বিএনপি একটি ‘উভচর’ দল

Send
হাসান ইমাম
প্রকাশিত : ১৫:৫৪, মে ১০, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৪:৪৪, মে ১৯, ২০১৯





হাসান ইমাম

সমান্তরালে জলে ও ডাঙায় থাকার নজির প্রাণিকুলে আছে বৈকি। এতে প্রাণীর স্বকীয়তা যতটা না আলাদাভাবে চিহ্নিত, এর চেয়ে বেশি বোধকরি তার টিকে থাকার সামর্থ্যের ইঙ্গিতবাহী। এই বিবেচনায় বিএনপির একই সঙ্গে সংসদে যোগদান ও বর্জন তার রাজনৈতিক অভিযোজন ক্ষমতা হিসেবে আমলে নেওয়াই দস্তুর। সিদ্ধান্তটি কতটা দূরদর্শিতা বা প্রজ্ঞার পরিচায়ক, উত্তরটা সময়ের হাতে। তবে এক্ষেত্রে বিএনপির পূর্বসূরি জাতীয় পার্টির যুগপৎ সরকারে হিস্যা ও সরকারবিরোধিতার অভিজ্ঞতা কিন্তু লেজে-গোবরে। তাদের এই ‘না ঘরকা না ঘাটকা’ কীর্তি স্থাপন এখনও রাজনৈতিক হাস্যরসের জ্বালানি!
রাজনীতির অঙ্ক পাঠ্যবইয়ের অঙ্কের হিসাবে মেলে না। দুইয়ে দুইয়ে প্রায়ই তিন বা পাঁচ বানানো হয় রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের খাতায়। এই ‘অস্বাভাবিক’ ফলের সঙ্গে দলের আদর্শিক অবস্থান, আন্দোলনের কৌশল, জনগণের (মোটাদাগে সমর্থক অংশ) আকাঙ্ক্ষা—অন্তত এই তিনটি বিষয়ের নির্যাস থাকতে হয়। তা না হলে রাজনৈতিক দলকে আর রাজনৈতিক দল হিসেবে চেনা যায় না। এ কারণেই জাতীয় পার্টির কপালে জুটেছে ‘গৃহপালিত’ বা ‘মেরুদণ্ডহীন’ বিরোধী দলের তকমা। তাদের কোনও সিদ্ধান্তই বোধকরি আর জনগণ এখন সিরিয়াসলি নেয় না।
তবে কিতাবে বিবৃত রাজনীতির মতো দেশের রাজনীতির অঙ্গন সমান্তরাল নয়, বরং উঁচু-নিচু, খাদে ভরা, কাঁটায় বিছানো। উন্নত বিশ্বের দেশগুলোর থেকে ভিন্নতর এই অবস্থাই—বলা চলে—আমাদের রাজনীতির প্রধান ‘বৈশিষ্ট্য’। এই অবস্থায় টিকে থাকতে অর্থ, পেশিশক্তি, আঁতাত, কূটচাল ইত্যাদি হাতিয়ার হিসেবে যতটা কার্যকর, সুস্থ রাজনৈতিক ধারা, গণতান্ত্রিক কর্মসূচি, শান্তিপূর্ণ অবস্থান ঠিক ততটাই ব্যর্থ। সুতরাং অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা নেওয়ার উদাহরণ ভূরি ভূরি, যেখানে আদর্শিক অবস্থানকে পুরোপুরি উপেক্ষা করা হয়েছে। যেমন, জামায়াতের সঙ্গে আওয়ামী লীগের জোট (যদিও তা দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর ছিল না)। অর্থাৎ রাজনীতিতে শেষ কথা বলে কিছু নেই—এই সিদ্ধবাক্যের বাসি ও টাটকা প্রমাণ দেশবাসী পেয়েছেন বহুবার। আজ যে মিত্র, কাল তার সঙ্গে বৈরিতা হবে না— এ কথা রাজনীতিতে হলফ করে বলা যায় না।
তা সত্ত্বেও দেশ, জনগণ, শাসনব্যবস্থা, প্রতিপক্ষের অবস্থান, দলীয় আদর্শ, এজেন্ডা ইত্যাদির ন্যূনতম ছায়া না থাকলে রাজনৈতিক দলের সিদ্ধান্ত নিয়ে নানা প্রশ্ন ওঠে। দলের বাইরে ওঠা বা প্রতিপক্ষের প্রশ্ন তোলা বা সমালোচনা অবশ্য আমাদের দেশে সর্বদা সচল। কিন্তু বিরোধী মহল ছাড়াও দলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে, দলের বিভিন্ন পর্যায় থেকে যখন প্রশ্ন ওঠে, তা বাড়তি মনোযোগ দাবি করে। বিএনপির পাঁচজনের সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ এবং দলের মহাসচিবের সংসদ বর্জনের সদুত্তর খুঁজছেন খোদ বিএনপির নেতাকর্মীরাই।
কারাবন্দি দলীয় প্রধানের সম্ভাব্য মুক্তি, দলের ভাঙন প্রতিরোধ এবং সরকারের ‘চাপ’ থেকে সাময়িক রক্ষা—এই তিন কারণ মূলত আলোচনায় আছে বিএনপির সংসদে যোগদানের নেপথ্য হিসেবে। এর বাইরের অপেক্ষাকৃত আরেকটু আড়ালের আরেকটা কারণও এক, দুই করে পাঁচ কান হচ্ছে: ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের একক সিদ্ধান্ত গ্রহণের বিষয়টি।
কিন্তু দলের নীতিনির্ধারকদের সমন্বিত বা জিয়া পরিবারের একক সিদ্ধান্ত, কারণ যাই হোক একই সময়ে একই বিষয়ে ‘হ্যাঁ’ ও ‘না’ অবস্থান মোটা দাগে হাস্যকরই, অস্বাভাবিক। স্বল্প সময়ের ব্যবধানে সিদ্ধান্ত পরিবর্তনকেও ‘কৌশলগত’ অবস্থান হিসেবে হয়তো দাগিয়ে দেওয়া চলে, কিন্তু শপথ নিয়ে যে ‘নাটক’ হলো তাতে বিএনপির নড়বড়ে দলীয় অবস্থান, নীতিনির্ধারকদের মধ্যে সমন্বয়হীনতা এবং জিয়া পরিবারের উত্তরাধিকারের ‘ছেদহীন’ উত্তরাধিকারের বিষয়টি কমবেশি উন্মোচিত।
ঠাকুরগাঁও-৩ আসনের সংসদ সদস্য জাহিদুর রহমানের শপথ নেওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে তাকে দল থেকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত এবং এর দুই দিন পরই চার সংসদ সদস্যের শপথের পক্ষে শক্ত অবস্থানের পরিপ্রেক্ষিতে যে ‘কৌশলের’ উদ্ভব হলো, তার বিচক্ষণতা নিয়ে প্রশ্ন না উঠে পারে না। জাতীয় ঐক্যফ্রন্টভুক্ত বিএনপি আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচনের ফল প্রত্যাখ্যান করেছিল, সেই নির্বাচনের ফসল ‘অবৈধ’ সংসদে যাওয়াকে যতই কৌশলের অংশ হিসেবে গলা চড়ানো হোক, জনপরিসরে এর প্রতিফলন কিন্তু ভিন্ন। উপজেলা, সিটি ইত্যাদি নির্বাচন বর্জন তাদের অবস্থানকে যতটা যৌক্তিক করেছিল, সংসদে যাওয়ার সিদ্ধান্ত ততটাই পরস্পরবিরোধী। এই পরস্পরবিরোধী অবস্থানকে সাংঘর্ষিক করে তুলেছে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুলের সংসদে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত।
এ যেন জলে নামবো কিন্তু কাপড় ভেজাবো না অবস্থা! দলীয় মহাসচিবকে তাই ‘সার্কাসের জোকার’ বলতে কসুর করেননি গয়েশ্বর রায়, এমনকি ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের একক সিদ্ধান্ত নেওয়ার বিষয়টি নিয়েও তিনি প্রকাশ্যে প্রশ্ন তুলেছেন (সম্ভবত প্রথমবারের মতো)। শপথ প্রসঙ্গে তিনি বলেছিলেন, সংসদে যারা যাবেন তারা ‘গণদুশমন’। বিএনপির স্থায়ী কমিটির আরেক সদস্য ও সাবেক একজন মন্ত্রী সংসদে যাওয়া নিয়ে ‘টাকা খাওয়ার’ অভিযোগ পর্যন্ত তুলেছেন। সুতরাং যুগপৎ সংসদে যোগদান ও বর্জন বিএনপিকে কতটা ভাঙন থেকে রক্ষা করলো, তার উত্তর ভবিষ্যতের হাতে হলেও দলীয় নড়বড়ে অবস্থার লক্ষণ কিন্তু এরই মধ্যে স্পষ্ট!
মির্জা ফখরুলও এরই মধ্যে স্বীকার করেছেন, সংসদে না যাওয়ার বিষয়ে দলীয় সিদ্ধান্ত ভুল ছিল।
আর খালেদা জিয়ার জামিন বা প্যারোলে মুক্তি যদি সংসদে যোগদানের কারণ হয়, তবে এটি ‘পূর্বশর্ত’ও হতে পারতো। বিএনপির সংসদে যাওয়া শাসক দলকে যতটা ‘স্বস্তি’ দিয়েছে, তার বিনিময়মূল্য হিসেবে খালেদা জিয়ার মুক্তির সওদা অবাস্তব নয়, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ‘অরাজনৈতিক’ তো নয়ই। আর সংসদে গিয়েই যদি খালেদা জিয়ার ‘অন্যায়’ কারাবাসের বিরুদ্ধে কণ্ঠ তোলা লক্ষ্য হয়, তবে মির্জা ফখরুল হতে পারতেন যোগ্য ‘ভোকাল’।
শোনা যাচ্ছে, সংসদে না যাওয়ার সিদ্ধান্তটি নাকি মির্জা ফখরুলের নিজের। যদিও এর বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন আছে, তবু এ সিদ্ধান্তকে ব্যক্তিগত পর্যায়ে সীমিত রাখা যায় না, যখন তিনি দলের মহাসচিব। তবে তার সংসদে না যাওয়ার সিদ্ধান্তের সঙ্গে দলে জিয়া পরিবারের ধারাবাহিকতা রক্ষার বিষয়টি জড়িত। সে আলোচনায় না ঢুকে আপাতত এটুকু বলাই যায়, পাঁচজনের সংসদে যাওয়া আর মির্জা ফখরুলের না যাওয়া দলীয় নেতাকর্মীদের দুটি অংশকেই আলাদাভাবে একটা সান্ত্বনার জায়গা করে দিয়েছে। তবে ‘অবৈধ’ সংসদ বর্জনে অটল অংশ এবং সংসদকে ব্যবহার করে খালেদা জিয়ার মুক্তি আদায়ের পক্ষের নেতাকর্মীদের ভিন্ন মাত্রার নাখোশি বিএনপি সমন্বিতভাবে কীভাবে দূর করবে, সেটাই দেখার বিষয়।
লেখক: সাংবাদিক


hello.hasanimam@gmail.com

/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ