কলাম পাঠকদের নিন্দা-ভালোবাসা

Send
আনিস আলমগীর
প্রকাশিত : ১২:৩০, মে ১৪, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৩:১২, মে ১৪, ২০১৯

আনিস আলমগীরআগেও একদিন বলেছি, আমার কলাম লেখার বয়স নিজের বয়স অনুযায়ী একটু বেশিই। ২৫ চলছে এখন। কারণ, পত্রিকার স্টাফ রিপোর্টার থাকতেই উপলব্ধি করি, কিছু বিষয় রিপোর্টের গ্রামারে আমি লিখতে পারছি না। ‘মন্তব্য প্রতিবেদন’ নাম দিয়ে শুরু করেছিলাম। দেখি সেটিও অন্যরা অনুকরণ শুরু করে দিয়েছে। ‘মন্তব্য প্রতিবেদন’ শব্দযুগল যে আমিই প্রথম ব্যবহার করি, ইতিহাসে সেটা থাকার সুযোগ নেই। পরে ট্রাডিশনাল কলামেই স্থির থাকি, দেখলাম মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এখানে অনেক বেশি। সাপ্তাহিক ‘খবরের কাগজ’-এ শুরু করলাম ‘টোটালি বায়াস।’
আগে যখন সংবাদপত্রে কলামের সঙ্গে ছবি যেতো না, লোকে ভাবতো আমি বুড়ো কোনও লোক। কারণ, বুড়ো লোকেদের সঙ্গে লিখতাম। আর লোকজন ধরেই নিয়েছেন চুল পাকলেই শুধু কলাম লেখার অধিকার গজায়। এখন অবশ্য কলাম লেখক হওয়া অনেক সহজ। বয়স তো বিষয়ই না, কনটেন্টও একটা কিছু হলেই হলো। কলাম লেখকের ছবিও যায় লেখার সঙ্গে। গুগল আর সোশ্যাল মিডিয়ার কারণে লেখককে আরও ভালো করে চিনতেও কষ্ট হয় না। নাম সার্চ করলেই সব পাওয়া যায়।
আগে পত্রিকায়ই সব লিখতাম। এখন সিংহভাগ লিখি অনলাইনে। কারণ, টাটকা ইস্যু নিয়ে লেখার জন্য একটি পত্রিকার সম্পাদক বা নিজস্ব লোক না হলে পত্রিকায় জায়গা পাওয়া কঠিন। তার ওপর পত্রিকার আছে নিজস্ব পলিসি। কারও সার্কুলেশন দেখে, কারও পলিসি মেনে সবখানে যেমন লেখার আগ্রহ হয় না, তেমনি সবার লেখাও সবাই ছাপতে আগ্রহী না। পত্রিকাগুলো থেকে সম্মানী পাওয়ার যন্ত্রণার কথা প্রকাশ্যে নাই বা বললাম।
যাক, পত্রিকায় যখন লিখতাম, তখন অনলাইন এত রমরমা ছিল না বলা চলে। পাঠ-প্রতিক্রিয়া পেতাম চিঠিপত্রের মাধ্যমে। প্রভাবশালী কারও পক্ষে-বিরুদ্ধে গেলে সম্পাদক ডেকে নিয়ে জানাতেন। কারণ, আমাকে পাওয়ার চেয়ে ওনাকে পাওয়া তাদের পক্ষে সহজ ছিল। যখন অনলাইনে লিখতে শুরু করলাম, তখন এই পাঠ-প্রতিক্রিয়া প্রাপ্তির ধরনও পুরোপুরি পাল্টে গেলো। বিশেষ করে বাংলা ট্রিবিউনের জন্মলগ্ন থেকে যখন নিউজ পোর্টালটিতে লেখা শুরু করি, প্রতিক্রিয়া আসতে থাকে ফেসবুকে, ই-মেইলে। কলামের নিচে দেওয়া মন্তব্যের ঘরেও। কেউ কেউ মোবাইল নম্বর সংগ্রহ করে ফোনও করেন।
প্রতিক্রিয়ার মধ্যে সবচেয়ে খারাপ হচ্ছে অচেনাদের ফেসবুক মন্তব্য। বিশেষ করে বাংলা ট্রিবিউনের ফেসবুক পেজে যেসব প্রতিক্রিয়া দেখি, সেটা সবচেয়ে খারাপ শ্রেণির বলা যায়। বেশিরভাগ লোক তার রাজনীতির পক্ষে লেখা না গেলে গালির মাধ্যমে এখানে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে। গালিতেই বোঝা যায় কোন ধরনের লোককে তারা রাজনৈতিক সমর্থন দেয়। প্রশংসা যে সেখানে হয় না তা নয়, কিন্তু নিন্দার পাল্লাটাই ভারি। প্রতিক্রিয়া জানানো দলের অধিকাংশই কাজটি করে ভুয়া আইডির মাধ্যমে।
আমি ব্যক্তিগতভাবে দেখেছি আমার লেখায় বিএনপি-জামায়াতের সমালোচনা থাকলে বা লেখাটা হয়তো তাদের বিরুদ্ধে গেলে মন্দ প্রতিক্রিয়ার ঝড় ওঠে। রাজাকার-মৌলবাদীদের বিরুদ্ধে লিখেছি বলে দুইবার হজ করার পরও মৌলবাদীরা আমাকে নাস্তিক বলে গালি দেয়। আর নাস্তিকদের ধান্ধা নিয়ে লিখেছি বলে একবার ওরা করেছিল সংঘবদ্ধ আক্রমণ। তথাকথিত প্রগতিবাদীরাও কম যান না। বরং তারা থাকে একধাপ এগিয়ে। ছাত্র ইউনিয়নের এক সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি আমার লেখা বন্ধ করার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে স্ট্যাটাস দিয়েছে, এমন নজিরও আমি দেখিছি। ভাবা যায়, এরাই আবার সবাই মত-প্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে বড় বড় বুলি দেয়। মানুষ কথা বলতে পারছে না বলে সরকারের সমালোচনা করে। কেউ কেউ কমেন্টে এটা নিয়ে আফসোস করে যে, তাদের এসব প্রতিক্রিয়া কী চোখে দেখি না! কত নির্লজ্জ লোক, আমি এত গালি খেয়েও প্রতি সপ্তাহে লিখি। বাংলা ট্রিবিউন কেন আমার লেখা বন্ধ করে না।
আমার যে একসময় এতে খারাপ লাগতো না, তা নয়। বিশেষ করে ইনবক্সে এসে অকথা বলায় আমি চরম ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়াও দেখিয়েছি, যা মোটেও দরকার ছিল না। এখন সময় পেলে দেখি আর হাসি। আর কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ করি, অসহনীয় গালি হলে যেন সাফ করে রাখে। একেবারেই ধরে নিয়েছি এটা হচ্ছে সোশ্যাল মিডিয়ার কুফল। তবে প্রশংসা কে না মনে রাখে? আমিও পাঠকের প্রশংসা পেলে ধন্য হই। যুক্তিসঙ্গত বিরোধিতা পেলে নোট রাখি। এমনকি তাদের সঙ্গে তথ্য নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় কথাও বলি। তথ্য ভুল থাকলে সংশোধন করে দেই, যেটা পত্রিকায় সম্ভব না হলেও অনলাইনে সম্ভব। লেখার সূত্র ধরেই কতজন যে কত সম্মান করলো, নিন্দার তুলনায় সেটার স্মৃতিই মধুর এবং স্থায়ী।
এক কথায় আমি সত্যিকারের পাঠকদের পাঠ-প্রতিক্রিয়ার মূল্য দেই। যারা না পড়েই কমেন্ট করে, গালি দেয়, তাদের গণনায় ধরি না। বরং নেগেটিভ কমপ্লিমেন্ট হিসেবে নেই। জানি, তারা এসব প্রধানত কোনও দলের বা নেতানেত্রীর অন্ধ মুরিদ হয়েই করে। যুক্তি ছাড়াই বলে। তারা জানে না, আমি যা কিছু বলি নিজের বিশ্বাসেই বলি, মনের শান্তির জন্য পরিশ্রম করে লেখি। আম-জনতাকে খুশি করতে আমি কিছুই করি না। বলি না। লিখি না। কারণ, আমি ভোটও করবো না, কোনও রাজনৈতিক দলের উচ্ছিষ্টও খাই না ( যেটা নিন্দুকদের অনেকে ভাবে)।
আমি আমার প্রকাশিত কলাম নিজের ফেসবুক ওয়ালেও শেয়ার করি। পড়ার জন্য পাবলিক করা, তবে মন্তব্য করার সুযোগ শুধু বন্ধুদের। অনেকে এতেও ক্ষিপ্ত। কারণ, আমাদের তথাকথিত অনেক ফেসবুক সেলিব্রেটি তাদের ফ্যান ফলোয়ার বাড়ানোর জন্য কমেন্ট অপশন খোলা রেখেছেন, স্ট্যাটাসে কমেন্ট করতে পারেন যে কেউ। সেটা দেখে কেউ কেউ আমাকেও সেলিব্রেটি ভেবে আবদার করেন যে, কমেন্ট অপশন যেন খোলা রাখি।  যেন সবাই অভিমত ব্যক্ত করতে পারেন। আমি করিনি। কারণ, ফেসবুককে এখনও বন্ধুদের মধ্যে রাখতে চাই। আর পাঠ-প্রতিক্রিয়া ফেসবুকের চেয়ে কলামের নিচে মন্তব্যের ঘরে থাকাটা অনেক যুক্তিসঙ্গত মনে হয়। এতে আলোচনায় সবাই অংশ নিতে পারে। মতবিনিময়ের সুযোগ আছে। এর বাইরেও আপনি সময় থাকলে মেইলে প্রতিক্রিয়া জানাতে পারেন। প্রাইভেসির স্বার্থে অনেকে তাই করেন। লেখার সঙ্গে তো ই-মেইল দেওয়াই থাকে। আমিও যতটুকু সম্ভব মেইলের জবাব দেই।
এত কথার পর আবারও বলবো, লেখার প্রতিক্রিয়া দেখার জন্য যে কোনও লেখক কাঙাল হয়ে থাকেন। আমি ব্যতিক্রম না। আমাকে যারা মেইল, ইনবক্স কিংবা লিংকে গিয়ে প্রতিক্রিয়া জানানোর পরিশ্রমটা করেন, তাদের সবাইকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি বাংলা ট্রিবিউনের জন্মবার্ষিকীর এই সুযোগে। সেটা পক্ষে হোক বা বিপক্ষে হোক। এই ডিজিটাল যুগে আপনারা যে পড়েন, সেটাই বা কম কিসে। ক’জনের লেখা পড়ার সময় আছে মানুষের, যেখানে দিন মাত্র ২৪ ঘণ্টার।
সবার মঙ্গল কামনা করছি। বাংলা ট্রিবিউনের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে তার জন্যও আন্তরিক শুভ কামনা।
লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট। ইরাক ও আফগান যুদ্ধ-সংবাদ সংগ্রহের জন্য খ্যাত।
anisalamgir@gmail.com

/এমএএফ/এমএনএইচ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ