ধর্ষণের অর্থনীতি

Send
আনিস পারভেজ
প্রকাশিত : ১৬:৫৪, মে ১৯, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:৫৬, মে ১৯, ২০১৯

আনিস পারভেজ‘বাঘে ধরলে এক ঘা, পুলিশে ধরলে আঠারো ঘা’—কালোত্তীর্ণ প্রবাদ এবং ধ্রুব সত্য। এখন পুলিশের সঙ্গে যোগ হয়েছে শাসক, প্রশাসক, পাড়ার মাস্তানসহ অনেকেই। আদালত পাড়ায়ও একই অবস্থা,  নইলে দীর্ঘ ছয় মাস সীমা বেগম কেন ঢাকার জজ কোর্টে তার মেয়ে  সানজিদা রশিদ মীমের হত্যার বিচার চেয়ে ঘুরে বেড়াবেন?
মীম মাদ্রাসায় পড়তো, চৌদ্দ বছর বছরের কিশোরী। দেখতে সুন্দর, মাদ্রাসার শিক্ষকরা লোভ সংবরণ করতে পারেননি। এরকম হামেশাই ঘটছে। সীমাকে ধর্ষণ করা হয়। শোনা যায় ধর্ষণের পর তাকে মেরে ফেলা হয় এবং তা আত্মহত্যা হিসেবে চালিয়ে দেওয়ার জন্য গলায় ওড়না দিয়ে ফাঁস লাগিয়ে ঝুলিয়ে রাখে।    
মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত হত্যা সামাজিক মিডিয়ায় সাম্প্রতিক আলোচিত বিষয়। ধর্ষণের পর সাহস করে নুসরাত আইন নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাছে বিচার চাইতে গেলে ‘ধর্ষক গ্যাং’ দিয়ে তাকে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়। থানার ওসি মামলা নিতে চাননি। বরং কুকর্মের আলামত সম্পর্কিত অশ্লীল প্রশ্ন করে তার ভিডিওচিত্র ধারণ করে ওসি তা সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দেয়। আইন নিয়ন্ত্রণ না করে আইনের সেবক এভাবেই লম্পটদের লালসা ফুসকে দিয়ে নুসরাতকে প্রকারান্তরে ভার্চুয়াল জগতে বারবার ধর্ষণের আয়োজন করলেন।  এ নিয়ে প্রশ্ন উঠলে ওসির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ওসিরই সাফাই গাইলেন। 

সম্প্রতি আবারও ধর্ষিত হলো নিম্নবিত্ত একজন নারী, যিনি নার্সের কাজ করে জাতির সেবা করতেন। চলন্ত বাসে তাকেও হত্যা করে রাস্তায় ছুড়ে ফেলে দেওয়া হয়। এখানেও যে সুবিচার পাওয়া যাবে, তার কোনও গ্যারান্টি নেই, পরিবহন শ্রমিকদের অভিবাবক তো এক শক্তিধর রাজনৈতিক নেতা।

এভাবেই মরেছে তনু। দিন যায়, কিন্তু বিচার আর হয়ে ওঠে না।  

বিচার হয় না কেন?

প্রতিপত্তি ও অপশক্তির সিন্ডিকেট প্রতিটি ধর্ষণ ও অপরাধকে বাণিজ্য বানিয়েছে। একদল করে ইন্দ্রিয় সুখ, যাদের প্রটেকশন দিয়ে ক্ষমতাসীনরা তাদের অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি ঘটায়। যে যেদিক থেকে পারে একমুঠো টাকা তুলে নেয় নিজেদের ওয়ালেটে।

সীমা বেগম বিচার চেয়েই যাচ্ছেন, অন্যদিকে চলছে টাকার লেনদেন। একটি অনলাইন গণমাধ্যমের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে জানানো হয়, পুলিশ তালবাহানা করে মামলা নিতে, বরং মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আপস করার জন্য হুমকি দেয় পুলিশ। ফরেনসিক ডাক্তার আসামির কাছ থেকে টাকা নিয়ে ভুল প্রতিবেদন দেন। এলাকার মাস্তানরাও বাদ যাবে কেন? তাদেরও কিনে ফেলেছে আসামি পক্ষ।

সীমা বেগম তবু প্রতিদিন আদালতে যান, অপেক্ষা করেন বিচার হবে। বিচার একটি প্রক্রিয়া, পুলিশ তদন্ত করে প্রতিবেদন দেয় এবং সে প্রতিবেদনের ওপরই মূলত বিচারের সিদ্ধান্ত নির্ভর করে। যিনি তদন্ত করবেন, মর্গের রিপোর্ট যার হাত থেকে বেরোবে এবং যারা সাক্ষী, তাদের কাছে আইনের শাসনের নগ্ন অনুপস্থিতিতে অর্থনীতির পাল্লাটাই ভারী হবে—এটাই তো স্বাভাবিক।

অপশাসনে নীতিকথা, ধর্মকথা সব অসার। অপশাসনের দৌরাত্ম্য নাগরিক টের পায়, যখনই সে রাষ্ট্রীয় সেবা প্রত্যাশা করে—যেকোনও ক্ষেত্রেই হোক না কেন। হোক শিক্ষা, সম্পত্তি কেনা ও হস্তান্তর—কখনও কখনও মৃতের সৎকার করতে গেলেও। নাগরিকের দেয় করের ২২ শতাংশ ব্যয় হয় সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতায়। অথচ তারাই নাগরিকের অধিকার সেবা চাইতে গেলে আপনার কোচড় খালি করে ছাড়বে।  

আইনি প্রথায় সেবা নেওয়ার সুযোগ এদেশে কেবলই সঙ্কুচিত হচ্ছে। আইন না ভেঙেও নাগরিক রাষ্ট্রীয় সেবক ও শাসকদের হাতে জিম্মি, আইন ভাঙলে তো কথাই নেই। কালো টাকার কোষাগারে আপনার কষ্টে অর্জিত অর্থ দিতেই হবে। সে অর্থের অনেকটাই চলে যায় দেশের বাইরে। ইতোমধ্যেই চার লাখ কোটি টাকা পাচার হয়ে গেছে, পানামা পেপারস তাই বলে। টরেন্টোতে দেশের টাকায় অনেক আমলা, রাজনীতিবিদ আর ব্যবসায়ীদের স্ত্রীরা বেগম’স কোয়ার্টারে বসবাস করছে আকাশচুম্বী বিলাসিতায়, যা বিত্তবান কানাডিয়ান নাগরিকেরও অসাধ্য।

তাই দেশে ধর্ষণ, হত্যা ও যাবতীয় অনাচার অনেকের জন্যই প্রয়োজন তাদের অর্থনীতির স্ফীতি বাড়াতে। এ অর্থনীতি ক্রমেই ফুলেফেঁপে উঠছে। শুদ্ধাচার ও সুবিচার এ অর্থনীতির শত্রু, যাকে সম্মিলিতভাবে ঠেকাচ্ছে সে অর্থনীতির সুবিধাভোগীরা রাষ্ট্রেরই প্রতিষ্ঠান ও কাঠামো ব্যবহার করে।

একটা ভিন্ন অর্থনীতি এদেশের বৈধ অর্থনীতির চেয়েও আকারে বড়। এ অর্থনীতি আসে ধর্ষণ করে, হত্যা করে ও নাগরিকের সম্পত্তি দখল করে। অপশাসন এ অর্থনীতির পৃষ্ঠপোষক।

লেখক: যোগাযোগ ও সিনেমা গবেষক

/এসএএস/এমএনএইচ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ