সামনে ফিটফাট ভেতরে সদরঘাট

Send
আবদুল মান্নান
প্রকাশিত : ১১:৪৩, মে ১৭, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১২:০৪, মে ১৭, ২০১৯



আবদুল মান্নান
ভেজাল খাদ্যদ্রব্য বিক্রি ও প্রস্তুতকারীদের বিরুদ্ধে এখন বিএসটিআই, সিটি করপোরেশনও আরও দুই-একটি সরকারি সংস্থার অভিযান চলছে। এই অভিযানটা শুধু রমজানেই কেন দৃশ্যমান হয়, তা বোঝা মুশকিল। বিশ্বে সম্ভবত বাংলাদেশ একমাত্র দেশ, যেখানে মানুষ নিজেকে, পরিবারের সদস্য অথবা অন্যকে হত্যা করার জন্য নিজেই সব উপাদান প্রস্তুত অথবা সরবরাহ করে। বিক্রেতার কাছে ক্রেতা ঠকবেন, তা একপ্রকার নির্ধারিত। হতে পারে তা শিশু বা বড়দের খাদ্য অথবা গাড়ির জ্বালানি কিংবা মিষ্টির ওজন। আবার পণ্যের প্যাকেটের গায়ে লেখা এক ভেতরে অন্য জিনিস। ক’দিন আগে আমার বাসার কাছে সদ্য খোলা এক বিরাট সুপার শপ থেকে একটি ভেজিটেবল চিকেন রোল কিনলাম। বাসায় একজন নিরামিষভোজি বন্ধু আসবেন। তেলে ভেজে টেবিলে সার্ভ করা হলো। মুখে দিয়ে দেখি তাতে ভেজিটেবলের সঙ্গে মাংসের কিমা মেশানো আছে। কিসের মাংস তা জানতে চাইলে বিব্রত হবো। বছর কয়েক আগে আরিচা ফেরিঘাটে খাসির মাংসের নামে কুকুরের মাংস বিক্রি করার সময় এক হোটেলের মালিককে ক্রেতারা গণধোলাই দিয়ে পুলিশের হাতে সোপর্দ করেছিল। একদিন পর সেই দোকানে গিয়ে বিষয়টি জানালে কাউন্টারের মহিলা জানালেন, ওটা নিয়ে আসলে পাল্টে দিতাম। সাধে কী আর বলে কোনও কোনও মানুষের বুদ্ধি হাঁটুতে থাকে।

এক সময় শুনতাম আমের আঁচারে আমের সঙ্গে চালতা মেশায়, টমেটো কেচাপে মিষ্টি কুমড়া। একবার খবরের কাগজে উঠলো বিশ্বের সবচেয়ে দক্ষ সার্জন ঢাকার ঠাঠারি বাজারে অবস্থান করছে। কারণ এই সার্জনরা মহিষকে গরু আর ভেড়াকে খাসি বানাতে বেশ দক্ষ। তাও-তো খাবার জিনিস। এখন তো সেই সবের বালাই নেই। এখন শুরু হয়েছে নতুন জেনারেশনের ভেজাল পদ্ধতি আর প্রক্রিয়া। পাটালি গুড়ে গুড় নেই। আছে সব রাসায়নিক পদার্থ। বড় বড় খাদ্য দ্রব্য প্রক্রিয়াকরণ প্রতিষ্ঠান। বাজারে ব্র্যান্ডের খ্যাতি আছে। দেশি-বিদেশি টিভিতে অনেক প্রোগাম স্পন্সর করে। তাদের পণ্যে ভেজালে ঠাসা। ওষুধে ভেজাল, ডায়াগনস্টিক সেন্টারের পরীক্ষায় ভেজাল, আদালতের আইনজীবী ভেজাল, মুক্তিযোদ্ধার সার্টিফিকেটধারী ভেজাল, ডাক্তার ভেজাল, ড্রাইভিং লাইসেন্স ভেজাল, পেট্রোল পাম্পের তেলেও ভেজাল, চিনি আর লবণে ভেজাল, ওষুধে ভেজাল, ওয়াসার পানিতে ভেজাল, লাল শাখে ভেজাল, মাছ ভেজাল, আইসক্রিমে ভেজাল, মাদ্রাসা  শিক্ষক ভেজাল,  পিএইচডি ডিগ্রিতে ভেজাল, বিশ্ববিদ্যালয় ডিগ্রি  ভেজাল, উপাচার্য ভেজাল, পুলিশ, র‌্যাব সদস্য, ডিবি ভেজাল। তালিকার কোনও শেষ নেই। টিভিতে দেখাচ্ছিল কুষ্টিয়ার একটি কলার বাজার। এটি নাকি দেশের কলার সব চেয়ে বড় পাইকারি মার্কেট। এখান থেকে সারাদেশে কলা সরবরাহ করা হয়। পাকানোর জন্য সবাই বেশ ফূর্তি করে কাঁচা কলায় বিষ স্প্রে করছিল। বিষ কিনা তারা জানে না। জানে এই জিনিস স্প্রে করলে কলা তাড়াতাড়ি পাকে। রমজানে কলার চাহিদা বেড়ে যায়। কলার কদর পবিত্র রমজান মাসে একটু বেশি। সেই কদরকে পুঁজি করে একটু বাড়তি লাভ করলে খারাপ কী!

সব জিনিসে ভেজাল দিলে মানুষ ঠকে। কিন্তু খাদ্যে ভেজাল দিলে মানুষের স্বাস্থ্যের ক্ষতি হওয়াটা স্বাভাবিক আর দীর্ঘ মেয়াদি সময়ে প্রাণহানি হতে পারে, বাচ্চা বিকলাঙ্গ হতে পারে, মানুষের দুরারোগ্য ব্যাধি হতে পারে, এই কথাটা এই ভেজাল-কারবারিরা  মনে রাখে না। একটু যশখ্যাতি হয়েছে তেমন খাদ্যের দোকানের সামনেটা বেশ পরিপাটি থাকে। দেশি কথায় বলে ফিটফাট কিন্তু ভেতরে যে সদরঘাট তা ক’জনে জানে? হোক না সেটা কোনও নাম করা মিষ্টির দোকান অথবা গুলশান বনানি বা ধানমন্ডির কোনও ‘হাইফাই’ ইন্ডিয়ান বা চীনা খাবারের দোকান। দোকানের ভেতর তকমা পরা লোকজন বেশ স্মার্ট স্যুট পরে ঘুরে ফিরছে। সামনে কাস্টমারকে অভ্যর্থনা জানানোর জন্য বেশ পরিপাটি করে কাপড় পরে একজন সুন্দরী মহিলা। কোনও কোনও চীনা খাবারের দোকানে চাকমা মেয়েও থাকতে পারে। একটু চীনা টাচ দেওয়া আর কী! মানে এখানে যা কিছু পাবেন, সবই আসলে চীনা। এমনকী সেফও,  যদিও তার বাড়ি রাঙ্গামাটি বা বান্দরবান। সুযোগ হলে একটু রান্না ঘরে ঢুকলে মাথা ঘুরে যাবে। কুকুরের আর বিড়ালের গলাগলি ভাব এই রান্না ঘরেই দেখা যাবে। ইঁদুর গত রাতে মরেছিল। পরিষ্কার করার সময় পাওয়া যায়নি। খদ্দেরের চাপ একটু বেশি। তেলে পোকা কিলবিল করছে। এগুলো কোনও ক্ষতি করবে না। হোটেল পালিত। মাঝে মধ্যে কোনও আসল চীনা বা থাই নাগরিক আসলে চুপি চুপি বলে ‘তেলে পোকা ভাজা কী একটু হবে?’ খদ্দেরের খায়েস বলে কথা। যাবে, তবে একটু সময় নেবে।

এই সব ভেজালের অভ্যাস দেশে সীমা ছাড়িয়ে বিদেশেও নিয়মিত রফতানি হয়। আমার বন্ধু শহীদ দীর্ঘ দিন ধরে যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী। ভালো সরকারি চাকরি করে। একমাত্র-পুত্র বড় বহুজাতিক কোম্পানিতে কর্মরত। যুক্তরাষ্ট্রের পরিমাপে উচ্চবিত্ত বলা যাবে। প্রতি রাতেই ফোন করে। খেজুরে আলাপ আর কী। সেদিন জানালো তারা এখন আর দেশি মাছ কেনে না, কারণ দেশি মাছ হিমায়িত করার আগে তার ভেতর অনেক সময় শিসা ঢুকায়। এক পাউন্ড পাবদা মাছ কিনেছিল। ওপরে দুই চারটা বড়। নিচেরগুলো সব ছোট ছোট। হিমায়িত করার আগে প্যাকেটে পানি ঢুকিয়ে ওজন বাড়িয়েছে। একপাউন্ডে বার চৌদ্দটা ধরেছে। আর লাউস, ভিয়েতনাম, ক্যাম্বোডিয়া হতে যেগুলো আসে সেগুলোতে এমন ঠকবাজি থাকে না। পাউন্ডে কুড়ি হতে বাইশটা পাওয়া যায়। সাইজ সবগুলোর সমান।

হাজার বারো টাকা কেজিতে মিষ্টি কিনলেন। প্যাকেটসহ ওজন। ওজনে কোনও কারচুপি নেই। কিন্তু এক কেজি মিষ্টির প্যাকেটের ওজন কমপক্ষে চারটি মিষ্টির সমান। বছর কয়েক আগের কথা। আমি উত্তরায় থাকি। ইফতারের পর কাছের মসজিদে নামাজ পড়তে যাওয়ার পথে দেখি স্থানীয় মানুষ মসজিদের সামনের চনা পিঁয়াজুর দোকানদার চাঁদা তুলে গণধোলাই দিচ্ছে। হেতু জনতে চাইলে একজন জানালো বেটা আজ বেগুনি বানিয়েছে কচুর ডগা দিয়ে। সেই বছর বেগুনের দাম সত্তর টাকা কেজি ছিল। তৎকালীন অর্থমন্ত্রী সাইফুর রহমান সহজ উত্তর দিয়েছিলেন। বেগুনি না খেলে কী হয়? বেশ যুৎসই উত্তর। সাইফুর রহমান বর্তমানে প্রয়াত। আল্লাহ তাকে বেহেশত নসিব করুক। তার কথা অবশ্যই প্রতিবাদের একটি ভাষা। দেশের উচ্চ আদালত  ৫২টি খাদ্য পণ্য বিক্রি নিষিদ্ধ করেছে। কারণ এগুলোয় স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকারক উপাদান আছে। কিন্তু দেশের সব মানুষ তো এই সব ব্যাপারে তেমন একটা সজাগ নয়। কোনও কোনও ক্ষেত্রে এই ভেজাল প্রতিষ্ঠানের কয়েকজনকে দুই তিনদিনের জেল দেওয়া হয়েছে। জরিমানা করা হয়েছে কম-বেশি সবাইকে। কিন্তু সমস্যাটি তো কখনও দূর হবে না যদি না অপরাধীরা উপযুক্ত শাস্তি না পায়। চীন দেশে খাদ্যে ভেজাল দেওয়ার একমাত্র শাস্তি মৃত্যুদণ্ড, তাও আবার ফায়ারিং স্কোয়াডে। বাংলাদেশে এমন শাস্তির বিধান করা তো কঠিন হওয়ার কথা নয়। গাড়ি দুর্ঘটনা করে কাউকে যদি ইচ্ছাকৃতভাবে হত্যা করা হয় তাহলে চালকের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের বিধান আছে। সে তো এক কী দু’জন মানুষ মারে। আর এই ভেজালকারিরা তো প্রজন্মের পর প্রজন্ম নীরবে ধ্বংস করে দিচ্ছে। আর যে সব দোকানে এই সব খাদ্যদ্রব্য বিক্রি হয়,  বিশেষ করে মিষ্টি জাতীয় জিনিস, সে সব দোকান স্থায়ীভাবে সিল করতে তো কোনও বাধা হওয়ার কথা না। যে সব বড় বড় প্রতিষ্ঠান তথাকথিত ব্র্যান্ড জিনিস বানায়, তাদের লাইসেন্স কেন বাতিল হবে না? কেন তাদের মালিক আর কর্মকর্তাদের দীর্ঘ মেয়াদি কারাদণ্ড জরিমানা করা হবে না? সেই আইন তো দেশেই আছে। দেশের সাধারণ মানুষ চলমান এই ভেজাল সংস্কৃতি হতে নিষ্কৃতি চায়। তারা নিজের ও ছেলে-মেয়ের জীবনের নিরাপত্তা চায়। বর্তমান সরকারের কাছে এই চাওয়াটা খুব বেশি নয়। সহজে চাহিদা পূরণ করা সম্ভব। শুধু রমজান মাসে ভেজালবিরোধী অভিযান পরিচালনা না করে  সারাবছর চালু থাকুক। পবিত্র রমজান মাসে পাঠকদের নির্ভেজাল শুভেচ্ছা।
লেখক: বিশ্লেষক ও গবেষক

 

/টিটি/এমএনএইচ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ