয়ে তিনি জাতীয় নেতায়  পরিণত হন। জেএনইউ ক্যাম্পাসে বক্তৃতা করে গোটা দেশকে মাতিয়ে তোলা কানহাইয়ার নাম এখন সকল ভারতীয়’র মুখে মুখে। সংবাদমাধ্যমে সোশ্যাল মিডিয়ায় তার বক্তৃতা ভাইরাল হয়ে ঘুরছে।
অথচ বছর তিনেক আগে পর্যন্তও কানহাইয়া মানে ছিল শ্যামলা, মাঝারি উচ্চতার একটি ছেলে। জেএনইউ ছাত্র সংসদের জনপ্রিয় নেতা। সুবক্তা। হাসিমুখে যুক্তির সঙ্গে তর্ক মিশিয়ে প্রখর উপস্থাপনার ক্ষমতাই তাকে ছাত্রনেতা বানিয়েছিল। গত বছর বিহারের নির্বাচনি ময়দানে পৈতৃক জেলায় বক্তৃতা করে সাড়া ফেলেছিলেন বছর সাতাশের কানহাইয়া। বিহারের লেনিনগ্রাদ বলে পরিচিত বেগুসরাইয়ে সিপিআইকে জেতাতে না পারলেও বক্তা হিসেবে নিজের জাত চিনিয়েছিলেন!
এ যেন স্বপ্নের উত্তরণ। কানহাইয়া নিজেও হয়তো এতটা ভাবেননি। প্রকাশ কারাট, সীতারাম ইয়েচুরি বা ডিপি ত্রিপাঠীর পর ফের এক সর্বভারতীয় তরুণ কমিউনিস্ট নেতার জন্ম দেখছে ভারতবর্ষের মহাবৈচিত্র্যময় মাটি। তার প্রতি চড়চড় করে বাড়ছে প্রত্যাশা।

তার আইকন রোহিত ভেমুলা। রোহিত ও কানহাইয়া দু’জনেই দরিদ্র পরিবারের সন্তান। রাষ্ট্রের পীড়ন সহ্য করতে না পেরে রোহিত আত্মঘাতী হয়েছিলেন। কানহাইয়া কিন্তু ফিরে এসেছেন নতুন আশা দেখিয়ে। আর তাকে ঘিরেই ঘুরে দাঁড়াতে চাইছে কার্যত ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া সিপিআই। 

কানহাইয়ার জনপ্রিয়তা কেমন? একটি ঘটনাই প্রমাণ দেয়। নির্বাচন কমিশনের নির্দেশ সর্বোচ্চ ৭০ লাখ টাকা খরচ করতে পারবেন কোনও প্রার্থী। প্রার্থী কানহাইয়া কুমার এই অর্থ সংগ্রহ করছেন ক্রাউড ফান্ডিংয়ের মাধ্যমে। যেখানে একদিনের সংগ্রহ ৩১ লাখ টাকা! ‘আওয়ার ডেমোক্র্যাসি’ নামক ওই ফান্ডিংয়ে ৭০ লাখ টাকা উঠে গেছে নিমেষেই।

বেগুসরাই থেকে সিপিআইয়ের প্রার্থী কানহাইয়া কুমারের প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী বিজেপির কেন্দ্রীয় মন্ত্রী গিরিরাজ সিং। ফলে কানহাইয়ের পক্ষে নির্বাচনে বিজয়ী হওয়াটা খুব সহজ হবে না। তারপরও তিনি আলোড়ন তুলেছেন। তার পক্ষে ভারতের নামিদামি ব্যক্তিরা এসে প্রচার করছেন। ভোট চাইছেন।

সবাই তাকে ভয় পাচ্ছেন। সমীহ করে চলছেন। কারণ কী? বয়স তো মাত্র তিরিশের কাছাকাছি। পোড়খাওয়া রাজনীতিক নন, সেলিব্রিটি নন, বিত্তশালী নন, বাহুবলি নন। তবে এত ভয় কেন কানহাইয়া কুমারকে?‌ শিবসেনা মুখপাত্র সঞ্জয় রাউত লিখেছেন, ‘‌কানহাইয়াকে হারানোর জন্য দরকার হলে ইভিএমে কারচুপি করুন!‌ ও হলো বিষের শিশি।’‌

তাকে সমর্থন দেননি ঘোর বিজেপিবিরোধী লালু-তনয় তেজস্বী যাদবও। তেজস্বীর হয়তো ভয়, এমপি হলে বিহারে জনপ্রিয়তার পারদ চড়বে কানহাইয়ার, রাজ্যে বিজেপি‌বিরোধী শক্তির প্রধান নেতা হয়ে উঠবেন তিনি।

বেগুসরাইয়ের জনসংখ্যা প্রায় তিরিশ লাখ, স্বাক্ষরতার হার ৬৬%, বিহারে উচ্চশিক্ষার বিচারে জেলাগুলোর শীর্ষে। গত শতক থেকে কিছু লোকে বেগুসরাইয়ের নাম বদলে ডাকতে শুরু করেন লেনিনগ্রাদ, যার সঙ্গে জড়িয়ে আছে ভূমিহীন চাষিদের জমি দখলের আন্দোলন ও চন্দ্রশেখর সিংহের ভূমিকা। কংগ্রেসি বাবা এবং সেচমন্ত্রী রামচরিত সিংহের বিদ্রোহী সন্তান, চন্দ্রশেখর সিংহ তেঘরা ক্ষেত্র থেকে ১৯৬২ সালে বিহারের প্রথম কমিউনিস্ট বিধায়ক। সেই থেকে ২০১০ অবধি তেঘরা থেকে বিধানসভায় বামপন্থীরাই জিতে এসেছেন এবং বালিয়া ক্ষেত্র থেকে জিতেছেন তিনজন বামপন্থী এমপি। যদিও ১৯৯৮ সাল থেকে এলাকার রাজনৈতিক রাশ চলে যায় লালু ও নীতিশের দলগুলোর হাতে। পালাবদলে মুখ্য ভূমিকা নেয় জাতপাতের পালটে যাওয়া সমীকরণ। ৮৭% হিন্দুর মধ্যে ১৯% ভূমিহার, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃত্ব ছিল তাদের দখলে, কমিউনিস্ট পার্টিও তার মধ্যেই পড়ে। ক্ষমতার অপর প্রান্তে ছিলেন ১২% যাদব আর ১৩% মুসলিম, মূলত এদের নিয়ে লালু ও নীতিশের নির্বাচনি পাটিগণিত। নীতিশের জোট আর মোদির হাওয়ায় ভর করে ২০১৪ সালে চার লাখের বেশি ভোট পেয়ে জেতেন বিজেপির ভোলা সিংহ, সাড়ে তিন লাখের ওপর ভোট পেয়ে দ্বিতীয় স্থানে আসেন আরজেডি’র তনভির হাসান, যিনি এবারে আবার প্রার্থী, আর দুই লাখের কাছাকাছি ভোট পেয়ে তৃতীয় হন সিপিআইয়ের রাজেন্দ্র সিংহ। পরের বছর কিন্তু বিজেপি এলাকার সাতটি বিধানসভা আসনেই গোহারা হারে। মোটের ওপর, জিততে গেলে কানহাইয়ার দরকার আরও দু’লাখ ভোট, যা কঠিন হলেও অসম্ভব নয়। এবারের নির্বাচনে কানহাইয়াই ‘ডার্ক হর্স’, তার পেছনে তিনটি কারণ আছে।

প্রথমত, যতই তাকে তনভির হাসান দিল্লি থেকে আমদানি ইউটিউবে তৈরি নেতা বলে বিদ্রূপ করুন না, কানহাইয়া বেগুসরাই থেকেই উঠে আসা লড়াকু এক ছেলে। বিহাট গ্রামে তাদের টিনের চালার বাড়ি, বাবা চাষি, মা অঙ্গনওয়ারি কর্মী, বড় ভাই সিকিউরিটির কাজ করতেন এই সেদিন অবধি। পড়াশোনার খরচ চালাতে মেডিক্যাল সেলসম্যানের কাজ করেছেন, আর দশটা দূর গঞ্জ শহর থেকে আসা ছেলেমেয়ের মতো আইএএস হওয়ার চেষ্টা করেছেন, জেএনইউ’তে বৃত্তি পেয়ে উচ্চ শিক্ষালাভ করেছেন, পিএইচডি করেছেন দক্ষিণ আফ্রিকার সামাজিক পটপরিবর্তন নিয়ে। বামপন্থী ছাত্র সংসদের নেতা হিসেবে সরকারি রোষে পড়ে জেল খেটেছেন, বিচার চলাকালীন গণপিটুনির শিকার হয়েছেন একাধিকবার। আজও বিজেপির মন্ত্রী, নেতা, অভিনেতা থেকে শুরু করে গিরিরাজ সিংহের মতো প্রতিপক্ষ প্রার্থী তাকে দেশদ্রোহী, ‘টুকরে টুকরে গ্যাং’-এর নেতা বলে আক্রমণ করে চলেছেন, কিন্তু কোনও কিছুই নিজের প্রত্যয় থেকে কানহাইয়াকে টলাতে পারেনি। এই রাজনৈতিক প্রত্যয় কানহাইয়ার জোরের দ্বিতীয় কারণ। যে বিশ্বাসের মূলে আছে অন্য এক স্বাধীন দেশের স্বপ্ন, যে দেশে মুটেমজুরের অনাহারে মৃত্যু নেই, ঋণগ্রস্ত চাষিদের আত্মহত্যা নেই, ধনী-দরিদ্রের বাড়তে থাকা ফারাক নেই, জাত, ধর্ম, লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্য নেই, সংখ্যালঘুর ওপর সবলের অত্যাচার নেই। বরং ঐতিহাসিকভাবে পিছিয়ে পড়া গোষ্ঠীগুলোর জন্য সংরক্ষণ আছে, ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রব্যবস্থা আছে, আইনের শাসন আছে, সঙ্গে আছে সাংবিধানিক মূল্যবোধের প্রতি গভীর দায়বদ্ধতা, এবং এই মুহূর্তে যেটার অভাব সব থেকে বেশি বিপক্ষে থাকলেও অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধা এবং তাদের কথা মন দিয়ে শোনার ধৈর্য আছে। এই শেষ গুণটি অত্যন্ত জরুরি, কারণ এটা ছাড়া গণতন্ত্র কার্যত অচল। এমন এক স্বপ্নকে মাটির বাস্তবে অনুবাদ করার জন্য একদিকে যেমন লাগে ধৈর্য তেমনই দরকার নতুন এক ভাষার দখল। আর এটাই কানহাইয়ার সবচেয়ে বড় সম্পদ।

আজকের প্রচারমুখী যুগে সবাই প্রবল আত্মবিশ্বাসী, সামাজিক মাধ্যম খুললেই দেখা যায় অমুকে বা তমুকে বলছেন ছোটবেলা থেকে কীভাবে লড়াই করতে করতে তিনি আজ এক বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বে পরিণত হয়েছেন। কানহাইয়া কিন্তু এই ধারার ঠিক উল্টো। কিছুদিন আগে প্রকাশিত ‘বিহার সে তিহার’-এ তিনি জানিয়েছেন নিজের নেতা-অবতার নিয়ে তার কী রকম অস্বস্তি, নিজেকে সাধারণ আমজনতার একজন ভাবতেই তিনি অনেক বেশি স্বচ্ছন্দ। কানহাইয়ার বক্তব্য শুনলে এর সত্যতা সরাসরি মিলিয়ে নেওয়া যায়। সে কথায় সাম্যবাদী আদর্শ, পুঁজিবাদের সমালোচনা আছে, নেই কোনও তাত্ত্বিক ভারিক্কিপনা, কেতাবি আর খটোমটো শব্দের আড়ম্বর। বরং হাতের কাছে উদাহরণ দিয়ে কঠিন বিষয়কে প্রাঞ্জল করে তোলায় তিনি দক্ষ। একটি আলোচনায় যেমন বিপক্ষের সওয়াল ছিল সমতা চাইলে কানহাইয়া কীভাবে সংরক্ষণ সমর্থন করেন। জবাবে তিনি বলেন সমাজে কিছু গোপন সংরক্ষণ আগে থেকেই আছে, যেগুলো বিশেষ কিছু জাত, শ্রেণি, ধর্ম, আর লিঙ্গকে নানা সুবিধা পাইয়ে দেয়, এদের সঙ্গে বাকিদের সামঞ্জস্য আনার জন্যই সংরক্ষণ প্রয়োজন। খেয়াল করবেন, এটা আমাদের পরিচিত ছকে বাঁধা বামপন্থী ভাষ্য নয়। এর শিকড় বিগত পাঁচ বছরের ছাত্র আন্দোলনের গভীরে, যেখানে মিশে আছে পিতৃতান্ত্রিক পীড়নের প্রতিবাদ, জাতিগত আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার, দলিত তরুণদের শিক্ষা এবং ক্ষমতায়নের স্বপ্ন, সংখ্যাগুরু জাতীয়তাবাদের বিরোধিতা, বাকস্বাধীনতার সাংবিধানিক অধিকার, সর্বোপরি, দেশের মানুষকে ভালোবেসে দেশপ্রেমের সংজ্ঞা খোঁজার প্রচেষ্টা। এই ভাষার কারণেই, স্থানীয় পত্রিকাগুলোর মতে, ভূমিহার হওয়া সত্ত্বেও কানহাইয়া তাদের ভোট পাবে না, বরং হিন্দু হলেও, মুসলিম প্রার্থী ছেড়ে মুসলিমরা তাকেই জেতাতে চায়। কিন্তু তাতে কি বাড়তি দু’লাখ ভোট ঘরে আসবে? হারজিতের প্রসঙ্গ উঠলে হিসেবনিকেশ করার বদলে কানহাইয়া হেসে ফেলেন। বিহারের সাধারণ মানুষের মধ্যে আছে গম্ভীর বিষয় নিয়ে কথার মাঝে অকস্মাৎ রসিকতার ক্ষমতা, যে হাসি নিছক প্রতিপক্ষ নিয়ে নয়, নিজেকেও যে হাসি রেহাই দেয় না! এমন একজন জনপ্রতিনিধি যদি ভারত পায় তাহলে তা গণতন্ত্রের জন্যই মঙ্গল!     

কানহাইয়ার এমন উত্থানে নিজের মনের মধ্যে একটা দীর্ঘশ্বাসই শুধু উঁকি দেয়, হায়, আমাদের দেশে এমন একজন কানহাইয়া কুমারের আবির্ভাব কবে ঘটবে?

লেখক: কলামিস্ট

 

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ