লোকসভা নির্বাচনের আগে-পরে মুসলমানরা

Send
বখতিয়ার উদ্দীন চৌধুরী
প্রকাশিত : ১৪:২১, মে ১৬, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:৩৫, মে ১৬, ২০১৯

বখতিয়ার উদ্দীন চৌধুরীভারতে স্বাধীনতার পর ১৭তম লোকসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। কোনও নির্বাচনে এবারের মতো এত সাম্প্রদায়িক প্রচারণা ছিল না। এবারের ভোটে ধর্ম কেন গুরুত্ব পাচ্ছে– এটা নিয়েই একের পর আন্তর্জাতিক মিডিয়া সংবাদ প্রচার করছে। গত পাঁচ বছর সাম্প্রদায়িক কর্মকাণ্ড ও প্রচারণার মধ্য দিয়ে একটা উর্বর ভূমি তৈরি করা হয়েছে। এবং পাকাপাকিভাবে ভারতের ২০ কোটি মুসলমানকে নরেন্দ্র মোদি এবং অমিত শাহ হিন্দুত্ববাদের একটা প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড় করিয়েছেন।
গত ফেব্রুয়ারি মাসে প্রকাশিত হিউম্যান রাইটস ওয়াচের একটি নতুন প্রতিবেদনের মতে, ভারতে মৌলবাদী গো-রক্ষা গোষ্ঠী অন্তত ৪৪ জন লোককে হত্যা করেছে। এরা প্রায়ই আইন প্রয়োগকারী সংস্থা এবং হিন্দু জাতীয়তাবাদী নেতাদের কাছ থেকে এ কাজে সমর্থন পেয়েছে। ১০৪ পৃষ্ঠার রিপোর্টটিতে বলা হয়েছে, গরু সুরক্ষাকারীদের হাতে মৃতদের ৩৬ জন ভারতের বৃহত্তর সংখ্যালঘু মুসলিম সম্প্রদায়ের সদস্য। নিউ ইয়র্কভিত্তিক গ্রুপের রিপোর্টে বলা হয়েছে, ২০১৫ সালের মে থেকে ২০১৮ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে শতাধিক হামলায় ২৮০ জন আহত হয়েছে। রিপোর্টে আরও বলা হয়, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির হিন্দু জাতীয়তাবাদী ভারতীয় জনতা পার্টি দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুদের কাছে সম্মানিত প্রাণী গরুকে রক্ষা করার নীতি সমর্থন করে। বিজেপি সদস্যরাই ক্রমবর্ধমানভাবে সাম্প্রদায়িকতাকে ব্যবহার করে যারা গরুর মাংস খায় এবং এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট তাদের বিরুদ্ধে সহিংস নজরদারির প্রচারণা চালিয়েছে।

অথচ ভারত গরুর মাংস রফতানিতে ব্রাজিলের সঙ্গে বিশ্বের শীর্ষ দেশের একটি। উভয়ে ২০১৬ সালে গরুর মাংস রফতানি করেছে সাড়ে ১৮ লাখ মেট্রিক টন করে। দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে অস্ট্রেলিয়া। একদিকে গো-মাতা সুরক্ষার নামে গরুর মাংস খাওয়ার জন্য মানুষ মারছে, অন্যদিকে বিশ্বে গরুর মাংস বিক্রিতে শীর্ষে আছে। মুসলমানদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ ছড়ানো, মুসলমানরা সংখ্যাগুরু হিন্দুদের জন্য হুমকি প্রচারণা, দেশপ্রেম-জাতীয়তাবাদের ধর্ম জুড়ে দেওয়া- এমন সব কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে নরেন্দ্র মোদির সরকার গত ৫ বছর ভারতে যে হিন্দুত্ববাদের জিকির তুলেছে, বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, তারই প্রভাব পড়েছে চলতি লোকসভা নির্বাচনে।

সপ্তদশ লোকসভা নির্বাচনটাকে নরেন্দ্র মোদি তার পক্ষ-বিপক্ষের জনমত যাচাইয়ের একটা গণভোট হিসাবে দাঁড় করানোর চেষ্টা করেছেন এবং তাতে  তিনি সফল হয়েছেন। এখন লোকসভা নির্বাচন শেষ পর্যায়ে, আগামী ২৩ মে ভোট গণনা হবে। যদি মোদি আর অমিত শাহরা আবার জিতে যায় তবে সংখ্যালঘু মুসলমানদের ভাগ্যে কী ঘটবে এটা নিয়েই জল্পনা-কল্পনা সংখ্যালঘুদের মনে। টকশো করেছে এনডিটিভিসহ কয়েকটি টিভি। বিশেষজ্ঞরা মত দিচ্ছেন, শুধু সংখ্যালঘু মুসলমান নয়, তাদের প্রতি সহানুভূতিশীল সুশীল সমাজের কপালেও অপূরণীয় দুর্ভোগ নেমে আসবে। অবশ্য, বেশিরভাগ টিভি মিডিয়া মোদির পক্ষে নগ্ন প্রচারে নেমেছে, এটিও অতীতের নির্বাচনে কখনও ঘটেনি।

অমিত শাহ প্রকাশ্যে বলেছেন, উইপোকার মতো মুসলমানদের পিষে মারবেন। আবার আরেক জনসভায় বলেছেন মুসলমানদের বঙ্গোপসাগরে ছুড়ে ফেলবেন। গত ৬৭ বছরে অর্থাৎ প্রথম লোকসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ১৯৫২ সালে, সে থেকে ২০১৪ সালের ষষ্টদশ লোকসভা নির্বাচন পর্যন্ত কেউ অনুরূপ প্রচারণা শোনেন নি। ষষ্ঠদশ লোকসভা নির্বাচনেও মোদি উন্নয়নের কথা বলেছিলেন, ‘আচ্ছে দিন’-এর কথা বলেছিলেন। মুসলমান নিধনের কথা বলেননি। মোদি-অমিত শাহদের রাজনৈতিক গুরু সাভারকার তার বইতে মুসলমানদের ভোট রহিত করে দেওয়ার কথা বলছেন, দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক করে দেবেন বলেছেন, কিন্তু তিনিও পিষে মারার হুমকি দেননি।

নরেন্দ্র মোদিরা গত পাঁচ বছর ক্ষমতায় থাকার সময় ঘরওয়াপসি কর্মসূচির রিহার্সেলও দিয়েছেন। মানে হিন্দু থেকে ধর্মান্তরিত লোকদের আবার হিন্দু বানানো। সুতরাং এবারের নির্বাচনে তারা জিতে আসলে মুসলমানদের ভয়, তারা চূড়ান্ত এক ভয়াবহ অবস্থার সম্মুখীন হবেন। আসামে গত বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি ক্ষমতায় এসে রাজ্য সরকার গঠন করেছে। বিজেপি সরকার গঠনের পর সেখানে নাগরিক পঞ্জির কাজ শুরু করেছিলো। সেখানে ৪০ লাখ বাঙালির নাগরিকত্ব ঝুলিয়ে দিয়েছে। এখন বলছে নাগরিকত্বের কাগজপত্রে দেখাতে না পারলে তাদের দেশছাড়া করবে। অর্থাৎ বাংলাদেশ ও পশ্চিম বাংলায় পাঠিয়ে দেওয়া হবে।

নরেন্দ্র মোদি বলছেন, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান যারা তারা নাগরিকত্ব পাবেন কিন্তু মুসলমানদের নাগরিকত্ব দেওয়া হবে না। ৪০ লক্ষ লোকের মাঝে ১৭ লক্ষ নাকি মুসলমান। পশ্চিম বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি একটি সংসদীয় দল পাঠিয়েছিলেন সবকিছু পর্যবেক্ষণ করার জন্য, কিন্তু আসাম ও কেন্দ্রীয় সরকার সেই সংসদীয় দলকে রাজধানী থেকে অন্যত্র কোথাও যেতে দেয়নি। তাদের আসাম ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য করেছে। আসাম সরকার বলছে মুসলমানদের নাকি বাংলাদেশে পাঠাবে। অথচ এ বিষয় নিয়ে বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে কোনও আলাপই করেনি।

প্রাচীনকালেও শংকরাচার্য্য অনুরূপ এক অভিযান পরিচালনা করেছিলো। সমগ্র ভারতবর্ষে তিনটি মঠ স্থাপন করে, ভারতের বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের ঘরওয়াপসি কর্মসূচিতে হিন্দু ধর্মে ফিরিয়ে এনেছিলো। শংকরাচার্য্যের অত্যাচারে বৌদ্ধরা হয় ধর্মান্তরিত হয়ে হিন্দু হয়েছে, না হয় চীন, থাইল্যান্ড, বার্মা, সিংহল, আফগানিস্তানে চলে গেছে। বৌদ্ধ ধর্ম ভারতের নিজস্ব ধর্ম। বুদ্ধ নিজে এ ধর্ম প্রচার করেছেন, আবার মৌর্য সম্রাট আশোকও বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহণ করার পর এই ধর্ম প্রচার করার উদ্যোগ নিয়েছিলেন।

ভারতে অর্ধেক বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী লোক থাকার কথা ছিল, কিন্তু শংকরাচার্য্যের কারণে বৌদ্ধরা নিজ ধর্মে টিকতে পারেনি। শংকরাচার্য্য খুবই দূরদর্শী লোক, দার্শনিক ছিলেন। ভারতীয় দর্শনের অদ্বৈত বেদান্ত নামের শাখাটিকে তিনি সুসংহত রূপ দেন। তিনি বৌদ্ধ ধর্মকে হিন্দু ধর্মের একটা শাখা রূপান্তর করার জন্য গৌতম বুদ্ধকে হিন্দু ধর্মের নবম অবতার ঘোষণা করেছিলেন। শংকরাচার্য্য গীতাভাষ্যও রচনা করেছিলেন। তিনি কেরলের লোক। ৩৩ বছর বয়সে মারা গিয়েছিলেন (৭৮৮-৮২০ খ্রিস্টাব্দ)। আরও বেশি দিন বাঁচলে হয়তো বৌদ্ধ অনুসারীদের নাম নিশানাও ভারতে রাখতেন না।

কিন্তু এই আধুনিককাল শংকরাচার্য্য সময়ের মতো বিশ্বের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন প্রাচীনকাল নয়। নরেন্দ্র মোদিরা মুসলমান সম্পর্কে যা বলছেন তা যদি করার চেষ্টা করেন তবে সমগ্র উপমহাদেশ অস্থির হয়ে উঠবে। ২০০৮ সালে কয়েক মিনিটের মধ্যে মুম্বাইকে লণ্ডভণ্ড করে দিয়েছিলো মাত্র ১০ জন সন্ত্রাসী। ২০১৬ সালে উরিতে সন্ত্রাসী প্রবেশ করেছিলো মাত্র ৪ জন। ২০১৬ সালের শুরুতে পাঠানকোটের বিমান ঘাঁটি ধ্বংস করেছিলো ৪/৬ জন। ২০১৯ সালের পুলওয়ামায় সন্ত্রাসী হামলা চালিয়েছে মাত্র একজন আত্মঘাতী।

তাই বলা যায়, সন্ত্রাস করে শান্তি বিনষ্ট করতে বেশি মানুষের প্রয়োজন হয় না। মোদিরা যদি ক্ষমতায় এসে আবারও সংখ্যালঘু নিষ্পেষণ অব্যাহত রাখেন, মুসলিম জঙ্গিদের সন্ত্রাস তখন উপমহাদেশের অনেক মুসলমানের সহানুভূতি পাবে। এমনকি আফগানিস্তানে সোভিয়েত আগ্রাসনের সময়ের মতো বিশ্ব মুসলিম জনগোষ্ঠীরও সহানুভূতি পেতে পারে। আর পাকিস্তানের জঙ্গিগোষ্ঠী তো ভারতে নিজস্ব সন্ত্রাসী চালান দিতে একপায়ে খাড়া আছে আগের থেকেই। মধ্যপ্রাচ্য থেকে বিতাড়িত আল-বাগদাদির আইএস এরইমধ্যে ভারতকে কেন্দ্র করে উপমহাদেশে তাদের কার্যক্রম চালাবে বলে ঘোষণা দিয়েছে। জানি না কী আগুন দিয়ে খেলছেন নরেন্দ্র মোদিরা। ভারতের রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ পরিবার চেষ্টা করছে ভারতকে হিন্দুত্ববাদী একটা রাষ্ট্র হিসেবে গঠন করতে। এ প্রচেষ্টায় তারা কখনও সফলকাম হবে না। কারণ, এই আধুনিককালে গরুর দুধের চেয়ে গরুর মূত্রগুণ বেশি- এ প্রচার বাজারে বেশি দিন চলবে না। ভারতকে তার উন্নতির জন্য গৌরবের অসাম্প্রদায়িক চেহারাতেই ফিরতে হবে।

লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলাম লেখক

bakhtiaruddinchowdhury@gmail.com

 

 

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ