‘অনুভূতি’-‘উসকানি’-‘ভাবমূর্তি’র চাষাবাদ বন্ধ হোক

Send
জোবাইদা নাসরীন
প্রকাশিত : ১৫:১৭, মে ১৯, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ২৩:৪৩, মে ১৯, ২০১৯

জোবাইদা নাসরীনপর পর ঘটে যাওয়া কয়েকটি ঘটনা সামাজিক মাধ্যমের সক্রিয় অনেককেই আতঙ্কগ্রস্ত করে তুলেছে। আতঙ্কের মাত্রা এমনই, এখন কেউ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কোনও লেখায় লাইক দেওয়া, কোনও বিষয়ে নিজস্ব মতামত বা মন্তব্য প্রদান, এমনকি ছবি বা কোনও লেখা শেয়ার করতেও ভয় পাচ্ছেন। কখন কাকে গ্রেফতার করা হবে, কখন কার বিরুদ্ধে মামলা হবে-এই ভয়েই এই অবস্থা। প্রত্যেকটি মুহূর্তই এখন টেনশনের, ভয়ের।
বাংলাদেশ বর্তমানে কয়েকটি সামাজিক রোগে ভয়াবহ আক্রান্ত। এই ভয়াবহ রোগগুলোর কয়েকটি হচ্ছে ‘ভাবমূর্তি’, ‘অনুভূতি’ এবং ‘উসকানি’। এগুলোতে আক্রান্ত হয়ে পড়েছে খোদ প্রতিষ্ঠানগুলোও। গত কয়েকদিন বেশ কয়েকজন সক্রিয় চিন্তাশীল মানুষ গ্রেফতার হয়েছেন। তার মধ্যে একজন হলেন বাংলাদেশের লিটলম্যাগ আন্দালনের অন্যতম পথিকৃৎ কবি হেনরী স্বপন। হেনরী স্বপনের দেওয়া একটি ফেসবুক স্ট্যাটাসে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগ করে বরিশালে খ্রিস্টান ধর্মযাজক ফাদার লাকাবা লিএল গোমেজ হেনরী স্বপনসহ তিন জনের বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা দায়ের করেছিলেন। সেই মামলায় গ্রেফতার হয়েছিলেন তারা। এর পরেই গ্রেফতার করা হয়েছে আইনজীবী ইমতিয়াজ মাহমুদকে। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ তিনি খাগড়াছড়ির একটি ঘটনা উল্লেখ করে ফেসবুক টাইমলাইনে একটি পোস্ট দেন এবং প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন। এবং সেটিতে ‘উসকানি’র অভিযোগ এনে ২০১৭ সালে মামলা করেন খাগড়াছড়ির একজন বাঙালি। এর আগে এ মাসের ৯ তারিখে বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌন হয়রানি সম্পর্কে গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবর এবং সম্পাদকীয় মতামত ফেসবুকে শেয়ার দেওয়ার মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘ভাবমূর্তি’ নষ্ট করার অভিযোগে শোকজ করা হয়েছে গোপালগঞ্জে বঙ্গবন্ধু বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঁচ শিক্ষার্থীকে। এরই মধ্যে আবার চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক মাইদুল ইসলামকে বাসার সামনে এসে গালিগালাজ করে হুমকি দিয়ে গেছেন কয়েকজন। তিনি প্রচণ্ড রকমের নিরাপত্তাহীনতায় আছেন। এর আগে তিনিও গ্রেফতার হয়েছিলেন কোটাবিরোধী আন্দোলনকে ‘উসকে’ দেওয়ার অভিযোগে। আর সেই মামলাটি করেছিলেন চট্টগ্রামের এক ছাত্রলীগ নেতা।

হেনরী স্বপন এবং ইমতিয়াজ মাহমুদ উভয়েই জামিনে কারাগার থেকে বের হয়ে এসেছেন। এই গ্রেফতারের বিষয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক প্রতিক্রিয়াও হয়েছে। এই কয়েকটি ঘটনা বিশ্লেষণ করলে আমরা দেখতে পাই, অনুভূতিতে আঘাত, উসকানি, ‘ভাবমূর্তি’ নষ্ট এগুলোর একটি রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে। কে কখন কোন বিষয়ে অনুভূতিতে আঘাত বোধ করবেন সেটির কোনও নির্দিষ্ট সংজ্ঞা বাংলাদেশের আইনে নেই। তবে এর চরিত্র কাটাছেঁড়া করলে দেখা যায়, সংখ্যাগরিষ্ঠরাই সবেচেয়ে বেশি ‘অনুভূতিপ্রবণ’। তারাই বারবার অনুভূতিতে আঘাত পায়। তাদের জাতীয়তাবাদী অনুভূতি আহত হয়, ধর্মীয় অনুভূতি আহত হয়, যৌন সংখ্যালঘুদের দেখলে সংখ্যাগরিষ্ঠ নারী-পুরুষের অনুভূতি আহত হয়, দরিদ্র কিছু বললে মধ্যবিত্ত বা ধনীদের শ্রেণি অনুভূতি আহত হয়। অপরদিকে প্রতিবছর যে হিন্দুদের প্রতিমা ভাঙচুর হয়, সে সময় কখনও বলা হয় না হিন্দুধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করা হয়েছে। এমনকি যখন রামুতে বৌদ্ধ মন্দির ভাঙচুর করা হলো ২০১২ সালে তখনও কিন্তু এই প্রসঙ্গ আসেনি যে বৌদ্ধদের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করা হয়েছে। আমাদের দেশে জাতিগত এবং ধর্মীয় সংখ্যালঘু নিয়ে যে ধরনের বুলিং/হেয় করার মনস্কতা সামাজিকভাবে চর্চিত হয় সেগুলোকেও কখনও জাতিগত বা ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হিসেবে হাজির করা হয় না। সুতরাং অনুভূতি বিষয়টা একেবারেই রাজনৈতিক। তবে কখন কার বিপরীতে এটি ব্যবহৃত হবে সেটি বলা কঠিন।

এখন আসি ‘ভাবমূর্তি’র প্রশ্নে। সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত শব্দ। ব্যক্তি এবং প্রতিষ্ঠানের ‘ভাবমূর্তি’ নষ্ট হচ্ছে বলে সামাজিক হাহাকার প্রায়শ শোনা যায়। এদেশে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে যখনই যৌন হয়রানির অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে তখনই এটিকে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করা হয় ‘ভাবমূর্তি’ রক্ষার প্রশ্নে। প্রতিষ্ঠানগুলোতে যৌন হয়রানি হবে, সেখানে সেই যৌন নিপীড়ক ব্যক্তিকে বাঁচানোর বিষয়টিকে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা তাহলে প্রতিষ্ঠানকে সম্মানিত করে? সেটাতে কোনও ধরনের ‘ভাবমূর্তি’ নষ্ট হয় না? কিন্তু সেসব বিষয়ে আন্দালন হলেই ‘ভাবমূর্তি’ নামক সিন্ধুকে রাখা বস্তুটি খান খান করে ভেঙে পড়ে? অথচ হওয়ার কথা ছিল উল্টোটি। অনেকে আবার বলেন, ‘এগুলোর প্রতিবাদ করা আমার রুচিতে বাধে’। এই কথা দ্বিধাহীনভাবে বলা যায়, এ ধরনের অপরাধের ক্ষেত্র চুপ থাকা, লুকানোর চেষ্টা করাই অরুচিশীল এবং প্রতিবাদটাই বরং রুচির পরিচয় এবং সুস্থ ‘ভাবমূর্তি’র পরিচয়।

‘উসকানি’ কিংবা ‘ইন্ধন’ শব্দটিও আমাদের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন নয়, বরং ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত শব্দ। উসকানির সংজ্ঞা কী? মানুষ কখন উসকানি বোধ করে? প্রায়শ উসকানি শব্দটা শোনা যায় সরকারদলীয় মন্ত্রী এবং নেতাদের দেখে। বিশেষ করে গার্মেন্টস কিংবা ছাত্র আন্দালনের নৈতিক জোরকে স্বীকার না করে বিরোধী দলের উসকানি কিংবা বিশেষ মহলের ইন্ধন হিসেবে প্রচার করেন তারা। অর্থাৎ ক্ষমতার গায়ে আঁচড় পড়া যে কোনও কিছুই ‘উসকানি’ হিসেবে পাঠ করা হয় এবং এর মধ্য দিয়ে আন্দোলনকারীকে একরকমভাবে ‘প্যাসিভ’ বা নিষ্ক্রিয় হিসেবে দেখার চেষ্টা করা হয়। যেখানে তাদের অন্যের উসকানির ‘পুতুল’ হিসেবে হাজির করার এ এক ধরনের জোর চেষ্টা থাকে। এর সাথে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে আইনের যোগসূত্রও মিলে যায় কখনও কখনও। আইসিটি অ্যাক্টের ৫৭ ধারা বিভিন্ন সময়ে সমালোচনা এবং দাবির বিলুপ্ত হলেও নতুন আইন ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্টের মধ্যে ৫৭ ধারার সব উপাদান আছে, যার কারণে এই আইনে মামলা দায়ে করার প্রবণতা ক্রমশ বাড়ছে। মানুষের প্রতিবাদ, প্রতিরোধের বোধকেই উসকানি হিসেবে ঠাওরে গ্রেফতার করে এটি থেকে মানুষকে ক্রমশ দূরে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে রাষ্ট্রীয়ভাবেই। তবে কোনও বক্তব্যের বিরুদ্ধে চট করে উসকানির অভিযোগ আনা নিশ্চিতভাবেই মত প্রকাশের স্বাধীনতার পরিপন্থী।

খুব লক্ষ্য করলে দেখবেন অনুভূতিতে আঘাত, উসকানি-ইন্ধন আর ‘ভাবমূর্তি’ নষ্ট এই তকমাগুলোর মধ্যে এক ধরনের যোগসূত্র আছে। আর এই যোগসূত্রটি তৈরি করছে স্বয়ং রাষ্ট্র। এটি প্রতিবাদহীনতা তৈরি করা এক বড় ধরনের আকাঙ্ক্ষা। আমাদের হাজার হাজার টাকা লুট হচ্ছে, দুর্নীতি হচ্ছে, কৃষক ন্যায্যমূল্য পাচ্ছে না, পাটকলের শ্রমিকরা বেতন পাচ্ছে না, যৌন হয়রানি, ধর্ষণ নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা হয়ে যাচ্ছে। আর আমরা এদিকে চাষাবাদ করেই যাচ্ছি ক্ষমতার অনুভূতির, উসকানির আর ভাবমূর্তির...

লেখক: শিক্ষক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
ইমেইল: zobaidanasreen@gmail.com

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ