গানে গানে শেষ যাত্রার ফরিয়াদ

Send
আহসান কবির
প্রকাশিত : ২০:০৮, মে ০৭, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ২০:১৫, মে ০৭, ২০১৯

আহসান কবিরআমরা জন্মেছিলাম সুবীর নন্দীর সময়ে। আমরা গান শোনায় যত্নবান হতে শিখেছিলাম তার সময়ে। শিখেছিলাম মানুষের অভিমান আর বেদনা জাগানোর একটা বড় নিয়ামক হচ্ছে ‘কথা না রাখা’। আর কথা না রাখার বেশ আয়োজন যেন চলে এসেছিল তার গানে। যেমন—
সে যে কথা দিয়ে রাখলো না
চলে যাবার আগে ভাবলো না
সে কথা লেখা আছে বুকে
দিন যায় কথা থাকে।

বেদনার সব কথা মানুষ বলে না কিন্তু সব কথা লেখা থাকে বুকে! হৃদয়ে নাম লিখলে সে নাম থেকে যায়। মানুষ চলে যায় কিন্তু নাম বেঁচে থাকে।

একদা সাত সাগর পাড়ি দিয়ে আমাদের গানের জগতে এসেছিলেন মাহমুদুন্নবী। গানের জাদু ‘পথে পথে দিলাম ছড়াইয়া’ অর্থাৎ ছড়িয়ে দিতে দিতে এসেছিলেন কলিম শরাফী। ময়না বাঁধন ছিঁড়ে গেলেও মিছে তার পায়ে মিছে শেকল পরাতে চেয়েছিলেন বশীর আহমেদ। দেশান্তরী হওয়ার পর ঘাটে ঘাটে তরি ভিড়িয়েও সুখ পাননি আব্দুল জব্বার। জানতে চাইতেন—‘তুমি কি দেখেছ কভু জীবনের পরাজয়?’ সুবীর নন্দীরও তেমন প্রশ্ন ছিল। যেমন—

কেন ভালোবাসা হারিয়ে যায়, দুঃখ হারায় না?

কেন স্বপ্ন ভেঙে যায় মানুষ কথা দিয়ে কথা রাখে না!

কেমন করে যেন কথা না রাখার এই দুঃখ সুবীর নন্দীর গানে চলে এসেছিল। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় যেমন সমাধান খুঁজে পেয়েছিলেন, ‘কেউ কথা রাখেনি/তেত্রিশ বছর কাটলো/কেউ কথা রাখে না’—এই দর্শনের ভেতর, সুবীর নন্দীর গান সেখান থেকে খানিক আলাদা। বেদনার রঙে নিজেকে শতভাগ রাঙানোর পরও গান বা কবিতার বরুনাদের প্রতি তার কোনও খেদ ছিল না। বলতে শোনা যায়নি—‘বরুনার গায়ে শুধুই মাংসের গন্ধ/সে এখন যেকোনও নারী’। বরং সুবীর নন্দীর গানে শোনা গেছে—

সে জ্বালা যন্ত্রণা কাউকে বলবো না
বলবো আছি কী যে সুখে
দিন যায় কথা থাকে!

অনেক কথা ছিল তার। নিজের শরীরের কথা সহসা বলতেন না কাউকে। দীর্ঘদিন ‘স্লিপ ডিস্ক’ সমস্যায় ভুগেছেন। এরপর উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ আর কিডনি সমস্যা তার জীবনকে এলোমেলো করে দিচ্ছিল। তারপরও গানে গানে বলতেন—কী জ্বালা যন্ত্রণা কাউকে বলবো না, বলবো...

অদ্ভুত বিষণ্ন এক আবদার ছিল তার। বলতেন, আমার মৃত্যুর পর কেউ যেন না কাঁদে। বুকভাঙা আর্তনাদ যেন কেউ না করে। শেষ যাত্রায় তাকে যেন গান শোনানো হয়! সম্ভবত তার এক জনপ্রিয় গান থেকেই তিনি প্রেরণা খুঁজে পেয়েছিলেন–

আমি তটিনীর কাছ থেকে চলতে শিখেছি

আমায় আর পিছু ডাকার ভয় দেখিয়ে কোনও লাভ নেই

অথবা

আমি সাগরের কাছ থেকে জানতে শিখেছি
আমায় আর অসীমের ভয় দেখিয়ে কোনও লাভ নেই

বৃষ্টির কাছ থেকে শেখা কান্নাটা ‘পাথর চাপা সবুজ ঘাসের সাদা কষ্টে’র মতো আমাদের বুকেই নীরব থাকুক। অসীমের পানে সুবীর নন্দীর যাত্রা ভয়হীন আর গানময় হোক। যে বন্ধু তাকে শত্রুজ্ঞান করতো, তিনি যেন তার কাছে গিয়ে আবারও শুধাতে পারেন—

তোমার অনুরাগে নাই বা হলাম ছন্দময়
বিরূপ মনের ভাবনা হলাম, সেও মন্দ নয়
আমি বৈরী হলেও দোষ কী বলো
সে তোমার জন্য হলাম

আমাদের জন্যই তিনি গান গাইতেন। আমরা তার সময়ে জন্মে তার গানে মুগ্ধ ছিলাম। সুবীর নন্দী জন্মেছিলেন ভাটি অঞ্চলে (সিলেটের হবিগঞ্জে) ১৯৫৩ সালে। প্রায় আড়াই হাজার গান গেয়েছেন রেডিও, টেলিভিশন, অ্যালবাম আর চলচ্চিত্রে। একজন মানুষ মনোযোগী শ্রোতা হয়ে আড়াই হাজার গান মনে রাখতে পারেন কি না সন্দেহ আছে। গানে তার একান্ত নিজস্ব এবং স্বতন্ত্র অবস্থান ছিল। এই নিজস্বতা তাকে নিয়ে গেছে আলাদা উচ্চতায়। আনন্দ কিংবা বেদনার গানে, মনকে নাড়া দিয়ে যাওয়া সব দুঃখ-জাগানিয়া গানের জন্য সুবীর নন্দীকে ভুলতে পারবে না বাংলার মানুষ। চারবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার কিংবা একবার একুশে পদকে ভূষিত হলেও বাংলার সঙ্গীতাঙ্গনে মুগ্ধতা ছড়ানো একজন শিল্পী চলে গেলেন না ফেরার দেশে। মানুষের হৃদয় জাদুঘরে গানের ‘উড়াল পঙ্খী’ হয়ে থাকলেও তার শূন্যতা আমাদের ভাবিয়ে তুলবে। আমাদের চোখের বৃষ্টি শুকোবে, মেঘের ওপর বাসা খুঁজে ফিরবে সবাই তার গানে। উড়াল পঙ্খীকে সবাই বেধে রাখতে চাইবে হৃদয়ের খাঁচায়। উড়াল পঙ্খীর উড়াল তবু থামবে না।

গানে গানে বাংলাদেশের আরেক জনপ্রিয় গায়ক আজম খানের অনুরোধ ছিল—‘এই বিদায় বেলা কেউ কেঁদো না/এই বিদায় বেলায় পিছু ডেকোনা/মোর গান ভালোবাসা স্মৃতি করে রেখো না...’

সুবীর নন্দীও তার জন্য কাঁদতে মানা করে গেলেন। হয়তো বিদায় বেলার কান্না তার চোখে পড়বে না।বিদায় বেলায় কেউ যদি তার গান গায়, সুরের সাম্পানে ভেসে সেই গান কী উড়াল দেবে তার কাছে? গান কী যেতে পারে এক পৃথিবী থেকে অনাবিষ্কৃত অন্য পৃথিবীতে?

জনপ্রিয় লেখক হ্‌ুমায়ূন আহমেদও শেষযাত্রায় পছন্দের গান শুনে বিদায় নিতে চেয়েছিলেন। সুবীর নন্দীর শেষযাত্রায় শহীদ মিনারে কিংবা অন্য কোথাও কী গানে গানে বিদায়ের কোন আয়োজন করা হবে? শেষযাত্রায় তিনি কি তার প্রিয় কোনও মানুষের কণ্ঠে শুনে যেতে পারবেন—

হাজার মনের কাছে প্রশ্ন রেখে
একটি কথাই শুধু জেনেছি আমি
পৃথিবীতে প্রেম বলে কিছু নেই

অথবা

আমার এ দুটি চোখ পাথর তো নয়
তবু কেন ক্ষয়ে ক্ষয়ে যায়?

কিংবা

এক যে ছিল সোনার কন্যা মেঘবরণ কেশ
ভাটি অঞ্চলে ছিল সেই কন্যার দেশ

কখনও দেখিনি শেষযাত্রায় কাউকে গানে গানে বিদায় জানানো হয়। সুবীর নন্দী তার এই অদ্ভুত বিষণ্ন যাত্রার সুরেলা বহিঃপ্রকাশের কথা বলে গিয়েছিলেন।

আসুন তার গানগুলো গাইতে আমরা সমবেত হই শহীদ মিনারে। গানের মানুষের বিদায় হোক গানে গানে। সুরের ডানায় চড়ে তার গান পৌঁছে যাক মেঘের ওপারে।

লেখক: রম্যলেখক

/এসএএস/এমএনএইচ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ