চীনের বেল্ট রোডে যেন বাংলাদেশ যুক্ত থাকে

Send
বখতিয়ার উদ্দীন চৌধুরী
প্রকাশিত : ১৫:২৩, মে ০৯, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:২৫, মে ০৯, ২০১৯

বখতিয়ার উদ্দীন চৌধুরীগত ২৫ এপ্রিল বেইজিংয়ে ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড ইনিশিয়েটিভের দ্বিতীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হলো। এবার সম্মেলনে নাকি ১২৯ রাষ্ট্র যোগদান করেছে। চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ২০১৩ সালে কাজাখস্থানের এক সম্মেলনে প্রথম সিল্ক রোড প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনার কথা ঘোষণা করেছিলেন। প্রাচীনকালে পশ্চিম চীন থেকে এ সিল্ক রোড বের হয়ে মধ্যপ্রাচ্যের দিকে গিয়েছিলো। প্রাচীনকালে রমরমা বাণিজ্যের পথ ছিল এটা। কালের আবর্তে এ বাণিজ্যপথে বহু রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা হওয়ায় ধীরে ধীরে পথটি বন্ধ হয়ে যায়।
একবিংশ শতাব্দীতে এসে চীন উদ্যোগ নিয়েছে এশিয়া, ইউরোপ আর আফ্রিকার ৭০টি দেশের মাঝে সংযোগ স্থাপন করে এ বাণিজ্য পথটি পুনরায় প্রতিষ্ঠা করার। সম্ভবত এটা হবে বিশ্বের বৃহত্তম প্রকল্প। চীন এক ট্রিলিয়ন ডলার অর্থ বরাদ্দের কথা ঘোষণা করেছে ২০১৭ সালে অনুষ্ঠিত বেইজিংয়ের প্রথম সম্মেলনে। মোট খরচ পড়তে পারে চার থেকে আট ট্রিলিয়ন ডলার। চীন বলেছে ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোডে থেকে বিচ্ছিন্ন কোনও নৌবন্দরের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের জন্যও রাস্তাঘাট তৈরি করার অর্থ চীন সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রকে প্রদান করবে। এ বাণিজ্য পথটি প্রতিষ্ঠিত হলে চীনের তো উপকার হবেই, ৭০টি রাষ্ট্রেরও উপকার হবে, কারণ তারাও পরস্পরের মাঝে বাণিজ্য করার উদ্যোগ নিতে পারবে।
এ বাণিজ্যপথের ধারে শিল্প গড়ে উঠবে, বেকার সমস্যা সমাধানেরও এক পথ উন্মুক্ত হবে। আমরা লক্ষ করেছি, এ বাণিজ্য পথটির কোনও কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠিত হয়নি। চীন এককভাবে অর্থ বরাদ্দ করবে এবং সদস্য রাষ্ট্রগুলো নিজ নিজ এলাকার নিজেই এ প্রকল্পের কাজ পরিচালনা করবে। চীনের প্রদত্ত অর্থ হবে সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রের ওপর চীনের ঋণ। এ পথটি গড়ে উঠলে আর কোনও একক রাষ্ট্রের ওপর তার বাণিজ্যের জন্য নির্ভরশীল হতে হবে না। এ পথের ৭০টি রাষ্ট্রই তার আমদানি-রফতানি বাণিজ্যে অংশীদার হবে। বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠার পথেও এ পথ সহায়ক ভূমিকা পালন করবে। অবশ্য চীন নিজের পাতে ঝোল বেশি টানতে চাইলে আবার বিঘ্ন সৃষ্টি হবে। চীন সফলতার সঙ্গে এ পথটি কার্যকর করতে পারলে বিশ্ব বাণিজ্য এশিয়ায় স্থানান্তরিত হবে।

এ পথ ছাড়াই বিশ্ব বাণিজ্য দ্রুত এশিয়ামুখী হয়ে পড়েছে। যেজন্য আমেরিকা তার নৌশক্তির ৬০ শতাংশ প্রশান্ত মহাসাগরে নিয়ে এসেছে। আমেরিকা বলছে তার বাণিজ্যের নিরাপত্তার জন্য তারা নৌশক্তি প্রশান্ত মহাসাগরে নিয়ে এসেছে। আসলে চীনকে চাপে রাখার জন্য তার এ দুরভিসন্ধি। চীন তা উপলব্ধি করে আকিয়াব উপকূলে বন্দর স্থাপন করছে এবং তেল প্রবাহ নির্বিঘ্ন করার জন্য প্রতিষ্ঠিতব্য আকিয়াব বন্দর থেকে চীন পর্যন্ত পাইপলাইন স্থাপন করছে। এখন চীনের জ্বালানি তেল মধ্যপ্রাচ্য থেকে চীনে যায় সমুদ্রপথে। ইন্দোনেশিয়া মালয়েশিয়ার মধ্যখানে অবস্থিত মালাক্কা প্রণালির মধ্য দিয়ে তেলবাহী জাহাজ প্রশান্ত মহাসাগরে প্রবেশ করে। মালাক্কা প্রণালির মুখে কোনও অশান্তি সৃষ্টি হলেই জাহাজ চলাচল বিঘ্নিত হবে, যে কারণে বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে চীন আকিয়াব উপকূলে বন্দর স্থাপন করে চীন পর্যন্ত পাইপলাইন বসানোর ব্যবস্থা করেছে। আকিয়াব উপকূলের এ বন্দরটা বাংলাদেশের সোনাদিয়ায় হওয়ার কথা ছিল। সম্ভবত বাংলাদেশের অসম্মতির কারণে তা হয়নি। আর হয়তোবা এ অসম্মতির পেছনে ভারতের চাপও থাকতে পারে।

চীনের ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড ইনিশিয়েটিভের বিরোধিতা করছে আমেরিকা, জাপান, ভারত। ভারত ২০১৭ সালের সভায় যোগদান করেনি। বরং তারা ঘোষণা করেছিলো তারা পূর্বমুখী একটা অনুরূপ রুট সৃষ্টি করবে। ভারত প্রাচীনকাল থেকে সুতিবস্ত্র তৈরির জন্য প্রসিদ্ধ ছিল। তাদের বস্ত্র রঙানোর কাজ খুবই টেকসই ছিল। ভারতের সুতিবস্ত্রের ব্যবসা জাভা, সুমাত্রা হয়ে ভিয়েতনাম পর্যন্ত চালু ছিল। নরেন্দ্র মোদি বলেছিলেন তারা সেই রুট চালু করবেন। ভারতের সুতিবস্ত্রের সেই রুটের ইনিশিয়েটিভ এখনও দৃশ্যমান হয়নি। চীন যে আর্থিক মজবুত ভিত্তি সৃষ্টি করেছে ভারতের অনুরূপ আর্থিক ভিত্তি নেই। সুতরাং ভারতের পরিকল্পনাটি যে মাঠে মারা যাবে তা আমরা পূর্বেই অনুমান করেছি। চীন এখন বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি।

বাংলাদেশ ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোডের কর্মকাণ্ডে রয়েছে। ২০১৭ সালের সম্মেলনেও যোগদান করেছে এবারের সম্মেলনেও শিল্পমন্ত্রী নূরুল মজিদ হুমায়ূনের নেতৃত্বে বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি এবং পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম যোগ দিয়েছিলেন। কিছুদিন আগে এক লেখায় প্রধানমন্ত্রীকে এবারের সম্মেলনে যোগদানের জন্য অনুরোধ করেছিলাম কেননা তিনি এক সাক্ষাৎকারের সাহসিকতা দেখিয়ে কথাবার্তা বলেছিলেন। এর আগে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তৃতীয়বারের মতো ক্ষমতায় আসার পর গত ২৩ জানুয়ারি বলেছেন, বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগ নিয়ে ভারতের উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই, বরং সব দেশের স্বার্থে ভারত তাতে অংশ নিতে পারে।

কিন্তু পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম কয়দিন আগে বলেছেন বাংলাদেশ বেল্ট রোড ইনিশিয়েটিভের আর কোনও ঋণ নেবে না। সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, যেসব দেশ উচ্চহারে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করছে না, তাদের জন্য যেকোনও অংকের ঋণ বিপজ্জনক হতে পারে বরং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে সমৃদ্ধ করতে ঢাকা এখন বিকল্প অর্থনৈতিক মডেলের দিকে নজর দিয়েছে। শুনেছি বাংলাদেশ সরকারকে ভারত আমেরিকা নাকি বলেছে এ ঋণ শেষ পর্যন্ত গলার কাঁটা হবে। বাংলাদেশকে দুই বৃহত্তম রাষ্ট্রের মধ্যখানে পড়ে মাঝে মাঝে অসহনীয় অবস্থার সম্মুখীন হতে হয়। বেল্ট রোড ইনিশিয়েটিভ নিয়েও সম্ভবত অনুরূপ পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছে। ভারত চীন থেকে ঋণ পাওয়ার জন্য মুখিয়ে আছে। চীন থেকে ঋণ নিতে ভারতের যদি কোনও অসুবিধা না হয় তবে বাংলাদেশ চীনা ঋণ নিলে অসুবিধা হবে কেন? ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি যখন গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন তখনও তিনি চীনা বিনিয়োগের সন্ধানে বেশ ক’বার চীন সফর করেছিলেন।

বাংলাদেশের সঙ্গে চীনের সম্পর্ক পাকিস্তানের সময়কাল থেকে। ১৯৫৬ সালে চীনের প্রধানমন্ত্রী চৌ এন-লাই ঢাকা সফর করেছিলেন। পল্টন ময়দানে ঢাকাবাসীর পক্ষ থেকে তাকে গণসংবর্ধনাও প্রদান করা হয়েছিলো। আওয়ামী লীগ নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, আতাউর রহমান খান, মানকী শরীফের পীর ৬০/৬১ বছর আগে প্রতিনিধি দল নিয়ে চীন সফর করেছিলেন। অর্থাৎ চীনের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক খুবই ভালো দীর্ঘ দিনব্যাপী। স্বাধীনতা যুদ্ধে তারা পাকিস্তানের পক্ষে সমর্থন দিয়েছিল এটা সত্য। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর স্বীকৃতি প্রদানের পূর্বেই চীন বাংলাদেশ থেকে কয়েক লাখ বেল কাঁচাপাট কিনেছিল বঙ্গবন্ধুর অনুরোধে। সুতরাং আমরা প্রধানমন্ত্রীকে অনুরোধ করবো কারও কান কথায় চীনের সঙ্গে সম্পর্ক বিনষ্ট হয় অনুরূপ কর্মকাণ্ডে যেন বাংলাদেশ জড়িয়ে না পড়ে।

চীন আকিয়াব উপকূলে বন্দর তৈরি করেছে তার প্রয়োজনে, পাইপলাইনও স্থাপন করেছে। আবার পাকিস্তানের গোয়াদারে বন্দর নির্মাণও করেছে তার নিজ প্রয়োজনে। কারণ পশ্চিম চীন হচ্ছে ল্যান্ড লক। কোনও সমুদ্র নেই, বন্দরও নেই। যে কারণে পশ্চিম চীন শিল্পায়িত হয়নি। সাংহাই বন্দর ৩ হাজার মাইল পূর্বে। এখন বেল্ট রোড ইনিশিয়েটিভের আওতায় গোয়াদার বন্দর নির্মাণ করা হচ্ছে পশ্চিম চীন থেকে আজাদ কাশ্মিরের ওপর দিয়ে রাস্তাও নির্মাণ করা হয়েছে। এ প্রকল্প দুটি বেল্ট রোড ইনিশিয়েটিভে হলেও এ দুই প্রকল্পই চীনের প্রয়োজন অন্য কারো প্রয়োজনের চেয়ে বেশি। সুতরাং এ দুই প্রকল্পে ঋণ প্রদানের সময় মিয়ানমার এবং পাকিস্তানকে খুবই সহজ শর্তে এবং স্বল্প সুদে ঋণ প্রদান করা উচিত। এ সহজ বিষয়টা চীনের অনুধাবন করা উচিত। প্রেসিডেন্ট শি চীনের দেওয়া প্রকল্পগুলো সম্পর্কে সম্মেলনে টেকসই ঋণের পারিপার্শ্বিক অবস্থা রক্ষা ও দুর্নীতিমুক্ত রাখার কথা আলোচনা করেছেন। চীনের এ প্রকল্পে ৭০টি দেশ জড়িত। সুতরাং চীন যুক্তিযুক্তভাবে কাজ না করলে তার প্রকল্প যে সফল হবে না এ কথা চীন নিশ্চয়ই অনুধাবন করতে সক্ষম। সুতরাং আমাদের সরকারকে তাড়াহুড়া কোনও সিদ্ধান্তে না পৌঁছার অনুরোধ করবো।

লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলাম লেখক

bakhtiaruddinchowdhury@gmail.com

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ