বাংলা ট্রিবিউন-এর জন্মদিনে আন্তরিক প্রার্থনা

Send
রেজানুর রহমান
প্রকাশিত : ১৩:২০, মে ১৫, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৩:২২, মে ১৫, ২০১৯

রেজানুর রহমানএকটা সময় কৌতুক করে বলা হতো দেশে কাকের চেয়ে কবি বেশি। এখন অনেকে কৌতুক নয়, সিরিয়াস ভঙ্গিতে বলেন, দেশে কাকের চেয়েও সাংবাদিকের সংখ্যা বেশি। এটাকে আমি অহংকারেই সঙ্গেই দেখি। কারণ, একটা সময় আমাদের দেশে সাংবাদিকতা পেশাকে মোটেই গুরুত্ব দেওয়া হতো না। বিশেষ করে বিয়ের বাজারে সাংবাদিকদের তেমন কোনও প্রভাব ছিল না। ছেলে কী করে? সাংবাদিক? ব্যস বিয়ের দরজা বন্ধ। প্রায় ৩০ বছর আগের কথা। গ্রামে বেড়াতে গেছি। তখন আমি দৈনিক ইত্তেফাকে চাকরি করি। দেশের একমাত্র শীর্ষ দৈনিক। দৈনিক পত্রিকা বলতে একমাত্র ইত্তেফাককেই বোঝাতো।
প্রসঙ্গক্রমে একটা মজার ঘটনা বলি। দক্ষিণাঞ্চলের একটি উপকূলীয় শহরে পেশাগত দায়িত্ব পালনের জন্য গিয়েছিলাম। নির্বাচনি জনসভা কাভার করার জন্য ঢাকা থেকে বিভিন্ন পত্রিকার সাংবাদিক বন্ধুরাও সঙ্গে ছিলেন। তখনও জনসভা শুরু হয়নি। এলাকা ঘুরে দেখছিলাম। নির্বাচনি হাওয়া বোঝার চেষ্টা করছিলাম। হঠাৎ একজন বয়স্ক লোক আমার সামনে এসে দাঁড়ালেন। কোনও প্রসঙ্গ ছাড়াই জিজ্ঞাসা করলেন, আপনি কি ‘সাম্বাদিক’? সাংবাদিক শব্দটিকে তিনি ‘সাম্বাদিক’ বলেই উচ্চারণ করলেন। তার প্রশ্ন শুনে মাথা নেড়ে বললাম, জি। ইত্তেফাকে কাজ করি।

তিনি এবার প্রশ্ন করলেন, কোন ইত্তেফাক? বুঝতে না পেরে তাকে জিজ্ঞেস করলাম, কোন ইত্তেফাক মানে? ইত্তেফাক তো একটাই।

লোকটি আবারও একই প্রশ্ন করলেন, বুঝলেন না? আপনি কোন ইত্তেফাকের? পরে তার সঙ্গে আলাপে বুঝেছি, ইত্তেফাক শব্দটি তার মনের ভেতর এমনভাবে গেঁথে গেছে যে, পত্রিকার কথা শুনলেই তার কাছে মনে হয় ইত্তেফাক নামে অনেক পত্রিকা আছে। তা না হলে ঘরে ঘরে একই নামের এত পত্রিকা আসে কী করে?

সাংবাদিক হিসেবে পাত্রের বিয়ের বাজারের একটা প্রসঙ্গ তুলেছিলাম। সে ব্যাপারেই একটা ঘটনার কথা বলি। তখনও আমি ইত্তেফাকেই আছি। সন্ধ্যার আগে আগে সবেমাত্র অফিসে ঢুকেছি। হঠাৎ একজন অপরিচিত লোক আমার সামনে এসে দাঁড়ালেন। ভাবলাম নিউজ সংক্রান্ত বিষয়ে হয়তো কথা বলবেন। তিনি আমার টেবিলের সামনে বসলেন। কিছুক্ষণ পর কাচুমাচু ভঙ্গিতে বললেন, ভাই আপনার সঙ্গে একটু কথা ছিল। সাগ্রহে জানতে চাইলাম, জি বলেন। নিউজ সংক্রান্ত? তিনি মৃদু হেসে বললেন, না নিউজ সংক্রান্ত কোনও বিষয় না। একটা বিয়ের ব্যাপারে আপনার কাছে খোঁজ নিতে এসেছি।

এবার কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, বিয়ের ব্যাপারে? ঘটনা কী বলেন তো। তিনি যা বললেন তার সারমর্ম অনেকটা এরকম, আমার পরিচিত এক সাংবাদিক বন্ধুর বিয়ের ব্যাপারে কথাবার্তা চলছে। পাত্রী ওই লোকের আপন ভাগ্নি। পাত্র হিসেবে আমার বন্ধুকে তাদের পছন্দ। ছেলে ভালো। কিন্তু ছেলের চাকরির ব্যাপারেই যত আপত্তি। সাংবাদিকরা নাকি ভালো বেতন পায় না। বেতন পেলেও সেটা নিতান্তই কম। সাংবাদিকদের ব্যাপারে আরও অনেক অভিযোগ। আমার বন্ধুর ব্যাপারে সেদিন বোধকরি একটু বেশিই বলেছিলাম। তবু পাত্রী পক্ষ আমার কথায় আশ্বস্ত হতে পারেনি। ওই মেয়ের সঙ্গে আমার বন্ধুর বিয়ে ভেঙে যায় যায় অবস্থা। শেষ পর্যন্ত ওরা পালিয়ে বিয়ে করে। বলা বাহুল্য, ওরা এখন অনেক সুখেই আছে।

এই যে সুখের কথা বললাম, জীবনে এই শব্দটাই বেশ গুরুত্বপূর্ণ। অহংকারের সঙ্গে বলতে পারি, আমাদের সাংবাদিকতা জগৎ এখন অতীতের তুলনায় অনেক বেশি উজ্জ্বল। মেধাবী ছেলেমেয়েরা সাংবাদিকতা পেশায় ঢুকেছে। পেশাটা আগের চেয়ে অনেক উজ্জ্বলতর হয়ে উঠেছে। বিয়ের পাত্র হিসেবে সাংবাদিকদের কদর বেড়েছে। বিয়ের পাত্রী হিসেবেও সাংবাদিকদের কদর এখন অনেক বেশি। শুধু ঢাকা শহরে নয়, দেশের নানা প্রান্তে মেয়েরা সাংবাদিক হিসেবে ঔজ্জ্বল্য ছড়াচ্ছে। বিশেষ করে টেলিভিশন মাধ্যমে তো মেয়েদের জয়জয়কার চলছে। কখনও কখনও মনে হয় হঠাৎ করেই যেন আমাদের সাংবাদিকতার জগৎটাই পাল্টে গেলো। একটা সময় ছাপা কাগজ অর্থাৎ দৈনিক পত্রিকার প্রচ- দাপট ছিল। হঠাৎ যেন পরিবেশ পাল্টে গেলো। এখন যেন দৈনিক পত্রিকার চেয়ে টেলিভিশন মাধ্যমের দাপট একটু বেশি। সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অনলাইন সংবাদপত্র। যেন চোখের পলকেই আমাদের সংবাদ মাধ্যমের ক্ষেত্রটা অনেক বড় বিস্তৃত হয়ে উঠলো। তরুণ সংবাদকর্মীদের দেখলে বুকে অনেক বল পাই। আহা! আমাদের তরুণ ছেলে-মেয়েরা কি দারুণ মেধা ছড়াচ্ছে মিডিয়ায়। স্মার্ট, বুদ্ধিদীপ্ত ভঙ্গিমায় দৃঢ়তার সঙ্গে ওরা যখন সংবাদের পেছনে ছোটে, জননেতাদের প্রশ্ন করে, তখন দেখতে কী যে ভালো লাগে। এটা তো সুখেরই প্রতিচ্ছবি। আমাদের সাংবাদিকতা জগতে সুখ বাসা বেঁধেছে। আহা! কী আনন্দ আকাশে-বাতাসে?

আসলেই কি সুখের পৃথিবী হয়ে উঠেছে আমাদের সাংবাদিকতা জগৎ? সুখের প্রসঙ্গটা না হয় আপাতত থাক। নিরাপত্তার প্রশ্ন নিয়েই কথা বলি। যে কোনও পেশায় বেতন-ভাতা অর্থাৎ আর্থিক নিরাপত্তার বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সেটা কি নিশ্চিত হয়েছে আমাদের সাংবাদিকতা জগতে। প্রচার মাধ্যমে খবর বেরিয়েছে, নিয়মিত বেতন ভাতা নিশ্চিত করাসহ ৪ দফা দাবি আদায়ের লক্ষ্যে ১৫ মে ঢাকায় জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে ধর্মঘট কর্মসূচি পালন করবে বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন ও ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন। তার মানে সাংবাদিকদের পেশাগত আর্থিক নিরাপত্তা এখনও হুমকির মুখে। পাশাপাশি আরেকটি প্রশ্ন বেশ গুরুত্বপূর্ণ। প্রশ্নটি হলো, আমাদের সাংবাদিকতা জগৎ হঠাৎ এই যে এত বড় হয়ে উঠলো, ভবিষ্যতে টিকে থাকার জন্য প্রস্তুতিটা কেমন? আবার যারা এই পেশায় ঢুকছেন, তাদের সবাই কি সত্যিকার অর্থে মেধাবী? অথবা তাদের জন্য আছে কি প্রশিক্ষণের কোনও সুযোগ?

প্রশিক্ষণের কথা শুনলে অনেকে ক্ষেপে যায়। ভাবটা এমন– সাংবাদিকতা কি এমন কঠিন কাজ যে তার জন্য প্রশিক্ষণ নিতে হবে। যারা একথা ভাবেন তাদের উদ্দেশে বিনীতভাবে বলি, শুধু সাংবাদিকতা পেশা নয়, প্রতিটি পেশায় যুক্ত হওয়ার আগে প্রশিক্ষণ থাকলে ভালো। অথবা পেশায় জড়িত হওয়ার পরও প্রশিক্ষণ নেওয়া যেতে পারে। প্রশিক্ষণ মানে আবার রীতিমতো লেখাপড়া শুরু করতে হবে এমন কোনও কথা নেই। পারস্পরিক সম্পর্ক জোরদার করার জন্যও প্রশিক্ষণ হতে পারে। এই যে আমাদের সাংবাদিকতা জগৎ এত বড় হয়ে গেলো, এটা কি হঠাৎ করেই হয়েছে? এর পেছনে নিশ্চয়ই একটা সংগ্রামী ইতিহাস আছে। ওই ইতিহাসের নায়কেরা ধাপে ধাপে একটি করে ইট বিছিয়ে সম্ভাবনার সিঁড়ি নির্মাণ করেছেন বলেই না আমরা ওপর তলায় উঠতে পারছি। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, আমাদের তরুণ প্রজন্মের সাংবাদিকদের অনেকেই বয়োজ্যেষ্ঠ সাংবাদিকদের অবদানের কথা স্বীকার করতেই চায় না। আবার এ ধরনের অভিযোগও শুনি, বয়োজ্যেষ্ঠদের কেউ কেউ তরুণদের ব্যাপারে এতটাই কঠিন ও কঠোর হন যে, তখন শ্রদ্ধা আর ভালোবাসার জায়গাটা স্বচ্ছ থাকে না।

আমরা কথায় কথায় পরিবারের কথা বলি। সাংবাদিকদের একটা বিরাট পরিবার আছে। কিন্তু আদৌ কি সেটা পরিবার হয়ে উঠতে পেরেছে? বড়রা কি যথার্থ অর্থে ছোটদের তখন স্নেহের চোখে দেখছেন? আবার ছোটরাও কি সেই অর্থে বড়দের সম্মান জানাচ্ছে? সাংবাদিকদের এখন অনেক ফোরাম অর্থাৎ অনেক সংগঠন! তবু যেন কিসের একটা হাহাকার ভেসে বেড়ায় বাতাসে। আমরা কি তা অনুভব করতে পারি?

কয়েকদিন আগে সাংবাদিকদের দ্বিতীয় বাড়ি খ্যাত জাতীয় প্রেস ক্লাবে গিয়েছিলাম। অনেক বছর পর জাতীয় প্রেস ক্লাবের নতুন সদস্য সংখ্যা বেড়েছে। কিন্তু বেড়েছে কি শ্রদ্ধা আর সহমর্মিতার কাক্সিক্ষত আঙিনাটা? যেখানে বড়রা ছোটদের স্নেহ করবে। ছোটরা বড়দের শ্রদ্ধা করবে। বোধকরি সেই আঙিনাটা বাড়েনি। বাড়লে কখনোই দেখতাম না প্রেস ক্লাবে ঢুকে বসার জায়গা না পেয়ে একজন বয়োজ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ইতস্তত করছেন, তিনি থাকবেন নাকি চলে যাবেন এরকমই এক দোদুল্যমানতায় ভুগছিলেন। অথচ তার সামনেই টেবিল দখল করে আড্ডা দিচ্ছিল একদল তরুণ সাংবাদিক। তারা ফিরেও তাকালো না। অনেকেই হয়তো ভাবতে পারেন, এটি একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা। এটাই আমাদের সাংবাদিক পরিবারের আসল চিত্র নয়। তাদের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে বলছি, এক বালতি দুধে সামান্য টক পড়লেই দুধ কিন্তু নষ্ট হয়ে যায়। কথাটা ভেবে দেখবেন।

বাংলা ট্রিবিউনের জন্মদিনে দাঁড়িয়ে কেন যে এই কথাগুলো লিখলাম তার প্রকৃত ব্যাখ্যা আমার কাছে নেই। তবে কথাগুলো বলতে পেরে কিছুটা হালকা বোধ করছি। বলতে গেলে সাংবাদিকতা পেশাকে ঘিরেই তো জীবনটা পার করে দিলাম। সে কারণে দেশের সাংবাদিকতা জগৎকে উজ্জ্বল হতে দেখলে গর্বে বুকটা ফুলে ওঠে। আগে ছিল মাত্র মুদ্রণ পত্রিকার সাংবাদিকতা। এখন যুক্ত হয়েছে টিভি মাধ্যমের সাংবাদিকতা। সেই সঙ্গে বাংলা ট্রিবিউনের মতো জনপ্রিয় অনলাইন সংবাদপত্রও সাংবাদিকতার নতুন দিগন্ত প্রসারিত করেছে। সাংবাদিকতার জগৎটা অনেক বড় ও বিস্তৃত হয়েছে। বাংলা ট্রিবিউনের জন্মদিন উপলক্ষে আমাদের সাংবাদিকতা জগতের বিরাট পরিবারকে নিয়ে একটা প্রত্যাশার কথা বলতে চাই। পরিবারটি অনেক বড় হয়েছে। নিজেদের ঐতিহ্য ও সম্মান-মর্যাদা বিকশিত করার লক্ষ্যে পরিবারটিকে সামলে রাখা খুবই জরুরি। যে কোনও মূল্যে আমাদের এই পরিবারটিকে সামলে রাখতে হবে। এজন্য যার যার অবস্থান থেকে কার্যকর ভূমিকা রাখা জরুরি কর্তব্য বলে মনে করি। স্নেহ, মমতা, শ্রদ্ধা আর ভালোবাসায় বিকশিত হোক আমাদের সাংবাদিকতার বিস্তৃত অঙ্গন। বাংলা ট্রিবিউনের জন্মদিনে এ আমার আন্তরিক প্রার্থনা। জয়তু বাংলা ট্রিবিউন।

লেখক: কথাসাহিত্যিক, নাট্যকার, সম্পাদক- আনন্দ আলো।

/এমওএফ/এমএনএইচ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ