গরমের ওম

Send
আহসান কবির
প্রকাশিত : ১৫:০৬, মে ২০, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:১২, মে ২০, ২০১৯

আহসান কবিরশীত হোক, বর্ষা হোক আর গ্রীষ্ম হোক সিনেমার নায়িকারা নাচ গানের সময়ে যে পোশাক পরেন সেটা দেখে যে কারও মনে হতে পারে নায়িকার পুরো কাপড় কেনার টাকা নেই। সে যাই হোক, বাংলাদেশের ‘গরমের ওম’ কিন্তু অসহ্য পর্যায়ে পৌঁছেছে! একদণ্ড শান্তি মেলে না তাতে। যারা সবসময় পজিটিভ চিন্তা করেন তারা অবশ্য বলেন, গরমে অভ্যস্ত হওয়া ভালো। অভ্যাস হয়ে গেলে নাকি নরকেও কষ্ট কম মনে হবে। বাংলাদেশের (এপ্রিল-মে ২০১৯) গরম দেখে ইদানিং ধারণা হয়, জীবনানন্দ এমন গরম এলেই হয়তো বনলতা সেনকে খুঁজে বের করতেন। তবে গরমের শেষে যে ঝড়ের রেওয়াজ, সেগুলোর কয়েকটির নামকরণ করা হয়েছিল নারীদের নামে। নারীরা শুধু পুরুষের জীবনে না, পৃথিবীব্যাপীও কী ঝড় বইয়ে দেয়?
তবে কবিরা হয়তো গরম সহ্য করতে পারেন না। তাদের বরফ মার্কা শান্তি খুঁজে ফিরতে হয়।ওয়ার্ডসওয়ার্থের শান্তির নাম ছিল লুসি, সুনীল গাঙ্গুলীর ছিল নীরা কিংবা মার্গারিটা। রবীন্দ্রনাথের লাবণ্য, হয়তো লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চির শান্তি ছিল মোনালিসায়! গরমে সাধারণ মানুষের শান্তি বরফে কিংবা বৃষ্টিতে। এপ্রিল এলে বা গেলেই নাকি এমন গরম আসে। ১৯৯১, ১৯৯৭, ২০১১, ২০১৪ আর ২০১৯-এর এপ্রিলের শেষে এমন গরম এসেছিল। মানুষের ধারণা এমন, গরম কমাতে পারে কোনও নিম্নচাপ, যার হাত ধরে আসবে ঝড় বা বৃষ্টি। গত কয়েক বছর ধরে রেওয়াজ এমনই। গরমে যখন অবস্থা চরমে তখন নিম্নচাপেই শান্তি।

সিনেমাতে আইটেম সং বলে একটা জিনিস আছে। আইটেম সংয়ের সঙ্গে কয়েক মিনিটের ভাঙচুর নাচে নাকি দর্শকদের হৃদয় ভাঙচুর করার ব্যবস্থা থাকে, দর্শকরা নাকি এক ধরনের প্রশান্তিও(!)পান। গরমের শেষের নিম্নচাপজনিত ঝড় নাকি তেমনই। ঝড় আসে, গরম থেকে তাৎক্ষণিক প্রশান্তি দেয় ঠিকই, কিন্তু নিয়ে যায় অনেক কিছু, রেখে যায় অনেক ভাঙচুরের স্মৃতি। গত এক দশকে (২০০৯-২০১৯)  বাংলাদেশে গরম পড়লে (গ্রীষ্মকালে) তাপমাত্রা ৩৬ থেকে ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ভেতর ওঠানামা করে। যারা তাপমাত্রা জানতে চান বা এটার খোঁজখবর রাখেন তাদের কাছে ‘ফিল লাইক’ বা গরম অনুভবের ব্যাপারটাও পরিচিত। সাধারণভাবে বাংলাদেশের তাপমাত্রা যদি ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস হয় তখন ফিল লাইক হয় ৪৩ বা ৪৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসের সমান। মরুভূমির অনুভূতি নেওয়ার জন্য তাই সৌদি আরব বা সুদান যাওয়ার দরকার নেই, মরুভূমির স্বাদ এখন বাংলাদেশেই পাওয়া যায়। বিশ্বাস হচ্ছে না?

সাহারা মরুভূমির গড় তাপমাত্রা গ্রীষ্মকালে ৩৭ থেকে ৪১ ডিগ্রি সেলসিয়াস। তাহলে বাংলাদেশেই এখন ‘ঠিক যেন মরুভূমির গরম ছোঁয়া’ পাওয়া যায়! তবে সাহারাতে গাছপালা এবং বাতাসের আর্দ্রতা কম ও বালুর স্তূপের তাপের (বালু গরম হয় খুব তাড়াতাড়ি) কারণে ‘ফিল লাইক’ বা গরম অনুভবের ব্যাপারটা একটু বেশি। তবে সুদান, লিবিয়া, সৌদি আরব, মিশর ও তিউনিসিয়ার মরুভূমি অঞ্চলে তাপমাত্রার সর্বোচ্চ রেকর্ড ৪৭ থেকে ৫৩.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। তবে এই তাপমাত্রা হয়তো পঞ্চাশ ষাট বছরে একবার দেখা যায়।

বাংলাদেশে এমন গরমের কারণে বাসাবাড়ির নকশা ও নির্মাণ প্রণালি বদলে যাবে কিনা বলা যাচ্ছে না। লিবিয়ার ঘাদাম হচ্ছে মরুভূমি বেষ্টিত এক দুর্গম এলাকা। বেদুইনরা বাস করে এখানে। তাদের ঘর বানানোর পদ্ধতিটা দারুণ। মাটি ও বালির ছাদের নিচে তারা একসঙ্গে অনেক ঘর বানায় যাতে গরমটা কম লাগে। মাটি, চুন আর গাছের গুঁড়ি দিয়ে বানানো এসব ঘরকে ‘ঐতিহ্য বা হেরিটেজ’ ঘোষণা করেছে ইউনেস্কো। বাংলাদেশে গরম এলে জ্বর, পেট খারাপের রোগ, ডায়রিয়া, হাম আর বসন্তসহ আরও কিছু রোগের প্রাদুর্ভাব হয়। মরুভূমির দেশে এমন অসুখ গরমের সঙ্গে না আসলেও গরম আর খেজুর সমার্থক মনে হয়। এশিয়ার সবচেয়ে উষ্ণতম স্থানের একটি ইসরায়েলের তিরাত জভি। এখানে মাত্র ৬৫০ জন মানুষের বাস, কিন্তু খেজুর গাছের সংখ্যা বিশ হাজার। খেজুর উৎপাদন আর রফতানির জন্য তিরাত জভি বিখ্যাত। মরুভূমিতে সবচেয়ে উৎকৃষ্ট খেজুর জন্মে। তিউনিসিয়ার মরুভূমি অঞ্চল কেবিলিও খেজুরের জন্য পৃথিবী বিখ্যাত। তবে কেবিলি মরুভূমিতে গরম বাড়লে এখানকার লোকজন এলাকা ছেড়ে পালায়। কারণ গরমের চোট এত বেশি যে মুরগির পাড়া ডিম সেদ্ধ হয়ে যায়। সুদানের হালফাতেও একই অবস্থা। তাপমাত্রার গড় ৩৯ থেকে ৪৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস। মোমবাতি কিংবা চকলেট গলে তরল হয়ে যায়। মালির আরাউয়ানি আর তিম্বাকতু পৃথিবীর সবচেয়ে উষ্ণতম এলাকার ভেতর দুটো। গরমে এখানে মোমবাতি গলুক আর ডিম সেদ্ধ হয়ে যাক ইরানের আহওয়াজ মরু শহর একটু ব্যতিক্রম। সমুদ্রসৈকত থেকে বেশ কাছে আহওয়াজ শহরের মানুষরা খুব ভোরে কাজে বের হয়। দুপুরের শুরুতে তারা বাসায় ফিরে যায়। পুরো আহওয়াজ হয়ে যায় জনমানব শূন্য। দুপুরের খাওয়া দাওয়া সেরে ‘ভাতঘুম’ দিয়ে সন্ধ্যার সময় বের হয় আবার। আহওয়াজ শহর জমজমাট থাকে ভোরে আর সন্ধ্যার পরে। বিদ্যুৎ বিল কিংবা গরমের হাত থেকে বাঁচতে বাংলাদেশেও একদিন এই রেওয়াজ চলে আসতে পারে। দিনের গরম থেকে মানুষ বেঁচে যাবে, থাকবে বাসাবাড়িতে। সন্ধ্যা থেকে শুরু হবে কাজকর্ম অফিস আদালত, স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়। রমজান এলে সব শুরু হবে ইফতারির পর, শেষ হবে সেহরির সময়। ব্যবসা তাতে আরও বাড়বে, ইফতার ও সেহরি পার্টি আরো জমবে। ঘড়ির কাঁটা একঘণ্টা এগিয়ে নেওয়ার মতো একটা দিনও এগিয়ে নেওয়া যেতে পারে শুধু গরমের হাত থেকে বাঁচার জন্য।

গরমের শেষে তুমুল ঝড় তুফান আসার রেওয়াজ বহুদিনের। এলাকাভেদে এই ঝড় তুফানের চরিত্র এক হলেও নাম ভিন্ন। গোলাপকে যে নামে ডাকা হোক সে যেমন গন্ধই বিলাবে তেমনি ঝড় তুফান কিছু না কিছু ধ্বংস করে যাবে। ভারতীয় উপমহাদেশে এই ঝড় তুফানের নাম সাইক্লোন (গ্রিক শব্দ কাইক্লোস থেকে এসেছে যার মানে কুণ্ডলি পাকানো সাপ) আবার আটলান্টিক মহাসাগর এলাকায় এটার নাম হ্যারিকেন আর প্রশান্ত মহাসাগরীয় এলাকায় এই ঝড়ের নাম টাইফুন। বাংলাদেশের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া ঝড়গুলোর নামও বিচিত্র, কিন্তু স্বাধীন হওয়ার পর যে ঝড় বাংলাদেশের ওপর সর্বোচ্চ তাণ্ডব চালায় ও লাখো মানুষের মৃত্যুর কারণ হয় ১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিলের সেই ঝড়ের কোনও নাম ছিল না। এই ঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের কারণে সেই সময়ে সদ্য ক্ষমতাসীন খালেদা জিয়াকে কেউ কেউ নাম দিয়েছিলেন ‘তুফানি বেগম’। ঝড় নিয়েও রাজনীতি হয় সে কথায় পরে আসা যাবে। ২০০৭ সালের ১৫ নভেম্বর ‘সিডর’ নামের যে ঝড় হয়েছিল তাতে মারা গিয়েছিলেন কয়েক হাজার মানুষ। লাখো মানুষ তাদের সর্বস্ব হারিয়েছিলেন। ঝড়ের দিনে জন্ম নেওয়া শিশুরাও আলোচিত হয়েছিল যাদের দুই একজনের নাম রাখা হয়েছিল সিডর। ২০০৯ সালের ২৫ মে বাংলাদেশের ওপর দিয়ে বয়ে গিয়েছিল ‘আইলা’ নামের ঝড়। এরপর ২০১৩ সালের মে মাসে এসেছিল ঝড় ‘মহাসেন’ এবং ২০১৭ সালের ৩০ মে এসেছিল ঘূর্ণিঝড় ‘মোরা’। একসময় ঝড়ের নাম হতো নারীদের নামে।  প্রথম দিকে যারা ঝড়ের নাম দিতেন তারা হয়তো নারীবিদ্বেষী ছিলেন। নারীবাদীদের তুমুল সমালোচনার মুখে এই রেওয়াজ বদলে যায়, এখন ঝড়ের জন্য বিভিন্ন দেশ থেকে নাম চাওয়া হয় এবং ইংরেজি বর্ণমালার ক্রম অনুসারে ঝড়ের নাম হয়ে থাকে। ভারত মহাসাগরে এরপর যে ঝড় আসবে সেসবের নাম হবে বুলবুল, সোবা, দাস, হিকা, কায়ের, আমপান প্রমুখ।

কথায় আছে ক্ষমতার গরম আর টাকার গরমের কাছে মরুভূমির গরম বা ঝড় তুচ্ছ। গরমে মানুষ যেমন বৃষ্টি বা ঠান্ডামুখী হয় তেমনি অনেকে যায় সমুদ্রস্নানে। তবে আবহাওয়ার পূর্বাভাস জেনে তারপর সমুদ্রস্নানে যাওয়া ভালো। নাহলে বিপত্তি ঘটতে পারে।  

বিশেষ দ্রষ্টব্য: ২০১৯-এর মে মাসের শুরুতে ‘ফণী’ নামের ঝড় তাণ্ডব চালিয়ে গেলো মূলত ভারত আর বাংলাদেশে। বাংলাদেশে এই ফণী নিয়ে যা যা হয়েছে এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যে ঝড় বয়ে গেছে তার সারাংশ করলে দাঁড়াবে-(প্রিয় পাঠক এসব পুরোটাই ফান। সিরিয়াসলি নেওয়ার কিছু নেই, কারণ ফণী নিজেই নাই হয়ে গেছে)

এক. ফণী’র সাথে সেলফি তোলা গেল না। শয়তানটা মনে হয় ট্রাম্পের চেয়েও নিজেকে বেশি শক্তিশালী ভেবেছিল। শেষমেশ বিএনপির মতো দুর্বল হয়ে মুখ থুবড়ে পড়েছে!

দুই. বিএনপি বলেছে এই ঝড় আওয়ামী লীগ ভারত থেকে আমদানি করতে চেয়েছিল। জনগণ তা প্রতিহত করেছে বলে ঝড় মুখ থুবড়ে পড়েছে। অন্যদিকে আওয়ামী লীগ বলেছে সেনা-নৌ-বিমানবাহিনী ছিল পুরোপুরি প্রস্তুত। আর বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের কারণে আগাম যে তথ্য ও পূর্বাভাস মিলেছে (বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের এই পারঙ্গমতা এতোদিন দেশ ও জাতি জানতো না!) সেসব দিয়ে এই ঝড়কে প্রতিহত করা গেছে। যারা ঝড় নিয়ে রাজনীতি করে তাদের ‘ফণী’ ঝড়ের মতোই প্রতিহত করুন।

তিন. শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত হু.মু.এরশাদ একটা কবিতা লেখা শুরু করেছেন, যার প্রথম কয়েক লাইন এমন-

মনে পড়ে প্রিয় ফণী?

ফণীমনসা নাম তোমার

আমি ডাকতাম শুধু ফণী–

আজও  তুমি স্মৃতিতে অমর

যেন আমার চোখের মণি!!

লেখক: রম্যলেখক

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ